আকাশপাতাল বনাম আকাশ পাতাল: আসা-যাওয়া বনাম আসা যাওয়া

ড. মোহাম্মদ আমীন

এই পেজের সংযোগ: https://draminbd.com/আকাশপাতাল-বনাম-আকাশ-পাতা/

আকাশপাতাল বনাম আকাশ পাতাল: আসা-যাওয়া বনাম আসা যাওয়া

আকাশপ্রদীপ জ্বলে দূরের তারার পানে চেয়ে – – -।
‘আকাশ পাতাল’ নয়, আকাশপাতাল। আধুনিক বাংলা অভিধানমতে, আকাশপাতাল শব্দই প্রমিত। কেন তা নিচে নিমোনিক বিধিতে দেখুন—
পাঞ্জেরী পাবলিকেশন্স লি.
সাধারণ বিধি: সমাসবদ্ধ হলে ‘আকাশ’ শব্দটি সাধারণত ক্রিয়া বা ক্রিয়াবিশেষ্য ছাড়া অন্যান্য ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট শব্দ/পদ বা শব্দাংশের সঙ্গে সেঁটে বসবে। যেমন: আকাশকুসুম, আকাশচারী, আকাশচিত্র, আকাশচুম্বী, আকাশছোঁয়া, আকাশজাত, আকাশদীপ, আকাশদুহিতা, আকাশপট, আকাশপথ, আকাশপ্রদীপ, আকাশবিহার, আকাশভ্রমণ, আকাশকণ্ডল, আকাশযান, আকাশযুদ্ধ প্রভৃতি।
বাক্য: আকাশপ্রদীপ জ্বলে দূরের তারার পানে চেয়ে, আমার নয়ন দুটি –
বিশেষ বিধি: তবে আকাশ শব্দের পর ক্রিয়া বা ক্রিয়াবিশেষ্য কিংবা ক্রিয়ার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট শব্দ বা পদ থাকলে তা ফাঁক রেখে বসবে। যেমন: আকাশ থেকে পড়া, আকাশ ধরা, আকাশ ভেঙে পড়া, আকাশ হাতে পাওয়া, আকাশে তোলা প্রভৃতি।
বাক্য: আকাশ মেঘে ঢাকা শাওন ধারা ঝরে – – -।
এখানে মেঘ শব্দটি ঢাকা ক্রিয়ার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট। তাই আকাশ শব্দের সঙ্গে সেঁটে না বসে পৃথক বসেছে।
 
 
‘আসা যাওয়া’ না কি ‘আসা-যাওয়া’
বাংলা একাডেমি আধুনিক বাংলা অভিধান লিখেছে— ‘আসা-যাওয়া’। এটাই এখন প্রমিত রূপ। ‘আসাযাওয়া’ বানানেও লেখা যায়। তবে উচ্চারণ বিভ্রাটের শঙ্কা থেকে যায়। বাক্যে বিশেষ্য হিসেবে ব্যবহৃত বাংলা ‘আসা-যাওয়া’ অর্থ— গমনাগমন, যাতায়াত। যেমন:
“আসা-যাওয়ার পথের ধারে গান গেয়ে মোর কেটেছে দিন।
যাবার বেলায় দেব কারে বুকের কাছে বাজল যে বিন॥”(রবীন্দ্রনাথ)।
 
মেলামেশা অর্থ প্রকাশেও ‘আসা-যাওয়া’ শব্দটি ব্যবহার করা হয়। যেমন:
তাদের মধ্যে আসা-যাওয়া নেই।
 
ক্রিয়াবিশেষণে ‘আসা-যাওয়া’ কথার অর্থ— ক্ষতিবৃদ্ধি হওয়া। যেমন:
তাতে কিছু আসে-যায় না।
 
যে-কোনো যেকোনো যে কোনো
শুদ্ধ কোনটি? আমি কোনটি লিখব? (শুবাচির প্রশ্ন)
সবগুলো শুদ্ধ। আপনার যেটি মনে হয় সেটি লিখতে পারেন। তবে, একই রচনায় বা একই গ্রন্থে অভিন্ন রূপের সমতাবিধান বাঞ্ছনীয়।
বাংলা একাডেমি আধুনিক বাংলা অভিধানে ভুক্তি হিসেবে যে-কোনো শব্দটি দেওয়া আছে। তবে এই অভিধানের নানা ভুক্তিতে যে কোনো কথাটি বেশি ব্যবহার করা হয়েছে। অতএব, যে-কোনো ও যে কোনো দুটোই শুদ্ধ। যে-কোনো এবং যেকোনো অভিন্ন শব্দ। হাইফেন কেবল উচ্চারণ কিংবা অর্থবিভ্রাট নির্দেশকের কাজ করে।
 
বিন অর্থ কী জানতে চাই
অভিধানে দুটি বিন দেখা যায়। একটি খাঁটি বাংলা বিন এবং অন্যটি ইংরেজি সবজি বিন। বাংলা একাডেমি আধুনিক বাংলা অভিধানমতে, সংস্কৃত বীণা থেকে উদ্ভূত খাঁটি বাংলা বিন অর্থ— (বিশেষ্যে) বীণা, বাদ্যযন্ত্রবিশেষ। বিন শব্দটি কাব্যে অধিক ব্যবহার করা হয়।  এটি অতৎসম শব্দ। তাই বানানে ই-কার বিধেয়। গদ্যে বিন-এর ব্যবহার বিরল। 
“আসা-যাওয়ার পথের ধারে গান গেয়ে মোর কেটেছে দিন।
যাবার বেলায় দেব কারে বুকের কাছে বাজল যে বিন॥”(রবীন্দ্রনাথ)।
 
ইংরেজি সবজি বিন অর্থ— (বিশেষ্যে) বরবটি, শিম প্রভৃতিজাতীয় সবজি। রোমান হরফে বানান bean.

কবি সাহিত্যিকদের লেখার বানান পরিবর্তন

শুবাচি জনাব দেবাশীষ চৌধুরী (DEBASHISH CHOWDHURY RAJA SRIMANGAL) শুবাচে জানতে চেয়েছিলেন,““সালাম সালাম হাজার সালাম সকল শহীদ স্মরণে…” এই গান যখন লিখা হয়েছে তখন শহীদ বানান ছিল ‘হী’। প্রমিত বাংলা বানানে শহিদ ‘হি’। এখন এই গানের লাইনটি কোথাও লিখার প্রয়োজনে শহিদ না শহীদ লিখব…”।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের প্রাক্তন অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক (২০১৯ খ্রিষ্টাব্দ, জুন) বাংলা বানান ও বানানের পরিবর্তন নিয়ে কথাপ্রসঙ্গে একটি তথ্য দিয়েছিলেন। তথ্যটি নিম্নে তুলে ধরা হলো:
জীবনের শেষদিকে বিশ্বভারতীর একদল পণ্ডিত রবীন্দ্রনাথকে প্রশ্ন করেছিলেন, গুরুদেব, আপনার অবর্তমানে যদি বাংলা শব্দের কোনো বানানের পরিবর্তন হয়, ওই পরিবর্তন কি আপনার লেখার বানানের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য হবে না কি আপনার লেখা বানান অপরিবর্তিত থাকবে?
রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন, সেক্ষেত্রে আমার লেখার কোনো শব্দের বানান ‘বিশ্বভারতী’ যেমন নির্ধারণ করে দেবে তেমনটিই প্রামাণ্য এবং আমার নিজের লেখা বানান বলে গণ্য হবে।
সূত্র: কোথায় কী লিখবেন: বাংলা বানান প্রয়োগ ও অপপ্রয়োগ, ড. মোহাম্মদ আমীন, পাঞ্জেরী পাবলিকেশন্স লি. (পৃষ্ঠা: ৩৮৬-৩৮৭)
বিন ইবনে বিনতে
বিন ও বিনতে সমার্থক। উভয়ের  অর্থ (son of); কারো পুত্র নির্দেশে শব্দ-দুটো ব্যবহার করা হয়। বিনতে মেয়েদের নামে ব্যবহার হয়। দুটো ভিন্ন নামের মাঝখানে বসলে বিন (BIN) হবে। যেমন মুহম্মদ বিন কাসিম (মুহম্মদ, কাসিমের পুত্র), আর যদি নামের প্রথমে বসে তখন লিখতে হয় ইবনে(IBN), ইবনে সিনা (সিনার পুত্র). সচরাচর সংক্ষেপে নাম লিখলে ইবনে ব্যবহার করতে হয়। যেমন: ওসামা বিন লাদেন
 
 
বিন এবং ইবনের মধ্যে পার্থক্য
বিন এবং ইবন দুটি শব্দেরই অর্থ ছেলে বা সন্তান। কিন্তু ব্যবহারের ক্ষেত্রে পার্থক্য রয়েছে।
*পিতা এবং ছেলের নামের মাঝে বিন ব্যবহার হয়। যেমন হাসান বিন আলী।
*মাতা এবং ছেলের নামের মাঝে ইবন ব্যবহার হয়। যেমন মুহাম্মাদ ইবন আল হানাফিয়্যা।
*দাদা এবং পৌত্রের নামের মাঝে বিন ব্যবহার হয়না বরং ইবন ব্যবহার হয়। যেমন মুহাম্মাদ ইবন আব্দিল মুত্তালিব।
*লাইনের শুরুতে বিন নয় ইবন ব্যবহার হয় । যেমন ইবনু হাজার আসকালানী,
* যখন রুপক অর্থে ব্যবহার হয় তখন ইবন ব্যবহার হয়। যেমন যে কোন ছেলের বয়সি ছেলেকে বললেন হে আমার ভাতিজা তথা ইয়া ইবনা আখি !!
 
 
 
 
— — — — — — — — — — — —
বাকি অংশ ও অন্যান্য:
সূত্র: ব্যাবহারিক প্রমিত বাংলা বানান সমগ্র, ড. মোহাম্মদ আমীন, পাঞ্জেরী পাবলিকেশন্স লি.
error: Content is protected !!