আওয়ামী ও আওয়ামী লীগ এবং উপকরণ বনাম উপাদান

আওয়ামী ও আওয়ামী লীগ এবং উপকরণ বনাম উপাদান

আওয়ামি ও আওয়ামী

ড. মোহাম্মদ আমীন

‘আওয়ামি’ আরবি হতে বাংলায় আগত শব্দ।বাক্যে আওয়ামি শব্দটি বিশেষণ হিসেবে ব্যবহৃত হয়। ‘আওয়ামি’ শব্দের আভিধানিক অর্থ জনগণের, সাধারণ মানুষের প্রভৃতি। বিদেশি বলে শব্দটির বানানে ‘ই-কার’ দিতে হয়। এর কোনো বিকল্প রাখা হয়নি।
কিন্তু, ‘আওয়ামী লীগ’ হিসেবে পরিচিত রাজনীতিক সংগঠনটির নাম লিখতে হলে ‘আওয়ামি’ শব্দের ম-য়ে অবশ্যই ‘ঈ-কার’ দিতে হবে। এর কোনো বিকল্প নেই। যতদিন সংগঠনটি তার নাম পরিবর্তন না-করে ততদিন ওভাবেই লিখে যেতে হবে।
কারণ ‘আওয়ামী লীগ’ একটি সংগঠনের নাম। নামের কোনো লিপ্যন্তর হয় না। নামের কোনো আভিধানিক অর্থও হয় না। নামের অর্থ কেবল ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান বা বস্তুর অদ্বিতীয় পরিচয়কে ঘিরে আবর্তিত হয়। এজন্য ‘আজাদ খান’ নামের কোনো ব্যক্তির ইংরেজি Freedom eat, কিংবা Mr. White Moon নামের কোনো ব্যক্তির বাংলা ‘সাদা চন্দ্র’ হয় না।
—————————————————————————
সূত্র: সমার্থক ও সমোচ্চারিত শব্দের অর্থভেদ: অপপ্রয়োগ ও প্রমিত প্রয়োগ, ড. মোহাম্মদ আমীন, পাঞ্জেরী পাবলিকেশন্স লি.
 
 
 
উপকরণ বনাম উপাদান
(এবি ছিদ্দিক)
 
দুইটি শব্দ কাছাকাছি অর্থের হলে ওই শব্দ দুটির একটিকে অপরটির বিকল্প হিসেবে ব্যবহারের সুবিধা যেমন পাওয়া যায়, তেমনি সূক্ষ্ম পার্থক্য অনুধাবন করে ক্ষেত্রভেদে যথাযথ প্রয়োগের বিড়ম্বনাও পোহাতে হয়— বিশেষ করে যাঁরা নিজেদের লেখায় শব্দের যথাযথ প্রয়োগ নিশ্চিত করতে চান। ‘উপকরণ’ আর ‘উপাদান’ এরকম সূক্ষ্ম পার্থক্যের শব্দজোড়ের মধ্যে একেবারেই পরিচিত একটি জোড়। বাংলা একাডেমি আধুনিক বাংলা অভিধানে উল্লেখ-করা অর্থ অনুসারে এই শব্দ দুটি সমার্থক হলেও এদের ব্যাবহারিক প্রয়োগে যথেষ্ট ভিন্নতা রয়েছে। এই ভিন্নতা স্পষ্টভাবে উপলব্ধি করতে না-পারলে ভাষার মূল উপাদান ‘ধ্বনি’ এবং মূল উপকরণ ‘বাক্য’ হওয়ার মতো ব্যাপারগুলো নিয়ে সবসময় ধোঁয়াশার মধ্যে থাকতে হবে। তাই, এই বিভ্রান্তি থেকে মুক্তির জন্যে আলোচ্য শব্দদ্বয়ের ব্যাবহারিক পার্থক্য ঠিকভাবে অনুধাবন করা মোটেও এড়িয়ে যাওয়ার মতো নয়। এই প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করে শিরোনামের মূল শব্দদ্বয়ের প্রায়োগিক পার্থক্য স্পষ্ট করার লক্ষ্যে আমার এই আলোচনা সামনে এগিয়ে নেওয়া হয়েছে। আর আমার বিশ্বাস, এই আলোচনার পরবর্তী অংশ পাঠের পর আপনি উপকরণ আর উপাদানের ব্যাবহারিক পার্থক্য অনেকটা অনুধাবন করতে পারবেন এবং আগামী দিনে নিজের লেখায় অনেকটা নির্দ্বিধায় প্রয়োগ করতে পারবেন।
উপকরণ আর উপাদানের প্রায়োগিক পার্থক্য শব্দ দুটির ব্যুৎপত্তিগত অর্থ নির্ণয়ের মাধ্যমে খুব সহজেই নিরূপণ করা যায়। প্রথমে ‘উপকরণ’ শব্দের ব্যুৎপত্তি দেখা যাক— ‘কৃ’ ধাতু থেকে ‘করণ’ শব্দের এবং এই ‘করণ’ শব্দের পূর্বে ‘উপ’ উপসর্গটি যুক্ত হয়ে ‘উপকরণ’ শব্দের সৃষ্টি। ৷ ‘√কৃ’ মানে ‘করা’ এবং ‘করণ’ হচ্ছে ‘করার সহায়ক বা যন্ত্র’। এই ‘করণ’-এর সঙ্গে ‘সাহায্য’ অর্থে ‘উপ’ উপসর্গটি যুক্ত হয়ে ‘উপকরণ’ শব্দটি গঠন করে বলে শব্দটির ব্যুৎপত্তিগত অর্থ দাঁড়ায়— যে যন্ত্র বা সহায়ক কোনো ক্রিয়া (কাজ) সম্পন্ন করতে সাহায্য করে। অর্থাৎ, উপকরণের মূল সম্পর্ক হচ্ছে ক্রিয়ার সঙ্গে। উপকরণ কেবল সেখানে পাওয়া যাবে, যেখানে ক্রিয়া বর্তমান থাকবে। তাই, কোনো কাজের উপকরণের নাম উল্লেখ করা যায়, কোনো জিনিসের নয়।
 
অপরদিকে, ‘আদান’ শব্দের পূর্বে ‘উপ’ উপসর্গটি যুক্ত হয়ে ‘উপাদান’ শব্দের সৃষ্টি। ‘আদান’ মানে ‘গ্রহণ’, ‘নেওয়া’ প্রভৃতি। এই ‘আদান’ শব্দটির সঙ্গে ‘সমীপে’ অর্থে ‘উপ’ উপসর্গটি যুক্ত হয়ে ‘উপাদান’ শব্দের উৎপত্তি। তাহলে উপাদান শব্দের ব্যুৎপত্তিগত অর্থ দাঁড়ায়— সমীপে গ্রহণ বা নিকটে নেওয়া। অর্থাৎ, যেসকল জিনিস একটিকে অন্যটির কাছে নিয়ে বা মিশ্রিত করে কোনোকিছু তৈরি করা হয়, সেগুলোই হচ্ছে ‘উপাদান’। উপাদানের মূল সম্পর্ক নতুন তৈরি জিনিসটির সঙ্গে, ক্রিয়ার সঙ্গে নয়। মূলত, উপকরণের সাহায্যে উপাদানসমূহকে সমীপে নিয়ে গিয়ে নতুন কিছু তৈরি করা হয়। মোদ্দা কথায় বললে— নতুন কোনোকিছু তৈরির সময় যেসকল জিনিসের সহায়তা নিয়ে তৈরির কাজটি করা হয়, সেগুলো উপকরণ; এবং তৈরিকৃত নতুন সৃষ্টিটির মধ্যে যে জিনিসগুলোর সমন্বয় থাকে, সেগুলো হচ্ছে উপাদান। কোনোকিছু তৈরির কাজ শেষ হয়ে গেলে ব্যবহৃত উপকরণের সঙ্গে নতুন সৃষ্টির কোনো সম্পর্ক থাকে না, উপকরণের প্রয়োজনীয়তা ফুরিয়ে যায়, কিন্তু উপাদান নতুন সৃষ্টির মধ্যে নবরূপে উপস্থিত থাকে। কয়েকটি প্রায়োগিক উদাহরণ দেখালে শব্দদ্বয়ের ব্যুৎপত্তিগত অর্থ আরও পরিষ্কার হয়ে যাবে:
 
তাসিয়া পুডিং তৈরি করবে। এখন, যদি কেউ পুডিং তৈরির উপকরণের নাম জানতে চায়, তাহলে কেবল ওই জিনিসগুলোর নাম বলতে হবে, যেগুলো পুডিং বানানোর কাজে সহায়ক বা যন্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা হয়। সাধারণত পাত্র, ডেকচি, ঢাকনা প্রভৃতি জিনিস (আসবাব) পুডিং তৈরির কাজে যন্ত্র বা সহায়ক হিসেবে সাহায্য করে বলে এগুলো হচ্ছে পুডিং তৈরির উপকরণ। তৈরি-করা পুডিঙের মধ্যে এসব জিনিসের কোনো উপস্থিতি নেই। অপরদিকে, শুরুতে উল্লেখ-করা করা উপকরণসমূহের সহায়তায় ডিম, দুধ, চিনি, লবণ প্রভৃতি জিনিস সমীপে এনে নতুন জিনিসটি (খাবারটি) তৈরি করা হয় বলে এসব হচ্ছে পুডিং তৈরির উপাদান। তৈরিকৃত পুডিঙের মধ্যে এসব জিনিসের উপস্থিতি ভিন্ন রূপে হলেও বর্তমান থাকে।
 
শহরের ব্যস্ত রাস্তাগুলোয় উড়ালসেতু নির্মাণের দরকার পড়ে। ওই উড়ালসেতু তৈরি করার সময় ক্রেন, শাবল, হাতুড়ি, করাত, কম্পাস, ফিতা প্রভৃতি যন্ত্র বা সহায়কের দরকার পড়ে, তাই এসব হচ্ছে উড়ালসেতু তৈরির উপকরণ। উড়ালসেতু তৈরির কাজ শেষ হয়ে গেলে এসবের উপস্থিতির প্রয়োজনও শেষ হয়ে যায়। আবার, ইট, পাথর, লোহা, সিমেন্ট, পানি প্রভৃতি জিনিসের সমন্বয়ে নতুন উড়ালসেতুটি তৈরি হয় বলে এসব জিনিস হচ্ছে উড়ালসেতু তৈরির উপাদান। তৈরিকৃত উড়ালসেতুর মধ্যে এই উপাদানগুলোর উপস্থিতি বর্তমান থাকে।
 
কতগুলো ধ্বনি বা আওয়াজ ভাষা হওয়ার জন্যে ওই ধ্বনি বা আওয়াজগুলো একত্র করে স্পষ্ট ভাব প্রকাশ করা আবশ্যক হয়ে পড়ে। একাধিক ধ্বনির একটিকে অপরটির সমীপে এনে স্পষ্টভাবে মনের ভাব প্রকাশ করতে শব্দ, পদবন্ধ, বাক্য প্রভৃতির সাহায্য নিতে হয়। এসবের মধ্যে বাক্যের সাহায্যে বক্তার মনের ভাব সবচেয়ে স্পষ্টভাবে ব্যক্ত করা যায় বলে ভাষা তৈরির মূল উপকরণ হচ্ছে ‘বাক্য’। আবার, অনেকগুলো ‘ধ্বনি’ শব্দ, পদবন্ধ, বাক্য প্রভৃতির সহায়তায় পরস্পরের সমীপে এসে একটি ভাষা সৃষ্টি করে বলে ভাষার মূল উপাদান হচ্ছে ‘ধ্বনি’। অনেকগুলো ধ্বনির সমন্বয় ঘটিয়ে কোনো বাক্যের সাহায্যে ব্যক্তির নির্দিষ্ট মনের ভাব প্রকাশ করা হয়ে গেলে ওই বাক্যের উপস্থিতির প্রয়োজনীয়তা ফুরিয়ে যায়। কিন্তু ওই বাক্যের সাহায্যে অনেকগুলো ধ্বনি মিলে যে ভাব প্রকাশ করে, তা ভাষায় সবসময় বর্তমান রয়ে যায়। যেমন: ছাফিয়া চাইলে ‘আমি ভালো আছি’ বাক্যটির সাহায্য নিয়ে আ, ম্, ই, ভ্, আ, ল্, ও, আ, ছ্, আর ই ধ্বনির সমন্বয় ঘটিয়ে নিজের হাল ব্যক্ত করতে পারে। ছাফিয়ার হাল ব্যক্ত করা হয়ে গেলে ওই বাক্যটি তার কাছে আর কোনো গুরুত্বের দাবি রাখে না। কিন্তু ওই ধ্বনিগুলো একত্র করে যে একটি ভাব তৈরি করে, তা সম্পূর্ণ ভাষার একটি ক্ষুদ্র অংশস্বরূপ। এভাবে বিভিন্ন ধ্বনি নানানভাবে সাজিয়ে (মিশ্রিত করে) ভাষা তৈরি হয় বলে ভাষায় ধ্বনি উপস্থিতি সবসময় বর্তমান এবং এই ধ্বনিই ভাষার মূল উপাদান।
 
 
আবশ্যিকভাবে আপনার আগ্রহ সৃষ্টি করবে এমন কয়েকটি লিংক: প্রয়োজনীয় কিছু লিংক:
শুবাচ গ্রুপ এর লিংক: www.draminbd.com

শুদ্ধ বানান চর্চা (শুবাচ) প্রমিত বানানবিধি

শুবাচ আধুনিক প্রমিত বাংলা বানান অভিধান

এক মিনিট সময় দিন বানানগুলো শিখে নিন

error: Content is protected !!