অনুসর্গ

ড. মোহাম্মদ আমীন

অনুসর্গ

যেসব অব্যয় বিশেষ্য বা সর্বনাম পদের পরে পৃথকভাবে বসে শব্দ বিভক্তির মতো তাদের কারক-সম্বন্ধ নির্ধারণ করে, তাদের অনুসর্গ বলা হয়।  অনুসর্গগুলো অব্যয়বাচক শব্দ। এগুলো কখনো স্বাধীন পদরূপে, আবার কখনো শব্দ-বিভক্তিরূপে ব্যবহৃত হয়ে বাক্যের অর্থ প্রকাশে সাহায্য করে। এর অন্য নাম পরসর্গ বা প্রবচনীয় (post position)। অনুসর্গের অপর নাম কর্মপ্রবচনীয়। বিশেষ্য অথবা সর্বনাম পদের পর বসে যে অব্যয় শব্দ কারক-

ড. মোহাম্মদ আমীন

বিভক্তির কাজ করে তা-ই অনুসর্গ বা কর্মপ্রবচনীয়। ‘অনুসর্গ’ বাংলা ব্যাকরণের রূপতত্ত্ব বা শব্দতত্ত্বের একটি আলোচ্য বিষয়। অর্থাৎ যেসব অব্যয়বাচক শব্দ কখনো স্বাধীন পদরূপে, আবার কখনো শব্দ-বিভক্তিরূপে ব্যবহৃত হয়ে বাক্যের অর্থ প্রকাশে সাহায্য করে, তাকে অনুসর্গ বলে।  অশোক মুখোপাধ্যায়ের মতে, “কিছু শব্দ আছে যারা বাক্যের কোনো পদের পরে বসে পদটিকে বাক্যের সঙ্গে অন্বিত করে। এই শব্দকে বলা হয় অনুসর্গ।”

উদাহরণ : ‘কোন দেশেতে তরুলতা সকল দেশের চাইতে শ্যামল?’ জ্ঞানের পাশে ধন স্থান পায় না। ‘মন দিয়ে কর সবে বিদ্যা উপার্জন।’  বাক্য তিনটিতে ব্যবহৃত ‘চাইতে’, ‘পাশে’ ও ‘দিয়ে’ এ শব্দগুলো হলো অনুসর্গ।
অনুসর্গের বৈশিষ্ট্য
১. অনুসর্গ অব্যয় পদ এবং এগুলোর নিজস্ব অর্থ আছে।
২. অনুসর্গ শব্দের পরে বসে সংশ্লিষ্ট শব্দের সঙ্গে পরবর্তী শব্দের অর্থবোধক সম্পর্ক সৃষ্টি করে।
৩. বিভক্তি দিয়ে যেমন কারক চেনা যায়, তেমনই অনুসর্গ দিয়েও কারক চেনা যায়।
৪. অব্যয়গুলোর নিজস্ব অর্থ থাকায় সেগুলো পৃথকভাবে ব্যবহৃত হলে অনুসর্গ হয় না।
৫. অনুসর্গের পূর্ব পদটি বিশেষ্য হলে সেটি বিভক্তিযুক্ত হতে পারে, আবার না-ও হতে পারে। কিন্তু সর্বনাম হলে অবশ্যই বিভক্তিযুক্ত হবে।
৬. অনুসর্গ বিভক্তির মতো কাজ করে।
৭. কতকগুলো অনুসর্গ শব্দ-বিভক্তির মতো কারক নির্ণয়ে সাহায্য করে। এগুলো : হইতে, হতে, চেয়ে, দ্বারা, দিয়া, দিয়ে, কর্তৃক ইত্যাদি।
৮. ক্ষেত্রবিশেষে অনুসর্গের ব্যবহার সাধু ও চলিত ভাষায় ভিন্ন হতে পারে।
অনুসর্গের নমুনা
মধ্যে, মাঝে, পরে, বই/বৈ, ব্যতীত, ছাড়া, জন্যে/জন্য, প্রতি, বিনা, বিহনে, সহ, ওপর, ওপরে, হেতু, পর্যন্ত, অপেক্ষা, সহকারে, তরে, পানে, পক্ষে, দ্বারা, দিয়া/দিয়ে, কর্তৃক, সাথে, থাকিয়া/থেকে, সঙ্গে, হইতে/হতে, চেয়ে, পাছে, ভিতর, নামে, মত, নিকট, অধিক, ইত্যাদি।  এগুলোর মধ্যে দ্বারা, দিয়া (দিয়ে) কর্তৃক, থেকে, চেয়ে প্রভৃতি বিভক্তিরূপে ব্যবহৃত হয়।
অনুসর্গের প্রয়োজনীয়তা
১. অনুসর্গগুলো বাংলা ভাষায় বিভক্তির কাজ করে। এজন্য বাক্য গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
২. অনুসর্গগুলো বাক্য গঠনে সহায়তা করে। অনুসর্গ ব্যতীত বাক্য গঠন সম্ভব হয় না।
৩. অভাব, তুলনা ইত্যাদি ভাব প্রকাশ করতে অনুসর্গের প্রয়োজন।
৪. অনুসর্গ ছাড়া কারকের অর্থ প্রকাশ পায় না।
৫. বিভক্তির কাজ অনুসর্গ দিয়ে করা যায়।

পাঞ্জেরী পাবলিকেশন্স লি.

৬. অনুসর্গ বাক্যে শব্দবিভক্তির ন্যায় ব্যবহৃত হয়ে কারক-বাচকতা প্রকাশ করে।
৭. অনুসর্গ বাক্যের পদগুলোর মধ্যে সম্পর্ক স্থাপন করে।
৮. বাংলা অনুসর্গ বিভক্তির কাজ করে, ফলে এর দ্বারা কারক নির্ণয় করা সহজ হয়।
৯. অনুসর্গের দ্বারা বাক্যের ভাব সুষ্ঠু ও পরিপূর্ণভাবে প্রকাশ করা যায়।
১০. বাংলা অনুসর্গ বিভক্তির ন্যায় বসে, যার ফলে এর দ্বারা কারক নির্ণয় করা সহজ হয়।

অনুসর্গ ও উপসর্গের পার্থক্য
১. অনুসর্গ সাধারণভাবে অব্যয় হলেও বিশেষ্য, বিশেষণ বা ক্রিয়া থেকেও সৃষ্টি হতে পারে। ১. উপসর্গমাত্রই অব্যয়।
২. অনুসর্গ পদের পরে বসে। ২. উপসর্গ পদের আগে বসে।
৩. অনুসর্গ শব্দের সঙ্গে জুড়ে যায় না। পৃথক শব্দ হিসাবে থাকে। ৩. উপসর্গ শব্দের সঙ্গে জুড়ে গিয়ে এক শব্দ হয়ে যায়।
৪. অনুসর্গ কারকের ধারণা দেয়। ৪. উপসর্গ একই ধাতু থেকে ভিন্ন অর্থবোধক শব্দ সৃষ্টি করতে পারে।
৫. অনুসর্গের স্বতন্ত্র ব্যবহার আছে। ৫. উপসর্গের স্বাধীন ব্যবহার নেই।

অনুসর্গের শ্রেণিবিভাগ
বাংলা ভাষায় ব্যবহৃত অনুসর্গগুলোকে দুই ভাগে ভাগ করা যায়। যথা :
১. শব্দজাত অনুসর্গ ও ২. ক্রিয়াজাত অনুসর্গ।
১. শব্দজাত অনুসর্গ : দিকে, প্রতি, নিকট, তরে, বিনা, ছাড়া, সহিত, সঙ্গে, সম্মুখে, সামনে, আগে, নিমিত্ত, জন্য, অবধি, পক্ষে, কারণে, সদৃশ ইত্যাদি হলো শব্দজাত অনুসর্গ।
২. ক্রিয়াজাত অনুসর্গ : করিয়া করে, দিয়া, ধরিয়া/ধরে, হইতে/হতে, চাইতে/চেয়ে, বলিয়া/বলে এগুলো ক্রিয়াজাত অনুসর্গের উদাহরণ।
অনুসর্গগুলো কখনো প্রাতিপদিকের পরে আবার কখনো বা ‘কে’ ও ‘র’ বিভক্তিযুক্ত শব্দের পরে বসে। যেমন
বিনা — জল বিনা প্রাণী বাঁচে না।
সনে — নদীর সনে চাঁদের মিতালি।
পরে — তুমি বরং পরে এসো।
অপেক্ষা — ধন অপেক্ষা জ্ঞান বড়।
ওপরে — ‘সবার ওপরে মানুষ সত্য।’

পাঞ্জেরী পাবলিকেশন্স লি.

কর্তৃক — আমা কর্তৃক এ কাজ সম্ভব।
কারণে — পরের কারণে স্বার্থ দাও বলি।
চেয়ে — সময়ের চেয়ে জীবনের দাম বেশি।
ছাড়া — ‘গ্রাম ছাড়া ঐ রাঙা মাটির পথ।’
তরে — ‘সকলের তরে সকলে আমরা।
প্রত্যেকে আমরা পরের তরে।’
পাশে — জ্ঞানের পাশে ধন স্থান পায় না।
দিয়ে — ‘মন দিয়ে কর সবে বিদ্যা উপার্জন।’
বিহনে — ‘উদ্যম বিহনে কার পুরে মনোরথ?’
সাথে — তার সাথে আমার কথা হয়নি।
হতে — দূর হতে কি শুনিস গর্জন?
ভিতর — ‘খাঁচার ভিতর অচিন পাখি।’
মতন — তোমার মতন কাউকে দেখিনি।
বিভক্তি ও অনুসর্গ
ক. বিভক্তি বাক্যস্থিত পদের সাথে মিশে যায়। কিন্তু অনুসর্গ স্বতন্ত্র অবস্থায় বাক্যে ব্যবহৃত হয়।
খ. বিভক্তি আলাদা কোনো অর্থ প্রকাশ করতে পারে না। কিন্তু অনুসর্গ পৃথক অর্থ প্রকাশ করে।
বিভিন্ন কারকে অনুসর্গের ব্যবহার
বিভিন্ন কারকে অনুসর্গ ব্যবহৃত হয়ে থাকে। যেমন
ক. কর্তৃকারক : তোমাকে দিয়ে এ কাজ হবে না।
খ. করণ কারক : এ গাছ হতে কোনো উপকার হবে না।
গ. সম্প্রদান কারক : গরিবের পানে মুখ তুলে চাও।
ঘ. অপাদান কারক : পাহাড় হতে ঝরনা নামে।
ঙ. অধিকরণ কারক : দেশের প্রতি সকলের ভালোবাসা থাকা উচিত।
বাক্যে অনুসর্গের প্রয়োগ
১. বিনা — কর্তব্য বিনা অধিকার হয় না।
২. সহ — তিনি স্ত্রীসহ উপস্থিত হলেন।
৩. অবধি — জোয়ার আসা অবধি অপেক্ষা করতে হবে।

অনুভব প্রকাশনী

৪. পরে — এ কথার পরে আর কথা চলে না।
৫. পানে — আমার পানে তাকিয়ে থেকে লাভ নেই।
৬. মতো — বোকার মতো কথা বল না।
৭. পক্ষে — নেতার পক্ষে সবই সম্ভব।
৮. মাঝে — আমার হৃদয় মাঝে তোমার স্থান।
৯. কাছে — সব ছেড়ে তোমার কাছে চলে যাব।
১০. প্রতি — প্রতি কৃষকের ঘরে আজ নবান্নের উৎসব।
১১. হেতু — ‘কী হেতু আসিয়াছ, কহ বিস্তারিয়া।’
১২. কারণে — তোমার কারণে আজ তার এ অবস্থা।
১৩. অপেক্ষা — মিরণ অপেক্ষা কিরণ লম্বা।


শুবাচ গ্রুপের লিংক: www.draminbd.com

পারিভাষিক শব্দ

ধারণ শব্দে মূর্ধন্য-ণ; ধরন শব্দে নেই

জয় ও বিজয় শব্দের পার্থক্য

— — — — — — — — — — — — — — — — — — —
— — — — — — — — — — — — — — — — — — —
error: Content is protected !!