আমার প্রিয় লেখক: আকবর হোসেন

ড. মোহাম্মদ আমীন

আমার প্রিয় ঔপন্যাসিক আকবর হেসেন

যদি আপনি আমাকে প্রশ্ন করেন আপনার প্রিয় ঔপন্যাসিক কে? দ্বিধাহীনচিত্তে আমি বলব আকবর হোসেন। সেই সূত্রে তিনি আমার প্রিয় লেখক। কারণ কী? অসংখ্য কারণ আছে। তার লেখা আমার ভালো  লেগেছে। তার উপন্যাসের কাহিনি আমাকে আলোড়িত করেছে, জীবনবোধে উদ্দীপ্ত করেছে দারুণভাবে।সর্বোপরি তাঁর উপন্যাসই আমাকে লেখক হওয়ার উৎসাহে বিপুলভাবে প্রাণিত করেছে। বাংলার আর কোনো ঔপন্যাসিকের উপন্যাস আমাকে এত আলোড়িত করতে পারেনি।

 আমার প্রিয় ঔপন্যাসিক আকবর হোসেন ১৯১৭ খ্রিষ্টাব্দের ১লা অক্টোবর কুষ্টিয়া জেলার কুমারখালী উপজেলার কেয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন।  তার বাবা হাজী আব্দুল বিশ্বাস ও মাতা ময়জান নেছা। উনিশ ও বিশশতকে বাংলা সাহিত্যে যে  কয়েকজন মুসলমান লেখক সাহিত্যকর্মের মাধ্যমে জনপ্রিয়তার শীর্ষে উপনীত হতে পেরেছিলেন তন্মধ্যে ঔপন্যাসিক আকবর হোসেন অন্যতম। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সঙ্গে সাক্ষাৎ তাঁর জীবনের উল্লেখযোগ্য ঘটনা। বলা হয়ে থাকে: রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে সাক্ষাৎ-স্মৃতি আকবর হোসেনের লেখক হওয়ার প্রেরণা।  ‘বিষাদ সিন্ধু’ রচয়িতা মীর মশাররফ হোসেন (১৮৪৭-১৯১২) এবং ‘আনোয়ারা’ উপন্যাস-খ্যাত মজিবর রহমান সাহিত্যরত্ন (১৮৬০-১৯২৩) এর পর পূর্ব বাংলায় আকবর হোসেন ছিলেন অন্যতম জনপ্রিয় মুসলিম সাহিত্যিক। তিনি এত জনপ্রিয়তা লাভ করেছিলেন যে, তাঁর উপন্যাস বের হওয়ার কয়েক দিনের মধ্যে বিক্রি হয়ে যেত এবং প্রকাশক সরবরাহ দিতে হিমশিম খেয়ে যেতেন।

পঞ্চাশ ও ষাটের দশকে যখন ভারতীয় লেখক ছাড়া আর কারো বই বাজারে বিক্রি হতো না, সে সময় একমাত্র আকবর হোসেনের উপন্যাস উভয় বাংলার পাঠকদের বৃহদংশের মনমানসিকতা পুরোই দখল করে নিয়েছিল। বাংলা সাহিত্যে তিনিই একমাত্র লেখক, যিনি উপন্যাস বিক্রি করে ষাটের দশকে ঢাকায় বাড়ি করতে সক্ষম হয়েছিলেন।

আকবর হোসেন কুমিল্লা হাইস্কুল থেকে ম্যাট্রিক পাস করেন। পরবর্তীকালে কলকাতা রিপন কলেজ থেকে বিএ পাশ করে কর্মজীবনে প্রবেশ করেন। দীর্ঘদিন তিনি সরকারি চাকুরিতে কর্মরত ছিলেন। ছাত্রাবস্থায়ই তার লেখালেখির শুরু। সন্ধানী, শিক্ষা, দৈনিক আজাদ ও নবযুগ প্রভৃতি   পত্রিকায় লেখা প্রকাশের মাধ্যমে তাঁর সাহিত্য প্রতিভার উন্মেষ বিকাশ ঘটে।

অবাঞ্চিত আকবর হোসেন-এর প্রথম উপন্যাস। একসময় এটি বিপুল জনপ্রিয়তা লাভ করে। এই উপন্যাসটি পড়ে আমি এতই মুগ্ধ হয়েছিলাম যে, আকবর হোসেন নামটি শুনলেই শরীর শ্রদ্ধা আর ভালোবাসায় রোমাঞ্চিত হয়ে যেত।১৯৬৯ সালে জুপিটার ফিল্মস কামাল আহমেদের পরিচালনায় এটিকে চলচ্চিত্রে রূপ দেয়, যা সারাদেশে ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করে।  তার বহুল জনপ্রিয় আরও কয়েকটি গ্রন্থ হলোঃ কী পাইনি, ঢেউ জাগে, দু’দিনের খেলাঘরে, মোহমুক্তি ইত্যাদি।

আকবর হোসেন মোট ১৩টি উপন্যাস ও ১টি ছোটগল্প গ্রন্থ রচনা করেছেন। তাছাড়া  কিছু কবিতা, সনেট, গান, প্রবন্ধ ও নাটক রচনা করেন। তাঁর রচিত উপন্যাসগুলো হলো:  অবাঞ্ছিত (১৯৫০), কি পাইনি (১৯৫২), নীলাঞ্জনা, প্রাণবসন্ত, উপল উপকূলে, হৃদয় উপবনে, মোহমুক্তি (১৯৫৩), ঢেউ জাগে (১৯৬১),  দুদিনের খেলাঘরে (১৯৬৫), মেঘ বিজলী বাদল (১৯৬৮), নতুন পৃথিবী (১৯৭৪), দুষ্টক্ষত এবং আভা ও তার প্রথম পুরুষ। গল্পগ্রন্থটির নাম: আলোছায়া (১৯৬৪)।

তিনি ১৯৮১ খ্রিষ্টাব্দের ২রা জুন মারা যান।

 

error: Content is protected !!