অনন্যা: যে নারী অন্য কারো প্রতি আসক্ত হয় না; অটোপাশ বনাম অটোপাস

ড. মোহাম্মদ আমীন 

 
 
অন্য থেকে অনন্য। অনন্য থেকে অনন্যা। সংস্কৃত অন্য (অন্‌+য) অর্থ— (সর্বনামে) অপর লোক এবং (বিশেষণে) ভিন্ন, অপর। বাক্যে বিশেষণ হিসেবে ব্যবহৃত অনন্য (ন+অন্য) শব্দের আক্ষরিক অর্থ—  যে নহে অন্যজন, যে অন্য জনের নয়; যে কেবল নিজের এবং প্রয়োগিক অর্থ ছিল— যে অন্য কিছুর বা অন্য কারো প্রতি আসক্ত নয়, যে অন্য কারো হয় না, সাধারণের মতো নয়। তখন শব্দটির অর্থের সঙ্গে রূপের কোনো সম্পর্ক ছিল না। অনন্য শব্দের সঙ্গে আ-প্রত্যয় যুক্ত করে শব্দটিকে নারীবাচকতা প্রদান করা হয়। এভাবে সৃষ্ট অনন্যা শব্দের  প্রায়োগিক অর্থ হলো— এমন নারী যে অন্য কারো প্রতি আসক্ত হয় না, যে নারী অন্য কারো হয় না, যে নারী সাধারণের নয়, যে নারীকে লাভ করা যায় না, সতী। অনন্যা শব্দটির সঙ্গেও তখন রূপের কোনো সম্পর্ক ছিল না। তৎকালীন পুরুষতান্ত্রিক সমাজে নিজের প্রিয় নারীর চারিত্রিক শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণের জন্য প্রায়শ কথাটি বলা হতো। যেমন— কন্যা আমার অনন্যা। আমার স্ত্রী অনন্যা।মানে অন্য কারো প্রতি আসক্ত নয়। এখানে সৌন্দর্য প্রকাশের উদ্দেশ্য ছিল গৌণ। মনে রাখা দরকার, তখন নারীচরিত্রের শ্রেষ্ঠ গুণ ছিল সতীত্ব, পুরুষ সংস্রব হতে মুক্ত থাকা। এরপর সামাজিক বিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে শব্দটির অর্থের আরো পরিবর্তন ঘটে। 
    
বর্তমানে অনন্য শব্দের আভিধানিক ও প্রয়োগিক অর্থ—  একক, অভিন্ন।  পরে সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আরও কয়েকটি অর্থ। যেমন: অতুলনীয় কিংবা ব্যতিক্রমী বৈশিষ্ট্যের অধিকারী।  এরপর শব্দটির অর্থ আরো সম্প্রসারিত হয়ে যুক্ত হয়— অনুপম, তুলনাহীন, অদ্বিতীয় প্রভৃতি। এই অর্থের সঙ্গেও রূপের কোনো সম্পর্ক নেই। অনন্য শব্দের আর্থিক পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে অনন্যা শব্দের  অর্থও পরিবর্তন হয়ে নারীবাচক শব্দ হিসেবে নারীতে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে। সামাজিক পরিবর্তনের কারণে নারীর সঙ্গে পুরুষ সংস্রবের বিষয়টি পূর্বের চেয়ে কিছুটা গুরুত্বহীন হয়ে নারীর রূপগুণটাই প্রধান হয়ে উঠে।  তখন অনন্যা শব্দটির অর্থ দাাঁড়ায়— অনুপমা, তুলনহীনা। এসময় শব্দটির অর্থের সঙ্গে রূপও গুণ হিসেবে যুক্ত হয়ে পড়ে। বর্তমানে অনন্যা শব্দটি শুধু অদ্বিতীয় রূপ বোঝায় না, একই সঙ্গে অতুলনীয় গুণের সমাবেশও বোঝায়। এভাবে শব্দের অর্থ পরিবর্তনের অনেক নজির বাংলা-সহ পৃথিবীর বিভিন্ন ভাষায় রয়েছে। যেমন: একসময় অপরূপ শব্দের একমাত্র অর্থ ছিল কদাকার, কুশ্রী। এখন এর প্রধান প্রচলিত অর্থ— অতি মনোহর, অনুপম।
বাকি অংশ এবং অন্যান্য বিষয় দেখুন নিচের লিংকে

অটোপাশ বনাম অটোপাস

ইংরেজি ‘অটো’ শব্দের সঙ্গে পাশ ও পাস যুক্ত হয়ে গঠিত হয়েছে যথাক্রমে অটোপাশ ও অটোপাস। পাস শব্দটি ভুল। সুতরাং, অটোপাস শব্দটিও ভুল।
বাকি থাকে অটোপাশ। এখানে যুক্ত ইংরেজি পাশ (pass) অর্থ— সাফল্য (পরীক্ষায় পাশ), অনুমতিপত্র, গেটপাশ, অনুমোদন (প্রকল্প পাশ)। সুতরাং পাশ শব্দটি শুদ্ধ।
পাশ ঠিক, শুদ্ধ এবং সঠিক। কিন্তু, অটোপাশ কখনো ঠিক নয়। এর চেয়ে অটোপার্টস অনেক ভালো। অটোপাস-এর চেয়ে ভুল আর কিছু হতে পারে না। অটোপাশ ব্যক্তির মেধাবিভ্রাট ও আত্মবিশ্বাসের হানি ঘটিয়ে জাতির অপূরণীয় ক্ষতি করে দিতে পারে।
যারা আজ অটোপাশ নিয়ে খুশিতে নৃত্য করছে, কিছুদিন পর এই অটোপাশ তাদের গলায় ফাঁস হয়ে বসবে। টের পাবে মজা যখন বিভিন্ন
প্রতিযোগিতায় গিয়ে শুনতে হবে—
অটোপাশ বুঝি তোমার!
যাও যাও বাছা,
ভর্তি আর চাকুরিটাও অটো হয়ে যাবে তোমাদের।
ভুল অটোপাশকে শুদ্ধ করে দেওয়ার দায় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এড়াতে পারবে না। শিক্ষার্থীদের কিছুই করার ছিল না। কর্তার ইচ্ছাই কর্ম।
 
সূত্র: পৌরাণিক শব্দের উৎসকথন ও বিবর্তন  (প্রকাশনীয়), ড. মোহাম্মদ আমীন, পাঞ্জেরী পাবলিকেশন্স লি.
 
বাকি অংশ এবং অন্যান্য বিষয় নিচের লিংকে:
 
error: Content is protected !!