অসি ও মসি-র গল্প

ইউসুফ খান

অসি ও মসি-র গল্প

অসি: অসি খুব খুব প্রাচীন শব্দ। প্রাচীন মানুষ শিকারে গিয়ে পশু কোপাতে যে অস্ত্র ব্যবহার করতো তাই অসি। এটা আবেস্তা-য় অহু, প্রাচীন তুর্কিস্তানের হিত্তাইত-এ হাসিরা, প্রত্নআর্যে হঁসি। বাংলায় এখনও চলে শব্দটা – হেঁসো, হাঁসুয়া। ‘বিশে ডাকাত হেঁসোর এক কোপে মানুষের মুণ্ডু ধড় থেকে আলাদা করে দিতো।’
আরণ্যক মানুষ হিংস্র অরণ্যে ঘুরতো হেঁসোরাম হুঁশিয়ার হয়ে, সবসময় সঙ্গে খোলা অসি বয়ে বয়ে। সে সময় অসি শব্দটা সাধারণ মানুষের কাছেই জলচল ছিলো। ঝুলিয়ে ঝুলিয়ে বয়ে বেড়ানো হাতের হেঁসো, কম ব্যবহার হতে হতে একসময় কোমরে আশ্রয় নেয়।

ইউসুফ খান

এখনও আমরা হেঁসো দেখতে পাই নারকোল গাছের পালা-কাটা লোক, গাছি-র কোমরে, আর খেজুর গাছের আগা ছেলা ছিৱলি সিউলি-র কোমরে। সেই হেঁসো আকার বদলে ধীরে ধীরে কোমরের কোষে আশ্রয় নেয়, তখনও তার নাম অসিই থাকে। একসময় সে নামও বদলে যায়, নাম হয় – ছোরা ভোজালি কৃপাণ তরবারি। শিখ পুরুষ কোমরে কৃপাণ নিয়ে ঘোরে, আর কাঙালি বাঙালির মুণ্ডু বর্গি দস্যুর তরবারিতে মাটিতে গড়াগড়ি যায়। তাই বাঙালির হাঁসুয়ার দিন গিয়াছে, বাঙালির কাছে অসি মানে হয়ে গেছে শুধুই সৈনিকের তরবারি, তলৱার।

মসি: গাড়ি সারাইয়ের মেকানিকরা বলে ‘আমাদের একটু কালিঝুলি মাখতেই হয়’। এই ঝুলি মানে কালো ঝুল। মশাল প্রদীপ প্রভৃতি জ্বললে তার শিখা থেকে বেরোনো কার্বনের যে ভুসো দেয়ালে ছাতে কুলুঙ্গিতে জমে তাই ঝুল। ইটভাটার চিমনির ভেতরের দেয়ালেও জমে ঝুল। আসলে এই ভুসো জিনিসটার নামই মস বা মসি বা মসী। ঝুলে থাকা মস তাই ঝুলিমস মানে ঝুল। এটা কালো, তাই মসের ঝুল-ই কালিঝুলি।
জামা গেঞ্জিতে ছাতা ধরার মতো ফোঁটা ফোঁটা কালো দাগ দেখা দিলে আমরা বলি জামাটাতে মইসে পড়েছে, গেঞ্জিতে মইসা ধরেছে। শহরের লোকেরা শব্দটা ভুল শুনেছে ব’লে, বলে গেঞ্জিতে মরচে পড়েছে।
তিলের মতো দেখতে একটা ফসলের নাম তিসি। এর ঔষধি গুণ প্রচুর । আমরা চাল-তিল ভাজার বদলে মাঝে মাঝে চাল-তিসি ভাজা খেতাম। তিসির একটা কালো প্রজাতিকে রাঢ়ে বলে মইসনে তিসি বা মসনে। কালো মসের মতো, তাই বিশেষণ মসনে।
মস মইসা মসনে সবের মধ্যেই কালো ব্যাপারটা পরিষ্কার।
‘শিরসি মসীপটলং দধাতি দীপঃ’ – মস্তকে মসীপট জন্ম দেয় প্রদীপ। প্রদীপের শিখার মস-টা তেল লেপা কাজললতায় ধরে কাজল তৈরি হতো। তাই মসি ও ভুসি, কাজলের দুটো প্রতিশব্দ। মস কালো তাই কাজল কালো।
দাঁতের কালো মাজন মিশি, কালো রঙের কারণেই মসি মাজন, পরে শুধুই মিসি হয়েছে। যেমন, কাঁসার তৈরি তাই কাঁসর-ঘন্টা, পরে শুধুই কাঁসর হয়ে গেছে। মিসি-র মতো কালো তাই মিশকালো।
মসি হচ্ছে শুকনো পাউডারের মতো কালো ভুসো বা তেলচিটে মস। ভুষো মেখে মানুষ হতো ‘মসিময়’, ‘মসিমুখ’- মসিমাখা, ঘোর কৃষ্ণবর্ণ।
পাঠশালার বাচ্চারা খাগের কলম দিয়ে তালপাতার পুঁথিতে লেখার জন্য, মসি জলে গুলে যা বানাতো তা ‘মসিজল’ মানে ইঙ্ক্‌ ink। এই মসিজল-ই পরে শুধু মসি নামে পরিচিত হয়। মালয়ালমে বলে মসী। তামিলে মৈ, প্রাচীন তামিলে মসি। ভুষো মস গুলে বানানো কালো ইঙ্ক, তাই লোকে একে ‘ভুষো কালি’-ও বলতো। কালো মস থেকে তৈরি ইঙ্ক কালো ছিলো বলে তার নাম হয় কালি, কালিখ। ভুসো কালির যুগ পেরিয়ে মানুষ কেমিক্যাল কালি পেয়েছে। আমরা নীল দিয়ে তৈরি কালির বড়ি দোকান থেকে কিনে জলে গুলে নীল কালি বানিয়েছি। কালো হোক বা না হোক, এখন যে কোনও রঙের ইঙ্ককেই বলে কালি। বলপেন আর জেলপেনের যুগে সব রঙের ইঙ্ক পাওয়া যায়। আমরা বলি, ‘একটা সবুজ কালির পেন দিন তো!’
পণ্ডিত মশাইয়ের টোল-পাঠশালায় প্রত্যেক ছাত্রের পাততাড়ির পাশে তার নিজস্ব একটা কালি রাখার পাত্র থাকতো, মসিপাত্র মস্যাধার মসিধানি মসিকূপি। যদিও সেই মসি তখন আর মস দিয়ে তৈরি হয় না। আশির দশকে প্রেসিডেন্সি কলেজে কাঠের বহু-পুরনো হাই-বেঞ্চে কালির দোয়াত রাখার গর্ত দেখেছি, চার টুকরো কাঠ দিয়ে ঘেরা বর্গাকার গর্ত। সেইসব প্রাচীন হাই-বেঞ্চে পুরনো প্রেমিক প্রেমিকার নাম খোদাই করা ছিলো পঞ্চানন কর্মকারের আদলের ফন্টে।
কালির দোয়াত উল্টে কালি ফেলে পাঠশালার শিশু হাতে মুখে কালি মাখামাখি করতো। ছাত্রধারা-য় আছে ‘হাতে মসি মুখে মসি, মেঘে ঢাকা শিশু শশী’ – কালিদাস রায়। ‘পূর্ণ শশী মাখে মসি’ – রবীন্দ্রনাথ। দোয়াতের কালিতে খাগের কলম বা ‘কাঠের হ্যাণ্ডেল’ ডুবিয়ে ডুবিয়ে কালি ঝরিয়ে ঝরিয়ে লিখতে লিখতেও কালির ছড়াছড়ি হতো। তাতেই বোঝা যেতো, ‘হাতে কালি মুখে কালি, মা বলে পড়ে এলি?’ মসীলিপ্ত মানে কালির দাগযুক্ত, মানে কলঙ্কযুক্ত।

অসির চেয়ে মসি বড়ো
কথাটা প্রমাণ করার কিছু নেই। এই কথাটার পেছনে একটা মজার গল্প আছে। লেখাপড়া শেখার গুরুত্ব বোঝাতে গুরুমশাইরা প্রতিবছর বিদ্যালয়ে আসা বাচ্চাদের গল্পটা শোনাতেন। ফলে আমাদের ছেলেবেলার প্রায় সব বয়েসের মানুষই গল্পটা জানতো। আমাদের মাস্টারমশাই বেশ গুছিয়ে রসিয়ে শিশুবোধ্য করে গল্পটা শুনিয়েছিলেন। ক্লাস টু এ শোনা কানে মাস্টার মশায়ের গল্প বলার সেই মুন্সিয়ানাটা ধরা নেই, শুধু গল্পটার সারাংশটা মনে আছে।
এক সেপাই তার গ্রামে এসে লোকজনকে খুব তড়পাতো। বলতো, সেপাইয়ের এই তরবারির কী ক্ষমতা! এই তরবারির ভয়েই শত্রু কাঁপে, এই তরবারির জোরেই দেশ চলে, এই অসিরই ক্ষমতা বেশি, ইত্যাদি ইত্যাদি। শুধু গ্রামের ব্যাঙ্কের কেরানি বলেছিল, না হে তোমার অসির চেয়ে আমার মসির ক্ষমতা বেশি। কিন্তু সেপাইয়ের তরবারির ভয়ে কেরানি সেই দফাটা তর্কে পিছু হটে গিয়েছিলো।
বহু বছর পরে সেপাই রিটায়ার করলে তার প্রভিডেন্ট আর পেনশনের টাকা তুলতে ব্যাঙ্কে গেলে, তার টাকা আটকে যায়। ব্যাঙ্ক বলে তার নাম মিলছে, কিন্তু চেহারার বর্ণনায় মিলছে না। কারণ ব্যাঙ্কের খাতায় লেখা আছে, তার সামনের দুটো দাঁত নেই। কিন্তু আসলে তার সব দাঁত আছে। শেষে টাকা তোলার চক্করে সেপাই মশাই ডাক্তারের কাছে গিয়ে দুটো দাঁত তুলিয়ে তবে টাকা পায়। টাকা দেবার সময় কেরানি সেপাইয়ের কানে কানে বলে – কী? বলেছিলাম না, অসির চেয়ে মসি বড়ো। তোমার তলোয়ার দিয়ে তুমি কিছুই করতে পারলে না, আমি আমার কলমের এক খোঁচায় তোমার দাঁত দুটো ঝরিয়ে দিলাম!

ইউসুফ খান, কলকাতা, ২০২০ জুন ২৪

সূত্র: অসি ও মসি-র গল্প,  ইউসুফ খান, শুদ্ধ বানান চর্চা (শুবাচ)

—————————————————————————-

না ঘরকা না ঘাটকা-র গল্প, ইউসুফ খান, শুদ্ধ বানান চর্চা (শুবাচ)

ঢাকাই বুলি: কলকাতার চিঠি, ইউসুফ খান, শুদ্ধ বানান চর্চা (শুবাচ)

পদ্মাপারের পদবি, ইউসুফ খান, শুদ্ধ বানান চর্চা (শুবাচ)

ঈশ্বরচন্দ্র কেন শর্ম্মা, ইউসুফ খান, শুদ্ধ বানান চর্চা (শুবাচ)

ঘেটো লেটো নজরুল, ইউসুফ খান, শুদ্ধ বানান চর্চা (শুবাচ)

ঈশ্বরচন্দ্র কেন শর্ম্মা, ইউসুফ খান, শুদ্ধ বানান চর্চা (শুবাচ)

বাঁকুড়া থেকে বগুড়া, ইউসুফ খান, শুদ্ধ বানান চর্চা (শুবাচ)

বেশ্যারা প্রস্টিটিউট নয়, ইউসুফ খান, শুদ্ধ বানান চর্চা (শুবাচ)

ইত্যাদি প্রভৃতি প্রমুখ. ইউসুফ খান, শুদ্ধ বানান চর্চা (শুবাচ)

শুবাচ গ্রুপ এর লিংক: www.draminbd.com

All Link

All Links/1

All Links/2 শুবাচির পশ্ন থেকে উত্তর

উৎস: ব্যাবহারিক প্রমিত বাংলা বানান সমগ্র, ড. মোহাম্মদ আমীন, পাঞ্জেরী পবিলেকশন্স লি.

বাক্য: গঠন-অগঠন/১

বাংলা শব্দের পৌরাণিক উৎস, ড. মোহাম্মদ আমীন

মৌলবাদ ও মৌলবাদী শব্দের অর্থ কী জানতে চাই

বাংলা ভাষার মজা, ড. মোহাম্মদ আমীন, পাঞ্জেরী পবিলেকশন্স লি.

আল্লাহ শব্দের বাংলা

শুবাচ বিসিএস বাংলা/১

শুবাচির প্রশ্ন থেকে উত্তর/৩২

শুবাচির প্রশ্ন থেকে উত্তর/ ৩৩

বহুল ব্যবহৃত কিছু শব্দের শুদ্ধ বানান/১২ ড. মোহাম্মদ আমীন

ইত্যাদি প্রভৃতি প্রমুখ

বেশ্যারা প্রস্টিটিউট নয়

ঢাকাই বুলি: কলকাতার চিঠি

না ঘরকা না ঘাটকা-র গল্প

অসি ও মসি-র গল্প

error: Content is protected !!