অলংকার : শব্দালংকার : অনুপ্রাস

ড. মোহাম্মদ আমীন

বাক্যে বিশেষ্য হিসেবে ব্যবহৃত সংস্কৃত ‘অলংকার (অলম্‌+√কৃ+অ)’ শব্দের অর্থ — (১) গহনা, ভূষণ, (২) প্রসাধন, (৩) শোভা, (৪) গৌরব ও (৫) ভাষার মাধুর্য ও উৎকর্ষ বৃদ্ধি করে এমন গুণ।

 অলংকার ভিন্ন স্থানে ভিন্নভাবে ব্যবহৃত হয়। তবে বস্তু  ও সাহিত্যের অধরা ধারণা হিসেবে অলংকার ভিন্ন প্রকৃতির হলেও উভয়ের উদ্দেশ্য ও কার্যকরণ অভিন্ন  এবং তা হলো সৌন্দর্য বৃদ্ধি। আলোচ্য প্রবন্ধের  (৫) ক্রমিকে বর্ণিত  বিষয় অর্থাৎ ভাষার মাধুর্য ও উৎকর্ষ বৃদ্ধি করে এমন গুণ অর্থে  পরিচিত অলংকারের বিষয় নিয়ে আলোচনা করা হবে। এবার এক্ষেত্রে অলংকারের সংজ্ঞার্থ পর্যালোচনা করা যাক।

 কাব্যের অতিরিক্তি শোভাবর্ধন ও রসাদির উৎকর্ষসাধনকারী হিসেবে শব্দ ও অর্থের যে অস্থায়ী ধর্ম পরিলক্ষিত হয়,  ভাষা ও সাহিত্যে তাকে অলংকার বলা হয়। গহনা বা ভূষণ যেমন অঙ্গের শোভবর্ধন করে থাকে তেমনি, সাহিত্যে অলংকার হিসেবে পরিচিত বিষয়টি কাব্য তথা বাক্য ও ভাষার শোভাবর্ধন করে থাকে। অলংকার কাব্যের অস্থায়ী ধর্ম। কাব্যদেহে লাবণ্য বা গুণসমূহ যত আবশ্যক অলংকার তত আবশ্যক নয়। আলংকরিকদের মত, অলংকার দুই প্রকার। যথা:  শব্দালংকার ও (২) অর্থালংকার।

শব্দালংকার

যে অলংকার, ধ্বনি বা শব্দের সৌন্দর্য বৃদ্ধি করে বাক্যেকে শ্রুতিমধুর করে, তাকে শব্দালংকার বলে। শব্দালংকার শব্দের অর্থের পরিবর্তন সহ্য করতে পারে না, কেবল সৌন্দর্য বর্ধন করে। দেহের ভূষণ বা গয়না যেমন ভূষণধারীর অবয়ব পরিবর্তন করতে পারে না, তেমনি শব্দালংকারও শব্দের কোনো অর্থ পরিবর্তন করতে পারে না। শব্দালংকার মূলত ধ্বনির অলংকার। শব্দালংকার পাঁচ প্রকার। যথা:  (১) অনুপ্রাস,  (২) যমক,  (৩) শ্লেষ,  (৪) বক্রোক্তি এবং  (৫) পুনরুক্তবদাভাস।

অনুপ্রাস: একই বর্ণ বা বর্ণগুচ্ছ অর্থাৎ একই ধ্বনি বা ধ্বনিগুচ্ছ যুক্তভাবে কিংবা বিযুক্তভাবে বারবার ধ্বনিত হলে তাকে অনুপ্রাস বলা হয়। প্রকৃতপক্ষে সার্থক অনুপ্রাস ধ্বন্যুক্তি ছাড়া আর কিছু নয়।  যেমন: 

 (ক) হেসে খল খল গেয়ে কল কল তালে তালে দিব তালি।  (নির্ঝরের স্বপ্নভঙ্গ, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর)

(খ) এত কথা আছে, এত গান আছে, এত প্রাণ আছে মোর,

এত সুখ আছে, এত সাধ আছে— প্রাণ হয়ে আছে ভোর। (নির্ঝরের স্বপ্নভঙ্গ, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর)।

এখানে (ক)  ‍উদাহরণে ‘ল’ ৭ বার এবং ‘ত’ ৩ বার ধ্বনিত হয়েছে।  (খ) ক্রমিকের উদাহরণে ‘এত’ শব্দটি ৫ বার এবং  ‘আছে’ শব্দটি ৬ বার ধ্বনিত হয়েছে।

অনুপ্রাস প্রধানত পাঁচ প্রকার। যথা:

(১) অন্ত্যানুপ্রাস,

(২) বৃত্ত্যনুপ্রাস,

(৩) ছেকানুপ্রাস,

(৪) লাটানুপ্রাস ও

(৫) শ্রুত্যনুপ্রাস।

১. অন্ত্যানুপ্রাস: কবিতায় পদান্তের সঙ্গে পদান্তের কিংবা চরণান্তের সঙ্গে চরণান্তের যে ধ্বনিসাম্য লক্ষ করা যায়, তাকে ‘অন্ত্যানুপ্রাস’ বলা হয়। অন্ত্যানুপ্রাসে স্বরধ্বনিকে পূর্ণমর্যাদা দেওয়া হয়। যেমন: 

(১) “শুধু বিঘে-দুই ছিল মোর ভুঁই, আর সবই গেছে ঋণে

বাবু বলিলেন, “ বুঝেছ উপেন? এ জমি লইব কিনে।” (দুই বিঘা জমি, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর)

২. এইখানে তোর দাদির কবর ডালিম গাছের তলে

তিরিশ বছর ভিজিয়ে রেখেছি দুই নয়নের জলে। (কবর, জসীম উদ্‌দীন)।

(১) নম্বর উদাহরণে প্রথম চরণের শেষ ধ্বনি ‘ণে’ এবং দ্বিতীয় চরণের শেষ ধ্বনি ‘নে’উভয় ধ্বনিসাম্য চরণদুটির অন্ত্যে হয়েছে। তাই এটি একটি অন্ত্যানুপ্রাস। (২) নম্বর উদাহরণে ‘তলে’ ও ‘জলে’ অন্ত্যমিল রয়েছে। তাই এটিও একটি অন্ত্যানুপ্রাস।

২. বৃত্ত্যনুপ্রাস:  যখন কোনো একটি ব্যঞ্জনধ্বনি একাধিকবার ধ্বনিত হয়, কিংবা ব্যঞ্জন ধ্বনিগুচ্ছ যথাক্রম বা যথাস্থান অনুসরণ করে যুক্ত কিংবা বিযুক্তভাবে বৃত্তের মতো বারবার ধ্বনিত হয়, তখন তাকে ‘বৃত্ত্যনুপ্রাস’ বলে। বৃত্ত্যনুপ্রাস রসের পরিপোষণকারী হিসেবে কাব্যকে আলাদা সৌন্দর্য মণ্ডিত করে। বৃত্ত্যনুপ্রাসের চারটি বৈশিষ্ট্য রয়েছে। যথা:

(ক) . একটি মাত্র ব্যঞ্জনধ্বনি দু-বার ধ্বনিত হবে। যেমন:   যে জন চলিয়াছে তারি পাছে সবে ধায়/ নিখিলের যত প্রা যত গা ঘিরে তায়। এই উদাহরণের প্রথম পদে ‘ছ’  দুবার এবং দ্বিতী পাদে ‘য’ ও ‘ন’ ( ন ণ) দুবার ধ্বনিত হয়ে বৃত্ত্যনুপ্রাস সৃষ্টি হয়েছে। আবার, পদান্তে ধ্বনিসাম্য থাকায় সৃষ্টি হয়েছে অন্ত্যানুপ্রাস। অন্যায় যে করে আর অন্যায় যে সহে/ তব ঘৃণা তারে যেন তৃণ সমদহে।” এই উদাহরণে অন্যায় ধ্বনিগুচ্ছ দুবার ধ্বনিত হয়েছে। ফলে এখানে বৃত্ত্যনুপ্রাস সৃষ্টি হয়েছে।

(খ) একটিমাত্র ব্যঞ্জনবর্ণ বহুবার ধ্বনিত হবে। যেমন:  বেলা যে পড়ে এ জলকে চ। (রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর) এখানে ল’ ৪ বার ধ্বনিত হয়েছে। পলে বৃত্ত্যনুপ্রাস হয়েছে। বন্দি চরণার বিন্দ, অতি মন্দ মতি” (মাইকেল মধুসূদন)। এখঅনে যুক্তব্যঞ্জন ‘ন্দ’ ৩ বার ধ্বনিত হয়েছে। সুতরাং এটি একটি বৃত্ত্যনুপ্রাস।

(গ) ব্যঞ্জনগুচ্ছ স্বরূপানুসারে কেবল দুবার ধ্বনিত হয়। যেমন:  ভূলোক দ্যুলোক গোলোক ছাড়িয়া/ খোদার আসন আরশ ভেদিয়া” নজরুল। এখানে প্রথম পঙ্‌ক্তিতে স্বরধ্বনি-সহ অযুক্ত ব্যঞ্জনগুচ্ছ ‘লোক’ পরপর তিন বার ধ্বনিত হয়েছে। ধ্বনিগুচ্ছের ক্রমও ভাঙেনি। সুতরাং এটি একটি বৃত্ত্যনুপ্রাস।

(ঙ) ব্যঞ্জনগুচ্ছ যুক্তভাবে বা অযুক্তভাবে ক্রমানুসারে বহুবার ধ্বনিত হবে। যেমন:  দুলিতেছ তরী ফুলিতেছে জল, ভুলিতেছে মাঝি পথ (নজরুল)। এখঅনে ‘-লিতেছে’ ধ্বনিগুচ্ছ তিন বার ধ্বনিত হয়েছে। জন পূজন সাধন আরাধনা সমস্ত থাক পড়ে (রবীন্দ্রনা)। এখানে ‘অন’ তিন বার ধ্বনিত হয়েছে।

(৩) ছেকানুপ্রাস: দুই বা ততোধিক ব্যঞ্জনবর্ণ যুক্তভাবে বা বিযুক্তভাবে ক্রম অবস্থান ভঙ্গ না করে  যদি দুবার মাত্র ধ্বনিত হয়, তবে তাকে ছেকানুপ্রাস বলে।  মনে রাখা প্রয়োজন, এক ব্যঞ্জনর্ণে ছেকানুপ্রাস হয় না। বৃত্ত্যনুপ্রাসেও ব্যঞ্জনগুচ্ছের দুবার ধ্বনিত হয়। কিন্তু সেখানে ধ্বনিত হয় শুধু অযুক্তভাবে এবং স্বরূপানুসারে। অন্যদিকে ছেকাুনুপ্রাসে দুবার ধ্বনিত হয় যুক্তভাবে কিংবা বিযুক্তভাবে  কিন্তু ক্রমানুসারে।  যেমন: 

আমি বিদ্রোহী রণ ক্লান্ত

আমি সেই দিন হব শান্ত। (নজরুল)

এখানে ‘ন্ত’ যুক্তব্যঞ্জনের ধ্বনিগুচ্ছ যুক্তভাবে ক্রম ভঙ্গ না করে দুবার ধ্বনিত হয়েছে। সুতরাং এটি একটি ছেকানুপ্রাস। 

পালঙ্কে শয়ন রঙ্গে                               বিগলিত চীর অঙ্গে। (জ্ঞানদাস)।

এখানে যুক্তব্যঞ্জন ‘ঙ্গ ধ্বনিগুচ্ছ যুক্তভাবে মাত্র দুবার ধ্বনিত হয়েছে। তাই এখানে ছেকানুপ্রাস সৃষ্টি হয়েছে।

(৪) লাটানুপ্রাস:  শব্দের গুরুত্ব  বা তাৎপর্য অনুযায়ী একই শব্দের পুনরাবৃত্তিকে ‘লাটানুপ্রাস’ বলা হয়। অর্থ অভিন্ন থাকলেও এই অলংকারে তাৎপর্যের সূক্ষ্ম তফাত লক্ষ করা যায়। লাটানুপ্রাস সংস্কৃতে বেশি দেখা যায়। বাংলায় এর প্রয়োগ তেমন একটা দেখা যায় না। যেমন:

১.  “কেবল আঁখি দিয়ে আঁখির সুধা পিয়ে

হৃদয় দিয়ে হৃদি অনুভব

আঁধারে মিশে গেছে, আর সব।”

এখানে আঁখি হৃদি শব্দ দুটির অর্থ এক হলেও উভয় শব্দের তাৎপর্য পৃথকভাবে অনুভূত হয়। তাই এখানে ‘লাটানুপ্রাস’ সৃষ্টি হয়েছে।

 

(৫) শ্রুত্যনুপ্রাস: শ্রুত্যনুপ্রাস অভিন্ন উচ্চারণ স্থান বা অভিন্ন বাগ্‌যন্ত্রের সঙ্গে জড়িত। বাংলায় একই স্থানে উচ্চারিত ধ্বনি: যেমন: ক ও খ সদৃশ্য ধ্বনি; গ ও ঘ সদৃশ্য ধবনি। কারণ এদের উচ্চারণ স্থান অভিন্ন (কণ্ঠ)। অনুরূপভাবে—  চ ছ, ট ঠ, ত থ, প ফ, জ ঝ, ড ঢ, দ ধ, ব ভ প্রভৃতি বর্ণজোড় সদৃশ্য ধ্বনি। বাগ্‌যন্ত্রের অভিন্ন স্থান থেকে উচ্চারিত এবং শ্রুতিগ্রাহ্য ও সাদৃশ্যময় ব্যঞ্জনধ্বনির সাহায্যে যে অনুপ্রাস সৃষ্টি হয়, তাকে ‘শ্রুত্যনুপ্রাস’ বলা হয়।  যেমন: 

সবাই তো ভুলে আছে/ কেহ হাসে কেহ নাচে। (রবীন্দ্রনাথ)

চলেছিলাম পূজার ঘরে সাজিয়ে ফুলের অর্ঘ্য

খুঁজি সারা দিনের পরে কোথায় শান্তি স্বর্গ। (রবীন্দ্রনাথ)।

আউলাইয়া মাথার কেশ কভু নাহি বান্ধে

রাধা কানু অভিমানে গোপিনী সব কান্দে ( সৈয়দ মর্তুজা)।

 ৩.  তোমার বাড়ি আমার বাড়ি মধ্যে বহে নদী

ও কুলের লাগিয়া এক কূল কান্দে নিরবধি। (জসমী উদ্‌দীন)

অর্থালংকার: যে অলংকার কাব্যে অর্থের বৈচিত্র্য আনে এবং একই সঙ্গে অর্থের শোভাও বৃদ্ধি করে তাকে অর্থালংকার বলে। শব্দালংকারের প্রধান আবেদন শ্রুতির মধ্যে, কিন্তু অর্থালংকারের প্রধান আবেদন বুদ্ধির কাছে। বাক্যে ব্যবহৃত শব্দার্থ বোধ্যগম্য না হলে এর অলংকারিত্ব অপ্রকাশিত থেকে যায়। অর্থালংকারের ক্ষেত্রে অর্থ ঠিক রেখে শব্দ পরিবর্তন করলেও অলংকারের কোনো ক্ষতি হয় না। অর্থালংকারকে পাঁচভাগে ভাগ করা হয়েছে। যথা: ১. সাদৃশ্যমূলক অলংকার। (২) বিরোধমূলক অলংকার। (৩) শৃঙ্খলামূলক অলংকার। (৪) গূঢ়ার্থমূলক অলংকার। ও (৫) ন্যায়মূলক অলংকার।

ক্রমশ

— √

error: Content is protected !!