আচোট জমি কাকে বলে, চুট চোট, চুটিয়ে প্রেম

ইউসুফ খান
সংযোগ: https://draminbd.com/আচোট-জমি-কাকে-বলে-চুট-চোট-চ/
চুট চোট: অশোকের সময় প্রাকৃতে কাটা মানেতে একটা কথা ছিলো চোট্ট। সংস্কৃতে ছিলো চুট। পাঞ্জাবী হিন্দি মারাঠি গুজরাটি নেপালি ওড়িআ অসমীয়া সবেতেই চোট্ট বা চুট হয়েছে চোট। সবেতেই মানে কাটা। বাংলায় ও উ অ কথায় কথায় অদ্‌লে বদ্‌লে যায় বলে চোট্ট কথাটা বাংলায় চোট চুট চট তিন রূপে আছে, কিন্তু মানের সূক্ষ্ম পার্থক্য নিয়ে আছে যা মাঝে মাঝেই মিলিয়ে যায়।
চোট চোট:  বাংলায় চোট এর প্রথম রূপ চোট যার মানে চোপ কোপ ঘা, মানে কোনও কিছু কাটতে কোনও ধারালো অস্ত্র দিয়ে হঠাৎ সপাট ঝটকা আঘাত, a swift stroke a sudden blow, কাটার জন্য কোপ। কোদালের চোট কাটারির চোট। কাপালিক খাঁড়ার এক চোটে পাঁঠাটার মুণ্ডু নামিয়ে দিলো। ডাকাতে মেজোকত্তার মুণ্ডু চুটিয়ে দিয়ে গেছে। কথার চোটে মাথা কাটে। মুকুন্দরাম লিখে গেছেন – ‘এক চোটে রাজস্কন্ধ করিয়া ছেদন।’ আজকাল চোট-এর চেয়ে চোপ কোপ কথাগুলো বেশি চলে। তবে মুণ্ডুতে কোপ মারা আর মুণ্ডু চোট করে নামিয়ে দেওয়া এক জিনিস নয়। চোট দিয়ে ক্রিয়া – চোট মারা চোট বসানো চোট দেওয়া চোট চালানো চোট লাগানো। চোট বলতে আচোট কথাটাও চলতো।
ওড়িআতে চোটেইবা আর হিন্দিতে চোটৱানা মানে চোটানো কোপানো। চোট.চপাট মানে সপাট.চোট ঝটকা.চোট। ওড়িআতে এটা চোটচপট হয়েই আছে, মানে আঘাত করা। নেপালিতে চুট্‌পিট্‌ মানে ঝগড়া ফসাদ। বাংলায় কথাটা এখন হয়েছে চোটপাট, আর তার মানেও লঘু হয়ে হয়েছে মুখ.করা বকাঝকা। ঘনরাম লিখে গেছেন – কোন প্রয়োজনে মুখ কর চোটপাট।
চুট চট: বাংলায় চোট এর দ্বিতীয় রূপ চুট যার মানে ছাল তোলা পিঠ চাঁছা সারফেস কোদলানো। সিমেন্টের মেঝেতে শ্বেতপাথর বা টাইল বসাতে গেলে মিস্ত্রিরা বলে – সানটাকে আগে চুটিয়ে ফেলতে হবে। মা বলে – ‘উঠোনের কোণটাকে কোদাল দিয়ে একটু চুটিয়ে দে না বাবা, কটা শশার বীচ পুঁতবো।’ বারদুয়োরে গোবর নিকিয়ে ধান মেলার চাটান তৈরি করতে গেলে আগে ঘাসের চাপড়া চুটিয়ে ফেলে দিতে হয়। মেঝের ছাল উঠোনের ছাল ইত্যাদি ছুলে ফেলা হচ্ছে চুটোনো চোটানো চটানো। চুটা ঝটকা কোপ না।
হালকা চুটোনোকে বলে চটানো। সিমেন্টের মেঝেটা জায়গায় জায়গায় চটে গেছে, তামচিনির থালাটার চটা উঠে যাচ্ছে, টেবিলের ওপরের সানমাইকাটার অনেকটা চটা ছেড়ে গেছে। মিস্ত্রি কী প্লাস্টিক পেন্ট করলে গো, দেয়াল থেকে তো সব চটা উঠে যাচ্ছে। মুখের মাডপ্যাক শুকিয়ে চটে যাচ্ছে। সেদ্ধ ডিমের খোসা চটানো। জমির চওড়া আল সরু করতে গেলে আলটার গা থেকে মাটি ঝুরে দিতে হয়। লোকে তেঁতুল গাছের ছাল চুটিয়ে নিয়ে যায় আর নারকোল গাছের পালা ঝুরে দেয়। পিঠ থেকে হয় চোটা কিন্তু পাশ থেকে ঝোরা আর ডেপ্‌থে গেলে খোঁড়া। তবে মুখের কথায় মেঝে চুটিয়ে ফেলা কুপিয়ে ফেলা খুঁড়ে ফেলা সবই একাকার হয়ে যায়।
চুটিয়ে প্রেম: যে বোমা ফাটিয়ে একবারে একটা এলাকা একটা ব্লক একসঙ্গে উড়িয়ে দেওয়া যায় তাকে বলতো ব্লকবাস্টার বোম। সাহেব দেশের যুদ্ধবাজ আর প্রোমোটাররাজ এই ভাষায় কথা বলতো। পরে এই কথাটাই কোনও হিট সিনেমা সম্পর্কে বলা হতে লাগলো, যেটা দেখে মহল্লার পর মহল্লার লোকজন উত্তাল উন্মত্ত হয়ে উঠতো। আবেগে যেন পুরো এলাকাটা উড়ে গেছে উপড়ে গেছে। এই উড়িয়ে দেওয়া উপড়ে দেওয়া মার্কা হাইপারবোল আমরা বাংলাতেও খুব ব্যবহার করি। আমাদের সিনেমাও ফাটাফাটি হয়, আমরা মশারি টাঙানো নিয়ে বউয়ের সঙ্গে ফাটাফাটি করি, আমরা ফাটিয়ে বক্তৃতা দিই, বাকিদের বক্তব্য সব গুঁড়িয়ে দিই উড়িয়ে দিই, আমাদের পাড়ার এক সুন্দরী কাকিমা আর তার সুন্দরী মেয়ে সেজেগুজে একসঙ্গে রাস্তায় বেরোলে পুরো পাড়া থথ্থর্‌ করে কাঁপে, রূপ দেখে আমরা উল্টে যাই চার-পা তুলে মুচ্ছো যাই। এসব শুনে ছোটোলোক ছোটোমামাটা পাড়া কাঁপিয়ে হাসে। বাড়াবাড়ির এই বোল বাতেলায় পাড়াকাঁপা ধামাকা ভূকম্প বোধহয় সব ভাষাতেই আছে।
তেমনি, কলেজ লাইফে আমরা চুটিয়ে প্রেম করি, মানে আমাদের চেতনা থেকে বাকি জগৎ সংসারকে আমরা চুটিয়ে ফাটিয়ে উড়িয়ে দিয়ে গোটা শহরে একা আমরা দাপাই। বাকি আর কেউ কোত্থাও নেই, সব উড়িয়ে দিয়েছি চুটিয়ে দিয়েছি। তাই আমাদের প্রেম চুটিয়ে প্রেম ফাটিয়ে প্রেম ফাটাফাটি প্রেম মারকাটারি প্রেম। ঢাকায় একে বলে উড়াধুড়া প্রেম। আমি কোম্পানি খুলে চুটিয়ে ব্যবসা করবো মানে বাকি কোম্পনিগুলোর পায়ের তলার মাটি চুটিয়ে দেবো ধুয়ে সাফ করে দেবো।
আচোট জমি:  যে জমিতে কোনওদিন চাষ হয়নি, এমনি পড়ে আছে তাকে বলে পড়া। পড়াতে ছেলেরা ডাংগুলি হিঙেডাঁড়ি খেলে আর গোরু ছাগল চরে। পড়া বা পড়াজমি মানে পতিত খিল জমি। পড়া ভুঁয়ের চটা টিক্কর হয়। পড়া ভুঁয়ে চাষ শুরু করতে চাইলে প্রথমেই ভুঁয়ে কোদাল চালিয়ে চটা চুটিয়ে নিতে হবে। যে জমি চুটানো হয়নি যাতে কোদালের চোট লাগেনি সে জমি আচোট জমি। আচট আচটা আচোটা জমি।
আব্দুল জব্বার তাঁর বাংলার চালচিত্র বইয়ে একটা গল্পে পান চাষ নিয়ে লিখেছেন – ‘একেবারে আচোট মাটি হলে হবে না। এক চাষ দিয়ে জমি চৌসো করে ঘাস আগাছা তুলে পরিষ্কার করে ফেলতে হবে।’
সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত বিদ্যুৎ-বিলাস কবিতায় লিখেছেন – বিদ্যুৎ-ঠোঁট হানে ধূত্রচুড় ঝড়-গরুড় পাখসাট আচোট বন লোটায়।
শ্রী রামকৃষ্ণ পুঁথিতে আছে –
আচোট পাষাণে যদি দেখে আঁখি মিলে।
দ্রবময়ী বারি হয়ে স্রোত বহি চলে॥
অভিধানে আর ওয়েবে আচোট মানের সুতো ছাড়তে ছাড়তে বহুদূর উড়িয়ে নিয়ে গেছে। এক পোন মানে থেকে এক ডজনকে তবু মানা যায় – অকৃষ্ট অকর্ষিত অনাকৃষ্ট অনাবাদী অনুন্নত অপরিশীলিত ঊষর জনশূন্য পরিত্যক্ত বসতিশূন্য বিজন.অরণ্য মরুভূমি।
আচোট গোরু: শুধু মাটির জমিই আচোট হয় না, আচোটের অন্য মানেও হয়। জব্বার সাহেবের চালচিত্রে অন্য একটা গল্পে আছে গোরুর দালাল নগেন গোরুর হাটে খদ্দেরকে বলছে -‘বড় ব্যাপারীর গরু, আমাদের সাধ্য কি এ রকম আচোট গরু হাটে তুলি! কুমারী মেয়ের পানা – কেউ ছোঁয়নি এখনো। দেখ না, দাঁত দেখ – ছ-দাঁত হয়েছে।’ যে গোরুকে কেউ ছোঁয়নি সে এখনও আচোট গোরু। মানে কেউ তাকে চুটোয়নি এখনও, কিসী নে নহী ঠোকা অভী তক। আচোটের এই মানেতেই পাড়ার চ্যাংড়ারাও বলে – আবে, আজ তো তোর ফুলশয্যা, পুরো আচোট জমিতে লাঙল চালাবি শালা। মাঠ চুটোনো আর খাটে চুটোনো দুটোকেই এক করে দেখা ভারতীয় কৃষি ও কৃষ্টির সংস্কৃষ্টি। লাঙ্গলে ও লিঙ্গে একই ধাতু আছে।
আচোট মানে আ-চোট, বিশেষণ। আঁচড় বিশেষ্য, আঁচ্‌ড়ে দেবার জিনিস। লাঙ্গলকেও আঁচড় বলে।
(ত্রুটি মার্জনীয় শুদ্ধি প্রার্থনীয়)
ইউসুফ খান, কলকাতা. ২০২১ আগস্ট ৩০
ইউসুফ খানের পোস্ট সমগ্র
ইউসুফ খানের পোস্ট শুবাচ লিংক
—————————————–
শুবাচ গ্রুপের লিংক: www.draminbd.com
জানা অজানা অনেক মজার বিষয়: https://draminbd.com/?s=অজানা+অনেক+মজার+বিষয়
শুবাচ গ্রুপের সংযোগ: www.draminbd.com
শুবাচ যযাতি/পোস্ট সংযোগ: http://subachbd.com/
error: Content is protected !!