অবহট্‌ঠ কী?

ড. মোহাম্মদ আমীন

অবহট্‌ঠ কী?

অবহট্‌ঠ অপভ্রংশ ভাষার পরবর্তী স্তর। অপভ্রংশ হচ্ছে মধ্যভারতীয় আর্যভাষা পালি-প্রাকৃতের শেষস্তর, যার শেষ পরিণতি অবহট্‌ঠ । এই অবহট্‌ঠ ভাষা থেকেই নব্য ভারতীয় আর্যভাষাসমূহের উৎপত্তি। যেমন: বাংলা ভাষা হচ্ছে পূর্বভারতীয় মাগধী অবহট্‌ঠ ভাষার পরিণত রূপ।

বাংলা ভাষার উৎপত্তির ক্রম হলো: মাগধী প্রাকৃত> মাগধী অপভ্রংশ> মাগধী অবহট্‌ঠ> বাংলা। অবশ্য ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্ এ বিষয়ে ভিন্ন মত পোষণ করেন। তাঁর মতে, গৌড়ীয় প্রাকৃত থেকে বাংলার উৎপত্তি। অর্থাৎ গৌড়ীয় প্রাকৃত> গৌড়ীয় অপভ্রংশ> গৌড়ীয় অবহট্‌ঠ> বাংলা

পদের বিভক্তি, বচন ও লিঙ্গভেদের লোপ, হ্রস্বস্বরের আধিক্য, পদান্তে বা পদমধ্যে সানুনাসিকতা, স বর্ণের স্থলে হ-এর ব্যবহার প্রভৃতি অবহট্‌ঠ ভাষার প্রধান বৈশিষ্ট্য।অবহট্‌ঠ ভাষার প্রচলন ছিল খ্রিষ্টীয় ছয় শতক থেকে পনেরো শতক পর্যন্ত।

অবহট্‌ঠ ভাষার প্রথম রচনা বৌদ্ধ তান্ত্রিক ও শৈব যোগীদের লেখা দোঁহা কোষ। সরহপা, কাহ্নপা প্রমুখ যোগী এগুলোর রচয়িতা। বাঙালি কবি ছাড়াও অনেক অবাঙালি কবি অবহট্‌ঠ ভাষায় দোঁহা রচনা করেছেন। ডাকার্ণব গ্রন্থটিও অবহট্‌ঠ ভাষায় রচিত।

অবহট্‌ঠ ভাষায় সাধারণ সাহিত্যও রচিত হয়েছে। দশম শতকে অনেকেই বাংলায় চর্যাপদ এবং অবহট্‌ঠ ভাষায় দোঁহা রচনা করেছেন। অবহট্‌ঠ ভাষার চর্চা পনেরো শতক পর্যন্ত বিদ্যমান ছিল। আনুমানিক পনেরো শতকে রচিত প্রাকৃতপৈঙ্গল-এর অধিকাংশ শ্লোক অবহট্‌ঠ ভাষায় রচিত। অবহট্‌ঠ ভাষার

পাঞ্জেরী পাবলিকেশন্স লি.

শেষ উল্লেখযোগ্য কবি বিদ্যাপতি (১৫শ শতক)। তাঁর জীবনীকাব্য কীর্তিলতা গদ্যে-পদ্যে অবহট্‌ঠ ভাষায় রচিত।

শুভঙ্করের আর্যা নামে সাধারণ জ্ঞানবিষয়ক কিছু শ্লোক বাংলায় আধুনিক কাল পর্যন্ত চলে এসেছে। যেমন গণিতবিষয়ক একটি শ্লোক হচ্ছে— ‘কুড়বা কুড়বা কুড়বা লিজ্জে/ কাঠায় কুড়বা কাঠায় লিজ্জে’। গবেষকদের অভিমত, এর মূল রূপ ছিল— “কুডবেঁ কুডবেঁ কুডবেঁ লিজ্জই/ কট্‌ঠাএঁ কুডব কট্‌ঠাএঁ লিজ্জই।” আধুনিক বাংলায় এটি দাঁড়ায়—‘কুড়ায় কুড়া কুড়ায় নিয়ে/ কাঠায় কুড়া কাঠায় নিয়ে”। কুড়বা (উচ্চারণ কুড়োবা): সংস্কৃত কুড়ব থেকে উদ্ভূত। এটি ভূমি পরিমাপের একটি একক।২০ কাঠা বা ১ বিঘা পরিমাণকে ১ কুড়বা বলা হয়।

কুড়বা কুড়বা কুড়বা লিহ্যে/লিজ্জে
বহুল প্রচলিত আর্যার উদাহরণ হিসেবে ভূমির ক্ষেত্রফল পরিমাপের জন্য ব্যবহৃত নিচের আর্যাটি একসময় খুব জনপ্রিয় ছিল।
“কুড়বা কুড়বা কুড়বা লিহ্যে/লিজ্জে
কাঠায় কুড়বা কাঠায় লিহ্যে/লিজ্জে
কাঠায় কাঠায় ধুল পরিমাণ
বিশ গন্ডা হয়ে কাঠার প্রমাণ
গন্ডা বাকি থাকে যদি কাঠা নিলে পর
ষোল দিয়ে পুরি তারে সরা গন্ডা ধর।”
মর্মার্থ : কুড়বা দিয়ে কুড়বাকে গুণ করলে হবে বর্গ কুড়বা, কাঠাকে কুড়বা দিয়ে গুণ করলে বর্গ কাঠা, কাঠাকে কাঠা দিয়ে গুণ করলে পাওয়া যাবে ধূল যা ২০ বর্গ কাঠার সমান। অবশিষ্ট যদি থাকে তাকে ১৬ দিয়ে গুণ করলে বর্গ গন্ডা বের হয়।


শুবাচ গ্রুপের লিংক: www.draminbd.com
— — — — — — — — — — — — — — — — — — —
— — — — — — — — — — — — — — — — — — —
error: Content is protected !!