অনুন্নত উন্নয়নশীল; উন্নয়ন অনুন্নয়ন স্বরূপার্থ

ড. মোহাম্মদ আমীন

অনেক সময় অনেকে নানা কারণে অপ্রিয় কথা সোজাসুজি বলতে চান না। কিন্তু অপ্রিয় কথাটি যখন না বললেই নয়, তখন ব্যক্তিত্ব বা মানসম্মান কিছুটা হলেও রক্ষার জন্য একটু ঘুরিয়ে শোভনীয়ভাবে কথাটি বলেন। ইংরেজিতে শব্দ চয়নের এই কৌশলকে Euphemism বলা হয়। বাংলায় এর নাম মঞ্জুভাষ বা মঞ্জুভাষণ। ‘চাল নেই’ বলাটা লজ্জাকর মনে করেন অনেকে। তাই বলেন, “চাল বাড়ন্ত”। ভিক্ষকুকে ভিক্ষা দেওয়ার অপারগতা প্রকাশ করা হয়, ‘মাফ করো’ কথা দিয়ে। কিন্তু তাতে ভিক্ষুকের ঝুলিতে কিছু পড়ে না। না-পড়লেও ভিক্ষুক কিছুটা মানসিক তৃপ্তি পায়। সাহেব তার কাছে মাফ চেয়েছেন। সাহেবও খুশি হয়ে যান, শুধু কথা দ্বারা আপদ দূর করা গেল।

ভোজে গেছেনে দার্শনিক চিকুচি।তিনি আবার নেতিবাচক কোনো শব্দ ব্যবহার করেন না। আবার মিথ্যাও বলেন না। দুর্ভাগ্যবশত তার পাতে পড়ল একটা পচা ডিম। মুখে দিতে গিয়ে গন্ধ পেয়ে ফেলে দিলেন হাড়গোড়ের ঝুড়িতে।

গৃহস্বামী বললেন, ফেলে দিলেন যে, ডিমটা কি ভালো না?
দার্শনিক বললেন, ভালো।
ফেলে দিলেন যে?

“কিছুটা রাসায়নিক পরিবর্তন হয়েছে।” চিকুচি হেসে বললেন।

 

কেউ নিজের দুর্বলতা ফলাও করে প্রচার করতে চায় না। যতটুকু সম্ভব ঢেকে রাখতে চায়। কিন্তু যখন প্রকাশ না করে উপায় থাকে না, তখন এমনভাবে প্রচার করে যেন, মানসম্মান কিছুটা হলেও বজায়

ড. মোহাম্মদ আমীন

থাকে। এমপি সাহেবের ছেলে ছাত্রজীবনে সব পরীক্ষায় তৃতীয় বিভাগ পেয়েছে।অনেকে জিজ্ঞাসা করে, আপনার ছেলে কোন বিভাগ পেয়েছে। ফাস্ট ডিভিশন পেয়েছ বলতে পারলে ভালো লাগত, কিন্তু ডাহা মিথ্যা তো আর বলা যায় না। হাস্যকর হয়ে যাবে।তাই বলেন, “আমার ছেলে জীবনে কখনো ফেল করেনি।” আমাদের এক বন্ধুর মুদ্রা দোষ ছিল ‘মাইরা ফেলা’। সবাই তাকে ডাকত মাইরা ফেলা। কিন্তু আমাদের বাংলা স্যার ডাকতেন, এমপি।

 

সচিবালয়ে এখন কোনো কেরানি নেই। আগের সব প্রধান কেরানি প্রাশাসনিক কর্মকর্তা নামে অধিষ্ঠিত। সব পিওন এক কলমের খোঁচায় ‘অফিস সহায়ক’।তহশিলদার পদ বিলুপ্ত, তারা এখন ইউনিয়ন ভুমি সহকারী কমর্কতা। পদের নাম শোভনীয় হয়েছে, কিন্তু কাজ একই।গলি আর অ্যাভিনিউ এবং মামলেট আর ডিমভাজির মধ্যে তফাত কেবল নামে। স্বাদ-কাজ অভিন্ন। অনেকে বলেন, “নামে কিছু হয় না”। কথাটি ঠিক; কিন্তু নামে অনেক কিছু হয় একথা আরও বেশি ঠিক।

 

অনুন্নত শব্দটি নেতিবাচক। ইংরেজিতে বলা হয় আন্ডার ডেভেলাপমেন্ট। অর্থাৎ উন্নয়নের নিচে। উন্নয়নশীল শব্দের অর্থ— ডেভলাপিং অর্থাৎ উন্নয়নকে ধরার চেষ্টায় রত। ‘আন্ডার ডেভেলাপমেন্ট’ এবং ‘ ডেভেলাপিং’ দুটোর অবস্থানই উন্নয়নের নিচে। উন্নয়নের নিচে কেউ থাকতে চায় না। কিন্তু উন্নয়নের ওপরে ওঠাও সম্ভব হচ্ছে না। উন্নয়নের নিচে অবস্থান করা লজ্জাকর। কিন্তু অবস্থানকে অপ্রকাশ্য রাখাও যাচ্ছে না। এ অবস্থায় নিজের সম্মান রক্ষার্থে কী বলা উচিত?

আপনার অবস্থান কোথায়? উন্নয়নের নিচে বলাটা সমীচীন হবে না। মান-সম্মানের ব্যাপার।তাই বলা হয়, “উন্নয়নকে ধরার চেষ্টা করছি।” মানে উন্নয়নশীল। ডিমভাজা ও মামলেট, তহশিলদার এবং ইউনিয়ন সহকারী ভূমি কর্মকর্তা, পিয়ন আর অফিস সহায়ক, হেডক্লার্ক এবং প্রাশাসনিক কর্মকর্তা যেমন, অনুন্নত এবং উন্নয়নশীল কথাটাও ঠিক তেমন।
 
আসল কথা হলো— ধরুন, ১৯৫০ খ্রিষ্টাব্দের জানুয়ারির এক তারিখ থেকে আপনি আর আমি উন্নয়নপুরের লক্ষ্যে ছুটে চলছি। আমি আপনার চেয়ে পঞ্চাশ মাইল পিছিয়ে। অর্থাৎ আপনাকে ধরতে হলে আমাকে আরও পঞ্চাশ মাইল এগোতে হবে। ততক্ষণ তো আর আপনি থেমে থাকবেন না, আপনিও উন্নয়নপুরের লক্ষ্যে ছুটতে থাকবেন।
২০০০ খ্রিষ্টাব্দে অর্থাৎ পঞ্চাশ বছর পর আমি আপনার স্থানে পৌঁছে গেলাম। ততদিনে আপনি আরও এগিয়ে— এখন আপনার আর আমার ব্যবধান পাঁচশ মাইল। অর্থাৎ আপনি আমার চেয়ে পাঁচশ মাইল এগিয়ে। অথচ পঞ্চাশ বছর আগে আমাদের ব্যবধান ছিল মাত্র পঞ্চাশ মাইল।

এ অবস্থায় আমার কি আসলে উন্নতি হয়েছে, না কি অবনতি? আমি কি উন্নয়ন প্রতিযোগিতায় এগিয়ে আছি না কি পিছিয়ে?

উন্নত উন্নয়নশীল; উন্নয়ন অনুন্নয়ন স্বরূপার্থ

শুবাচ গ্রুপের লিংক: www.draminbd.com

All Link : শুবাচে প্রকাশিত গুরুত্বপূর্ণ লেখা

All Link

All Links/1

All Links/2 শুবাচির প্রশ্ন থেকে উত্তরAll Links/3

error: Content is protected !!