অস্ট্রিয়া (Austria) : ইতিহাস ও নামকরণ

কীভাবে হলো দেশের নাম

ড. মোহাম্মদ আমীন

অস্ট্রিয়া (Austria)

অস্ট্রিয়া পশ্চিম ইউরোপের একটি স্থলবেষ্টিত রাষ্ট্র। এর উত্তরে জার্মানি ও চেক প্রজাতন্ত্র, পূর্বে স্লোভাকিয়া ও হাঙ্গেরি, দক্ষিণে স্লোভেনিয়া ও ইতালি এবং পশ্চিমে সুইজারল্যান্ড ও লিচটেনস্টেইন। অস্ট্রিয়া মূলত আল্পস পর্বতমালার উপরে অবস্থিত একটি দেশ, যার তিন-চতুর্থাংশ এলাকা পর্বতময়। অস্ট্রিয়া ইউরোপীয়ান ইউনিয়নের একমাত্র দেশ, যা ন্যাটোর (NATO) সদস্য নয়। অস্ট্রিয়ার ম্যাপ দেখতে স্লাগ এর মতো। স্লাগ একটি চর্মযুক্ত স্ললজ শামুক।

সাধারণভাবে বলা হয়, অস্ট্রো (austro) শব্দ হতে অস্ট্রিয়া নামের উদ্ভব। উল্লেখ্য অস্ট্রো শব্দের অর্থ পূর্ব।অস্টেরিচ শব্দ হতে অস্ট্রিয়া নামের উদ্ভব। অস্ট্রিয়া জার্মান শব্দ। ৯৯৬ খ্রিষ্টাব্দে  রক্ষিত অস্টারিচি (Ostarrîchi Document দলিল হতে জানা যায় ল্যাটিনজাত প্রাচীন হাই-জার্মান ভাষা হতে অস্টেরিচ (Osterreich)  শব্দটির উদ্ভব। ১১৪৭ খ্রিস্টাব্দেই বিষয়টি জানা যায়। আঞ্চলিক ল্যাটিন ভাষায় এর অর্থ মার্চিয়া ওরিয়েন্টালিস (Marchia Orientalis), যার ইংরেজি প্রতিশব্দ  ইস্টার্ন বর্ডার ল্যান্ড বা পূর্ব-সীমান্ত প্রদেশ। এটি ছিল ৯৭৮ খ্রিষ্টাব্দে  প্রতিষ্ঠিত বেভারিয়ার সীমান্ত প্রদেশ বা সীমান্ত এলাকা। উল্লেখ্য ‘reich’ শব্দের অর্থ সম্রাট। জার্মানি ভাষায় মার্চিয়া ওরিয়েন্টালিস শব্দটির প্রমিত অনুবাদ হচ্ছে অস্টমার্ক।

অস্ট্রিয়া নাজি বাহিনীর অধিকারে থাকাকালীন দেশটি সরকারিভাবে অস্টমার্ক নামে পরিচিত হতো। অনেকের মতে, অস্ট্রিয়া নামটি অস্টেরেচি শব্দের ল্যাটিনায়ন। যা দ্বাদশ শতকে প্রথম প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতি পায়। তবে একটা বিষয় সংশয়ের সৃষ্টি করে, সেটি হচ্ছে জার্মান ভাষায় ওস্ট্ (ost) মানে পূর্ব কিন্তু ল্যাটিন ভাষায় অস্টার (auster) মানে দক্ষিণ। অস্ট্রিয়া নামকরণ নিয়ে আর একটি সাধারণ প্রবাদ প্রচলিত আছে। এ প্রবাদমতে, অস্টেরিচ (Osterreich) শব্দের অর্থ ইস্টার্ন এ্যম্পায়ার বা পূর্ব সাম্রাজ্য।

অস্ট্রিয়ার মোট আয়তন ৮৩,৮৭৯ বর্গকিলোমিটার বা  ৩২,৩৮৫.৮৬ বর্গমাইল। তন্মধ্যে জলীয় ভাগের পরিমাণ ১.৭%। ২০১৫  খ্রিষ্টাব্দের হিসাবমতে, অস্ট্রিয়ার জনসংখ্যা ৮৬,২৩,০৭৩ জন এবং প্রতি বর্গকিলোমিটার জনসংখ্যার ঘনত্ব ১০১.৪ জন। আয়তন বিবেচনায় অস্ট্রিয়া পৃথিবীর ১১৫-তম এবং জনসংখ্যা বিবেচনায় ৯৪-তম বৃহত্তম দেশ। কিন্তু জনসংখ্যার ঘনত্ব বিবেচনায় এটি পৃথিবীর ১০৬-তম জনবহুল দেশ।

২০১৫ খ্রিষ্টাব্দের হিসাবমতে, অস্ট্রিয়ার জিডিপি (পিপিপি) ৪০২.৪২০ বিলিয়ন ইউএস ডলার এবং মাথাপিছু আয় ৪৭,০৩১ ইউএস ডলার। অন্যদিকে, জিডিপি (নমিনাল) ৩৮০.৫৫৫ বিলিয়ন ইউএস ডলার এবং মাথাপিছু আয় ৪৪,৪৭৫ ইউএস ডলার। মুদ্রার নাম ইউরো। রাজধানী ভিয়েনা। সরকারিভাবে অস্ট্রিয়ার অধিবাসীদের অস্ট্রিয়ান বলা হয়। সরকারি ভাষা জার্মান। ২০০১ খ্রিষ্টাব্দের আদমশুমারি অনুযায়ী অস্ট্রিয়ার ৭৩.৬% অধিবাসী খ্রিস্টান এবং ৪.২% অধিবাসী  মুসলিম। এ ছাড়া স্বল্পসংখ্যক হিন্দু, শিখ, বৌদ্ধ ও ইহুদিও এখানে রয়েছে।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের (১৯১৪-১৯১৮) পর অস্ট্রিয়ার বহুজাতিক সাম্রাজ্য ভেঙে যায় এবং একাধিক জাতিরাষ্ট্রের উদ্ভব ঘটে। বিশ্বরাজনীতির ফাঁদে অস্ট্রিয়া নিজেই একটি ক্ষুদ্র স্থলবেষ্টিত রাষ্ট্রে পরিণত হয়। ১৯৩৯ খ্রিষ্টাব্দে  নাৎসি জার্মানি অস্ট্রিয়াকে নিজেদের সঙ্গে যুক্ত করে নেয়।  দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে (১৯৩৯-১৯৪৫) জার্মানির পরাজয়ের পর মিত্রশক্তি অস্ট্রিয়া দখল করে নেয়। ১৯৫৫ খ্রিষ্টাব্দে  অস্ট্রিয়া আবার স্বাধীন হয়। ১৯১৮ খ্রিষ্টাব্দে  অস্ট্রিয়ার বর্তমান জাতীয় পতাকাটি গ্রহণ করা হয়। তবে ১১৯১ খ্রিস্টআব্দে পতাকাটি প্রথম গৃহীত হয়েছিল। নানা কারণে তা বিভিন্ন সময় স্থগিত রাখা হয়।

হাব্‌সবুর্গ রাজবংশের রাজারা প্রায় ৭৫০ বছর অস্ট্রিয়া শাসন করে। রাজনীতিক বিবাহ সম্পাদনের মাধ্যমে তারা মধ্য ইউরোপের এক বিরাট এলাকা দখল করে নেয়। তাদের ভূসম্পত্তি আইবেরীয় উপদ্বীপ (বর্তমান স্পেন) পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। ১৬শ ও ১৭শ শতকে উসমানীয় সাম্রাজ্যের আক্রমণের ফলে অস্ট্রীয়া ধীরে ধীরে দানিউব নদীর অববাহিকার কেন্দ্রীয় ইউরোপীয় অংশে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে। ১৯৩৮ খ্রিষ্টাব্দের ১২ মার্চ জার্মানি অস্ট্রিয়াকে নিজেদের অঙ্গীভূত করে নেয়। এ ঘটনাটির ঐতিহাসিক নাম দেওয়া হয়েছে আনশ্লুজ (Anschluss)। সে সময়  বেশির ভাগ অস্ট্রীয় এটি সমর্থন করেছিল।

অস্ট্রিয়া ছিল ইহুদি নির্যাতনের অন্যতম কেন্দ্র। ১৯৩৮ খ্রিষ্টাব্দের মার্চ থেকে ১৯৪৫ খ্রিষ্টাব্দের এপ্রিলের মধ্যে অস্ট্রিয়ার অধিকাংশ ইহুদিকে হয় হত্যা করা হয় অথবা নির্বাসনে যেতে বাধ্য করা হয়। ১৯৩৮ খ্রিষ্টাব্দের আগে অস্ট্রিয়াতে ২ লক্ষ ইহুদি বাস করত। ১৯৪০ খ্রিষ্টাব্দের মধ্যে এদের অর্ধেকের বেশি দেশ ছেড়ে পালিয়ে যায়। প্রায় ৩৫ হাজার ইহুদিকে পূর্ব ইউরোপে গেটো বা বস্তিতে পাঠান হয়। প্রায় ৬৭ হাজার ইহুদিকে কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্পে পাঠান হয়। যুদ্ধশেষে এদের মাত্র ২ হাজার জীবিত ছিল। ১৯৪৫ খ্রিষ্টাব্দে  জার্মানির পরাজয়ের পর মিত্রশক্তিরা অস্ট্রিয়াকে চারভাগে ভাগ করে। ১৯৫৫ খ্রিষ্টাব্দের ২৫ অক্টোবর নাগাদ এরা সবাই অস্ট্রিয়া ত্যাগ করে। ফলে অস্ট্রিয়া পূর্ণ স্বাধীনতা পায়।স্বাধীনতার পর থেকে দেশটির অভাবনীয় উন্নতি ঘটে। রপ্তানি ও পর্যটন শিল্প দেশটির আয়ের অন্যতম উৎস। ভিয়েনার সমৃদ্ধ সংস্কৃতি এবং অস্ট্রিয়ার অসাধারণ সৌন্দর্যময় পার্বত্য ভূদৃশ্যাবলীর টানে বহু পর্যটক এখানে বেড়াতে আসে। এটি এখন পৃথবীর অন্যতম ধনী রাষ্ট্র।

দানিউব নদী জার্মানিতে দোনায়ু নামে পারিচিত। নদীটি চারটি দেশের রাজধানীর ওপর দিয়ে প্রবাহিত হওয়ার বিরল কৃতিত্বের অধিকারী। রাজধানী চারটি হচ্ছে অস্ট্রিয়ার ভিয়েনা, স্লোভাকিয়ার ব্রাতিসলাভা, হাঙ্গেরির বুদাপেস্ট এবং সার্বিয়ার বেলগ্রেড।  জার্মানির কৃষ্ণবন হতে উৎপন্ন হয়ে ইউরোপের পশ্চিম হতে পূর্ব ভেদ করে  রোমানিয়া ও ইউক্রেন হয়ে কৃষ্ণ সাগরে পতিত হয়েছে।  পৃথিবীর কয়েকটি প্রাচীন জাতীয় পতাকার মধ্যে অস্ট্রিয়ারটি অন্যতম একটি।

অস্ট্রিয়ান জোসেফ মেদারেসপার্জার (Josef Madersperger) সেলাই মেশিন আবিষ্কার করেন অস্ট্রিয়ার এক চতুর্থাংশ লোক ভিয়েনায় বাস করে। ১৭৫২ খ্রিষ্টাব্দে  প্রতিষ্ঠিত ভিয়েনা চিড়িয়াখানা পৃথিবীর প্রাচীনতম চিড়িয়াখানা হিসাবে খ্যাত। বিখ্যাত অভিনেতা আর্নল্ড সোয়ার্জনিগার অস্ট্রিয়াতে বেড়ে ওঠেছেন। অস্ট্রিয়া বিশ্বে প্রথম পোস্টকার্ড ব্যবহার করে। ৬২% এলাকা আল্পস পর্বতের অন্তর্ভুক্ত।

অস্ট্রো-হাঙ্গেরিয়ান বারোনেস বার্থা ভন সাতনার ১৯০৫ খ্রিষ্টাব্দে  নোবেল পুরস্কার বিজয়ী প্রথম মহিলা। অস্ট্রিয়ান সাহিত্যিক এলফ্রেড জেলিনেক ২০০৪ খ্রিষ্টাব্দে  তার বিখ্যাত উপন্যাস দ্যা পিয়ানো টিচার (The Piano Teacher) এর জন্য নোবেল পুরস্কার লাভ করেন।

৮০৩ খ্রিষ্টাব্দে  প্রতিষ্ঠিত স্টিফ্টসকেলার সেন্ট পিটার হ্যাসলাওয়ার (Stiftskeller St. Peter, Haslauer) পৃথিবীর প্রাচীনতম রেস্টুরেন্ট, যা এখনও বিরামহীনভাবে চালু রয়েছে। এটি ইউরোপের প্রাচীনতম কোম্পানিও।

মনঃসমীক্ষণের জনক সিগমন্ড ফ্রয়েজের জন্ম অস্ট্রিয়ায়। জার্মানির এক সময়ের অবিসংবাদিত নেতা এডলফ হিটলারের জন্মস্থানও অস্ট্রিয়া। ইউরোপের অধিবাসীদের মধ্যে অস্ট্রিয়ানরা সবচেয়ে বেশি সময় কাজ করে। তারা প্রতি সপ্তাহে ৪৫ ঘণ্টা কাজ করে। তবে তাদের ৫০.৮% অস্ট্রিয়ান মেদবহুল বা অতিরিক্ত ওজনের। ১৯৬০ থেকে ২০১৩ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত অস্ট্রিয়ায় বেকারত্বের হার ছিল ৪.৫৯, যা ইউরোপীয়ান ইউনিয়নের অন্য দেশ লুক্মেমবার্গের তুলনায় দ্বিতীয় সর্বনিম্ন।

আলবেনিয়া (Albania) : ইতিহাস ও নামকরণ

অ্যান্ডোরা (Andorra) : ইতিহাস ও নামকরণ

আর্মেনিয়া (Armenia) : ইতিহাস ও নামকরণ

সূত্র:  কীভাবে হলো দেশের নাম, ড. মোহাম্মদ আমীন, পুথিনিলয়, বাংলাবাজার, ঢাকা।

error: Content is protected !!