অংশগ্রহণ, অংশ গ্রহণ; অভ্যন্তরীণ আভ্যন্তরীণ আভ্যন্তর, আভ্যন্তরিক; উপরোক্ত উপরিউক্ত; উর্পযুক্ত; কি না ও কিনা

ড. মোহাম্মদ আমীন

অংশগ্রহণ, অংশ গ্রহণ; অভ্যন্তরীণ আভ্যন্তরীণ আভ্যন্তর, আভ্যন্তরিক; উপরোক্ত উপরিউক্ত; উর্পযুক্ত; কি না ও কিনা

অংশগ্রহণ এবং অংশ গ্রহণ

অংশ’ ও ‘গ্রহণ’ শব্দদুটো পরস্পর সেঁটে বসে গঠন করেছে নতুন শব্দ অংশগ্রহণ। এখানে ‘অংশ’ ও ‘গ্রহণ শব্দের সার্থক মিলন ঘটেছে। ফলে উভয়ের অর্থ বা মৌলিকত্ব বহুলাংশে ক্ষুণ্ন হয়েছে। যেমনটি হয়ে থাকে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হলে। অন্যদিকে, ‘অংশ গ্রহণ’ দুটি পৃথক শব্দ নিয়ে গঠিত। এখানে ‘অংশ’ ও ‘গ্রহণ’ পরস্পর নিরাপদ দূরত্বে অবস্থানপূর্বক বাক্য-সমাজের শালীন শব্দ-ফাঁক বজায় রেখে অবস্থান করে। তাই অবিবাহিত নারী-পুরুষের মতো উভয় শব্দের অর্থ বা মৌলিকত্ব অক্ষুণ্ন থেকে যায়। ‘অংশগ্রহণ’ শব্দের অর্থ যোগ দেওয়া। যেমন : সভাপতি সাহেব যথাসময়ে সভায় অংশগ্রহণ করেছেন। ‘অংশ গ্রহণ’ বাগ্‌ভঙ্গির অর্থ ভাগ নেওয়া। যেমন : সমিরা তার পিতার সম্পত্তির প্রাপ্য অংশ গ্রহণ করেছেন। অতএব ‘অংশগ্রহণ’ অর্থে ‘অংশ গ্রহণ’ লেখা সমীচীন নয়।

অভ্যন্তরীণ আভ্যন্তরীণ আভ্যন্তর, আভ্যন্তরিক
 
অভ্যন্তর (অভি + অন্তর) শব্দের অর্থ ভেতর, মধ্য, অন্তপুর। এটি বিশেষ্য। ‘অভ্যন্তরীণ’ শব্দের অর্থ মধ্যবর্তী, অভ্যন্তরে আছে এমন, ভেতরের প্রভৃতি। এটি বিশেষণ। ‘আভ্যন্তর’ শব্দের অর্থ ভেতর, মধ্য প্রভৃতি। এটিও বিশেষ্য। ‘আভ্যন্তরিক’ শব্দের অর্থ অভ্যন্তরস্থ, অভ্যন্তরীণ প্রভৃতি। এটি বিশষণ। ‘অভ্যন্তর’ শব্দের সঙ্গে বিভিন্ন প্রত্যয় যুক্ত হয়ে শব্দগুলো গঠিত হয়েছে। যেমন : অভ্যন্তর + অ = আভ্যন্তর; অভ্যন্তর + ঈন = অভ্যন্তরীণ; অভ্যন্তর + ইক = আভ্যন্তরিক।

উপরোক্ত উপরিউক্ত এবং উর্পযুক্ত

‘উপরি’ থেকে ‘উপর’ এবং তা থেকে উপরিউক্ত এবং উপর্যুক্ত। বাক্যে অব্যয় ও ক্রিয়াবিশেষণ হিসেবে ব্যবহৃত সংস্কৃত ‘উপরি (ঊর্ধ্ব+রি) শব্দ হতে ‘উপর’ শব্দের উদ্ভব। কাজেই ‘উপরি’ সংস্কৃত শব্দ নয়, বাংলা শব্দ। ‘উপর’ শব্দের সঙ্গে ‘উক্ত’ শব্দের সন্ধির ফলে ‘উপরোক্ত’ শব্দ গঠিত হয়েছে। প্রসঙ্গত, ‘উপর’ শব্দের সঙ্গে যুক্ত “উক্ত (√বচ্ + ক্ত)” শব্দটি তৎসম।
 
সংস্কৃতঘেষা বৈয়াকরণগণ মনে করেন, একটি অতৎসম শব্দের সঙ্গে আরেকটি তৎসম শব্দের সন্ধি বিধেয় নয়। যেমন : বিধেয় নয় ব্রাহ্মণ শূদ্র সামাজিক সম্পর্ক, প্রেম-পিরিত। তাই বৈয়াকরণগণ এ অভিমত ব্যক্ত করেন যে, বাংলা তথা শূদ্র ‘উপর’ শব্দের সঙ্গে সংস্কৃত তথা ব্রাহ্মণ ‘উক্ত’ শব্দের সন্ধি না-করে সংস্কৃত ‘উপরি’ শব্দের সঙ্গে সংস্কৃত ‘উক্ত’ শব্দের সন্ধি করাই সমীচীন। সেক্ষেত্রে এই সন্ধির ফলে জাত শব্দটি হয় : উপরি-উক্ত বা উপরিউক্ত। বাংলা একাডেমি আধুনিক বাংলা অভিধানে কেবল এই উপরিউক্ত শব্দটিকে প্রমিত করা হয়েছে।
অন্যদিকে, সংস্কৃত ‘উপরি’ শব্দের সঙ্গে সংস্কৃত ‘যুক্ত (√যুজ্+ত)’ শব্দের সন্ধি করলে পাওয়া যায় : “উপরি+যুক্ত= উপর্যুক্ত’’। তাই বৈয়াকরণগণ, উপরোক্ত শব্দের পরিবর্তে উপরিউক্ত বা উপর্যুক্ত লেখা সমর্থন করে এই শব্দটিকে প্রমিত নির্দেশ করেছে। যদিও বাংলামতে, উপরোক্ত লেখা দূষণীয় হবে না। কারণ, বাংলা সংস্কৃত ভাষা নয়; আলাদা একটি ভাষা।
 
তাই বাংলা ব্যাকরণ এবং সংস্কৃত ব্যাকরণও এক নয়। সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় বলেছেন, “সংস্কৃত সন্ধির নিয়ম বাঙ্গালার পক্ষে খাটে না- বাঙ্গালা সন্ধির অন্য নিয়ম আছে”। সুতরাং, একটি কথা মনে রাখা প্রয়োজন যে, সংস্কৃত সন্ধির নিয়ম পুরোপুরি বাংলায় কার্যকর করা সম্ভব নয়। তারপরও বাংলা একাডেমি কেন উপরোক্ত শব্দকে সর্বশেষ অভিধানে রাখল না তা বোধগম্য নয়। এটি বাংলা একাডেমির স্বকীয়তা, আত্মমর্যাদাবোধ এবং ঐতিহ্যিক দীনতার পরিচায়ক।হীনম্মন্যতাও বটে।
 
কি না ও কিনা
 
‘কি না’ দুটো পৃথক শব্দ নিয়ে গঠিত একটি প্রশ্নজ্ঞাপক বাক্‌ভঙ্গি।
যেমন: ‘যাবে কি না বল?’
অন্যদিকে মনোভাবের ইঙ্গিত প্রকাশে কিংবা শুধু অলংকার হিসেবে বাক্যে ‘কিনা’ শব্দটি ব্যবহৃত হয়।
যেমন- হরতাল কিনা, তাই আসতে দেরি হয়েছে।
গণেশ ক্লাসের সবচেয়ে ভালো ছেলে কিনা!
 
‘কিনা’ শব্দটি বাক্যে অত্যাবশ্যক নয়। এটি বাদ দিলেও অর্থের হেরফের ঘটে না। কিন্তু ‘কি না’ শব্দটি বাক্য হতে তুলে নিলে বাক্যের ভাব ও অর্থের পরিবর্তন ঘটে।
যেমন: ‘যাবে কি না বল? বাক্যটি হতে ‘কি না’ বাক্‌ভঙ্গিটি সরিয়ে নিলে বাক্যটির পুরো অর্থই পাল্টে যায়।
অর্থ যখন ‘কিংবা নয়’, ‘কিংবা নেই’ বা ‘কিংবা নাই’ তখন বুঝতে হবে ‘কি’ হচ্ছে প্রকৃতপক্ষে ‘কিংবা’ শব্দের সংক্ষিপ্ত রূপ।
প্রয়োগ: তুমি খেয়েছ কি না আমি জানি না। বিশ্লিষ্ট অবস্থায় বাক্যটির রূপ হবে ‘তুমি খেয়েছ কিংবা খাওনি তা আমি জানি না।’
 
 
 
সূত্র: কোথায় কী লিখবেন বাংলা বানান: প্রয়োগ ও অপপ্রয়োগ, ড. মোহাম্মদ আমীন, পাঞ্জেরী পাবলিকেশন্স লি.
error: Content is protected !!