আমি ‘ইদ’ বানান সমর্থন করি কেন: ইদ বনাম ঈদ

ড. মোহাম্মদ আমীন
 
 
সংযোগ: https://draminbd.com/আমি-ইদ-বানান-সমর্থন-করি/
 
বাংলায় ধ্বনিমূলগত বা উচ্চারণগত কোনো দীর্ঘস্বর নেই। তাই ‘ইদ’ ও ‘ঈদ’ উভয় শব্দের উচ্চারণ অভিন্ন। প্রশ্ন আসতে পারে, তা হলে বানান পরিবর্তনের কারণ কী? কারণ আছে এবং তা যথেষ্ট যৌক্তিক। শব্দের অর্থ দ্যোতনা, বানানে আদর্শমান প্রতিষ্ঠা ও সমতা রক্ষার স্বার্থে বাংলা একাডেমি, বিদেশি শব্দ হিসেবে আরবি عيد শব্দের বানান ‘ইদ’ করেছে। তবে কেউ ‘ঈদ’ লিখলে সেটির উচ্চারণও হবে ‘ইদ’। অবশ্য কেউ যদি আরবি উচ্চারণ করেন সেটি অন্য বিষয়।
 
‘বাংলা একাডেমি আধুনিক বাংলা অভিধান (২০১৬)’ ও ‘বাংলা একাডেমি ব্যবহারিক বাংলা অভিধান (২০১৫)’ অনুযায়ী عيد (Eid) শব্দের প্রমিত ও সংগততর বাংলা বানান ‘ইদ’। عيد (Eid) বিদেশি শব্দ। তাই প্রমিত বানানরীতি অনুসারে শব্দটির প্রমিত ও সংগততর বাংলা বানান ‘ইদ’, ‘ঈদ’ নয়। শব্দটির বানানে ‘ঈ’ বা ‘ই’ যা-ই দেওয়া হোক না কেন; উচ্চারণের, সম্মানের বা গাম্ভীর্যের কোনো পরিবর্তন হবে না, কিন্তু ‘ই’ দিলে প্রমিত বানানরীতি প্রতিষ্ঠা ও ভাষার আদর্শমান এবং ঐকমত্য প্রতিষ্ঠিত হবে। যা ভাষাকে করবে আরও সর্বজনীন, বোধগম্য, অভিন্ন ও প্রমিত।
 
ভাষা বহমান নদীর মতো নয়, চলমান প্রকৃতির মতো। প্রত্যেক ভাষার নিজস্ব বৈশিষ্ট্য ও স্বকীয় পরিক্রমা রয়েছে। প্রাচীনত্বের অজুহাতে ভাষার স্বকীয়তা এবং ভাষাপ্রকৃতির সাবলীল পরিবর্তনে বাধা দিয়ে ঐকমত্য সৃষ্টিতে ব্যাঘাত সৃষ্টি করা সমীচীন হবে বলে মনে হয় না।
 
অনেকে বলেন, ‘ইদ’ বানান এখনও ব্যাপকভাবে প্রচলিত হয়নি। সম্মানিত শুবাচি জনাব
Khurshed Ahmed
এর ভাষায় বলা যায়, “আপনি-আমি শুরু করলেই সংগততর ‘ইদ’ বানানটি প্রচলিত হতে শুরু করবে।” শব্দটির বাংলা বানান নিয়ে বির্তকের এক পর্যায়ে একাদশ শ্রেণির একজন শিক্ষার্থী শুবাচি জনাব Minha Siddika মন্তব্য করেছেন : “আমাদের ঐকমত্য দূরহ বিষয়, যে কোনো ক্ষেত্রে।।” অনুজ/উত্তরসুরীদের এমন নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে বের করে আনার দায়িত্ব আমরা এড়িয়ে যেতে পারি না।
সূত্র:
১. আধুনিক চীন, শান, থান য়ুন,  প্রকাশক: কলকাতা, বিশ্বভারতী গ্রন্থালয়।
২. বাংলা একাডেমি আধুনিক বাংলা অভিধান, প্রকাশক বাংলা একাডেমি।
 

আমি ‘ইদ’  বানান সমর্থন করি কেন

আলোচনা করতে গেলে পরোক্ষভাবে ধর্ম চলে আসবে। কারণ, যারা ইদ বানানের পক্ষে, তাঁদের মুখ্য বিষয়টি ধর্মবোধকে উপলক্ষ্য করে জাগ্রত, বিকশিত ও পরিব্যাপ্ত। অধিকন্তু শব্দটিও ধর্মীয়। এ বিষয়ে কেউ বিব্রত বোধ করে থাকলে ক্ষমাপ্রার্থী। আর একটা বিষয় মনে রাখবেন, বাংলা উচ্চারণবিধি মতে, বাংলায় উচ্চারণগত দীর্ঘস্বর নেই। ইদ/ঈদ, দিন/দীন, বিনা/বীনা সমোচ্চারিত। এ শব্দরাশির ঈ-কার উচ্চারণের পার্থক্য নির্দেশ করে না, বানানের পার্থক্য নির্দেশ করে।
 
ঈ ঊ ঋ ণ ষ এই কয়টি বর্ণকে জাত্য-ব্রাহ্মণ্য দাবিকৃত বৈদিক সংস্কৃত ভাষার ব্রাহ্মণ্য বা জাত্যন্ধ বর্ণ বলা যায়। সংস্কৃত পণ্ডিতবর্গের দাবি এসব বর্ণ যাদের গায়ে চড়বে তারাই সংস্কৃত ভাষার ম্লেচ্ছ শব্দ হিসেবে সংস্কৃতের অনুগত হয়ে থাকবে। প্রথম থেকে তাদের উদ্দেশ্য ছিল, যে ভাষার শব্দই হোক না, এ বর্ণগুলো (ঈ ঊ ঋ ণ ষ ) পরিয়ে সংস্কৃত ভাষার আওতায় নিয়ে আসা। তাঁরা তা-ই করেছেন। করতে পেরেছেন। বাংলা সংস্কৃত ভাষা নয়, সম্পূর্ণ আলাদা ভাষা। প্রাকৃত ভাষাকে সংস্কার করে বরং সংস্কৃত। বাংলা কেন ব্রাহ্মণ্য বর্ণ পরে তার যবন হয়ে থাকবে?
 
ভারতে ইসলামের প্রথমদিকে সংস্কৃত পণ্ডিতগণ আরবি/ফারসি শব্দকে ঈ ঊ ঋ ণ ষ বর্ণ পরিয়ে দিয়ে সংস্কৃত আদলে সজ্জিত করে সংস্কৃত প্রভাবিত শব্দে পরিণত করে দিয়েছিলেন। মুসলিমরা তখন শিক্ষা-দীক্ষায় এত অজ্ঞ ছিল যে, আধুনিক শিক্ষার ক্ষেত্রে হিন্দু পণ্ডিতবর্গের সিদ্ধান্তই ছিল তাদের শিরোধার্য ঐশীবাণী। মুসলিমরা নামের আগে শ্রী লিখতেন। মোহাম্মদ/মুহাম্মদ-এর বদলে লিখতেন মু/মো./ মোহাং। অনেক পরে ১৯৩০ খ্রিষ্টাব্দে এসে বাংলাপ্রেমী কিছু পণ্ডিত বাংলাকে প্রথম সংস্কৃত মুক্ত করার কার্যকর প্রয়াস গ্রহণ করেন। ফলে বাংলা, সংস্কৃতের করাল গ্রাস থেকে বহুলাংশে মুক্ত হওয়ার সুযোগ পেয়ে যায়।
 
ইসলামিক শব্দ হিসেবে ইদ, ইমাম, ইসলামি, শহিদ, আরবি, মদিনা, কুরআন, হাজি, নামাজি প্রভৃতি শব্দকে সংস্কৃত জাত্যন্ধ বর্ণ মুক্ত করে বাংলাকরণ ছিল বাংলা ও ইসলামি শব্দের আত্মমর্যদার পক্ষে একটি বিরাট গৌরব এবং অনবদ্য প্রাপ্তি। প্রসঙ্গত, বাংলায় বিদেশি শব্দের মধ্যে অধিকাংশই আরবি ও ফারসি এবং বিরাট অংশ ইসলামিক শব্দ।
 
প্রমিত বাংলা বানানের নিয়মের সঙ্গে সংস্কৃত জাত্যন্ধ বর্ণ ধারণাকে উচ্ছেদ করে মাতৃভাষা বাংলা ও ইসলামিক শব্দরাজিকে স্বকীয় বাংলা মর্যাদায় অধিষ্ঠিত করার জন্য আমি ইদ লিখি।
 
কেউ যদি ঈদ লিখে থাকেন, আমার আপত্তি নেই। সেটি প্রত্যেকের ব্যক্তিগত বিষয়। বাংলা একাডেমি ঈদ বানানকে সম্পূর্ণ পরিত্যাগ করেনি। বলেছে, ঈদ, ইদ-এর প্রচলিত ও অসংগত বানান। আমি সংগত বানানটাই লিখি।
 
আমি কেবল আমার ধারণাটি দিলাম। কেউ অশোভন কিংবা উগ্র মন্তব্য করবেন না। পুরো যযাতি পড়লেও না বুঝে মন্তব্য করবেন না। না বুঝে মন্তব্য করা অন্ধকারে ঢিল ছোঁড়ার মতো। এটি আপনার প্রিয়জনের গায়েও পড়তে পারে।
 
 
শুবাচ গ্রুপের লিংক: www.draminbd.com
তিনে দুয়ে দশ: শেষ পর্ব ও সমগ্র শুবাচ লিংক
error: Content is protected !!