বিসিএস কী কেন এবং সাফল্যের খুঁটিনাটি

ড. মোহাম্মদ আমীন, বিসিএস (প্রশাসন), ১০ম ব্যাচ

সিসিএস থেকে বিসিএস। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি যেসব স্থানীয় অফিসারদের পৃষ্ঠপোষকতায় দেশীয় সংস্থাগুলোর বাণিজ্যিক কার্যক্রম পরিচালনা করত তারা সুপারভাইজার নামে পরিচিত ছিল। ব্রিটেন হতে আগত কোম্পানির সিভিল সার্ভেন্টদের বলা হতো কভেন্যান্টেড সিভিল সার্ভেন্ট। ব্রিটিশ সিভিল সার্ভিসের সদস্যরা চাকরির জন্য ভারত-সচিবের সঙ্গে চুক্তিতে আবদ্ধ হয়ে কাজ করতেন। তাই পদটির নাম রাখা হয়েছিল কভেন্যান্টেড সিভিল সার্ভিস (সিসিএস)।

১৭৮৬ খ্রিষ্টাব্দে লর্ড কর্নওয়ালিস কোডের অধীনে পুনর্গঠিত সিভিল সার্ভিসকে বলা হতো ‘কভেন্যান্টেড সিভিল সার্ভিস অফ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি’। ১৮৫৩ খ্রিষ্টাব্দে সর্বশেষ চার্টার অ্যাক্ট জারি হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত কভেন্যান্টেড সিভিল সার্ভিসে ভারতীয়দের

finding chi

নিয়োগ নিষিদ্ধ ছিল। এই বছর চার্টার অ্যাক্ট জারি এবং পৃষ্ঠপোষকতার মাধ্যমে নিয়োগের ব্যবস্থা বিলোপ করে প্রতিযোগিতার মাধ্যমে নিয়োগের প্রক্রিয়া শুরু করা হয়। তখন থেকেই ভারতীয়দের জন্য সিভিল সার্ভিসের দ্বার উন্মুক্ত হয়। ১৮৬১ খ্রিষ্টাব্দে কভেন্যান্টেড সিভিল সার্ভিসের নতুন নামকরণ হয় ইন্ডিয়ান সিভিল সার্ভিস (আইসিএস)।

১৮৫৩ খ্রিষ্টাব্দে ভারতীদের জন্য আইসিএসের দ্বার উন্মুক্ত করে দেওয়া হলেও ১৮৬৩ খ্রিষ্টাব্দের পূর্ব পর্যন্ত কোনো ভারতীয় আইসিএস-এর সদস্য হতে পারেননি। কারণ তখন শুধু ইংল্যান্ডে আইসিএস পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হতো। ভারতীয় প্রার্থীদের ইংল্যান্ডে গিয়ে প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়া ছিল প্রায় অসম্ভব। ১৮৬৩ খ্রিষ্টাব্দে ভারতীয় হিসেবে সর্বপ্রথম আইসিএস পাস করেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জ্যেষ্ঠ ভাই সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুর। ১৮৯৩ খ্রিষ্টাব্দে ব্রিটিশ পার্লামেন্ট আইসিএস পরীক্ষা একই সঙ্গে ইংল্যান্ড ও ভারতে অনুষ্ঠানের সিদ্ধান্ত নেয়। ১৯২৭ খ্রিষ্টাব্দে অন্নদাশঙ্কর রায় আইসিএস পরীক্ষায় প্রথম স্থান অধিকার করেন। ব্রিটিশ-ভারতের নিযুক্ত শেষ আইসিএস অফিসার নির্মল মুখোপাধ্যায়।

বাংলাদেশ সরকারের সিভিল সার্ভিস তথা বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিস এর সংক্ষিপ্ত রূপ বিসিএস। ব্রিটিশ আমলে এর নাম ছিল ইন্ডিয়ান সিভিল সার্ভিস (আইসিএস) এবং পাকিস্তান আমলে যার নাম হয় সেন্ট্রাল সুপিরিয়র সার্ভিস অব পাকিস্তান বা সিএসপি। স্বাধীনতার পর সিভিল সার্ভিস অধ্যাদেশের দ্বারা নাম পরিবর্তন করে ‘বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিস’ করা হয়। এর মূলনীতি ও ব্যবস্থাপনাদি বাংলাদেশ সরকারি কর্ম কমিশন দ্বারা নির্ধারিত হয়। বর্তমানে, বিসিএস এর ক্যাডার সংখ্যা ২৬। প্রসঙ্গত, কিছুদিন আগেও বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিসে ২৭টি ক্যাডার ছিল। ২০১৮ খ্রিষ্টাব্দের ১৩ই নভেম্বর পিএসসির সুপারিশক্রমে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়, ইকোনমিক ক্যাডারকে প্রশাসন ক্যাডারের সঙ্গে একীভূত করে গেজেট প্রকাশ করে। ফলে বিসিএস ক্যাডারের সংখ্যা ২৬ হয়ে যায়। এই ২৬টি ক্যাডারের মধ্যে ১৪টি সাধারণ ক্যাডার এবং ১৩টি পেশাগত বা কারিগরি ক্যাডার রয়েছে। ক্যাডারগুলোর নাম নিচে দেওয়া হলো :
১. সাধারণ ক্যাডার
বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিস (প্রশাসন)
বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিস (আনসার)
বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিস (নিরীক্ষা ও হিসাব)
বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিস (সমবায়)
বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিস (শুল্ক ও আবগারি)
বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিস (পরিবার পরিকল্পনা)
বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিস (খাদ্য)
বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিস (পররাষ্ট্র)
বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিস (তথ্য)
বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিস (পুলিশ)
বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিস (ডাক)
বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিস (রেলওয়ে পরিবহন ও বাণিজ্যিক)
বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিস (কর)
বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিস (বাণিজ্য)
২. প্রফেশনাল ক্যাডার
বিসিএস (সড়ক ও জনপথ)
বিসিএস (গণপূর্ত)
বিসিএস (জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল)
বিসিএস (বন)
বিসিএস (স্বাস্থ্য)
বিসিএস (রেলওয়ে প্রকৌশল)
বিসিএস (পশু সম্পদ)
বিসিএস (মৎস)
বিসিএস (পরিসংখ্যান, গবেষণা কর্মকর্তা)
বিসিএস (কারিগরী শিক্ষা)
বিসিএস (কৃষি)
বিসিএস (খাদ্য)
বিসিএস (সাধারণ শিক্ষা)

বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিস বা বিসিএস পরীক্ষা হচ্ছে সিভিল সার্ভিসে নিয়োগ লাভের যোগ্যতা অর্জনের পরীক্ষা। পিএসসি বা পাবলিক সার্ভিস কমিশন এই পরীক্ষার আয়োজন করে থাকে। পাবলিক সার্ভিস কমিশনের প্রধানকে চেয়ারম্যান বলা হয়। সিভিল সার্ভিস কথার আভিধানিক অর্থ বেসামরিক চাকুরি, সাধারণ বোধগম্য অর্থ সরকারি চাকুরি। সরকারি চাকুরি প্রধানত দু ভাগে বিভক্ত। প্রথম হচ্ছে মিলিটারি সার্ভিস বা সামরিক চাকুরি এবং দ্বিতীয় হচ্ছে সিভিল সার্ভিস বা বেসামরিক চাকুরি। সামরিক চাকুরি বলতে সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী ও বিমান বাহিনীর চাকুরি বোঝায়। এছাড়া অন্য সব চাকুরিকে বেসামরিক চাকুরি বলে। বেসামরিক চাকুরি সাধারণভাবে প্রশাসন, পুলিশ, আয়কর, পররাষ্ট্র, কাস্টমস, অডিট, আনসার, শিক্ষা প্রভৃতি-সহ ২৯ টি ক্যাডারে বিভক্ত। এছাড়াও রয়েছে জুডিশ্যল সার্ভিস, বিভিন্ন স্বায়ত্বশাসিত প্রতিষ্ঠান, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক প্রভৃতি। ক্যাডার হচ্ছে কোনো নির্দিষ্ট কার্য সম্পাদনের জন্য জন্যে বিশেষভাবে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত একটি দল। বেসামরিক চাকুরিতে নিয়োগপ্রাপ্ত কর্মচারীদের নির্দিষ্ট দায়িত্ব পালনের জন্য বিশেষ প্রশিক্ষণ দিয়ে গড়ে তোলা হয়। তাই এদের বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিস ক্যাডার বা বিসিএস ক্যাডার বলা হয়। এরা প্রথম শ্রেণির কর্মকর্তা। এদের নিয়োগ সরকার, গেজেট বা বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে রাষ্ট্রপতির আদেশক্রমে জারি করে থাকে। তাই তাদের প্রথম শ্রেণির গেজেটেড কমকর্তাও বলা হয়। যদিও প্রকৃতপক্ষে রাষ্ট্রপতি এসবের কিছুই জানতে পারেন না। এরপর আছে দ্বিতীয়, তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী।

ক্যাডার প্রধানত দুই প্রকার। যথা : সাধারণ ক্যাডার এবং পেশাগত বা কারিগরি ক্যাডার। প্রশাসন, পুলিশ, পররাষ্ট্র, কাস্টমস, অডিট, আনসার, ট্যাক্স প্রভৃতি সাধারণ ক্যাডার। সাধারণ ক্যাডারে যে কেউ, তিনি যে বিষয় নিয়ে অধ্যয়ন করুন না কেন, নিয়োগ লাভের পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করতে পারেন। তবে, পেশাগত বা কারিগরিক ক্যাডারে নিয়োগ পেতে হলে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে অধ্যয়ন করতে হয়। যেমন, বিসিএস (স্বাস্থ্য) ক্যাডারে পরীক্ষা দিতে হলে আপনাকে এমবিবিএস পাস করতে হবে। অন্য কোনো ডিগ্রি থাকলে হবে না। প্রকৌশল বিষয়ক ক্যাডারে নিয়োগ পেতে চাইলে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে প্রকৌশল বিদ্যায় পাস হতে হবে। তবে সাধারণ ক্যাডারে ডাক্তার-ইঞ্জিনিয়ার, কৃষিবিদ সবাই নিয়োগলাভের জন্য আবেদন করার যোগ্য।
বিসিএস পরীক্ষা যে কেউ দিতে পারেন না। এই পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করতে হলে নির্দিষ্ট যোগ্যতা থাকতে হয়। কাউকে বিসিএস পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করতে হলে তাকে বাংলাদেশের নাগরিক হতে হবে, নির্দিষ্ট বয়স নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে থাকতে হবে, যে কোনো বিষয়ে চার বছরের অনার্স বা সমমানের ডিগ্রি থাকতে হবে। তিন বছরের অনার্স এবং এক বছরের মাস্টার্স করা প্রার্থীরাও পরীক্ষা দিতে পারবেন। বিদেশে অধ্যয়ন করেছেন এমন বাংলাদেশি নাগরিকও বিসিএস পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করতে পারবেন। তবে তাদের শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে এরূপ সনদ নিতে হবে যে, বিদেশে অর্জিত ডিগ্রি কমপক্ষে বাংলাদেশে প্রদত্ত চার বছরের ডিগ্রির সমমর্যাদা বহন করে।

বিসিএস পরীক্ষায় পাস করার জন্য কমপক্ষে অনার্স পাস করতে হয়। তবে, বিজ্ঞপ্তিতে বর্ণিত তারিখের মধ্যে অনার্স এর সব বিষয়ের পরীক্ষা শেষ হয়েছে, কিন্তু রেজাল্ট দেওয়া বাকি আছে- উপযুক্ত কর্তৃপক্ষ তথা বিভাগীয় প্রধানের কাছ থেকে পরীক্ষায় অংশগ্রহণের এরূপ সনদ যুক্ত করলে অনার্স পাস করার আগেও বিসিএস পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করা যায়। তবে, মৌখিক পরীক্ষার সময় অনার্স পাসের সনদ নিয়ে যেতে হয়। আমি দশম বিসিএস-এ অনার্স পরীক্ষায় অংশগ্রহণের সনদ সনদ দিয়ে অংশগ্রহণ করেছিলাম।

অনেকে মনে করেন, প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্জিত ডিগ্রিধারীদের বিসিএস পরীক্ষায় অবমূল্যায়ণ করা হয়। কথাটি ঠিক নয়। আপনি সরকারি- বেসরকারি, শহর বা গ্রাম, মাদ্রাসা- যে প্রতিষ্ঠান থেকে ডিগ্রি অর্জন করুন না কেন, বিসিএস পরীক্ষা দিতে পারবেন। তবে সর্বক্ষেত্রে বিসিএস পরীক্ষায় অংশগ্রহণের ন্যূনতম শিক্ষাগত যোগ্যতা থাকে। বিসিএস ক্যাডার পদে নিয়োগ লাভের যোগ্যতা আপনার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের উপর নির্ভর করবে না, নির্ভর করবে আপনি পরীক্ষার খাতায় কী লিখলেন, কত নম্বার পেলেন, ভাইভা পরীক্ষায় কেমন যোগ্যতা দেখালেন তার উপর, অন্য কিছুর উপর নয়। অধিকন্তু, আপনার অধীত বিষয় যেটাই হোক না, আপনি বিসিএস সাধারণ ক্যাডারে নিয়োগ প্রাপ্তির যোগ্যতা থাকলে পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করতে পারবেন।
আমার এক আত্মীয় কিছুদিন আগে আমার সঙ্গে দেখা করতে এলেন। তখন আমি একটি সরকারি কোম্পানির সচিব পদে নিয়োজিত। আত্মীয় আমাকে বললেন, তার এক বন্ধুর চাচাত ভাইয়ের ছেলে পঁচিশ লাখ টাকা দিয়ে এএসপি হয়ে গেছেন। নামও বললেন। পরে আমি খবর নিয়ে দেখলাম, ওই নামের একটা ছেলে এএসপি হয়েছেন। তবে পঁচিশ লাখ টাকা ঘুস দিয়ে হয়েছেন কি না জানি না। আমিও বিসিএস পরীক্ষা দিয়েছি। ছবি, সনদ ফটোকপি, বিসিএস ফরম ক্রয়, মেডিক্যাল টেস্ট প্রভৃতি-সহ পাঁচশ টাকা মতো খরচ হয়েছিল। এখন শুনি, পঁচিশ লাখ টাকা দিলে নাকি বিসিএস ক্যাডারের চাকুরি হয়ে যায়। আমার কথা হচ্ছে, ওই বয়সে আমার যদি পঁচিশ লাখ টাকা দেওয়ার সামর্থ্য থাকে, তাহলে আমি চাকুরি করব না, ব্যবসায় করব। চাকর শব্দ থেকে চাকুরি। তবে আপনি যদি মনে করেন, পঁচিশ লাখ খরচ করে চাকুরি নিয়ে বিশ কোটি টাকা আয় করবেন, তাহলে নিয়ে নিন। আর যদি যোগ্যতা না থাকে, এসব উড়ো খবরে মন না দিয়ে মন দিয়ে লেখাপড়া করুন। পঁচিশ লাখ টাকা বেঁচে যাবে।

কোটা বহির্ভূত অনেক প্রার্থী আমাকে বলেন, কোটা সব পদ দখল করে নেয়, আমাদের কী হবে? আমি কীভাবে টিকব? আমারও কোটা ছিল না, আমি কীভাবে টিকলাম? আমার অনেক পরিচিত ছেলে বিসিএস পাস করেছে, কোটা ছাড়াই। তাহলে আপনি হবেন না কেন? কোটার প্রতি যদি আপনার এত ঘৃণা থাকে, তাহলে আপনি কোটাধারী হলে আপনিও ঘৃণার পাত্র হয়ে যেতেন। আসলে কোটা কোনো বিষয় নয়, বিষয় হচ্ছে আপনি পরীক্ষায় কত নম্বর পেলেন। আর পরীক্ষায় ভালো নম্বর পেতে হলে অনুগ্রহপূর্বক এসব কোটা-কোঠা বাদ দিয়ে পড়তে বসে যান এক্ষুনি।

অনেকে বলেন, বিসিএস পরীক্ষায় পাস করতে হলে চেহারা-সুরুত সুন্দর হতে হয়। তা সত্য হলে আমি কখনো বিসিএস পাস করতে পারতাম না। আমি যখন বিসিএস পরীক্ষা দিচ্ছি, তখন আমার চেহারা ছিল, অনেকটা পিয়নের মতো। আমার এক বান্ধবী ডাকত চিকা। বিশ্ববিদ্যালয়ের সবচেয়ে কুশ্রী মেয়েটাও আমার সঙ্গে প্রেম করা দূরে থাক, পাশে বসতে পর্যন্ত ঘৃণা করত। অভিজ্ঞতা থেকে বলছি, বিসিএস পরীক্ষায় প্রার্থীর চেহারা এবং অবয়ব, মাথার চুল, চোখের রং, হাতের স্নিগ্ধতা- কিছুই বিবেচনা করা হয় না। বিবেচনা করা হয়, শুধু আপনার প্রজ্ঞা। আমি এমন অনেক প্রার্থীকে প্রশাসনের মতো ক্যাডার পেতে দেখেছি, যার উচ্চতা চার ফুটের মতো। তবে পুলিশ ও আনসার ক্যাডারে উচ্চতার একটা বিষয় আছে। মনে রাখবেন, বিসিএস পরীক্ষায় মগজের স্পন্দন যাচাই করা হয়, সিনেমার নায়ক-নায়িকার মতো উপরের চেহারা নয়।

বিসিএস পাস করে ক্যাডার হতে হলে কত নম্বর পেতে হয়, তা এই পুস্তকে বর্ণিত প্রফেসর রচনার ভাইভা হতে জেনে নিতে পারবেন। বিসিএস পরীক্ষায় লাখ লাখ পরীক্ষার্থী অংশগ্রহণ করে। এটি পাস-ফেলের পরীক্ষা নয়, প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষা। আপনি কত নম্বর পেয়েছেন, তার উপর আপনার সফলতা নির্ভর করে না, আপনি অন্যদের চেয়ে কত বেশি পেয়েছেন তার উপর আপনার সফলতা নির্ভর করে। ধরুন, আপনি ১১০০ নম্বরের মধ্যে ১০৫০ পেয়েছেন, তারপরও আপনি নিশ্চিত হতে পারবেন না। কারণ, যে সংখ্যক পদ খালি আছে এবং সে অনুপাতে যত জনকে ক্যাডার দেওয়া হবে, তারা ১০৫০ এর উপরে পেতে পারেন। অতএব, এসব চিন্তা না করে ভালোভাবে পড়ে যান। প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার প্রশ্ন সহজ হওয়া মানে আপনার সফলতার হার কমে যাওয়া। কারণ প্রশ্ন সহজ হলে, তা শুধু আপনার জন্য হয়নি, সবার জন্য হয়েছে।

অনেকে বলেন বিসিএস পরীক্ষায় পাস করতে হলে গাধার মতো খাটুনি দিতে হয়। এটি সম্পূর্ণ ভুল এবং মিথ্যা কথা। ধীরস্থিরভাবে সময় নিয়ে এগিয়ে যান, গাধার শ্রম নয়, বুদ্ধিমত্তাই আপনাকে এগিয়ে নিয়ে যাবে। যারা গর্দভ তারাই গাধার মতো পরিশ্রম করতে পারে, মানুষ কখনও গর্দভের মতো পরিশ্রম করতে পারে না এবং প্রয়োজনও নেই। মানুষ পরিশ্রম করে চিন্তা দিয়ে, ভাবনা দিয়ে। শক্তি দিয়ে বড়ো জোর ভালো কুলি হওয়া যায়, প্রকৌশলী নয়- বিসিএস ক্যাডার তো নয়ই। প্রকৌশলী হতে হলে আপনাকে কুশলী হতে হবে। আমি বিসিএস পরীক্ষায় পাস করেছি এবং পড়েছিও, তবে তা গাধার মতো শ্রম দিয়ে নয়, প্রতিদিন অল্প অল্প করে পড়েছি।

বিসিএস পরীক্ষায় পাস করতে হলে যেসব বিষয় পড়তে হয়, তা আয়ত্তে আনার জন্য গাধা না হয়ে কুশলী হোন, হাতে প্রচুর সময় রেখে অধ্যয়ন শুরু করেন। প্রতিদিন অল্প অল্প করে পড়–ন; দেখবেন, বিসিএস পরীক্ষার পড়াগুলো আপনার কাছে পড়া মনে হচ্ছে না, মনে হচ্ছে নতুন জানার আনন্দে বিভোর একটি আকর্ষণীয় মহাকাব্য। এভাবে আপনি গাধার মতো বীভৎস শ্রম দিয়ে অধ্যয়নকারী গর্দভদের সহজে হারিয়ে দিতে পারবেন। গাধা কখনো মানুষের সঙ্গে পারে না।

অনেক ডাক্তার ইঞ্জিনিয়ার এবং বিশেষায়িত সনদের অধিকারী, তাদের জন্য নির্দিষ্ট পদ থাকা সত্ত্বেও বিসিএস পরীক্ষায় সাধারণ ক্যাডারে সদস্য হওয়ার জন্য প্রতিযোগিতায় অবতীর্ণ হন। এটি আইনগতভাবে যাই হোক, আমি মনে করি নৈতিকভাবে মোটেও উচিত নয়। আমাদের দশম ব্যাচে অনেক ডাক্তার ইঞ্জিনিয়ার এবং এরূপ বিশেষায়িত সনদধারী কিছুসংখ্যক প্রার্থী বিসিএস ক্যাডারে সুযোগ পেয়েছেন। কয়েক বছর পর দেখলাম, ডাক্তার সাহেবের সব ডাক্তারি বিদ্যা, ইঞ্জিনিয়ার সাহেবের সব ইঞ্জিনিয়ারিং বিদ্যা শেষ। সরকার এত খরচ করে তাদের বিশেষায়িত হিসেবে গড়ে তুলছেন- সাধারণ ক্যাডারের জন্য নয়। যদি সাধারণ ক্যাডারে চাকুরি করার ইচ্ছে থাকে, তাদের উচিত প্রথম থেকে তা করা। তবে, সৌভাগ্যের কথা, এরা তুলনামূলকভাবে অনেক মেধাবী হলেও সে অনুপাতে বিসিএস সাধারণ ক্যাডারে বেশি সুযোগ পান না। কারণ, বিশেষায়িত বিষয় অধ্যয়নে এত বেশি মগ্ন থাকতে হয় যে, তারা বিসিএস-এর মতো সাধারণ জ্ঞান আহরণে তেমন সময় দিতে পারেন না।

পত্রিকায় বিসিএস পরীক্ষার বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়। বিজ্ঞপ্তি পাওয়ার পর আগ্রহী প্রার্থীর প্রথম কাজ হবে তা খুব ভালোভাবে পড়ে নেওয়া। তারপর নির্দেশনামতে ফরম পূরণ করে যথাসময়ে যথানিয়মে জমাপ্রদান করা। আবেদনপত্র পূরণে ভুল হলে বা অসম্পূর্ণ থাকলে তা বাতিল হয়ে যায়। তাই সতর্কতার সঙ্গে এটি পূরণ করে নির্দিষ্ট তারিখের মধ্যে নির্দিষ্ট স্থানে জমা দিতে হবে।
জাতীয় পরিচয়পত্রে আপনি যে স্বাক্ষর দিয়েছেন, বিসিএসের আবেদন ফরমেও সেই স্বাক্ষর দেবেন। তাহলে ভবিষ্যতে অনেক জটিলতা থেকে রেহাই পাবেন।

বিসিএস-এর আবেদন ফরমে অবশ্যই সাম্প্রতিক তোল ছবি ব্যবহার করবেন। তবে, ছবিটি যেন এমনভাবে এডিট বা পরিবর্তন করা না হয়, যাতে আপনার বয়স, গায়ের রঙ, মুখাবয়ব, স্বাস্থ্য ইত্যাদি প্রকৃত অবস্থা হতে ভিন্ন হয়ে যায়। তাহলে পুলিশ ভ্যারিফিকেশনেও জটিলতা সৃষ্টি হতে পারে। কাউকে বিশ্বাস নেই।

আর একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে ঠিকানা। বর্তমান ঠিকানায় আপনি যদি দীর্ঘদিন অবস্থান না-করেন, কিংবা দীর্ঘদিন অবস্থান করলেও ওই এলাকায় আপনার তেমন পরিচিত না থাকে, তাহলে পুলিশ ভ্যারিফিকেশন-সহ নানা ঝামেলা এড়ানোর জন্য স্থায়ী ঠিকানাকেই বর্তমান ঠিকানা হিসেবে উল্লেখ করবেন। সেক্ষেত্রে আপনার স্থায়ী ঠিকানা ও বর্তমান ঠিকানা হবে অভিন্ন।বিস্তারিত :বিসিএস প্রিলিমিনারি থেকে ভাইভা কৃতকার্য কৌশল


এখানে বিসিএস সহায়ক কয়েকটি বইয়ের নাম দেওয়া হলো। বইগুলো সংগ্রহ করতে পারেন:

আলমগীর ০১৯১৫১-৬৫৩৩৩ (পুথিনিলয়)।
মাসুদুল হক : ০১৮১৭০৯১৩৮৬ (উত্তরণ)।
ওসমান গনি : ০১৮১৯-২১৯০২৪ (আগামী প্রকাশনী)।
তুষার প্রসূন : ০১৯৮০-১০৫৫৭৭ (অনুভব প্রকাশনী)।
মাকসুদ : ০১৭২৬-৯৫৬১০৪ (হাওলাদার প্রকাশনী)।

অথবা রকমারি ডট কম বা অন্যান্য অনলাইন গ্রুপ কিংবা নিকটস্থ লাইব্রেরিতে বলতে পারেন।

error: Content is protected !!