অপত্যার্থ, সম্পৎশালী, শানচ্‌ প্রত্যয়, জামদগ্ন্য, পুস্তক, সন্ধি, বহুবচন প্রয়োগে শুদ্ধতা

ড. মোহাম্মদ আমীন
সংযোগ: https://draminbd.com/অপত্যার্থ-সম্পৎশালী-শান/
অপত্যার্থ প্রত্যয়:  বংশ বা উত্তরসূরি, পুত্র; কন্যা; নাতি, জাত, সম্প্রদায় প্রভৃতি অপত্য অর্থ বুঝাবার জন্য যে সকল প্রত্যয় ব্যবহৃত হয় তাদের অপত্যার্থ প্রত্যয় বলে।
যেমনঃ-কুরু+অ । ভাবার্থ অর্থ কোনো বিষয়ের ধারণা অর্থাৎ গুণ, বৈশিষ্ট্য, চরিত্র, স্বভাব প্রভৃতি প্রকাশ করে। যেমন: সুন্দর+য= সৌন্দর্য।

সম্পদশালী না কি সম্পৎশালী: সম্পৎশালী সঠিক।এর ব্যুৎপত্তি হলো: সম্পৎ+√শাল্+ইন্‌।সম্পদের অধিকারীকে সম্পৎশালী বলা হয়। সম্পদশালী শব্দটি আধুনিক অভিধানে নেই। তবে এটি অনেকে ব্যবহার করে থাকে।

শানচ্ প্রত্যয়:  সিদ্ধান্তকৌমুদী গ্রন্থের ৭/২/৮২ শ্লোকে শানচ্ প্রত্যয় নিয়ে বলা হয়েছে “আনে মুক্” যার মানে “শানচ্ প্রত্যয়ের আন পরে থাকলে ধাতুর উত্তর মুম্ আগম হয়। উদাহরণ দেওয়া হয়েছে সেবমান। √সেব্+শানচ্= সেবমুম্+আন=সেবমান। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য সকল সংস্কৃত শব্দে শানচ্ প্রত্যয় মান রূপে বিবর্তিত হয় না। যেমন অধীয়ান, ক্রীণান, দদান, দীহান প্রভৃতি সংস্কৃত শানচ্ প্রত্যয়ান্ত শব্দ। হরিণ নীতি ব্যাঘ্র নীতি বলতে যা বোঝায় সেগুলো  গোযূথাধিকার, সিংহদৃষ্টি অধিকার, মণ্ডুকপ্লুতি ও গঙ্গাস্রোতপ্রবাহ। এসব অধিকার ব্যাকরণের সকল শাখায় সমানভাবে প্রযোজ্য। শানচ্ প্রত্যয়ে বা যে কোনো প্রত্যয়ের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে এসব অধিকারের কোন আলাদা গুরুত্ব নেই। এছাড়া শানচ্ প্রত্যয়যোগে কিছু শব্দে য ফলার আগমন ঘটে। যেমন দীপ্যমান, দৃশ্যমান প্রভৃতি; যা সবক্ষেত্রে ঘটে না (সেবমান, বহমান)। এই ব্যত্যয় কেন ঘটে, তাও ঠিকমত বোঝা যাচ্ছে না।
বহুবচন প্রয়োগে শুদ্ধতা
১। সংখ্যাবাচক পদের পর কোন বহুবচনবাচক প্রত্যয়(রা, গুলো, গণ প্রভৃতি) যুক্ত হবে না। যেমন দুটি পাখি, সাতজন মানুষ। ‘দুটি পাখিরা’ অশুদ্ধ প্রয়োগ।
২। সব, সকল, কিছু, কতিপয় ইত্যাদি শব্দ থাকলেও কোন বহুবচনবাচক প্রত্যয় যুক্ত হবে না।
অশুদ্ধ: কিছু লোকেরাই এমন কাজ করে।
শুদ্ধ: কিছু লোকই এমন কাজ করে।
অশুদ্ধ: সকল অতিথিরা উপস্থিত আছেন।
শুদ্ধ: সকল অতিথি উপস্থিত আছেন।
৩। তৎসম তৃচ প্রত্যয়ান্ত শব্দের বহুবচনে তা স্থলে তৃ হয়। যেমন পিতা>পিতৃকুল,নেতা>নেতৃবৃন্দ। অনুরূপ মাতৃগণ, দাতৃগণ, ভ্রাতৃবৃন্দ, ক্রেতৃবৃন্দ, শ্রোতৃমণ্ডলী, কর্মকর্তৃগণ ইত্যাদি।
৪। ছদ্ম তৃচ প্রত্যয়ান্ত শব্দ: কিছু তৃচ প্রত্যয়ান্ত শব্দের শেষে তা থাকে না, টা অথবা ধা থাকে। এগুলোর বহুবচনে টা এবং ধা স্থলে যথাক্রমে টৃ এবং ধৃ হয়। যেমন স্রষ্টা>স্রষ্টৃগণ, দ্রষ্টা>দ্রষ্টৃমণ্ডলী, উপদেষ্টা>উপদেষ্টৃবৃন্দ, যোদ্ধা>যোদ্ধৃবর্গ, বোদ্ধা>বোদ্ধৃবৃন্দ।
৫। সংস্কৃত ণিনি প্রত্যয়ান্ত শব্দের বহুবচনে ঈ-কার এর পরিবর্তে ই-কার হবে। নগরবাসী>নগরবাসিগণ, মধুপায়ী>মধুপায়িসমূহ, তৃণভোজী>তৃণভোজিসকল।
৬। সংস্কৃত ইন প্রত্যয়ান্ত শব্দের বহুবচনে ঈ-কার এর পরিবর্তে ই-কার হবে। যেমন হস্তিযূথ, করিযূথ, মন্ত্রিবর্গ, প্রাণিকুল, কর্মিবৃন্দ, গুণিগণ, প্রার্থিগণ, শিক্ষার্থিবৃন্দ প্রভৃতি।
৭। দ্বিত্ব প্রয়োগজনিত কারণে বহুবচন বোঝালেও কোন বহুবচনবাচক প্রত্যয় যুক্ত হবে না।
অশুদ্ধ: বিক্রি করতে না পেরে বস্তা বস্তা আমগুলো নিয়ে কৃষকরা বিপদে পড়েছে।
শুদ্ধ: বিক্রি করতে না পেরে বস্তা বস্তা আম নিয়ে কৃষকরা বিপদে পড়েছে।
অশুদ্ধ: বাজার থেকে লাল লাল টমেটোগুলো নিয়ে আসবে।
শুদ্ধ: বাজার থেকে লাল লাল টমেটো নিয়ে আসবে।
‘সন্ধি’ শব্দের গঠন 
সন্ধি শব্দটির গঠন আপনার উল্লেখ-করা তিনটি উপায়েই সম্ভব।
১) প্রত্যয়যোগে: সংস্কৃত ‘√ধা’ ধাতুর পূর্বে ‘সম্’ উপসর্গ এবং পরে ‘ই’ প্রত্যয় যুক্ত হয়ে ‘সন্ধি’ শব্দটি গঠন করে। অর্থাৎ, সম্+√ধা+ই = সন্ধি। যেহেতু ‘সন্ধি’ শব্দটির গঠনের সময় শেষে ‘ই’ প্রত্যয় যুক্ত হয়েছে, সেহেতু শব্দটি প্রত্যয় সাধিত।
২) ‘সন্ধি’ শব্দটির সন্ধি বিচ্ছেদ করলে দেখা যায়— সম্+ধি = সন্ধি। এখানে ‘সম্’ হচ্ছে তৎসম উপসর্গ। অতএব, ‘সন্ধি’ উপসর্গ যোগে গঠিত।
৩) দুই নম্বরেই উল্লেখ করেছি যে, ‘সন্ধি’ শব্দের সন্ধি বিচ্ছেদ হচ্ছে— সম্+ধি = সন্ধি।
পুস্তক:সংস্কৃত ‘পুস্ত (√পুস্ত্ +অ)’ শব্দের তিনটি অর্থ। যথা— লেপন, শিল্পকর্মবিশেষ এবং হিসাব লেখার খাতা। সংস্কৃত এই ‘পুস্ত’ শব্দের সঙ্গে ক-প্রত্যয় যুক্ত হয়ে গঠিত হয়ছে পুস্তক। অতএব, পুস্তক সংস্কৃত শব্দ। বাংলায় যা তৎসম নামে পরিচিত। ‘পুস্ত’ বানানের আর একটি শব্দ বাংলায় ব্যবহৃত হয়। এর অর্থ— বংশপরম্পরা। এটি ফারসি উৎসের শব্দ। ফারসি পুস্ত-এর সঙ্গে সংস্কৃত/তৎসম পুস্তকের ‘পুস্ত’-এর কোনো সম্পর্ক নেই।
জামদগ্ন্য: সংস্কৃত ‘জামদগ্নি’ শব্দের সঙ্গে য-প্রত্যয় যুক্ত হয়ে গঠিত হয়েছে জামদগ্ন্য(জামদগ্নি+য)। য-প্রত্যয় যুক্ত শব্দ বাক্যে সাধারণত বিশেষ্য হিসেবে ব্যবহৃত হয়। ভারতীয় পুরাণমতে, ‘জামদগ্ন্য’ হচ্ছে বিষ্ণুর ষষ্ঠ অবতার এবং জমদগ্নি ও রেণুকার পঞ্চম পুত্র। জামদগ্ন্য, মহাদেবের নিকট থেকে কুঠার অস্ত্র লাভ করেন। কুঠার অস্ত্রের অন্য নাম পরশু। মহাদেবের কাছ থেকে পরশু লাভ করার পর জামদগ্ন্য (উচ্চারণ: জামোদোগ্‌নো) পরশুরাম নামে খ্যাত হন।
error: Content is protected !!