আঁতেল ও আঁতলামো অন্তর্হিত ও অন্তর্হতি এবং দালাল ও দালালি

ড. মোহাম্মদ আমীন

আঁতেল ও আঁতলামো অন্তর্হিত ও অন্তর্হতি এবং দালাল ও দালালি

অন্তর্হিত ও অন্তর্হতি
অন্তর্হিত: অন্তর্হিত অর্থ— (বিশেষণে) তিরোহিত; অদৃশ্য হয়েছে এমন।
 
অন্তর্হতি: অন্তর্হতি
পাঞ্জেরী পাবলিকেশন্স লি.
ব্যাকরণিক পরিভাষা। কোনো কারণ ছাড়া কোনো শব্দের বানানের ধ্বনি লুপ্তিকে অন্তর্হতি বলে। যেমন: ফাল্গুন থেকে ফাগুন।
এখানে মূল শব্দ— ফাল্গুন। ধ্বনি পরিবর্তন হয়ে তা ফাগুন হয়েছে। ধ্বনি পরিবর্তনের ফলে শব্দের উচ্চারণের পরিবর্তন হলেও অর্থের বা পদের কোনো পরিবর্তন হয় না। ফাল্গুন আর ফাগুন সমার্থক।
 
তাহলে কেন অন্তর্হতি?
 
আঞ্চলিক উচ্চারণ অন্তর্হতির প্রধান কারণ। অধিকন্তু, কবিতায় ছন্দের কারণে কোমল রূপের আবশ্যকতা অন্তর্হতির আর একটি অন্যতম কারণ। যেমন:
 
ওমা ফাগুনে তোর আমের বনে ঘ্রাণে পাগল করে – – –
ফাগুন হাওয়া হাওয়ায় করেছি যে দান —–

আঁতেল ও আঁতলামো

আঁতেল: আঁতেল ফারসি উৎসের শব্দ। বাক্যে সাধারণত বিশেষণ হিসেবে ব্যবহৃত আঁতেল অর্থ— পণ্ডিত। ইংরেজিতে যাকে বলা হয়— intellectual, বুদ্ধিজীবী। শব্দটির ব্যঙ্গার্থ— শিক্ষিত না হয়েও যে বুদ্ধিজীবীর চালচলন অনুকরণ করে, পণ্ডিতম্মন্য। ইদানীং আঁতেল শব্দটি নেতিবাচক অর্থে সমধিক ব্যবহৃত, যদিও এর ইতিবাচক অর্থ রয়েছে।
 
আঁতলামো: বুদ্ধিজীবীর হাবভাব বা চালচাল অনুকরণ, পাণ্ডিত্য প্রদর্শনের চেষ্টা প্রভৃতি অর্থ প্রকাশে নেতিবাচক বাগ্‌ভঙ্গি হিসেবে আঁতলামো শব্দটির বহুল ব্যবহার লক্ষণীয়। আঁতলামো তাকে হাস্যকর করে তুলেছে।

দালাল ও দালালি

দালাল: দালাল আরবি উৎসের শব্দ। বাক্যে বিশেষ্য হিসেবে ব্যবহৃত দালাল অর্থ— (১) পারিশ্রমিকের বিনিময়ে ব্যাবসাবাণিজ্য বা ক্রয়বিক্রয়ে মধ্যস্থতা করা যার পেশা। যেমন: গোরুটি কেনার জন্য দালালকে দুই হাাজর টাকা দিতে হয়েছে। (২) যে ব্যক্তি স্বার্থোদ্ধারের আশায় বিশেষ কোনো পক্ষ অবলম্বন করে তাকেও দালাল বলে। যেমন: মালিকের দালাল, সরকারের দালাল।
ইদানীং দালাল শব্দটি বেশির ভাগ ক্ষেত্রে নেতিবাচক দ্বিতীয় অর্থ প্রকাশে ব্যবহৃত হয়।
 
দালালি: ফারসি দালালি অর্থ (বিশেষ্যে) দালালের বৃত্তি, দালালের পারিশ্রমিক, অনাহূত মধ্যস্থতা। দালালি করো না, নিজের চরকায় তেল দাও গিয়ে।
প্রসঙ্গত, বাংলা একাডেমি আধুনিক বাংলা অভিধানে, দালাল শব্দকে আরবি এবং দালালি শব্দকে ফারসি দেখানো হয়েছে। 

জনাব ও বাবু

জনাব: জনাব আরবি শব্দ। এটি বাক্যে বিশেষ্য হিসেবে ব্যবহৃত হয়। এর অর্থ— ব্যক্তি নামের পূর্বে ব্যবহৃত সম্মানসূচক শব্দ, মহাশয়, শ্রী। শব্দটি একসময় কেবল মুসলিমদের নামের পূর্বে ব্যবহৃত হতো। এখন নারী-পুরুষ আর ধর্ম-নির্বিশেষে সবার নামের আগে ব্যবহৃত হয়। তবে অমুসলিমদের ক্ষেত্রে জনাব কম ব্যবহৃত হয়। তারা শ্রী বা মহাশয় শব্দটি অধিক ব্যবহার করে থাকে।
 
বাবু: বাবু হিন্দি শব্দ। শব্দটি বাক্যে বিশেষ্য হিসেবে ব্যবহৃত হয়। এর অর্থ (বিশেষ্যে) শিক্ষিত মধ্যবিত্ত ভদ্রলোক; বাঙালি ভদ্রলোকের নামের শেষে ব্যবহৃত সম্মানসূচক আখ্যা ( রমণীবাবু, শরৎবাবু খোলা চিঠি দিলাম তোমার কাছে); অফিসের কেরানি (বড়োবাবু আজ অফিসে আসেননি); গৃহকর্তা, গৃহস্বামী, সৌখিন বিলাসী লোক প্রভৃতি। সম্মানসূচক পদ হিসেব বাবু শব্দটি সাধারণত অমুসলিমদের ক্ষেত্রে ব্যবহার করা হয়।
সম্মানসূচক পদ হিসেবে জনাব ব্যবহৃত হয় নামের আগে এবং বাবু ব্যবহৃত হয় নামের পরে। যেমন: জনাব মনীন্দ্র। মনীন্দ্রবাবু। জনাব কামাল হোসেন। হরিশবাবু। বড়োবাবু।
 
error: Content is protected !!