অ্যাকচুয়াল বনাম ভার্চুয়াল

বাস্তব (real, actual) জগতের অনুভব, স্বাদ, সাধ্য, স্থায়িত্ব, বিস্তৃতি, আশা-নিরাশা, উপযোগিতা, কার্যকারতা এবং প্রতিক্রিয়া-সহ কাঙ্ক্ষিত বিষয় যেখানে শেষ, সেখানে যা দিয়ে আমরা এসব বিষয়কে আদিম বা সনাতন

ড. মোহাম্মদ আমীন

বাস্তবতার চেয়ে অধিক উপযোগিতা, প্রয়োজনীয়তা ও গ্রাহ্যতায় প্রত্যাশিত সুবিধামতো পেতে পারি, নিতে পারি, উপভোগ করতে পরি— সেটিই ভার্চুয়াল (virtual) জগৎ। করোনাকালে আমার কয়জন বন্ধুর সঙ্গে সনাতন বাস্তবতায় কথা হয়েছে? কিন্তু ফেসবুক  ভার্চুয়াল জগতের মাধ্যমে অধিকাংশ বন্ধুর সঙ্গে আলাপ হয়েছে, হাসিঠাট্টা হয়েছে, মান-অভিমান হয়েছে এবং তা কোনোরূপ সংক্রমণ ছাড়া।মোবাইল যোগাযোগও একপ্রকার ভার্চুয়াল।

ভার্চুয়াল ধারণাটি তেমনই একটা অনুভবনীয় ধারণা যা বাস্তবতার চেয়ে অধিক স্থায়ী, ক্রিয়াশীল এবং সুদূরপ্রসারী। মনে রাখতে হবে,  Actual বানানের A পাড়ি দিয়ে অনেক দূর আসার পর মানুুষ কিন্তু Virtual-এর ভি এর দেখা পেয়েছে।V পার হয়ে Zirtual পর্যন্ত পৌঁছলে বলা যাবে মোটামুটি সন্তোষজনক অবস্থান।

ভাচুর্য়াল আর অ্যাকচুয়াল নয়, আমি বলব— ভার্চুয়াল আর সনাতন বা আদিম (Primitive) জগৎ। যেটাকে বাস্তব বলা হচ্ছে প্রকৃতপক্ষে ভার্চুয়াল জগতের সঙ্গে তুলনা করলে ওটি হবে সনাতন বা আদিম গুহা-জগৎ। 
রাত দুটোয় মেয়েটা লন্ডন থেকে জানতে চাইল কেমন আছি। দেখতে চাইল আমার মুখ; দেখল। রাত আড়াইটায় এক শুবাচি জানতে চাইলেন: একটি শব্দের অর্থ। জানিয়ে দিলাম, তিনি প্রত্যাশিত বিষয় পেয়ে গেলেন। এটি ভার্চুয়াল। যা সনাতন বা বাস্তবতা দিয়ে করা সম্ভব হতো না। যেখানে অ্যাকচুয়াল নামের আদিম ধারণা পুরো ব্যর্থ সেখানে যে প্রক্রিয়াটি সার্থক সেটিই ভার্চুয়াল।
 actual হচ্ছে ঠ্যালাগাড়ি আর virtual হচ্ছে বিমান কিংবা রকেট। actual যদি চলমান সংজ্ঞার্থে ঘুমে অনুভূত স্বপ্ন হয়, তাহলে virtual হচ্ছে জাগ্রত অবস্থার ভৌতরূপ। কার্যকারতা বিবেচনায় ভার্চুয়াল হচ্ছে আধুনিক এবং অ্যাকচুয়াল হচ্ছে সনাতন। স্টিভেন হকিং-এর জীবনের সিংহভাগই ছিল ভার্চুয়াল। ওই সময় তিনি যা করেছেন তা অন্য সময়ে কৃত বিষয়ের তুলনায় অনেক বেশি আকর্ষণীয়।তবে বাস্তবতার শ্রেষ্ঠত্ব এখানেই যে, সে তার সীমাবদ্ধতা দূরীভূত করার জন্য ভার্চুয়াল জগৎটাকে সৃষ্টি করতে সক্ষম হয়েছে।
ভার্চুয়াল এমন একটি ধারণা যা প্রাণীর মনে বাস্তব কিংবা প্রকৃত অনুভূতির চেয়ে অধিক গাঢ়, দ্রুত, স্থায়ী, কার্যকর এবং প্রত্যাশিত মাত্রার কাছাকাছি অনুভূতির সৃষ্টি করতে পারে।  এটি নিরাপদ এবং শোভন, যদি  অশোভন হয়, তার দায় আমাদের। ভার্চুয়াল জগত যদি আমেরিকার ওয়াশিংটন ডিসির নাসা হেডকোয়াটার্স হয়, অ্যাকচুয়াল বা সনাতন জগৎ হবে বাংলাদেশের শাল্লা। বাস্তব জগৎ হচ্ছে গোনার জন্য হাতের আঙুল আর ভার্চুয়াল হচ্ছে ক্যালকুটের বা কম্পিউটার।
হয়ত প্রশ্ন করতে পারেন, ভার্চুয়াল উপায়ে আমি কী শারীরবৃত্তীয় কাজ যেমন: খাওয়া-দাওয়া, মলত্যাগ, ঘুমানো, যৌন সম্ভোগে সন্তান উৎপাদন প্রভৃতি করতে পারব? কে বলেছে পারবেন না? একসময় তো বিদ্যমান ভার্চুয়াল জগতের অস্তিত্বও ছিল না। তখন কেবল স্মৃতিই ছিল ভার্চুয়াল জগৎ। বিদ্যমান ভার্চুয়ালিটি কল্পনাতেও ছিল না। এখন তা হয়েছে। এল রেডিও, টিভি, ফেসবুক, টুইটার, ইনস্টাগ্রাম, ইউটিউব, লিংকডইন আরও কত কী!  সুতরাং, ভার্চুয়াল জগৎ শরীরবৃত্তীয় কাজ পূরণ করার মতো অবস্থায় পৌঁছতে পারবে না, এমন ভাবনা অমূলক এবং হাস্যকর।
স্থায়িত্ব বিবেচনায়, ভার্চুয়াল হচ্ছে একটি শক্তিশালী ধারণা যা বাস্তবতা বলে পরিচিত আদিম ধারণার কার্যকর অত্যাধুনিক রূপ। সনাতন বাস্তবতার ব্যর্থতা ও সীমাবদ্ধতা পূরণ করার জন্য মানুষকে ভার্চুয়াল জগৎ সৃষ্টি করতে হয়েছে। আদিম জগৎ আর আধুনিক জগত যেমন তেমনি অ্যাকচুয়াল ও ভার্চুয়াল জগৎ। অ্যাকুচয়াল জগৎ যদি ৫০ হাজার বছর পূর্বের ব্যবস্থা হয় হয়, তাহলে বর্তমান ভার্চুয়াল হবে ২৫০০০ বছরের পরের বাস্তবতা। আমরা মাত্র ভার্চুয়াল জগতে প্রবেশ করেছি। এর পূর্ণতা পেতে আরও সময় লাগবে।
ভার্চুয়াল কেবল তথ্যপ্রযুক্তির বিষয় নয়। আমাদের স্মৃতি একটি বিশাল ভার্চুযাল ভান্ডার। ভার্চুয়াল জগৎ আবিষ্কারের পূর্বে মানুষ স্মৃতি নামের অতি ক্ষুদ্র ও ক্ষণস্থায়ী এবং স্বল্প বিস্তৃতির ভার্চুয়াল জগৎ নিয়ে যাপন করতে বাধ্য হয়েছিল।
বাস্তবতায় প্রচুর কল্পনা কিন্তু ভার্চুয়ালে কোনো কল্পনা থাকে না। এটি বাস্তবতাকে পার হয়ে আসতে হয়। এটি এমন একটি জগৎ যা মানুষের বাস্তব জগতকে আরও স্থায়ীত্ব দিয়েছে। বাস্তবতা যেখানে অসহায় সেখানে ভার্চুয়াল ছাড়া গত্যন্তর নেই।

মরে গেলে বাস্তব জীবন শেষ, কিন্তু ভার্চুয়াল জগতে যা কিছু করা হয়েছে তা সংরক্ষিত রাখা যায়। বাস্তব জীবন কয়েক বছরের কল্পনা মাত্র, ধরুন ৭০-৮০ একশ বা দুশো; তারপর সব শূন্য; কিন্তু ভার্চুয়াল জগৎ বেঁচে থাকবে

ড. মোহাম্মদ আমীন

যুগের পর যুগ। অধিকাংশ মানুষের বাস্তব জগতে পিতামহের পূর্বের স্মৃতি নেই বললেই চলে। কিন্তু ভার্চুয়াল জগত দিয়ে আলেকজান্ডার এবং সক্রেটিস পর্যন্ত পৌঁছে যাচ্ছি। এমনই ঠুনকো বাস্তব জগৎ।

ঘুম ভাঙার সঙ্গে সঙ্গে যেমন স্বপ্নের ইতি ঘটে, তেমনি মৃত্যুর পর পরই শুধু নয়, কিছুদিন পর স্মৃতিশক্তিরও ইতি ঘটে। আজকে পড়লে কাল ভুলে যাই। আমি তো পড়ার পরপরই ভুলে যায়। এ হচ্ছে রিয়ালিটি বা অ্যাকচুয়াল জগৎ। তাই সংরক্ষণ করার জন্য ভার্চুয়াল জগতের আশ্রয় নিতে হয়। কিন্তু ভার্চুয়াল জগতের মাধ্যমে আমি সংরক্ষণ করে রাখতে পারি অসীম তথ্য, যখন ইচ্ছা তখন নিয়ে নিতে পারি।
এই মুহূর্তে আমার জানতে ইচ্ছা হচ্ছে ক্লিউপেট্রার বাবার নাম। আমার রিয়াল ঘরে প্রচুর রিয়াল বই, পাচ্ছি না; জানা প্রয়োজন কোরোনার হালনাগাদ খবর, রিয়াল জগৎ তা দিতে অক্ষম, কিন্তু ভার্চুয়াল জগৎ তা আমাকে মুর্হর্তের মধ্যে এনে দিচ্ছে। অর্থাৎ actual জগৎ হচ্ছে ক্ষণস্থায়ী স্বপ্ন, ঠুনকো এবং অকার্যকর আর ভার্চুয়াল হচ্ছে দীর্ঘস্থায়ী ও কার্যকর এবং নিশ্চিত।
মানুষ মরলে সব শেষ, কিন্তু ভার্চুয়াল জগতের প্রতিটি বিষয় থেকে যায় অনেক দিন, সংরক্ষণ করা গেলে অনন্তকাল। বাস্তব জগৎ স্বপ্ন দেখার মতো ক্ষণস্থায়ী, ভার্চুয়াল জগৎ সে তুলনায় অনেক দীর্ঘস্থায়ী।
বাস্তব জগৎ মিথ্যা, আবেগ, শঠতা আর কল্পনায় ভরা, কিন্তু ভার্চুয়াল জগতে এসব নেই। যদি থেকেও থাকে তা বাস্তব জগৎ থেকে রপ্তানি করা বাস্তব মানুষের বাস্তব কুকাজ।
——————-
শুবাচ গ্রুপের লিংক: www.draminbd.com
error: Content is protected !!