অর্হণা : এক মলাটে সম্পূর্ণ উপন্যাস অর্হণা

ড. মোহাম্মদ আমীন

সংযোগ: https://draminbd.com/অর্হণা-এক-মলাটে-সম্পূর্ণ/

অর্হণা : এক মলাটে সম্পূর্ণ উপন্যাস অর্হণা

স্যমন্তক সিরিজের, দ্বিতীয় উপন্যাস। পুথিনিলয়

 

ভূমিকা

অর্হণা উপন্যাসের কেন্দ্রীয় চরিত্র রচনা ও আহমদ ছফা। তবে পড়তে পড়তে মনে হয়েছে প্রত্যেকটা চরিত্রই কেন্দ্রীয়। তাই প্রতিটা লাইনই পাঠকের মনকে আকণ্ঠ মুগ্ধতায় আটকে রাখতে সক্ষম।
অন্নাদশঙ্কর রায়, আহমদ ছফা, ড. মফিজ আলী চৌধুরী, আহমদ শরীফ, ডাক্তার নুরুল ইসলাম, কবীর চৌধুরী, শামসুর রাহমান, সত্যেন সেন, রণেশ দাশগুপ্ত, আলাউদ্দিন আল আজাদ, সৈয়দ শামসুল হক, গাফফার চৌধুরী, সরদার ফজলুল করিম, মযহারুল ইসলাম, আবদুল মান্নান সৈয়দ, নরেন বিশ^াস, আল মাহমুদ, হুমায়ুন আজাদ, আবদুল কাইউম, আসকার ইবনে সাইখ, শফিউদ্দীন আহমেদ, সুভাষ মুখোপাধ্যায়, প্রফেসর গ্রিয়েল, প্রফেসর ব্রুম, প্রফেসর মিন্ড্রা, প্রফেসর ম্যাক থম্পসন, শ্রাবন্তীনাহা, অরুণাভ সরকার, আবদুল আলিম, নাজিম উদ্দিন মোস্তান, ওসমান গনি, শক্তি চট্টোপাধ্যায়, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, হায়াৎ মামুদ, বুদ্ধদেব বসু, অসীম সাহা, সৈয়দ আলী আহসান, কে এম শিহাব উদ্দিন, আখতারুজ্জামান চৌধুরী বাবু, প্রফেসর কোবাইসি মাসাহিতো, লীলা রায় (অ্যালিস ভার্জিনিয়া ওর্নডর্ফ), প্রফেসর র‌্যাফেল, আবু ইসহাক প্রমুখসহ আরও অনেক কালজয়ী কবি-সাহিত্যিক এই উপন্যাসের চরিত্র।
সমাজ, রাষ্ট্র, সাহিত্য ও সংস্কৃতির সঙ্গে প্রেম-ভালোবাসা আর মানবীয় মূল্যবোধের সুষমিত প্রগাঢ়ত্বের সঙ্গে এতগুলো বিস্ময়কর চরিত্রের চরিত্রায়ণ উপন্যাসটিকে করে তুলেছে অনবদ্য। চরিত্রের সঙ্গে কথোপকথন, সজ্জা আর গ্রহণযোগ্যতা এতই নিবিড় যে, ঘটনা চোখের সামনেই ভেসে থাকে।
উপন্যাসে চরিত্রবর্গের আলাপচারিতায় সমকালীন সাহিত্য-সংস্কৃতি, আর্থ-রাজনীতি ও সামাজিক পরিবেশ সম্পর্কে যে তথ্য-উপাত্ত নির্দেশিত হয়েছে তা বাস্তবতার দ্যোতনায় ইতিহাস-সম দ্যোতিত। সর্বোপরি কল্পনার সঙ্গে নায়কের ভীষণ স্পর্শকাতর সম্পর্ক পাঠককে নতুন ভাবনায় মারাত্মক দ্বিধায় ফেলে দেবে। বাংলা সাহিত্যকে এমন একটি অসাধারণ উপন্যাস উপহার দেওয়ার জন্য আমি লেখক ড. মোহাম্মদ আমীনকে গভীর কৃতজ্ঞতা জানাই।

অধ্যাপক হায়াৎ মামুদ
গেণ্ডারিয়া, ঢাকা

এবার শুরু করে যাক মূল উপন্যাস 

অর্হণা: প্রথম পর্ব

সামাজিক ও জৈবিক সম্পর্ক বিবেচনায় রচনা আমার কেউ না। কিন্তু হার্দিক নৈকট্য বিবেচনায় বলা যায়— সে ছাড়া আমার কেউ নেই। সেই আমার সবকিছু। কর্মের চেয়ে বড়ো আর কী হতে পারে?
অনেকে বলেন, জন্মের চেয়ে বড়ো কিছু নেই।
জন্ম?
সে এমন একটি ঘন ও ঘৃণ্য তরলের জমাট কারসাজি যা মানুষ গ্যালনে গ্যালনে মূত্রের চেয়েও চরম অবলীলায় যখন-তখন ছেড়ে-ঝেড়ে স্বস্তি পায়। এই মুহূর্তে আমার এমনই মনে হচ্ছে। ভালোবাসা মানুষের মনে এমন অস্থির সাংঘর্ষিকতা সৃষ্টি করে। তবু মানুষের জীবনে ভালোবাসা মৃত্যুর মতো অনিবার্য। তাই মৃত্যুর মতো আকস্মিক কোনো পূর্ব ঘোষণা ছাড়াই নেমে আসে সে।
উড়োজাহাজ আকাশে। ওখানেই রচনা। রাত একটার আগে পৌঁছতে পারবে না। আরও বেশিও লেগে যেতে পারে। পথের মত আছে কিন্তু ব্রত নেই। রচনা চলে গেছে। কষ্টে বুক ফেটে অগণিত খণ্ডে ছিটকে বেড়ানো ছন্নছাড়া মেঘের মতো সারা আকাশ ছুটে বেড়াচ্ছে—জড়ো হয়ে ঝরে পড়ার জন্য । কষ্টে কষ্টে বুক ফেটে এমন অগণিত টুকরো হয়ে যাওয়াই কি ভালোবাসা?
চারদিকে তাকালাম।
রচনা নেই।
আমার অর্ধ দশকের ইতিহাস এক মুহূর্তের মধ্যে বিলীন হয়ে গেল। কর্তব্য যেখানে মাথাচাড়া দেয়, আবেগ সেখানে পিঁপড়েভোগ্য কেঁচো। ভালোবাসা সেখানে স্ত্রীর আদেশে বয়ে আনা দৈনিক বাজার।
রচনা নেই। যেন কেউ নেই, কিছু নেই। ইতস্তত কত মানুষ, কত ভিড়, তবু কথা বলার কেউ নেই। এত কষ্টকর সময় আসবে কখনো ভাবতে পারিনি। চারদিকে কত মুখ, কত কোলাহল- সব যেন জাদুঘরের ছবি, নির্জীব কাগজ। অনেক দূরাকাশে উড়োজাহাজের ভেতর শুধু দুটো চোখ টলমল জলে জ্বলজ্বল করেছে— চোখ নয়, যেন স্বপ্নের দেউল। আমি বন্ধুহীন হয়ে গেলাম। বন্ধুহীন হওয়ার চেয়ে ভয়ংকর আর কিছু হয় না।
বিষণ্ন মনে গাড়িতে উঠলাম।
কোথায় যাবেন, স্যার? ড্রাইভার জানতে চাইল।
জানি না, তবে বাসায় নয়; অফিসেও নয়।
বুঝতে পেরেছি।
বাসায় ফিরলাম রাত সাড়ে দশটার পরে। আরও পরে যেতাম, কিন্তু পিচ্চিদের জন্য তাড়াতাড়ি ফিরতে হল। এখানেও কর্তব্য এসে আমার ইচ্ছাকে অনিচ্ছাসত্ত্বেও ক্রীতদাসের মতো উঠবস করাচ্ছে।
গৃহকর্মী রান্নাবান্না করে অনেক আগে চলে গেছে। বাসায় ঢুকে আরও অস্থির হয়ে পড়ি। সবাই আমাকে দেখে সমবেত কান্না জুড়ে দিল। আনাচেকানাচে রচনার চিহ্ন। চিহ্নগুলো আমার কলজেকে ছিন্নভিন্ন করে দিতে ধেয়ে আসছে। দরজা খুলে বারান্দায় চলে গেলাম। কল্পনা আসতে চাইল, নিষেধ করলাম। অন্য সময় হলে আসার জন্য বায়না ধরত।
অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে। পেছন হতে কেউ এসে গায়ে চাদর জড়িয়ে দিয়ে বলছে না— স্যার, ঠান্ডা লাগবে। চলে আসুন ভেতরে। মনে মনে গানে গানে রচনার গলা ভেসে আসছে মগজের কল্পনায়। সে যেন আমার পাশে বসে গাইছে—
“বরষার ভরসায় দিন কেটে গেল কতকাল
তুমি এখনো যে আসনি তাই

রাত আমার হয়নি সকাল।”
আমারই লেখা গান। বড়ো সুন্দর করে গাইত। বারান্দা ছেড়ে ব্যালকনিতে চলে যাই। বাইরে আলোর লুটোপুটি, গাড়ির ছোটাছুটি, হর্নের আওয়াজ— সবকিছু বিদঘুটে লাগছে। আল্পনা-কল্পনা ও টুটুল-নিনির অবস্থা আরও খারাপ। সেই দুপুর থেকে এ অবধি কেউ খায়নি। শোকের মতো ক্ষুধানাশক বটিকা আর নেই। আমি নিজেই যেখানে ভেঙে পড়েছি, সেখানে এদের কী দোষ দেব।
ভাবনায় ছেদ আনে টেলিফোন, এত রাতে কে রিং করবে? নিশ্চয় রচনা। আলোর বেগে রিসিভার নিয়ে হ্যালো বলতেই ভেসে এল রচনার কান্নামোড়া কণ্ঠ, স্যার, আপনি কেমন আছেন?
তুমি কেমন আছ, মেয়ে? কোথায় এখন?
এই মাত্র হলে আমার নির্ধারিত রুমে ঢুকলাম। আধ ঘণ্টার মধ্যে রেডি হয়ে আইস-ব্রেকিঙে যেতে হবে। স্যার, আপনি কোথায়?
ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে চাঁদ, না না তোমাকে দেখছিলাম চাঁদে।
আপনার গায়ে কেউ চাদর জড়িয়ে দিয়েছে?
দেবে।
কখন?
ওরা আমার চেয়েও বেশি ভেঙে পড়েছে।
এলোমেলো চুলগুলো সোজা করার ছলে কেউ কি আরও এলোমেলো করে দিয়েছে?
কয়েকদিন পর সব ঠিক হয়ে যাবে।
স্যার, ওষুধটা খেয়েছেন?
এই তো খাব।
আপনার গলা এত ভার ভার লাগছে কেন?
“তোমার অনুপস্থিতি বড়ো কষ্ট দিচ্ছে।” কথাটা বলেই বুঝতে পারলাম, বলা উচিত হয়নি। রচনা তার সব কষ্ট কান্নায় ঢেলে দিয়ে হাউমাউ শব্দে বলল, “আমি বুঝেছিলাম, আমার বিদায়ে আপনি কত কষ্ট পেয়েছিলেন, তবু আমার জন্য আমাকে বিদায় দিয়েছেন। এটাই তো বলে বিসর্জন, তাই না স্যার?”
প্রিয়জনকে শান্ত রাখতে হলে সান্ত্বনার বাণী শোনাতে হয়, আমি রচনার শোকের আগুনে ঘি ঢেলে দিয়েছি। শোধরানোর জন্য বললাম, আমি ভালো আছি, শীঘ্রি আসছি অক্সফোর্ড; কেঁদো না, সোনা।
এ সোনা ডাকটা শোনার জন্য পাঁচ বছর অপেক্ষা করেছি। কোনোদিন ডাকেননি। এখন কেন ডাকলেন?
এবার হতে ডাকব—
“তুমি আমার সোনা,
জীবনের আলপনা; মুগ্ধতায় বোনা।”
স্যার, আমার এমন কষ্ট লাগছে কেন?
তুমি আমাকে ভালোবাস, তাই।
স্যার, আপনি কি আমাকে ভালোবাসেন?
তোমার কী মনে হয়?
শ্রদ্ধায় এত নুইয়ে ছিলাম কখনো ভালোবাসার উষ্ণতা নেওয়ার সাহস পাইনি। তাই শ্রদ্ধা-ভয়ে, মা-বোন-প্রেমিক-বন্ধু আর সেবিকার আড়ালে নিজেকে লুকিয়ে রাখতে বাধ্য হয়েছি। বের হওয়ার চেষ্টা করেছিলাম, এগিয়ে যাওয়ার সাহস হয়নি।
তোমার শ্রদ্ধা আমার ভালোবাসাকে লজ্জার আবরণে মন্দির করে দিয়েছিল। আমিও এগোতে পারিনি। প্রার্থনায় প্রার্থনায় সব ভালোবাসা নৈবেদ্য হয়ে জমে গেছে বরফের মতো শীতল মমতায়।
স্যার, আমার কথা কি আপনার মনে থাকবে? সময়ের স্রোতে হয়তো একদিন কথাও বন্ধ হয়ে যাবে। কারও মনেই থাকবে না কাউকে। কেউ বুঝতেই পারবে না, কত বড়ো সৃষ্টি আর কত বড়ো ধ্বংসলীলা ঘটে গেল।
“এমন হবে না”, আমি বললাম।
চোখের আড়াল মানে মনের আড়াল।স্যার, এটি ইউরোপ, বাংলাদেশ নয়। নামার পর বুঝতে পারলাম নিজেকে ছাড়া আর কাউকে নিয়ে ভাবার ফুরসত হবে না। এখানকার প্রত্যেকটা মানুষ যেন রক্তমাংসের একেকটা বিকট যন্ত্র। তাদের ভালোবাসাও যন্ত্রের মতো জ্বালানি ভরা ধোঁয়া।
না সোনা, আমাদের এমন হবে না। আমরা তো ইংরেজ নই।
এটাই ভরসা স্যার। আইস ব্রেকিঙের বেল বেজে উঠেছে।
ভালো থেকো, সোনা, শরীরের যত্ন নিয়ো।
রিসিভার রেখে রচনার ছবির দিকে তাকাই। আমার মন, আমার মনকে হাহাকার করে তোলে। রচনার কাছে যাব? না কি চলে আসতে বলব?
উত্তর এলো— এখন কোনোটা সম্ভব না। তুমি নিজেই তোমার সব পথ রুদ্ধ করে দিয়েছ। সবকিছু অতীত হয়ে গেছে। অতীতকে ঈশ্বরও পরিবর্তন করতে পারে না। তোমার কোনো অজুহাত আর অবশিষ্ট নেই।
তুমি কে বলছ?
“আমি অতীত”, উত্তর এল, “ঈশ্বরের ঈশ্বর। যখন ঈশ্বর ছিল না তখনও আমি ছিলাম। আমিই একমাত্র চিরন্তন।”
আল্পনা-কল্পনা ও টুটুল আমার রুমে আমাকে ঘিরে বড়ো বেশি বিষণ্নমুখে বসে আছে। সকাল প্রায় হয়ে আসছে। নিনি খাওয়ার জন্য বারবার ডাকছে, অনুনয় করছে বিনত গলায়। এই বয়সে তার এমন কর্তব্যবোধ ভীষণ নাড়া দিল আমাকে। কেউ নেই তার, বাসায় এসেছে গৃহকর্মী হিসেবে। এখন মায়ের ভূমিকায়।
কাছে গিয়ে নিনিকে জড়িয়ে ধরে বললাম, এই পিচ্চি বয়সে মা হয়ে গেলে তুমি! কী দিয়ে শোধ করব তোমার এ মাতৃত্বের অনাবিল ঋণ!
ভাইয়া, না খেলে যে শরীর খারাপ হয়ে যাবে, তাই। আমার কষ্ট লাগছে। আপনি ক্ষুধায় কষ্ট পাবেন।
আল্পনা-কল্পনা আর টুটুল খেয়েছে?
“অনেক বার বলেছি; খাচ্ছে না”, নিনি বলল।
আমারও খেতে ইচ্ছে করছে না। তুমি খেয়ে নাও।
আমারও খেতে ইচ্ছে করছে না।
টুটুলকে খাইয়ে দাও।
“খেতে ইচ্ছে করছে না।”, টুটুল আমার গলা জড়িয়ে ধরে আদুরে গলায় বলল, “ভাইয়া আমি আপনার সঙ্গে থাকি?”
আল্পনা-কল্পনাও সমস্বরে বলে ওঠে, আমরাও থাকব।
থাকবে।
আমার কথা শেষ হওয়ার আগে আল্পনা-কল্পনা আর টুটুল সব শোক ভুলে নৃত্যভঙ্গিতে বালিশ আনার জন্য চলে গেল। নিনি চুপ করে দাঁড়িয়ে। মনে হচ্ছে তার অধিকারে ঘাটতি আছে। তাই সে বালিশ আনতে যেতে পারল না। বলতে পারছে না—ভাইয়া, আমিও আপনাদের সঙ্গে থাকব।
নিনি?
জি ভাইয়া।
তুমিও আমাদের সঙ্গে থাকবে।
আমার কথা শুনে নিনি এমন একটি হাসি দিল— মনে হলো সৌরজগতের সব গ্রহের মিলিত জোছনা নিনির হাসির কাছে ম্লান হয়ে গেছে। তা দেখে আমি লজ্জায় কুণ্ঠিত, অনুশোচনায় আহত। এত সহজে মানুষকে এত আনন্দ দেওয়া যায়, তৃপ্তি দেওয়া যায়!
কেন এতদিন তা করিনি?
ছি!
 

error: Content is protected !!