অতৎসম শব্দে ষ-এর ব্যবহার : চাষা চাষি ও চাষা

ড. মোহাম্মদ আমীন

চাষা চাষি ও চাষী
 
চাষাচাষি দুটোই বাংলা শব্দ। তবে চাষী ভুল বানান। শুদ্ধ বানান চাষিচাষি অতৎসম শব্দ। অতৎসম শব্দের বানানে সাধারণত ঈ বা ঈ-কার হয় না। তাই চাষি বানানে  ঈ-কার বিধেয় নয়। অতৎসম শব্দে সাধারণত  মূর্ধন্য-ষ হয় না। কিন্তু চাষি অতৎসম (বাংলা) হলেও বানানে মূর্ধন্য-ষ রয়েছে। বাংলায় এরূপ কিছু শব্দ আছে, যা অতৎসম হলেও বানানে মূর্ধন্য-ষ ব্যবহৃত হয়। যেমন: ষণ্ডা, ষণ্ডামর্ক, ষণ্ট(নপুংসক), ষাঁড়, ষোলো, খ্রিষ্টাব্দ, খ্রিষ্ট, খ্রিষ্টপূর্ব, ষড়যন্ত্র, ষাট, পোষা, পষ্ট, তেষ্টা, কেষ্টা, বিষ্টু, বোষ্টম, বরষ, হরষ, মুষড়ে পড়া প্রভৃতি।
   
বাক্যে বিশেষ্য হিসেবে ব্যবহৃত চাষা ও চাষি সমার্থক। বাংলা একাডেমি আধুনিক বাংলা অভিধানমতে, উভয় শব্দের অর্থ— যার পেশা চাষাবাদ বা ভূমি কর্ষণ, কৃষক। ইংরেজিতে  farmer. চাষা শব্দটি চাষি শব্দের কাব্যিক রূপ হিসেবে নানা কবিতায় দেখা যায়। গদ্যে সাধারণত চাষি কথাটি ব্যবহৃত হয়।
 
মাঝে মাঝে বিশেষ করে আঞ্চলিক ভাষায় ও কথোপকথনে চাষা শব্দটি নেতিবাচক গ্রাম্য, অশিক্ষিত, অভদ্র প্রভৃতি অর্থে গালি হিসেবে ব্যবহৃত হতে দেখা যায়। প্রকৃতপক্ষে, প্রাচীনকালে শাসক, জমিদার কিংবা ভূস্বামী বা প্রভাবশালী ধনীরা বঞ্চিত, কিন্তু প্রতিবাদী ও বিদ্রোহী কৃষক-প্রজা এবং মজদুরদের চাষা বলে অবজ্ঞা করত। যা পরবর্তীকালে তুচ্ছার্থ ও অবজ্ঞাজ্ঞাপক গালিতে পরিণত হয়। কিন্তু সাহিত্যে চাষি শব্দের মতো চাষা শব্দটিও অভিন্ন অর্থদ্যোতক মর্যাদায় অধিষ্ঠিত। চাষি কবিতায় রাজিয়া চৌধুরাণী লিখছেন—
“সব সাধকের বড়ো সাধক আমার দেশের চাষা,
দেশ মাতারই মুক্তিকামী, দেশের সে যে আশা।”
 
অতুল প্রসাদ সেন চাষাকে অতি সম্মানের আসনে অধিষ্ঠিত করে লিখেছেন—
“কি জাদু বাংলা গানে,
গান গেয়ে দাঁড় মাঝি টানে,
গেয়ে গান নাচে বাউল,
গান গেয়ে ধান কাটে চাষা।
আ-মরি বাংলা ভাষা!”
 
অভিধানে চাষা শব্দটি গালি উল্লেখ করা হয়নি। তবে কথোপকথনে এবং মাঝে মাঝে সাহিত্যকর্মে নাটকে আর উপন্যাসের সংলাপে অনেক ক্ষেত্রে চাষা শব্দটি একই উদ্দেশ্যে গালি অর্থে ব্যবহার করে থাকে।
 
 
অতৎসম শব্দে ষ এর ব্যবহার
অতৎসম শব্দের বানানে সাধারণত ণ-এর ব্যবহার হয় না। বাংলা একাডেমি প্রণীত প্রমিত বানানের নিয়মে বলা হয়েছে, “অতৎসম শব্দের বানানে ণ ব্যবহার করা হবে না।” তবে মূর্ধন্য-ষ ব্যবহারের ক্ষেত্রে এমন কোনো কঠিন নিয়ম করা হয়নি। কারণ, বিভিন্ন অর্ধতৎসম ও তদ্ভব শব্দে ষ এমনভাবে ঘনিষ্টভাবে মিশে আছে, যে এসব শব্দে বিদ্যমান ষ আর পরিহার করা যায় না। ষ বর্ণটি ণ-এর মতো শুধু সংস্কৃতে সীমাবদ্ধ নয়। তাই অতৎসম শব্দে ষ-এর ব্যবহার নিয়ে যেন কোনো দ্বিধায় আমরা না পড়ি। তাই তৎসম নয়, এমন বহু শব্দের বানানে ষ ব্যবহার করা হয়। নিচে অতৎসম শব্দে ষ ব্যবহারের নিয়ম ও কারণ বর্ণনা করা হলো—
 
১. কোমল রূপ:  সংস্কৃত বা তৎসম শব্দের কোমল রূপ অতৎসম হলেও কোমল রূপে মূর্ধন্য-ষ বহাল থাকে। যেমন বর্ষা> বরষা, হর্ষ> হরষ।
 
২.  যুক্তাক্ষরে:  তৎসম শব্দের যুক্তাক্ষর রূপে মূর্ধন্য-ষ থাকলে, তদ্ভবে একই যুক্তাক্ষর বা মূর্ধন্য-ষ যুক্ত অন্য একটি যুক্তাক্ষর হতে পারে। যেমন: স্পষ্ট>পষ্ট, তৃষ্ণা> তেষ্টা, কৃষ্ণ> কেষ্টা, বিষ্ণু>বিষ্টু, বৈষ্ণব> বোষ্টম।
 
৩. সংখ্যাবচাক শব্দ:  বাংলা সংখ্যাবাচক শব্দে মূর্ধন্য-ষ ব্যবহৃত হতে পারে। যেমন:  ষোলো, ষাট ইত্যাদি
 
৪. তৎসমের মূর্ধন্য-ষ অতৎসমে থাকে:  তৎসম শব্দের বানানে ণ থাকলে তদ্ভবে ন হয়। যেমন কর্ণ>কান, স্বর্ণ>সোনা। কিন্তু মূর্ধন্য-ষ থাকলে তদ্ভবেও মূর্ধন্য-ষ থাকে। যেমন আমিষ>আঁষ, ষণ্ড>ষাঁড়, সুনিষণ্নক>সুষনি
 
৫. ক্রিয়াপদে মূর্ধন্য-ষ:  আধুনিক বাংলায় ক্রিয়াপদে ণ হয় না, কিন্তু মূর্ধন্য-ষ হতে পারে। যেমন পোষা, মুষড়ে পড়া, শুষে নেওয়া ইত্যাদি।
 
৬. প্রাচীন বাংলার ক্রিয়াপদে ণ দেখা যায়। যেমন “লুই ভণই গুরু পুচ্ছিঅ জাণ” (চর্যাপদ)। অর্থ: লুই বলছেন গুরুকে জিজ্ঞাসা করে জেনে নাও।
বাংলা একাডেমি বলেছে— বিদেশি শব্দে ষ এর প্রয়োজন নেই। কিন্তু ক্ষেত্রে ণ-এর মতো কোনো কঠিন নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়নি। ণ-এর জন্য বলা হয়েছে, “অতৎসম শব্দের বানানে ণ ব্যবহার করা হবে না।” অন্যদিকে,মূর্ধন্য-ষ-এর জন্য বলা হয়েছে— “বিদেশি শব্দের ক্ষেত্রে মূর্ধন্য-ষ ব্যবহারের প্রয়োজন নেই।” তবে ইংরেজির ক্ষেত্রে স/শ ব্যবহারের নিয়ম উল্লেখ করা হয়েছে।  ষড়যন্ত্র শব্দটি বিদেশি হলেও বানানে মূর্ধন্য-ষ আছে।
বাংলা একাডেমি  সকল অতৎসম শব্দে মূর্ধন্য-ণ বর্জন করেছে। কিন্তু কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয় প্রবর্তিত বাঙ্গালা বানানের নিয়ম পুস্তিকায় বলা হয়েছে “অ-সংস্কৃত শব্দে কেবল ‘ন’ হইবে, যথা— কান, সোনা, বামুন, কোরান, করোনার। কিন্তু যুক্তাক্ষর ণ্ট, ণ্ঠ, ণ্ড, ণ্ঢ চলিবে, যথা— ঘুণ্টি, লণ্ঠন, ঠাণ্ডা।” তবে বাংলা একাডেমির মতে লন্ঠন, ঠান্ডা ইত্যাদি বানান প্রমিত।
 
 
 
 
 
 
অন্য থেকে অনন্য। অনন্য থেকে অনন্যা। সংস্কৃত অন্য (অন্‌+য) অর্থ— (সর্বনামে) অপর লোক এবং (বিশেষণে) ভিন্ন, অপর। বাক্যে বিশেষণ হিসেবে ব্যবহৃত অনন্য (ন+অন্য) শব্দের আক্ষরিক অর্থ—  যে নয় অন্যজন, যে অন্য জনের নয়; যে কেবল নিজের এবং প্রয়োগিক অর্থ ছিল— যে অন্য কিছু বা অন্য কারো প্রতি আসক্ত নয়, যে অন্য কারো হয় না, সাধারণের মতো নয়। তখন শব্দটির অর্থের সঙ্গে রূপের কোনো সম্পর্ক ছিল না। অনন্য শব্দের সঙ্গে আ-প্রত্যয় যুক্ত করে শব্দটিকে নারীবাচকতা প্রদান করা হয়। এভাবে সৃষ্ট অনন্যা শব্দের  প্রায়োগিক অর্থ হলো— এমন নারী যে অন্য কারো প্রতি আসক্ত হয় না, যে নারী অন্য কারো হয় না, যে নারী সাধারণের নয়, যে নারীকে লাভ করা যায় না, সতী। অনন্যা শব্দটির সঙ্গেও তখন রূপের কোনো সম্পর্ক ছিল না। তৎকালীন পুরুষতান্ত্রিক সমাজে নিজের নারীর চারিত্রিক  শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণের জন্য প্রায়শ কথাটি বলা হতো: আমার কন্যা অনন্যা; আমার স্ত্রী অনন্যা।মানে অন্য কারো প্রতি আসক্ত নয়। এখানে সৌন্দর্য প্রকাশের উদ্দেশ্য ছিল গৌণ। মনে রাখা দরকার, তখন নারীচরিত্রের শ্রেষ্ঠ গুণ ছিল সতীত্ব।  এরপর শব্দটির অর্থের আরও পরিবর্তন ঘটে। 
    
বর্তমানে অনন্য শব্দের আভিধানিক ও প্রয়োগিক অর্থ—  একক, অভিন্ন।  এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আরও কয়েকটি অর্থ। যেমন: অতুলনীয় কিংবা ব্যতিক্রমী বৈশিষ্ট্যের অধিকারী।  ফলে শব্দটির অর্থ আরো সম্প্রসারিত হয়ে যুক্ত হয়— অনুপম, তুলনাহীন, অদ্বিতীয় প্রভৃতি। এর সঙ্গেও রূপের কোনো সম্পর্ক নেই। অনন্য শব্দের আর্থিক পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে অনন্যা শব্দের  অর্থও পরিবর্তন হয়ে নারীবাচক শব্দ হিসেবে নারীতে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে।  তখন অনন্যা শব্দটির অর্থ দাাঁড়ায়— অনুপমা, তুলনহীনা। এসময় শব্দটির অর্থের সঙ্গে রূপও গুণ হিসেবে যুক্ত হয়ে পড়ে। বর্তমানে অনন্যা শব্দটি শুধু অদ্বিতীয় রূপ বোঝায় না, একই সঙ্গে অতুলনীয় গুণের সমাবেশও বোঝায়। এভাবে শব্দের অর্থ পরিবর্তনের অনেক নজির বাংলা-সহ পৃথিবীর বিভিন্ন ভাষায় রয়েছে। যেমন: একসময় অপরূপ শব্দের একমাত্র অর্থ ছিল কদাকার, কুশ্রী। এখন এর প্রধান প্রচলিত অর্থ— অতি মনোহর, অনুপম।
 
সূত্র: পৌরাণিক শব্দের উৎসকথন ও বিবর্তন  (প্রকাশনীয়), ড. মোহাম্মদ আমীন, পাঞ্জেরী পাবলিকেশন্স লি.
 
বাকি অংশ এবং অন্যান্য বিষয় নিচের লিংকে:
 

 

 

error: Content is protected !!