অবান্তর বনাম অপ্রাসঙ্গিক: ক্ষণ যে-কারণে মহেন্দ্র ও সরা হতে পারে না

‘অব’ আর ‘অন্তর’ মিলে ‘অবান্তর’ শব্দটি গঠন করেছে। এখানে ‘অব’ মানে ‘গত’, এবং ‘অন্তর’ মানে ‘মধ্য’। তাহলে ‘অবান্তর’ শব্দের গঠনগত অর্থ দাঁড়ায়— যা কোনোকিছুর মধ্য থেকে গত হয়েছে। অর্থাৎ, যা মূল বিষয় অতিক্রম করে যায়, তাই (তা-ই) অবান্তর। ধরা যাক, কেউ একজন ‘দ্বেষ’ আর ‘বিদ্বেষ’ শব্দ দুটির আলোচনা করছেন। আলোচনার একপর্যায়ে তিনি নিজের আলোচনের বিষয় ছাড়িয়ে ‘ঈর্ষা’ আর ‘হিংসা’ পার্থক্য নিরূপণে লেগে গেলেন। ওই ব্যক্তি মূল বিষয় বা প্রসঙ্গ অতিক্রম করে এরূপ নতুন আরেকটি বিষয় বা প্রসঙ্গে চলে যাওয়াই হচ্ছে অবান্তর।
 
আবার, ‘প্রাসঙ্গিক’ শব্দের অর্থ হচ্ছে ‘প্রসঙ্গ বা বিষয়সংক্রান্ত’। এই ‘প্রাসঙ্গিক’ শব্দটির শুরুতে নঞর্থক ‘অ’ যুক্ত হয়ে ‘অপ্রাসঙ্গিক’ (ন+প্রাসঙ্গিক) শব্দটি গঠন করে। অর্থাৎ, নয় প্রাসঙ্গিক যা, বিষয়ের সঙ্গে সম্পর্কহীন যা, তাই (তা-ই) হচ্ছে অপ্রাসঙ্গিক। আমরা কোনো প্রসঙ্গে বা বিষয়ে বলতে গিয়ে ওই প্রসঙ্গ বা বিষয়ের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত নানান বিষয়ের অবতারণা করি। যেমন: বাংলাদেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হিসেবে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়াশোনার মান নিয়ে আলোচনা করার ক্ষেত্রে ঢাকা কিংবা জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রসঙ্গ টানি। কেননা, এগুলোও বাংলাদেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। এগুলোর সঙ্গে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্যক্রমের যথেষ্ট সম্পর্ক রয়েছে বলে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়াশোনার মান নিয়ে আলোচনায় এসব প্রতিষ্ঠানের প্রসঙ্গ টেনে আনলে তা প্রসঙ্গের বাইরে চলে যায় না; অর্থাৎ, পাশাপাশি এসব প্রতিষ্ঠানের আলোচনা প্রাসঙ্গিক। কিন্তু চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়াশোনার মান বোঝাতে অক্সফোর্ড কিংবা হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়কে টেনে আনা অপ্রাসঙ্গিক। কারণ, বাংলাদেশ আর ওসব দেশের রীতিনীতি, ধ্যানধারণা, শিক্ষাব্যবস্থা ও সামর্থ্য একেবারেই আলাদা। পলাশীর যুদ্ধ নিয়ে লিখতে গিয়ে কুমিরের খাঁজকাটা লেজের বর্ণনা দেওয়ার গল্পটি অপ্রাসঙ্গিকতার সবচে সুন্দর উদাহরণগুলোর একটি।
 
কোনো বিষয়ের আলোচনায় অন্য আরেকটি বিষয়কে টেনে আনা অবান্তর হয়ে গেলেও অনেকসময় অপ্রাসঙ্গিক হয়ে যায় না। যেমন: কোনো ব্যক্তি সম্প্রতি ‘গরু’ বানান ‘গোরু’ লেখার শুদ্ধতা-অশুদ্ধতা নিয়ে আলোচনা করছেন। তাহলে আলোচনার মূল প্রসঙ্গ বা বিষয় হচ্ছে ‘গোরু বানানের শুদ্ধতা-অশুদ্ধতা’। ওই ব্যক্তি আলোচনার একপর্যায়ে ইদ, ইগল, মেডিক্যাল, ঝরনা, ধরন প্রভৃতি পরিবর্তিত বানানের শব্দ টেনে এনে সেগুলোর শুদ্ধতা-অশুদ্ধতা নিয়েও যুক্তিতর্ক করলেন। তাঁর আলোচনায় এসব শব্দের প্রসঙ্গ টেনে আনা প্রাসঙ্গিক। কারণ, গোরুর মতো এসব শব্দের বানানের পরিবর্তন নিয়েও সম্প্রতি শোরগোল চলছে। কিন্তু তাঁর আলোচনায় এসব শব্দ টেনে আনা একেবারেই অবান্তর। কারণ, আলোচনার মূল বিষয় হচ্ছে ‘গোরু বানানের শুদ্ধতা কিংবা অশুদ্ধতা নিরূপণ করা’; অন্য কোন কোন শব্দের বানান পরিবর্তন করেছে, তা নয়।
এখানে একটি লক্ষ করবার মতো বিষয় হচ্ছে— অপ্রাসঙ্গিক মানেই অবান্তর, কিন্তু অবান্তর মানেই অপ্রাসঙ্গিক হয়। আলোচনা মূল বিষয়ের পাশাপাশি আনুষঙ্গিক বিষয়ও অতিক্রম করে গেলে, তবেই অবান্তর আলোচনা অপ্রাসঙ্গিক আলোচনায় রূপ নেয়।
 
 
 
 
 
ক্ষণ যে-কারণে মহেন্দ্র ও সরা হতে পারে না
 
‘ক্ষণ’ একটি নামপদ; অর্থাৎ, বিশেষ্য পদ। শব্দটি সাধারণত সময়ের পরিমাণ বোঝাতে কিংবা সময় নির্দেশ করতে ব্যবহৃত হয়। প্রিয় বন্ধুর কথা হঠাৎ হঠাৎ মনে পড়লে বন্ধুকে মুখ দিয়ে ‘ক্ষণে ক্ষণে তোমার কথা মনে পড়ে’ আওড়াতে শোনা যায়। ব্যক্তির ভালো কিংবা খারাপ সময়ের যে-কোনো একটি চলতে পারে। কারোর সঙ্গে সাক্ষাৎ মঙ্গল বয়ে আনলে লোকে শুভক্ষণের কথা বলে।
 
একইভাবে, কোনো নির্দিষ্ট সময়ে অমঙ্গল সাধিত হলে মানুষ কুক্ষণের জিকির করে। এভাবে নিজের অনুকূল-প্রতিকূল সময়কে বিশেষিত করতে হলে ক্ষণের পূর্বে বিশেষণ বসাতে হয়, বিশেষ্য নয়। কারণ, সময়টি কীরকম, তা বিশেষণ দিয়ে ব্যক্ত করতে হয়; বিশেষিত করার কাজ বিশেষণের; অন্যপদকে বিশেষিত করবার জন্যেই বিশেষণের সৃষ্টি। তাই, সময় নির্দেশক ‘ক্ষণ’ শব্দটির আগে কোনো শব্দ বসিয়ে ক্ষণকে বিশেষিত করতে হলে, ক্ষণের আগের শব্দটি অবশ্যই বিশেষণ পদ হতে হবে, অন্যথায় কোনো প্রাসঙ্গিক অর্থবোধক সমাসবদ্ধ শব্দ পাওয়া যাবে না। যেমন: অল্প+ক্ষণ = অল্পক্ষণ;
দীর্ঘ+ক্ষণ = দীর্ঘক্ষণ;
কু+ক্ষণ = কুক্ষণ;
শুভ+ক্ষণ = শুভক্ষণ
সারা+ক্ষণ = সারাক্ষণ প্রভৃতি।
 
এখানে, শুরুতে যুক্ত-হওয়া প্রতিটি শব্দ বিশেষণ হওয়ায় এভাবে লিখতে কোনো বাধা নেই। বলা বাহুল্য যে, এখানে শুরুতে যুক্ত-হওয়া প্রতিটি বিশেষণ ওই ক্ষণটি কীরকম, তা নির্দেশ করছে।
 
এবার মূল প্রসঙ্গে আসা যাক— ‘মহেন্দ্র’ শব্দটি একটি বিশেষ্য পদ এবং শব্দটির অর্থ ‘দেবরাজ ইন্দ্র’। এই ‘মহেন্দ্র’ শব্দটি ক্ষণের শুরুতে যুক্ত করে ‘মহেন্দ্রক্ষণ’ লিখলে অর্থ দাঁড়াবে ‘দেবরাজ ইন্দ্র ক্ষণ’, যা একেবারেই অপ্রাসঙ্গিক। তাই, সময় নির্দেশক ‘ক্ষণ’-এর পূর্বে ‘মহেন্দ্র’ শব্দটি সরাসরি যুক্ত না-করে বিশেষণে বদলে নিয়ে যুক্ত করতে হয়৷ সেক্ষেত্রে, তৎসম বিশেষ্য পদকে বিশেষণে পরিণত করার একটি সহজ উপায় হচ্ছে ‘ষ্ণ (অ)’ প্রত্যয় যুক্ত করা। অর্থাৎ, বিশেষ্য মহেন্দ্র+ষ্ণ = বিশেষণ মাহেন্দ্র— বৃদ্ধির সূত্র মেনে আদ্য ‘অ’ স্বর ‘আ’-তে পরিণত হয়েছে।
নতুন সৃষ্ট ‘মাহেন্দ্র’ রূপটি বিশেষণ হওয়ায় নির্দ্বিধায় ‘ক্ষণ’ শব্দের শুরুতে জুড়ে দেওয়া যায় এবং বিধিসম্মত এবং প্রাসঙ্গিক অর্থসম্মত ‘মাহেন্দ্রক্ষণ’ শব্দটি পাওয়া যায়।
 
আবার, সংস্কৃত ‘সৃ’ ধাতু কিংবা বাংলা ‘সর্’ ধাতু থেকে যতগুলো ‘সরা’ রূপ পাওয়া যায়, তার কোনোটিই বিশেষণ হিসেবে ব্যবহার করা যায় না। তাই, সময় নির্দেশক ‘ক্ষণ’ শব্দের শুরুতে ‘সরা’ যুক্ত করে ‘সরাক্ষণ’ লিখলে ব্যাকরণ সমর্থন করে না।
 
 
 
এই পোস্টের লিংক:  https://draminbd.com/অবান্তর-বনাম-অপ্রাসঙ্গিক/
 
error: Content is protected !!