আদ্য শব্দ, লঙ্গ লেজ ল্যাং লঙ্গ লাঙ্গা লাং পান্তুয়া ল্যাংচা হল লাঙ্গল হল লাঙ্গল, লাঙ্গল ও নাগরদোলা মেরি-গো-রাউন্ড

ল্যাংচা মানে তো খোঁড়া, যে লেংচে চলে। তাহলে খাবার জিনিস ল্যাংচা কেন? আর নাগরদোলা তো গ্রামের মেলা-খেলার জিনিস, নগরের নয়। তাহলে নাগরদোলা গাঁয়ের দোলা না হয়ে নাগর দোলা হলো কেন? জাতি জান্তি চায়। কিন্তু জানতে গেলে আমাদের অনেকটা পেছনে যেতে হবে। মূলে পৌঁছে দেখবো দুটো প্রশ্নেরই উত্তর একই।
আদ্য শব্দ
আদিম মানুষ প্রথম দিকে তার ভাষার যে সব শব্দ তৈরি করেছে তা তার হাতের কাছের গাছ পাথর দেখে আর তার নিজের হাত পা মুখ মাথা দেখে দেখে। সব জীবন্ত ইডিঅমেটিক ভাষার এটা লক্ষণ। গুহামানব তার বউ-বাচ্চাদের কিছু বোঝাতে, কোনও কথা বলতে হাত পা মুখ নেড়ে বোঝাতো। বক্তৃতার সময় আমরা আজও তাই করি। খাঁটি বাংলা ডিকশনারিতে হাত পা মুখ মাথা চোখ কান আঙুল ইত্যাদি নিয়ে লিখতে গেলে পাতার পর পাতা ভরে যাবে। এই রকম একটা দেহজ শব্দলঙ্গ লঙ্গ্‌। এই লঙ্গ-এর মানে-র বিস্তার হয়ে লঙ্গ বহুদূর পৌঁছে গেছে। পৃথিবীর বহু প্রাচীন ভাষাতে একে খুঁজে পাওয়া যাবে। সংস্কৃত ল্যাটিন তামিল খ্মের তুর্কি পার্সি কুর্দি।
লঙ্গ লেজ ল্যাং
লঙ্গ শব্দের ধাতুমূল লন্‌গ্‌ long বা লঞ্‌জ্‌ longe। দুটো একই ধাতু। এর মানে long লম্বা এবং *leyg লাগা। এ দুটোর মূল ভাব সম্প্রসারণ হয়ে অনেক ভাবনা এবং কথা এসেছে। লম্বা ভাবনাটা থেকে সরাসরি এসেছে সোজা লম্বা ঝুলে থাকা উল্লম্ব থাকা, এবং লাগা ভাবনাটা থেকে সরাসরি এসেছে লগ্ন, লাগানো, লেগে থাকা, লেগে যাওয়া। লম্বা কথাটারও প্রাথমিক মানেই ঝুলে থাকা, বাঁদরলাঠির মতো। আদি ধাতু লঞ্‌জ্‌ থেকে এসেছে লেজ লেজা লেজুড়, যা লম্বা লেগে থাকে ঝুলে থাকে। আর লন্‌গ্‌ লঙ্গ থেকে এসেছে লাঙ্গুল লেঙ্গুড় লেঙুর, মানে long লেজ। লন্‌গ্‌ থেকে এসেছে লগা লগি।
আদি ধাতু লন্‌গ্‌ থেকে আর এসেছে লম্বা long leg লঙ্গ ল্যাং ঠ্যাং। পার্সি পাশতো কুর্দ সংস্কৃত এই সব ভাষায় লঙ্গ মানে লেগ বা পা। ‘একটু টেবিলে গিয়ে বস না, আমি দিচ্ছি খেতে, আমার পায়ে পায়ে ল্যাং ল্যাং করে বেড়াচ্ছিস কেন?’ ল্যাং মারা লেঙ্গি মারা লেঙচি মারা মানে অন্যের ল্যাঙে নিজের ল্যাং লাগিয়ে অন্যকে ফেলে দেয়া। ‘সব সিনিয়ারকে লেঙ্গি মেরে দত্তবাবু ম্যানেজার হয়ে বসেছেন’, ‘ওর পায়ে তো বলটা ছিলই, তুই তো ওকে লেংচি মেরে গোলটা করতে দিলি না’। যার একটা ল্যাং খুঁতো সে ল্যাঙড়া। খুঁতো ল্যাং-টা অশক্ত লিলবিলে, তাই ল্যাংড়া তার এই পা-টাকে ঝুলিয়ে টেনে টেনে নিয়ে চলে। একে বলে ল্যাংচানো। মানে ল্যাংড়া ল্যাংচায়, লেংচে লেংচে হাঁটে। ‘‘খোঁড়া ল্যাং ল্যাং ল্যাং / ও পাড়াতে গোরু মরেছে আনগা দুটো ঠ্যাং’’, ‘বউটা কি ল্যাংড়া নাকি, কেমন একটু লেংচে লেংচে চলছে মনে হচ্ছে।’ এক ল্যাংড়া ফকিরের লাগানো আম গাছের আম ল্যাংড়া আম।
তুর্কি-পার্সিতে লঙ্গ এর মানে ল্যাঙড়া। এক যুদ্ধে বর্শার খোঁচা খেয়ে ডান হাত আর কোমর থেকে ডান পা ভেঙে পঁচিশ-ছাব্বিশের যুবক তিমুর কু্র্‌গেন সারা পৃথিবীর কাছে ল্যাংড়া তিমুর তয়মুর-এ-লঙ্গ তৈমুর লং নামে পরিচিত হন।
লঙ্গ লাঙ্গা
শব্দ ব্যবহারে ফোক বাঙালির কোনও ছুচিবাই ছিলো না, বাবু বাঙালির ভণ্ডামি তাদেরকে কোনওদিন ছোঁয়নি। হেগোপোঁদা বলতে ছোটোলোকদের মুখে আটকায় না, ওদিকে বাবুরা নির্দ্বিধায় শিবলিঙ্গ পুংলিঙ্গ স্ত্রীলিঙ্গ মুখে আনে। একটা অশ্লীল হলে অন্যটাও অশ্লীল। আদি ধাতু লন্‌গ্‌  লঙ্গ মানে যা লম্বা ঝুলে থাকে লেগে থাকে লাগানো যায়। সেটা থেকে এসেছে লিঙ্গ, মানে পুং-লিঙ্গ, যা লাগানো যায়। যার লঙ্গ দেখা যাচ্ছে সে উলঙ্গ লাঙ্গা লেঙ্গা নাঙ্গা নাগা। যার লঙ্গ ঢাকা নেই সে লঙ্গটা লেঙ্গটা ল্যাংটা ন্যাংটা। লঙ্গ ঢাকার পাট্টা হচ্ছে লঙ্গপট্ট লঙ্গোট ল্যাঙোট ন্যাঙোট নেংটি। নেংটি ইঁদুরকে বলে লিঙ্গালিকা।
লন্‌গ্‌ এর একটা মানে লাগানো। এই লাগানো মানে গমন রমণ মৈথুন। এই অর্থে লাগানো কথাটা এখনও জলজ্যান্ত আছে। এই অর্থ অভিধান গুলোতে রেকর্ডেড আছে। ভাষার আত্মায় শব্দগুলো আছে বলে হাজার হাজার বছর পার করে মূল মানেটা প্রবাহিত হয়ে এত যুগ পরেও একই মানেতে বেঁচে আছে। পাড়ার চ্যাংড়া ছেলেদের কাছে খবর আছে – পঞ্চুদা বাড়ি ফাঁকা পেলেই বাড়ির কাজের মেয়েটাকে লাগায়। পঞ্চুদা যা লাগায় সেটা লিঙ্গ। দুপুর বেলা পঞ্চুদা বাড়িতে না থাকলে বৌদি যার লঙ্গ লাগায় সে বৌদির লাঙ্গ লাঙ নাঙ নাঙর নাগর। তাই পঞ্চুবৌদি লাঙ্গ-করুনি মাগি। এর দেখাদেখি লাঙ্গ-করুনে মিনশে কথাটাও তৈরি হয়েছে। লাঙ্গ এর দেখাদেখি লাঙ্গনি কথাটাও চলতো। ১৭৪৩ এর মানোএল বইটাতে আছে। লাঙ নাঙ নাঙর নাগর এর সঙ্গে নগরের সম্পর্ক নেই। নগর থেকে হয় নগরী নাগরী নাগরিক।
পান্তুয়া ল্যাংচা
আদিতে বাংলার মণ্ডা মেঠাই মূলত আটা ময়দা বেসন চিনি দিয়ে তৈরি শুকনো জিনিস হতো। ভেতরটা রসালো হলে তাকে বলতো রসের মিষ্টি, যেমন রসকদম্ব। কিন্তু রসের হাঁড়িতে ডুবু ডুবু মণ্ডা বাংলা প্রথম শেখে মোগল আমলে। পানিতে মানে চিনির রসে ডোবা সেই মণ্ডা হলো পানিতৱা পানতওয়া পানতোয়া পান্তোয়া পান্তুয়া। পান্তুয়া বরাবরই আটা ময়দা বেসন দিয়ে তৈরি হতো। সাহেবরা ছানা নিয়ে এলে পান্তুয়াতে ছানাও ঢোকে, তখন আলাদা করে তার নাম হয় ছানার পান্তুয়া। সেই কথাটা আজও চলছে। কড়া ভাজা বলে পান্তুয়ার রং গাঢ় লাল বা খয়েরি বা কালচে হয়।
দেশেবিদেশে বইয়ে সৈয়দ মুজতবা আলী তাঁর চাকর আবদুর রহমানের চোখের বর্ণনায় বলেছেন – ‘দুটো চিনেমাটির ডাবরে যেন দুটো পান্তুয়া ভেসে উঠেছে’। মানে পান্তুয়া হতো গোল গোল, লম্বা না। হালুইকরদের বাড়াবাড়িতে পান্তুয়ার সাইজ একসময় বড়ো আর লম্বা হতে শুরু করে। জমিদার কন্যার বিয়েতে একমনি দুমনি পান্তুয়ার কথাও শোনা যায়। একসেরি দুসেরি ওজনের পান্তুয়া হেঁশেলের নোড়ার মতো দেখতে হতো বলে লোকে তাকে বলতো নোড়া-পান্তুয়া, আর একপো আধপো ওজনের পান্তুয়া লম্বা long লঙ্গ লিঙ্গের মতো দেখতে হতো বলে লোকে তাকে বলতো লেঙ্গচা-পান্তুয়া। দুটো বিশেষণই চেহারা দেখে। ল্যাংচা-পান্তুয়া পরে শুধুই তার বিশেষণে ল্যাংচা নামে পরিচিত হয়।
ফোক এটিমোলজিস্টরা ল্যাংচা নামের ব্যুৎপত্তি নিয়ে প্রচুর উমদা গল্প ছেড়েছে বাজারে। নেট ঘেঁটে পড়ে দেখুন, মনের মাধুরী মেশানো মধুর গল্প সে সব। ল্যাংচার গল্পটা বহু আগের। গল্পটাকে বছর পঁচিশেক আগে নারায়ণ সান্যাল তাঁর রূপমঞ্জরী উপন্যাসে আরও রসিয়ে ফেঁদেছিলেন, তারপর থেকে সেটাকেই লোকে ইতিহাস বলে ধরে নিয়েছে। বছর দুয়েক হলো ওই গল্পটাকেই সামান্য এদিক-ওদিক করে লোকে সিঙ্গারার নামে চালাচ্ছে ফেসবুক হোআটসঅ্যাপে। সেটা পড়ে সিঙ্গারা জিনিসটা বাঙালিরই আবিষ্কার ধরে নিয়ে ফাঁপা বাঙালিরা গর্বে মটমট করছে। যদিও বাকি পৃথিবী জানে সিঙ্গারা ইরানের জিনিস, যা সর্বত্র সমোসা নামে চলে, গোটা এশিয়া আফ্রিকা জুড়ে যার সাম্রাজ্য পাতা। এবং সেটা দুহাজার বছর ধরে চলে আসছে। বাঙালি তখন জন্মায়ওনি। সিঙারা পশ্চিম দিক থেকে ভারতে ঢোকে ১৩ শতকে। পুবের বাঙালি তখনও ভেতো, আটা খেতে শেখেনি। সিঙারা তো আসলে পুর পোরা পরোটা।
হল লাঙ্গল
লন্‌গ্‌ এর একটা মানে লঙ্গ long লম্বা লম্ব। লগা লগি এই ধাতুজ শব্দ। গাছের সোজা ডাল বা বাঁশ লম্বা করে কেটে ঝুরে নিলে যে ডাং ডাণ্ডাটা হাতে থাকে সেটা লাঙ্গল। এই মানেতে লাঙ্গল হচ্ছে লম্বা ডাণ্ডা। লম্বা লম্ব আকারের কারণে তালগাছকে বলতো লাঙ্গল আর নারকোল গাছকে বলতো লাঙ্গলী। সব ভালো ডিকশনারিতে কথা দুটো আছে।
শখের ফুলবাগানের মাটি চেলে ঝুরো ঝুরো করতে ফলা-র মতো যে খুরপি ব্যবহার হয় তার ফলাটা ছুঁচলো হুলওলা হলে তাকে বলে ফাল বা হল। এর ছবিটা আমরা দেখতে পাই হসন্ত বর্ণের হস্‌ চিহ্নে। বর্ণের তলায় ছুঁচলো দাগটার নাম হলো হল।
ডাং অর্থাৎ ডাণ্ডা-লাঙলের ডগায় ছুঁচলো ফাল মানে হল লাগিয়ে হাল করার লাঙল তৈরি হয়। এটা হলো চাষ করার লাঙ্গলের আদিমতম রূপ, ফাল লাগানো কাঠের ডাণ্ডা। এটা দিয়ে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে মাটি চষা যেতো, কোদাল চালানোর মতো ঝুঁকতে হতো না। মাটি চষার এই লাঙ্গল প্রাগৈতিহাসিক শব্দ। লাঙ্গলের তেলুগু নাগালি, কানাড়া নেগিলু, মারঠি নাঙ্গর, চাইনিজ লি, বারমিজ হ্‌তাল, খ্মের ভাষায় নঙ্গল। উত্তর ভারতে লাঙ্গল কেন চলে না এটা ভাবার বিষয়, ওখানে হল হাল চলে।
হাল করতে মানুষ হেলে বলদের ব্যবহার শিখলে লাঙ্গলের চেহারায় বিবর্তন আসে, তাতে মূল ডাণ্ডাটা থেকে যায় হেলানো ভাবে আর মূল ডাণ্ডাটার নামে গোটা জিনিসটার নাম লাঙ্গলই থেকে যায়, অভিধানে যাকে লেখে লাঙ্গলদণ্ড। গোরুর কাঁধে জোয়াল দিয়ে এই লাঙ্গলটাই টানা হয়, ফলে সঙ্গে লাগানো ফালটা মাটি ফালা ফালা করে দেয়। লাঙ্গল টানতে গোরু মোষ হঠে গিয়ে ট্রাক্টর এসে গেলেও মাটি চাল চাল করার মূল সিস্টেমটা একই আছে, ফাল আছে লাঙ্গল আছে। কিন্তু আর কিছু বছর পরে ট্রাক্টর দেখিয়ে কাউকে বোঝানো যাবে না যে লাঙ্গল মানে ছিলো লম্বা ডাণ্ডা।
লঙ্গ লাঙ্গল
অভিধানগুলোতে লাঙ্গলের ব্যুৎপত্তি বলা আছে লন্‌গ্‌ + কলচ্‌। অভিধানকাররা লন্‌গ্‌ মানে লাগানো গমন করা মিলন – শুধু এই ব্যাপারটাকেই ধরছে আর মানেতে লিঙ্গ কথাটা রাখছে। নামের ব্যুৎপত্তি আর আকারের সাদৃশ্যের কারণে লাঙ্গল এর একটা মানে লিঙ্গ। সব ভালো অভিধানেই এটা আছে। আষাঢ়ের সাত তারিখ নাগাদ সুর্য যখন মিথুন রাশিতে প্রবেশ করে তখন শুরু হয় অম্বুবাচী ব্রত। লাঙ্গল চালানো মানে ধরিত্রীতে লিঙ্গ প্রবেশ করিয়ে মৈথুন করা। অম্বুবাচীর তিনদিন বসুমতী ঋতুমতী থাকে, তাই ওই সময়ে ভূমিতে লাঙ্গল প্রবেশ করাতে নেই। এই বিশ্বাসে অম্বুবাচীতে কৃষক ভূমিতে হাল চালাতো না গাছ লাগাতো না। এখনও অনেকে এটা মেনে চলে।
লাঙ্গল ও নাগরদোলা
গাছের ডাল থেকে ঝোলানো দোলনা হচ্ছে ঝুলনা, ঝোলা। ‘সেদিন দুজনে দুলেছিনু বনে ফুলডোরে বাঁধা ঝুলনা’। ‘লছমনঝোলা’। ঝুলন পূর্ণিমায় রাধাকৃষ্ণ এই ঝোলাতেই ঝুলতো।
যে বাচ্চার বাড়ির সামনে ঝুলনা ঝোলানোর গাছ নেই, ফাঁকা, সে দুলবে না? তার জন্য দুদিকে দুটো লাঙ্গল মানে ডাং পুঁতে, তাদের মাথায় আর একটা লাঙ্গল শুইয়ে দিয়ে ফুটবল মাঠের বার-পোস্টের মতো করে সেই বার থেকে দোলনা ঝোলানো হলো। এই লাঙ্গল দিয়ে ঝোলানো দোলাই হচ্ছে লাঙ্গলদোলা।
পার্কে লোহার পাইপ পুঁতে শেকল দিয়ে ঝোলানো যে দোলনা আমরা আজকাল দেখতে পাই সেই সুইংটাই আদি লাঙ্গলদোলার নব্য লৌহ সংস্করণ। গ্রামের বুড়োবুড়িদের নাঙোলদোলা-ই বলতে শুনেছি। এই নাঙলদোলা নাঙরদোলা হয়ে কেতাবি বাবুদের হাতে পড়ে শুদ্ধ হয়ে নাগরদোলা হয়েছে। তাতে মানেটা খারাপ হচ্ছে ভেবে বাবুরা ভেবে ভেবে নতুন মানে দেগে দিয়েছে – নগরের দোলা। একটা অভিধানে লিখেছে অনেক লোকের ভিড় হয় তাই নাগর – এটা আরো উর্বর ব্যাখ্যা।
যে লাঙ্গল দুটোকে খাম্বা করে গাছের প্রক্সি দেওয়া হলো সেই লাঙ্গল দুটোকে গাছই বলা হয়। যেমন চড়কগাছের খুঁটিটাই গাছ। গ্রামের মেলায় যারা নাগরদোলা বসায় তারা এখনও নাগরদোলাকে গাছ বলে – ‘আগে মেলায় কত ভিড় হতো, তখন দুটো করে গাছ দিতাম, এখন তো একটা গাছেই লোক হয় না।’
কালের গতির সঙ্গে নাগরদোলার গঠনেও বিবর্তন এসেছে। ঝোলা বা দোলাতে একজন দুলতো। একসময় এলো চারজন করে বসার মোট চার বা ছয় ঝোলার দোলা, যেটা পুরো ওপর নিচ ঘুরপাক খেতে পারে। এখনকার আমবাঙালি এটাকেই নাগরদোলা বলে জানে। অভিধান লেখা বাঙালি পুরুষ মেলায় বসা এই বাণিজ্যিক গণ-দোলাকেই নাগরদোলা বুঝেছে। অবশ্য আমার মতো গাঁইয়ারা মেরি-গো-রাউণ্ড আর জায়াণ্ট-হুইল এ দুটোকেও নাগরদোলা বলে।
দোলা মানে আগুপিছু করা। ‘দুলে দুলে পড়, নইলে ঘুম পেয়ে যাবে’, ‘ভূমিকম্পে বাড়িটা দুলছে’। নাঙলদোলা ঠিক মানেতেই দোলা। এই দোলাতে শুধু দোলাই হতো, সামনে পিছনে করে। সাহসীরা সামনে অনেক উঁচুতে উঠে আবার পেছনে অনেক উঁচুতে উঠে যেতো। মেলার নাগরদোলা মেরি-গো-রাউণ্ড জায়াণ্ট-হুইল কোনওটাই দোলা নয়, কারণ এরা দোলে না, এরা ঘোরে চক্কর মারে। তাই এদের নাম চরকি চড়কি হওয়া উচিত, যে কারণে চড়কগাছ চড়ক গাছ। কিন্তু এদের ফোরফাদার নাঙলদোলা বলে এদের নামেও দোলা কথাটা লেগে গেছে।

ইউসুফ খানের পোস্ট সমগ্র: ইউসুফ খান পোস্ট: শুবাচ

ইউসুফ খান, কলকাতা, ল্যাংচার নাম ল্যাংচা কেন; নাগর দোলা নাগর কেন, শুদ্ধ বানান চর্চা শুবাচ

 তারিখ: ২৩শে মে ২০২১ খ্রিষ্টাব্দ।
error: Content is protected !!