অসমাপিকা ক্রিয়া : বাংলা ব্যাকরণ সমগ্র

ড. মোহাম্মদ আমীন

অসমাপিকা ক্রিয়া : যে ক্রিয়ারূপ বাক্যকে সম্পূর্ণতা দেয় না এবং বিধেয় এর বিষয়ে সুনির্দিষ্টভাবে কিছু প্রকাশ করে না, তাকে বলে অসমাপিকা ক্রিয়া বা অসমাপিকা ক্রিয়ারূপ। এরূপ ক্ষেত্রে বাক্য শেষ করতে হলে অন্য একটি ক্রিয়ার আগমন ঘটাতে হয়। যেমন- কথাটা শুনে তিনি খুশি [হলেন]; “আজ তোমারে দেখতে [এলেম]”-রবীন্দ্রনাখ; “টাকা মেরে পালালি শেষে?” -সুকুমার। তুমি যে সুরের আগুন ছড়িয়ে [দিলে] মোর প্রাণে।”-রবীন্দ্রনাথ।

এসব বাক্যে— দেখতে, শুনে, মেরে প্রভৃতি অসমাপিকা ক্রিয়া। বাক্যে অসমাপিকা ক্রিয়া থাকলে, বাক্যটি সম্পূর্ণ করার জন্য সমাপিকা ক্রিয়ার প্রয়োজন হয়। অসমাপিকা ক্রিয়ার কোনো কালরূপ হয় না। ধাতুর সঙ্গে প্রত্যয় যুক্ত করে অসমাপিকা ক্রিয়ারূপ হয়। যেকোনো ধাতুর অসমাপিকা ও সমাপিকা— দুরকম রূপ হতে পারে। কোন প্রত্যয় যুক্ত হচ্ছে— এ বিচারে অসমাপিকা ক্রিয়াকে কয়েকটি ভাগে ভাগ করা যায়। যেমন: ১. ল্যবর্থ অসমাপিকা ক্রিয়া বা পূর্বক্রিয়া। যেমন- তোমরা হাসিয়া খেলিয়া চলিয়া যাও। হেসে খেলে চলে যাও। “সম্মুখ সমরে পড়ি বীর চূড়ামণি।”-মাইকেল মধুসূদন। ২. ভূতার্থ অসমাপিকা ক্রিয়া বা সাপেক্ষ সংযোজক। যেমন- তাড়াহুড়ো করলে কাজ হবে না। আগে গেলে বাঘে খায়, পরে গেলে ধন পায়। সভাপতি এলে সভার আসল কাজ শুরু হবে। ৩. তুমর্থ অসমাপিকা ক্রিয়া বা নিমিত্তার্থক অসমাপিকা ক্রিয়া। যেমন- সে গান শুনিতে গিয়েছিল। “আজ তোমারে দেখতে এলেম”-রবীন্দ্রনাথ।

অসমাপিকা ক্রিয়াজাত ক্রিয়াবিশেষণ : অসমাপিকা ক্রিয়া যদি ক্রিয়া বিশেষণের কাজ করে, তবে তাকে অসমাপিকা ক্রিয়াজাত ক্রিয়াবিশেষণ বলা হয় । যেমন- সে চেঁচিয়ে বলল। লোকটি হাঁ-করে ঘুমায়। “গান গেয়ে দাঁড় মাঝি টানে”—অতুলপ্রসাদ।

অসমাপিকা ক্রিয়ার প্রত্যয় : ধাতুর সঙ্গে যে ধাতুপ্রত্যয় যুক্ত হলে অসমাপিকা ক্রিয়া হয়, সেটি হচ্ছে অসমাপিকা ক্রিয়ার প্রত্যয়। এর তিনটি প্রকারভেদ রয়েছে:

১. ল্যবর্থ বা পূর্বক্রিয়াবোধক : ইয়া (সাধুভাষায়); এ, য়ে (চলিত ভাষায়)। যেমন- √চল্ + ইয়া = চলিয়া; √খা + ইয়া = খাইয়া; √চল্ + এ = চলে; √খা + য়ে = খায়ে  খেয়ে।

২. ভূতার্থ বা সাপেক্ষ সংযোজক : ইলে (সাধু); লে (চলিত)। যেমন- √কর্‌ + ইলে = করিলে ; √কর্‌ + লে = করলে। ৩. তুমর্থ বা নিমিত্তার্থক : ইতে (সাধু) ; তে (চলিত)। যেমন- √কর্ + ইতে = করিতে ; √কর + তে = করতে। এ প্রত্যয়ের চলিত রূপগুলোকে স্বতন্ত্র প্রত্যয় না বললেও চলে। বস্তুত খেয়ে, বলে, করলে, করতে প্রভৃতি চলিত রূপ যথাক্রমে খাইয়া, বলিয়া, করিলে, করিতে ইত্যাদি সাধুভাষার রূপগুলো পরিবর্তিত হয়ে এসেছে। এ পরিবর্তনের মূলে আছে অভিশ্রুতি, অপিনিহিতি, স্বরসংগতি, স্বরধ্বনি লোপ ইত্যাদি।

অসমাপিকা ক্রিয়ারূপ কর্ম : অনেক সময় অসমাপিকা ক্রিয়া বিশেষ্যের ভাব বহন করে এবং বাক্যে কর্মপদের কাজ করে। এরকম কর্মকে বলা হয় অসমাপিকা ক্রিয়ারূপ কর্ম। যেমন- “মরিতে চাহি না আমি সুন্দর ভুবনে”-রবীন্দ্রনাথ। তিনি তো বাঁচতেই চেয়েছিলেন। তারা খেতে চেয়েছিল দুটো ভাত।

অসম্পূর্ণ ক্রিয়া : যেসব ক্রিয়াকে সব রকম কালে ও ভাবে ব্যবহার করা চলে না, তাদের বলা হয় অসম্পূর্ণ ক্রিয়া বা অপূর্ণরূপ ক্রিয়া বা পঙ্গু ক্রিয়া। যেসব ধাতু থেকে এ ধরনের ক্রিয়া হয়, তাদের নাম অসম্পূর্ণ ধাতু বা পঙ্গু ধাতু। যেমন- ‘আছ্’-ধাতুর ভবিষ্যৎকাল নেই, এই কালের জন্য ‘থাক্’-ধাতু ব্যবহার করতে হয়। যেমন- ‘বট্’-ধাতুর বর্তমানকাল ছাড়া অন্য কোনো কাল নেই। আমি আজ চোর, তুমি সাধু বটে। কিন্তু ‘বটব’, ‘বটতাম’ হয় না। যেমন- ‘যা’-ধাতুর ক্ষেত্রে অতীতকালে ‘গম্’-ধাতুর সাহায্য লাগে। যায়, যাবে কিন্তু গেল, গেলাম। পুরাঘটিত বর্তমানেও তাই। 


সঠিক বানান কোনটি

সাধারণ জ্ঞান সমগ্র/২

সাধারণ জ্ঞান সমগ্র/১

বাংলা বানান কোথায় কী লিখবেন এবং কেন লিখবেন/১

বাংলা বানান কোথায় কী লিখবেন এবং কেন লিখবেন

কীভাবে হলো দেশের নাম

বাংলা ভাষার মজা, ড. মোহাম্মদ আমীন, পাঞ্জেরী পাবিলিকেশন্স লি.।

উৎস: বাংলা ব্যাকরণ অভিধান, ড. মোহাম্মদ আমীন, পুথিনিলয়, বাংলাবাজার, ঢাকা।

error: Content is protected !!