আফ্রিকা মহাদেশ : ইতিহাস ও নামকরণ

[su_heading size="30" margin="30"]আফ্রিকা মহাদেশ[/su_heading]

আফ্রিকা মহাদেশ : ইতিহাস ও নামকরণ

 ড. মোহাম্মদ আমীন

অ্যাফ্রি একটি ল্যাটিন শব্দ। শব্দটি বর্তমান আফ্রিকা মহাদেশের অধিবাসীদের চিহ্নিত করার জন্য ব্যবহার করা হতো। এর দ্বারা মেডিটেরিনিয়ানের দক্ষিণে অবস্থিত সমগ্র ভূম-ল বা প্রাচীন লিবিয়াকে বুঝানো হয়। ইতিহাসবেত্তাদের অভিমত, স্থানীয় লিবিয়ান উপজাতির নাম হতে আফ্রি নামের উৎপত্তি । আফ্রি ছিল প্রাচীন লিবিয়ার একটি জনবহুল ও প্রভাবশালী জনগোষ্ঠী। অনেকে মনে করেন, আফ্রি(Afri ) শব্দের উৎপত্তির সঙ্গে হ্রিব্রু আফার (afar) শব্দের সংশ্লিষ্টতা রয়েছে। হিব্রু আফার শব্দের অর্থ ধুলা বা ডাস্ট। কিন্তু ১৯৮১ খ্রিস্টাব্দের কিছু আবিষ্কার এ ধারণাটি প্রমাণ করেছে যে, বার্বার (Berbdr) ভাষার শব্দ ইফ্রি ((ifri) হতে আফ্রিকান শব্দের উদ্ভব। ইফ্রি শব্দের বহুবচন ইফ্রান (ifran)। এর অর্থ গুহা। যদ্বারা গুহাবাসী বুঝান হতো। আলজেরিয়া ও ত্রিপোলিতানিয়া (ripolitania) এর বানু ইফ্রান (Banu Ifra) একই শব্দের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট। বার্বার উপজাতির লোকেরা প্রাচীন লিবিয়ার উত্তর-পশ্চিমাংশে বাস করত।

প্রথম শতকের ইহুদি ইতিহাসবেত্তা ফ্ল্যাভিয়াস যোশেফাস (Flavius Josephus  ) লিখেছেন, জেন. ২৫.৪ অনুসারে নবি আব্রাহামের (মুসলমানদের ইব্রাহিম) এক দৌহিত্রের নাম ছিলেন ইফার (Epher)। তার এক উত্তরসুরী লিবিয়া আক্রমণ করে বিশাল এক অঞ্চল নিজের আয়ত্তে নিয়ে আসেন এবং এলাকাটির নাম দেন ইফার। বিশেষজ্ঞদের ধারণা এ ইফার নাম হতে, আফ্রিকা নামের উদ্ভব। ইটোমোলোগিয়ায় ইসডোর অব সেভাইল লিখেছেন, ল্যাটিন শব্দ আপ্রিকা (aprica) হতে আফ্রিকা নামের উদ্ভব। ল্যাটিন ভাষায় আপ্রিকা শব্দের অর্থ ছিল সানি বা রোদ্রময়। অঞ্চলটিতে বৃষ্টি কম ছিল। মেঘও থাকত না। তাই প্রায় সময় রোদ্র থাকতো।

আফ্রিকা মহাদেশের স্থলবন্দি দেশের তালিকা

ক্রম দেশ   আয়তন (বর্গকিমি)জনসংখ্যা
বতসোয়ানা    ৫৮২,০০০       ১,৯৯০,৮৭৬
বুরকিনা পাসো  ২৭৪,২২২১৫,৭৪৬,২৩২
বুরুন্ডি২৭,৮৩৪   ৮,৯৮৮,০৯১
 মধ্য আফ্রিকান প্রজাতন্ত্র৬২২,৯৮৪ ৪,৪২২,০০০
চাদ  ১,২৮৪,০০০ ১০,৩২৯,২০৮
ইথিওপিয়া ১,১০৪,৩০০৮৫,২৩৭,৩৩৮
লেসোথো৩০,৩৫৫২,০৬৭,০০০
মালাউই  ১১৮,৪৮৪ ১৫,০২৮,৭৫৭
মালি   ১,২৪০,১৯২১৪,৫১৭,১৭৬
১০নাইজর  ১,২৬৭,০০০১৫,৩০৬,২৫২
১১রোয়ান্ডা ২৬,৩৩৮ ১০৭৪৬,৩১১
১২ সাউথ সুদান৬১৯,৭৪৫ ৮,২৬০,৪৯০
১৩সোয়াজিল্যান্ড১৭,৩৬৪ ১,১৮৫,০০০
১৪উগান্ডা  ২৪১,০৩৮  ৩২,৩৬৯,৫৫৮
১৫ জাম্বিয়া   ৭৫২,৬১২১২,৯৩৫,০০০
১৬জিম্বাবুয়ে  ৩৯০,৭৫৭১২,৫২১,০০০

১৮৮১ খ্রিস্টাব্দে ম্যাসে উল্লেখ করেছেন যে, মিশরীয় (Egyptian)) আপ-রুই-কা ( af-rui-ka) হতে আফ্রিকা শব্দের উদ্ভব।

এর অর্থ কা (Ka)-উন্মুক্ত হওয়ার দিকে ঘোরা বা ফেরা (to turn toward the opening of the Ka)। ‘কা (Ka)’ ব্যক্তির শক্তিমত্তা এবং কা খোলা গর্ভ বা জন্মস্থান ইঙ্গিত করা হয়েছে। এর অর্থ আফ্রিকা মিশরীয়দের জন্মস্থান। আফ্রিকা নামের উৎপত্তির সঙ্গে আর একটি কিংবদন্তি রয়েছে। মিচেল ফ্রুইটের (Michèle Fruyt)  মতে ল্যাটিন শব্দ আফ্রিকাস (aricus) হতে আফ্রিকার উদ্ভব। ল্যাটিন আফ্রিকাস অর্থ দখিনা-বায়ু। এ দখিনা বায়ু ছিল বৃষ্টির বাহন এবং বৃষ্টির বাহন হিসাবে সবুজ, জীবন ও সমৃদ্ধির উৎস। তাই আফ্রিকাস শব্দের প্রকৃত অর্থ ছিল বৃষ্টিবাহক বায়ু (rainy wind)।

মানুষের উৎস বিষয়ক গবেষণায় জানা যায়, আফ্রিকা মহাদেশই মানুষের উৎস-স্থান। প্রায় ২০ লাখ থেকে ১৮ লাখ বছর আগে মানুষ প্রথম আফ্রিকা থেকে এশিয়া মহাদেশে অভিবাসী হয়। এর কয়েক লাখ বছর পর, ১৫ লাখ হতে ১০ লাখ বছর আগে মানুষ ইউরোপে প্রবেশ করে। আধুনিক মানুষের উৎপত্তির ইতিহাস পুরানো নয়। অস্ট্রেলিয়ায় মনুষ্য বসতির বয়স ৬০,০০০ বছরের এবং আমেরিকায় ৩০,০০০ বছরের অধিক হবে না। কৃষি এবং সভ্যতার বয়স হতে পারে সর্বোচ্চ ১২,০০০ বছর। একসময় আফ্রিকা মহাদেশ অন্যান্য মহাদেশের সঙ্গে যুক্ত ছিল। তাই মানুষের মহাদেশ গমনে কোনো জলীয় বা সামুদ্রিক বিঘœতা ছিল না।

আফ্রিকা মহাদেশের স্থলবন্দি দেশের তালিকা

আয়তন ও জনসংখ্যা উভয় বিবেচনায় আফ্রিকা পৃথিবীর দ্বিতীয় বৃহত্তম মহাদেশ। পৃথিবীর মোট ভূভাগের এক পঞ্চমাংশ পড়েছে আফ্রিকায়। জনসংখ্যা ১ বিলিয়ন। অনুসারী বিবেচনায় আফ্রিকার বৃহত্তম ধর্ম ইসলাম, তারপর খ্রিস্টান। ২০০৯ খ্রিস্টাব্দের হিসাবমতে, পৃথিবীর মোট জনসংখ্যার ১৪.৭% বাস করে আফ্রিকায়। ইথিওপিয়া প্রায় ২ লাখ বছর পূর্বেকার মনুষ্য শরীরের ধ্বংসাবশেষ পাওয়া গিয়েছে। এটিই আফ্রিকা মহাদেশে পাওয়া প্রাচীনতম মনুষ্যের চিহ্ন। এর ভূভাগের আয়তন ৩০.২ মিলিয়ন বর্গ কিলোমিটার বা ১১.৭ মিলিয়ন বর্গমাইল। এটি পৃথিবীর একমাত্র মহাদেশ, যা বিষুব রেখার উভয় পাশে এবং উত্তরের শীতপ্রধান অঞ্চল থেকে দক্ষিণের শীতপ্রধান অঞ্চল পর্যন্ত বিস্তৃত। আফ্রিকা পৃথিবীর সবচেয়ে উষ্ণতম মহাদেশ। এ মহাদেশের মোট আয়তন পৃথিবীর মোট আয়তনের ৬%, তবে পৃথিবীর মোট ভূমির ২০.৪% আফ্রিকা মহাদেশে অবস্থিত।

আফ্রিকা মহাদেশে অবস্থিত ৬,৬৫০ কিলোমিটার বা ৪,১৩২ মাইল দীর্ঘ নিলনদ পৃথিবীর দীর্ঘতম নদী।

পৃথিবীর বৃহত্তম মরুভূমি ‘সাহারা’

পৃথিবীর বৃহত্তম মরুভূমি ‘সাহারা’ আফ্রিকায়। এর আয়তন প্রায় যুক্তরাষ্ট্রের সমান। ৩৫৫ ফুট উঁচু ও এক মাইল প্রশস্ত ভিক্টোরিয়া জলপ্রপাত আফ্রিকা মহাদেশে অবস্থিত। মাউন্ট কিলিমানজারো আফ্রিকার সর্বোচ্চ পর্বত। এর উচ্চতা ১৯,৩০০ ফুট। এটি এত উঁচু যে, বিষুব রেখার কাছাকাছি হওয়া সত্ত্বেও এর শৃঙ্গে হিমাবহের দেখা পাওয়া যায়। মাদাগাস্কার আফ্রিকার বৃহত্তম এবং পৃথিবীর চতুর্থতম দ্বীপ। এটি ভারত মহাসাগরে আফ্রিকার পূর্ব উপকূলীয় এলাকায় অবস্থিত।

নিলনদ

৯,৬৮,০০০ আয়তনের সুদান আফ্রিকার বৃহত্তম দেশ। মিশরের রাজধানী কায়রো আফ্রিকার বৃহত্তম শহর। আফ্রিকান হাতি পৃথিবীর বৃহত্তম স্থলপ্রাণী। পৃথিভীর দীর্ঘতম প্রাণী জিরাপ আফ্রিকা মহাদেশে বাস করে। পৃথিবীর দ্রুততম প্রাণী চিতাও বাস করে আফ্রিকায়। পৃথিবীর বৃহত্তম সরীসৃপ নিল কুমির পাওয়া যায় আফ্রিকায়। পৃথিবীর বৃহত্তম প্রাইমেট বা শ্রেষ্ঠ বর্গভুক্ত স্তন্যপায়ী প্রাণী (primate) গরিলা আফ্রিকা ছাড়া আর কোথায়ও জন্মে না।

আসাল

মধ্যপূর্ব জিবুতিতে অবস্থিত লেক আসাল আফ্রিকার সর্বনিম্ন বিন্দু। এটি সমুদ্র সমতল থেকে ১৫৫ মিটার গভীর। গভীরতার দিক হতে মৃতসাগর ও গ্যালিলি সাগর এর পর এর স্থান। পৃথিবর বৃহত্তম লবণের মওজুদ রয়েছে এ হ্রদে। সমুদ্রের চেয়ে এর লবণাক্ততা ১০ গুণ বেশি। আফ্রিকায় জলহস্তীর আঘাতে যত মানুষ মারা যায়, অন্য কোনো বড় আকারের হিংস্র প্রাণীর আঘাতে অত মানুষ মারা সিংহ ও কুমিরের আক্রমণেও তত মানুষ মারা যায় না। জলহস্তী তাদের এলাকাকে শত্রুমুক্ত রাখার জন্য অকারণেই মানুষকে হত্যা করে বসে। তারা মানুষকে ইউরোপীয়ান দখলকার মনে করে সম্ভবত এমন হিংস্র আচরণ করে।

পৃথিবীতে মিষ্টি জলে যত প্রজাতির মাছ পাওয়া যায়, তন্মধ্যে সবচেয়ে বেশি প্রজাতির মাছ পাওয়া যায় আফ্রিকার মালাউই হ্রদে। আফ্রিকায় বাস করে পৃথিবীর ৮৫% হাতি এবং পৃথিবীতে বিদ্যমান সিংহের ৯০ ভাগ বাস করে আফ্রিকায়। আফ্রিকান হাতির ওজন ৭ টন পর্যন্ত হতে পারে।

৫৪ টি স্বাধীন রাষ্ট ও একটি পশ্চিম স্বশাসিত ভূখ- পশ্চিম সাহারা নিয়ে আফ্রিকা গঠিত। ইথিওপিয়া ও লাইবেরিয়া ছাড়া পুরো মহাদেশ বিদেশি শক্তির উপনিবেশে পরিণত হয়েছিল। উপনিবেশের পূর্বে আফ্রিকা ভিন্ন ভাষা ও রীতিনীতসহ ১০,০০০ ভিন্ন রাষ্ট্র ও স্বায়ত্তশাসিত গ্রুপে বিভক্ত ছিল। ফারাও সভ্যতা ছিল পৃথিবীর অন্যতম প্রাচীন ও দীর্ঘস্থায়ী সভ্যতা।”

আফ্রিকা মহাদেশের ১৭০ মিলিয়ন লোক আরবি ভাষায়, ১৩০ মিলিয়ন লোক ইংরেজি ভাষায়, ১০০ মিলিয়ন লোক সোয়াহিলি ভাষায়, ১১৫ মিলিয়ন লোক ফ্রেঞ্চ ভাষায়, ৫০ মিলিয়ন লোক বার্বার ভাষায়, ৫০মিলিয়ন লোক হায়ুসা ভাষায়, ২০ মিলিয়ন লোক পর্তুগিজ ভাষায় এবং ১০ মিলিয়ন লোক স্পেনিশ ভাষায় কথা বলে। এ ছাড়া এ মহাদেশে আরও হাজার-অধিক ভাষা প্রচলিত আছে। আফ্রিকার লোকেরা ১০০০ এর অধিকা ভাষায় কথা বলে। ইতোমধ্যে আফ্রিকায় স্বতন্ত্র ২০০০ ভাষাকে চিহ্নিত করা হয়েছে। ২০৫০ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে আাফ্রিকা মহাদেশের অধিবাসীর সংখ্যা দ্বিগুণ হয়ে ২.৩ বিলিয়ন হয়ে যাবে।

জিডিপি ও মাথাপিছু আয় বিবেচনায় আফ্রিকা পৃথিবীর সবচেয়ে গরিব মহাদেশ। প্রবৃদ্ধির হার মাত্র ২.৪%। ৪০% বয়স্ক অশিক্ষিত। পৃথিবীর মোট ম্যালেরিয়ার ৯০% আফ্রিকায়। আফ্রিকার ৯০% ভূমি কৃষিকাজে ব্যবহারের অনুপযোগাী। ২৪০ মিলিয়নের অধিক আফ্রিকান দীর্ঘস্থায়ী অপুষ্টির শিকার। তবে, পৃথিবীর অবশিষ্ট খনিজ সম্পদের ৩০% মওজুদ আছে আফ্রিকায়। এখানে মওজুদ রয়েছে পৃথিবীর ৪০% স্বর্ণ, ৬০% কোবাল্ট এবং ৯০% প্লাটিনাম। এগুলো উত্তোলন শুরু হলে আফ্রিকা পৃথিবীর ধনী এলাকায় পরিণত হবে। তবে ইতিহাসবেত্তাদের ধারণা, হয়তো তখন আবার নব্য ঔপনিবেশ প্রতিযোগিতা শুরু হয়ে যাবে।

আলজেরিয়া

error: Content is protected !!