অতৎসম চীনা অসংগত নয়, অতৎসম ঈদ অসংগত হবে কেন

ড. মোহাম্মদ আমীন

অতৎসম চীনা অসংগত নয়, অতৎসম ঈদ অসংগত হবে কেন

সংযোগ: https://draminbd.com/অতৎসম-চীনা-অসংগত-নয়-অতৎসম/

 চিন না কি চীন? চিনদেশ না কি চীনদেশ? পত্রপত্রিকা ও বইপত্রে কমবেশি উভয় বানান দেখা যায়। বাংলা একাডেমি আধুনিক বাংলা অভিধান এবং অন্যান্য আরও অনেক অভিধানমতে  চীন সংস্কৃত শব্দ। তবে, শব্দটির আদি উৎস বা মূল সংস্কৃত ছিল না। গবেষণায় দেখা যায়— শব্দটি

আনুমানিক আড়াই হাজার বছর আগে চায়না থেকে সংস্কৃত ভাষায় ঢুকে সংস্কৃত ভাষার শব্দের ন্যায় সংস্কৃতে অঙ্গীভূত/একীভূত হয়ে  গেছে। ফলে তা সংস্কৃত শব্দ  গণ্যে  সংস্কৃত ব্যাকরণের অনুগত হয়ে পড়ে। বলা হয়— শব্দটি সংস্কৃতে যখন আসে তখনই চীন নামে প্রতিবর্ণীকৃত হয়। প্রাচীন সংস্কৃত গ্রন্থেও শব্দটির বানান ঈ-কার দিয়ে চীন লেখা— এমন দেখা যায়। মনুসংহিতা এবং মহাভারতে শব্দটির বানান করা হয়েছে চীনা।  সংস্কৃতে মিহি পশমি বস্ত্রকে চীনাংশুক বলা হতো। চীনাংশুক আসত চীন থেকে, তাই এমন নাম। প্রাচীনকালে চীনদেশের রেশম বিশ্বখ্যাত ছিল। সিল্করুট তার ঐতিহাসিক প্রমাণ। চীন ও অংশুক মিলে চীনাংশুক। অংশুক অর্থ আঁশযুক্ত তন্তু, অতি চিকন রেশম,  অতি সূক্ষ্ণ পশম প্রভৃতি। অংশু অর্থ সূর্য, সূর্যের কিরণ।  অতি মমৃণ বলে  চীনা তন্তুকে সূর্যের কিরণের সঙ্গে তুলনা করা হতো। তাই সূর্য কিরণের মসৃণতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে চীনাংশুক শব্দটির উদ্ভব। অংশুক শব্দের সঙ্গে চীন সন্ধিবদ্ধ হয়ে গঠন করে চীনাংশুক (=চীন+অংশুক)।

এবার দেখা যাক, আমাদের কাছে বাংলা বানানে  চীনদেশ নামে পরিচিত দেশটির নাম চিন হলো কী করে। বিখ্যাত চৈনিক ভাষাবিদ থান য়ুন শানের   মতে,  নামটি এসেছে তৎকালীন বর্তমান মূল চীনের একটি করদ রাজ্য থেকে। স্থানীয় ভাষায় করদ রাজ্যটির নাম ছিল চিন। চৌ বংশের রাজত্বকালে চিন নামের করদ রাজ্যটি শক্তিশালী হয়ে আশেপাশের অন্যান্য রাজ্যগুলো একে একে জয় করে খ্রিষ্টপূর্ব অষ্টম শতকের প্রথমে

 বিশাল এক  রাজ্যের নিয়ন্ত্রক হয়ে যায়। প্রাক্তন এই অঙ্গরাজ্য থেকে পুরো দেশের নাম রাখা হয় চিন বা জিং। সে হিসেবে  নামটির বানান চিন হওয়াই ছিল সমীচীন। কিন্তু সংস্কৃতে অঙ্গীভূত করার সময় প্রতিবর্ণীকরণে চীন লেখা হয়।

বাংলা একাডেমি আধুনিক বাংলা অভিধানে চীন বানানের পৃথক কোনো ভুক্তি নেই। তবে চীনা ভুক্তিতে বলা হয়েছে, “সংস্কৃত চীন থেকে উদ্ভূত চীনা অর্থ— (বিশেষ্যে) চীনদেশের অধিবাসী; (বিশেষণে) চীনদেশে উৎপন্ন; চীন দেশজ, চৈনিক। অর্থাৎ সংস্কৃত চীন থেকে উদ্ভূত চীনা শব্দটি অতৎসম। যেমন অতৎসম আরবি উৎসের ঈদ/ইদ। 
বাংলা একাডেমি আধুনিক বাংলা অভিধান অনুযায়ী (পৃষ্ঠা নং ৪৬৮) চীনা  অতৎসম শব্দ। অতৎসম চীনা বানানে ঈ-কার অসংগত না হলে অতৎসম ঈদ বানানে ঈ অসংগত হবে কেন? অথচ বাংলা একাডেমি আধুনিক বাংলা অভিধানে বহুল প্রচলিত ঈদ বানানকে অসংগত বলা হয়েছে। বলা হছে ঈদ ইদ-এর প্রচলিত ও অসংগত বানান।  আশা করি আগামী সংস্করণে বাংলা একাডেমি ঈদ বানানের পাশে অসংগত শব্দটি রাখবেন না।
ইদ বনাম ঈদ
বাংলায় ধ্বনিমূলগত বা উচ্চারণগত কোনো দীর্ঘস্বর নেই। তাই ‘ইদ’ ও ‘ঈদ’ উভয় শব্দের উচ্চারণ অভিন্ন। প্রশ্ন আসতে পারে, তা হলে বানান পরিবর্তনের কারণ কী? কারণ আছে এবং তা যথেষ্ট যৌক্তিক। শব্দের অর্থ দ্যোতনা, বানানে আদর্শমান প্রতিষ্ঠা ও সমতা রক্ষার স্বার্থে বাংলা একাডেমি, বিদেশি শব্দ হিসেবে আরবি عيد শব্দের বানান ‘ইদ’ করেছে। তবে কেউ ‘ঈদ’ লিখলে সেটির উচ্চারণও হবে ‘ইদ’। অবশ্য কেউ যদি আরবি উচ্চারণ করেন সেটি অন্য বিষয়।
‘বাংলা একাডেমি আধুনিক বাংলা অভিধান (২০১৬)’ ও ‘বাংলা একাডেমি ব্যবহারিক বাংলা অভিধান (২০১৫)’ অনুযায়ী عيد (Eid) শব্দের প্রমিত ও সংগততর বাংলা বানান ‘ইদ’। عيد (Eid) বিদেশি শব্দ। তাই প্রমিত বানানরীতি অনুসারে শব্দটির প্রমিত ও সংগততর বাংলা বানান ‘ইদ’, ‘ঈদ’ নয়। শব্দটির বানানে ‘ঈ’ বা ‘ই’ যা-ই দেওয়া হোক না কেন; উচ্চারণের, সম্মানের বা গাম্ভীর্যের কোনো পরিবর্তন হবে না, কিন্তু ‘ই’ দিলে প্রমিত বানানরীতি প্রতিষ্ঠা ও ভাষার আদর্শমান এবং ঐকমত্য প্রতিষ্ঠিত হবে। যা ভাষাকে করবে আরও সর্বজনীন, বোধগম্য, অভিন্ন ও প্রমিত।
ভাষা বহমান নদীর মতো নয়, চলমান প্রকৃতির মতো। প্রত্যেক ভাষার নিজস্ব বৈশিষ্ট্য ও স্বকীয় পরিক্রমা রয়েছে। প্রাচীনত্বের অজুহাতে ভাষার স্বকীয়তা এবং ভাষাপ্রকৃতির সাবলীল পরিবর্তনে বাধা দিয়ে ঐকমত্য সৃষ্টিতে ব্যাঘাত সৃষ্টি করা সমীচীন হবে বলে মনে হয় না।
অনেকে বলেন, ‘ইদ’ বানান এখনও ব্যাপকভাবে প্রচলিত হয়নি। সম্মানিত শুবাচি জনাব

Khurshed Ahmed

এর ভাষায় বলা যায়, “আপনি-আমি শুরু করলেই সংগততর ‘ইদ’ বানানটি প্রচলিত হতে শুরু করবে।” শব্দটির বাংলা বানান নিয়ে বির্তকের এক পর্যায়ে একাদশ শ্রেণির একজন শিক্ষার্থী শুবাচি জনাব Minha Siddika মন্তব্য করেছেন : “আমাদের ঐকমত্য দূরহ বিষয়, যে কোনো ক্ষেত্রে।।” অনুজ/উত্তরসুরীদের এমন নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে বের করে আনার দায়িত্ব আমরা এড়িয়ে যেতে পারি না।

সূত্র:
১. আধুনিক চীন, শান, থান য়ুন,  প্রকাশক: কলকাতা, বিশ্বভারতী গ্রন্থালয়।
২. বাংলা একাডেমি আধুনিক বাংলা অভিধান, প্রকাশক বাংলা একাডেমি।
শুবাচ গ্রুপের লিংক: www.draminbd.com
তিনে দুয়ে দশ: শেষ পর্ব ও সমগ্র শুবাচ লিংক
error: Content is protected !!