আমি শুবাচ থেকে বলছি: শুবাচির পোস্ট/যযাতি; মন্তব্য, প্রশ্ন উত্তর বিবিধ ৩

ড. মোহাম্মদ আমীন

আমি শুবাচ থেকে বলছি: শুবাচির পোস্ট/যযাতি; মন্তব্য, প্রশ্ন উত্তর বিবিধ ৩

মোদী
মোদী শব্দের উচ্চারণ: মোদি। পদ: বিশেষণ। অর্থ: আনন্দ দান করে এমন বা আনন্দদায়ক; হর্ষযুক্ত। ব্যুৎপত্তি: তৎসম বা সংস্কৃত √মুদ্‌+ইন্‌। স্ত্রীলিঙ্গ: মোদিনী (উচ্চারণ: মোদিনি)।

সংগৃহীত না কি সংগ্রহীত

সংগ্রহীত ভুল শব্দ।কোনো অভিধানে শব্দটি নেই। সংগ্রহ অর্থ (বিশেষ্যে) জোগাড়, আহরণ, সংকলন। সংগ্রহকারীকে বলা হয় সংগ্রহীতা। এটি ব্যক্তি, বস্তু নয়।সংগ্রহীতা যা সংগ্রহ করে তা সংগৃহীত। এটি বস্তু, লেখা ইত্যাদি।
সংস্কৃত সংগৃহীত অর্থ— (বিশেষণে) সংগ্রহ করা হয়েছে এমন, আহরণ করা হয়েছে এমন, জোগাড় করা হয়েছে এমন। যা সংগ্রহ করা হয়েছে তাই সংগৃহীত।

টম্যাটো টমেটো না কি টমাটো?

শব্দটি ফরাসি। ইংরেজি বানান tomato। বাংলা বানান এবং উচ্চারণ কী হবে? টমেটো, টমাটো না কি টম্যাটো? বৈয়াকরণগণ বলছেন, ফরাসি উৎস বিবেচনায় টম্যাটো লেখাই সংগত। তাই বাংলা একাডেমি আধুনিক বাংলা অভিধানে টম্যাটো বানানকে প্রমিত দেখানো হয়েছে।
 
ওই অভিধানমতে, টম্যাটো অর্থ বাংলাদেশ-সহ পৃথিবীর প্রায় সব দেশে ব্যাপকভাবে চাষ করা হয় এমন মসৃণ খাঁজযুক্ত রসালো উপবৃত্তাকার শীতকালীন সবজি বা তার শাখায়িত লোমশ বর্ষজীবী বীরুৎশ্রেণির উদ্ভিদ, টক বেগুন, বিলাতি বেগুন প্রভৃতি। অনেকে শব্দটির বানান লিখে থাকেন টমেটো, টমাটো প্রভৃতি। কিন্তু প্রমিত বানান টম্যাটো
 
মেঘমল্লার
মেঘমল্লার বা মেঘ মল্লার সংগীতের একটি রাগবিশেষ। নামটি আহরিত হয়েছে সংস্কৃত শব্দ মেঘ থেকে। কিংবদন্তি অনুসারে, এই রাগ যে এলাকায় গাওয়া হয় সেখানে এই রাগ বৃষ্টি নিয়ে আসে।

কিংবদন্তি

‘কিংবদন্তি’ শব্দের আভিধানিক অর্থ হচ্ছে ‘লোকপরম্পরায় শ্রুত কাহিনি’, ‘গুজব’ প্রভৃতি। শব্দটির আভিধানিক অর্থে সুস্পষ্ট দ্বিচারিতা লক্ষণীয়। অবশ্য এই দ্বিচারিতার পেছনে কারণও রয়েছে। বিষয়টি স্পষ্ট করতে কিংবদন্তি শব্দের আভিধানিক অর্থ বাদ দিয়ে প্রায়োগিক অর্থে গুরুত্ব দিতে হবে। ইংরেজি ‘legend’ শব্দের বাংলা প্রতিশব্দ হচ্ছে ‘কিংবদন্তি’। যদিও বাংলায় আভিধানিক অর্থে শব্দটি কোনো বিষয় সম্পর্কে ধারণা দেয়; কিন্তু, প্রকৃতপক্ষে শব্দটিকে ব্যক্তি ধারণ করে। অর্থাৎ, কিংবদন্তি ব্যক্তির কর্মে জন্ম নেয়। কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তির কৃতকর্ম যখন ওই ব্যক্তিকে অনন্য প্রমাণ করে, তার প্রজন্ম এবং তার পরবর্তী প্রজন্ম পরম্পরা অনুসারে তার কৃতকর্মের গল্প বলে বেড়ায়, তবে ওই ব্যক্তিকে কিংবদন্তি বলা হয়। বিস্তারিত
 

স্বার্থনিজ না-হয়ে বানানটি স্বার্থপর কেন?

সংস্কৃত স্বার্থ (স্ব+অর্থ) শব্দেরঅর্থ— (বিশেষ্যে) নিজ প্রয়োজনের বিবেচনা; নিজের মঙ্গল বা হিত। অন্যদিকে, স্বার্থপর (স্বার্থ+পর) অর্থ (বিশেষণে)— পরের বা অন্যের সুবিধা-অসুবিধা না দেখে সর্বদা নিজের স্বার্থসিদ্ধিতে তৎপর এমন, পরকে উপেক্ষাকারী ব্যক্তি স্বার্থপর।
 
আভিধানিক অর্থ হতে দেখা যায়, স্বার্থপর লোক নিজের স্বার্থ অর্থাৎ নিজের মঙ্গল বা হিত করার জন্য অন্যকে পর করে দেয়। তাই শব্দটির বানান স্বার্থপর।যদি এমন লোক নিজের স্বার্থ ত্যাগ করে অন্যকে নিজের করে নিত তাহলে শব্দটির বানান হতো স্বার্থনিজ
 
পরিবহন না পরিবহণ
 
শব্দটির বানানে সুস্পষ্ট কোন নির্ণায়ক সূত্র নেই। সংস্কৃতে পরিবহণ বলে কোন শব্দ নেই। আছে ‘পরিবহ’। তাই নির্ণায়ক সূত্র থাকার কথা নয়। শব্দটি বাংলায় পরিভাষা হিসেবে তৈরি করা হয়েছে। জ্ঞানেন্দ্রমোহন ও চলন্তিকায় ‘পরিবহন’ গৃহীত, ‘পরিবহণ’ নয়। কোনরূপ ভিত্তি ও যুক্তি ছাড়া ‘সংসদ’ ব্যবহারিক শব্দকোষ ‘পরিবহণ’ লিখেছে। বাংলা একাডেমি ব্যবহারিক বাংলা অভিধান পরিবহন ও পরিবহণ দুটোই রেখেছে। আসল কথা হল, যেখানে ণত্বের নির্ণায়ক সূত্র নেই সেখানে ‘ন’ লেখাই সমীচীন। কিন্তু বাংলা একাডেমি আধুনিক বাংলা অভিধান গ্রন্থে ‘পরিবহন’ শব্দকে রাখাই হয়নি। রাখা হয়েছে ‘পরিবহণ’। অতএব আপনার আমার কী আর করার আছে। ‘পরিবহণ’ লিখতে হবে, কারণ কর্তার ইচ্ছাই কর্ম।
রাষ্ট্রপতি ছাড়া অন্যকেও মহামান্য সম্বোধনে বাধা নেই
 
উচ্চাদালতের রায় বা সংবাদ সংক্রান্ত সকল প্রজ্ঞাপন, চিঠিপত্র এবং গেজেট ও পত্রপত্রিকা— সর্বত্র লেখা হয় মহামান্য হাই কোর্ট, মহামান্য আদালত, মহামান্য সুপ্রীম কোর্ট। প্রশাসনের আগা থেকে গোড়া পর্যন্ত সবাই কথোপকথনের সময়ও ‘হাই কোর্ট’/‘সুপ্রীম কোর্ট’ উচ্চারণের আগে পরম সম্মানে ‘মহামান্য’ শব্দটি উচ্চারণ করেন। রাষ্ট্রপতির কার্যালয় থেকে জারিকৃত হাই কোর্ট ও সুপ্রিম কোর্টবিষয়ক যোগাযোগ বা প্রজ্ঞাপনেও ‘মহামান্য’ আদালত, মহামান্য হাই কোর্ট, মহামান্য সুপ্রীম কোর্ট শব্দটি লেখা হয়। রাষ্ট্রের নির্বাহী প্রধানও উচ্চাদালতকে ‘মহামান্য’ সম্বোধন করে থাকেন।
 
সংসদ সদস্য, মন্ত্রিপরিষদের সদস্যবর্গ, এমনকি সাংবিধানিক সংস্থার প্রধানগণও বিনা দ্বিধায় হাই কোর্ট-সুপ্রীম কোর্ট বলার আগে ‘মহামান্য’ শব্দটি উচ্চারণ করে থাকেন। গুগুলে সার্চ দিলেও সবখানে হাই কোর্ট ও সুপ্রীম কোর্ট-এর আগে ‘মহামান্য’ লেখা পাওয়া যায়।অধিকন্তু, বাংলাদেশে এমন কোনো গেজেট নেই যেখানে রাষ্ট্রপতি ছাড়া আর কাউকে ‘মহামান্য’ বলা যাবে না।
 
হাই কোর্ট-সুপ্রিম কোর্টকে ‘মহামান্য’ বলার, লেখার এবং গেজেট প্রজ্ঞাপনের প্রমাণ এত বেশি যে, তার জন্য কোনো নজির উপস্থাপনের প্রয়োজন মনে হয় না। যে কেউ ‘মহামান্য হাই কোর্ট বা মহামান্য সুপ্রীম কোর্ট লিখে অনুসন্ধান দিলে তার প্রমাণ পেয়ে যাবেন। তারপরও কেউ যদি মুখের জোরে আর সিনিয়রিটির তোড়ে নিশ্চিত দাবি করে বসেন যে, রাষ্ট্রপতি ছাড়া আর কাউকে ‘মহামান্য’ বলা যায় না- তাহলে আমি বলব, তিনি অনেক জ্ঞানী এবং জ্ঞান আহরণ করতে করতে দৃষ্টিশক্তি এমনভাবে নষ্ট হয়ে গেছে যে, চারিদিকের কিছুই আর দেখতে পান না।

রবীন্দ্রনাথ হিন্দু ছিলেন না

রবীন্দ্রনাথ ধর্মমতে হিন্দু ছিলেন না, ছিলেন ব্রাহ্ম।তাই হিন্দুদের কাছে রবীন্দ্রনাথের পুরো পরিবারই ছিল অস্পৃশ্য। এ কারণে রবীন্দ্রনাথের পিতা মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর কোনো সন্তান-সন্ততির অনুকূলে উঁচু বলে কথিত কোনো হিন্দু পরিবারের সঙ্গে বৈবাহিক সম্পর্ক স্থাপন করতে পারেননি। রবীন্দ্রনাথের পরিবারের বৈবাহিক সম্পর্ক হতো কেবল বঙ্গদেশের নীচ বংশের পিরালি ব্রাহ্মণদের সঙ্গে। রবীন্দ্রনাথের পরিবারকে উচ্চবংশীয় হিন্দুরা, মুসলমানদের চেয়েও বেশি ঘৃণা করত।
 
বর্তমানে যারা রবীন্দ্রনাথকে হিন্দু বলে গর্ব করে, একসময় তারাই তাঁর পরিবারের সঙ্গে বৈবাহিক সম্পর্ক স্থাপনের চেয়ে আইবুড়ো থাকা বা রাখাকে শ্রেয় মনে করত। এ কারণে রবীন্দ্রনাথকে বিবাহ করাতে হয়েছে, তাদের পরিবারের অধস্তন কর্মচারী খুলনার ফুলতলার বেণীমাধব রায় চৌধুরীর কন্যা ভবতারিণীর সঙ্গে।পরে যার নাম রাখা হয়েছে মৃণালিনী দেবী।
 
রবীন্দ্রনাথের মেয়ের ক্ষেত্রেও এমন ঘটেছে। রবীন্দ্রনাথের মেয়ে মীরার বিবাহ দিতে গিয়ে রবীন্দ্রনাথকে প্রচণ্ড আর্থিক কষ্টে পড়তে হয়েছে। কাবুলিওয়ালা গল্পে এর বর্ণনা কিছুটি পাওয়া যায়। মীরার স্বামীর আব্দার মেটাতে গিয়ে হিমশিম খেতে হতো রবীন্দ্রনাথকে। রবীন্দ্রনাথের সামনেই মীরার স্বামী সিগারেট টানতেন, মাতলামি করতেন। তবু রবীন্দ্রনাথ প্রতিবাদ করার সাহস পেতেন না। তিনি ব্রাহ্ম, হিন্দু নন। বাকি সবাই কুসংস্কারে হাবুডুবু খাওয়া ধার্মিক হিন্দু।
 
রবীন্দ্রনাথের বড়ো ভাই উপমহাদেশের প্রথম আইসিএস সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুরের মতো প্রাজ্ঞ ব্যক্তিকেও বিয়ে করার সময় প্রচুর বেগ পেতে হয়েছে। যেসব হিন্দু এখন রবীন্দ্রনাথকে হিন্দু বলে গর্ববোধ করে তাদের বলছি— রবীন্দ্রনাথ হিন্দু ছিলেন না, যেমন নজরুল ছিলেন না মুসলিম।তাঁরা কবি, তাঁরা সাহিত্যিক। অবশ্য জীবনের শেষদিকে এসে রবীন্দ্রনাথ হিন্দু ধর্মের প্রতি অনুরক্ত হয়ে পড়েছিলেন। নজরুল দীর্ঘকাল চেতনাহীন থাকায় এমন কিছু দেখানো সম্ভব হয়নি। সুস্থকালে তিনি মা-কালীর ভক্ত ছিলেন।
 
প্রমিতা ম্যামের ফেসবুক দেওয়াল থেকে।

সরস্বতী

সংস্কৃত ‘সরস্বতী (সরস্‌+বৎ+ঈ)’ শব্দের অর্থ, বিদ্যা ও কলার দেবী, বাণী, বীণাপাণি, ভারত, বাগ্‌দেবী, মহাশ্বেতা, প্রাচীন নদীবিশেষ প্রভৃতি। অর্থ থেকে বোঝা যায় সরস্বতী শব্দের সঙ্গে ‘স্বর ’এবং ‘সতী’ শব্দের সরাসরি সম্পর্ক নাই। সরসবতী শব্দ থেকে (সরসবতী >সরস্বতী) সরস্বতী । সরস্বতী একটি প্রাচীন নদীর নামও বটে। পুরাণমতে, সরস্বতী ও গঙ্গা বিবাদ করে দুজন দুজনকে নদী হওয়ার অভিশাপ প্রদান করেন এবং দুই দেবীই নদীরূপে পৃথিবীতে নেমে আসেন। তাই সরস্বতী, স্রোতস্বতী রূপেও বিরাজমান। সরসবতী বা সরস্বতী বানানের প্রথম অক্ষর স্ব নয়, স।
অনেকে ‘সরস্বতী’ বানান লিখেন ‘স্বরসতী’। ভুল না হওয়ার জন্য একটি নিমোনিক মনে রাখতে পারেন। ‘সর’ মানে সরস। বিদ্যা সবচেয়ে সরস বলে বিদ্যার দেবীও সরস। সরস জিনিস সর-এর মতো উপরে বা আগে থাকে, দুধে সর ভেসে থাকে। এজন্য সরস্বতী বানানের আগে ‘সর’।শেষ অংশ ‘সতী’ হতে অসুবিধা কী? অসুবিধা আছে। কারণ সরস্বতীর সঙ্গে সতীর কোনো সম্পর্ক নেই। বিষয়টি মনে রাখলে সরস্বতী বানানে ভুল হবে না।
উৎস: ব্যাবহারিক প্রমিত বাংলা বানান সমগ্র, পাঞ্জেরী পাবলিকেশন্স লি.

নীরব কেন চক্ষূরোগ

নাই অংশ = নিরংশ, নাই অবলম্বন = নিরবলম্বন, নাই অভিমান = নিরভিমান কিন্তু নাই রব = নীরব এবং চক্ষুর রোগ = চক্ষূরোগ; কিন্তু কেন? কারণ
সন্ধির নিয়মানুসারে ‘র’ পরে থাকলে ই-কার ও উ-কার পরবর্তী বিসর্গ লোপ পায় এবং তার পূর্বস্বর দীর্ঘ হয়। যেমন :
নিঃ+রব = নীরব।
নিঃ+রস = নীরস
নি+রক্ত = নীরক্ত
নিঃ+রব = নীরব
নিঃ+রস = নীরস।
নিঃ+রোগ = নীরোগ।
নিঃ+ রজ = নীরজ
নিঃ+ রক্ত = নীরক্ত।
নিঃ + রত = নীরত।
নিঃ+ রন্ধ্র = নীরন্ধ্র।
চক্ষু+ রোগ = চক্ষূরোগ।
সূত্র: ব্যাবহারিক প্রমিত বাংলা বানান সমগ্র, পাঞ্জেরী পাবলিকেশনন্স লি.।

জরুরি শব্দের প্রমিত বানান/১

অদূর, অদ্ভুত, অদ্যাবধি।
আকাঙ্ক্ষা।
ইতোমধ্যে, ইতঃপূর্বে।
উপর্যুক্ত/উপরিউক্ত, উল্লিখিত।
এতদ্দ্বারা, এতদসংক্রান্ত, এক্ষণে, এক্ষুনি।
কাঙ্ক্ষিত।
চাকরি।চাকুরি।
জারি।
ঝরনা।
দাবি, দ্বন্দ্ব, দূর, দূর-দূরান্ত, দূরত্ব, দূরবীক্ষণ, দূষিত, দূষণ, দূষণীয়, দুর্গা, দুর্গ, দুর্দান্ত, দুরবস্থা, দুরন্ত, দুর্নীতি, দুর্যোগ, দুর্ঘটনা, দুর্নাম, দুর্ভোগ, দুরাকাঙ্ক্ষা, দুর্দিন, দুর্বল, দুর্জয়, দুরারোগ্য, দুরূহ, দুর্বিষহ, দূরীকরণ,।
পথিমধ্যে, পরিষদ, পরিষেবা, পরিষ্কার।
ভস্মীভূত, ভুক্ত, ভুক্তি, ভুল, ভুয়া, ভুবন, ভুতুড়ে, ,ভূমি, ভূত, বহির্ভূত, ভূতপূর্ব, ভূমিকা, ভূমিষ্ঠ, ভূয়সী ।
যথাবিহিত।
সাক্ষী, সাক্ষ্য, সেবা,স্বচ্ছ, সচ্ছল, সুষ্ঠু।

জরুরি শব্দের প্রমিত বানান/২

অধিকন্তু (অধিকিন্তু নয়)।
অপক্ষপাতী (অপক্ষপাতি নয়)।
আগামীকাল (আগামী কাল নয়)।
 
নৈঃশব্দ্য ( নৈঃশব্দ নয়)
নৈঃসঙ্গ্য ( নৈঃসঙ্গ নয় )
ন্যক্কারজনক (ন্যাক্কারজনক নয়)
ন্যূনতম (নূন্যতম নয়)
পক্ব ( পক্ক নয় )
অর্থ
নৈঃসঙ্গ্য বিশেষ্য, অর্থ একাকীত্ব।
নিঃসঙ্গ বিশেষণ, অর্থ একাকী।
নৈঃশব্দ্য বিশেষ্য, অর্থ নীরবতা।
নিঃশব্দ বিশেষণ, অর্থ নীরব।
পক্ব অর্থ পাকা।
সূত্র: ব্যাবহারিক প্রমিত বাংলা বানান সমগ্র, পাঞ্জেরী পাবলিকেশন্স লি.।

প্রয়োজনীয় শব্দের প্রমিত বানান/৩

অক্কা (ফারসি আকা হতে উদ্ভূত অক্কা অর্থ ঈশ্বর, কিন্তু অক্কাপ্রাপ্তি অর্থ মৃত্যু)
অখন-তখন (একটি হাইফেন দিয়ে লিখুন)।অর্থ- মুমূর্ষূ অবস্থাপ্রাপ্ত।মরো-মরো। এখন-তখন শব্দের আঞ্চলিক রূপ।
অগস্ত্যযাত্রা (অগস্তযাত্রা লিখবেন না।)।
অন্তস্তল (অন্তর+তল্‌ ) অন্তস্থল নয়। অন্তরের অন্তস্তল।
আবিষ্কার ( ই-কার থাকলে মূর্ধন্য-ষ হবে। যেমন: পরিষ্কার, বহিষ্কার।)
উপলক্ষ্য, উপলক্ষ্যে ( লিখবেন না : উপলক্ষ, উপলক্ষে)। [লক্ষ্য থেকে উপলক্ষ্য, লক্ষ থেকে উপলক্ষ হয় না।]
ঘুস ( লিখবেন না : ঘুষ)। ২০১৬ খ্রিষ্টাব্দের আগে ছিল: ঘুষ।
ধরন (লিখবেন না : ধরণ)।
ধারণ (লিখবেন না : ধারন)।
ধরণি (লিখবেন না : ধরণী)।
পটোল (লিখবেন না : পটল)। ২০১৬ খ্রিষ্টাব্দের আগে ছিল: পটল।
পরিবহণ (লিখবেন না : পরিবহন) [ণত্ববিধি অনুযায়ী : পরিবহণ]
ব্যাবহারিক ( লিখবেন না : ব্যবহারিক) [ব্যবহার+ ইক= ব্যাবহারিক।]
—————————————————————————-
সূত্র: ব্যাবহারিক প্রমিত বাংলা বানান সমগ্র, ড. মোহাম্মদ আমীন, পাঞ্জেরী পাবলিকেশন্স লি.।
শুবাচের বিভিন্ন লেখা দেখার জন্য ক্লিক করতে পারেন:

প্রয়োজনীয় শব্দের প্রমিত বানান/৪

অন্তঃসত্তা অর্থ — আত্মা, আমি; কিন্তু অন্তঃসত্ত্বা অর্থ —গর্ভবতী।
 
আলো করা ( উজ্জ্বল করা), কিন্তু আলোকরা(উজ্জ্বলকারী)।
 
এক কথা ( যে কথার নড়চড় হয় না), কিন্তু একবাক্যে (এক কথায়, বিনা প্রতিবাদে), একনজরে(এক পলকে), বাক্যহারা (নির্বাক, শান্ত)।
 
অন্তরঙ্গ (অন্‌তরংগো) অর্থ — আত্মীয়, বন্ধু, অভ্যন্থরস্থ অঙ্গ, ঘনিষ্ঠ; কিন্তু অন্তরজ্ঞ(অন্‌তরগ্‌গোঁ) অর্থ — অন্তর্যামী, দূরদর্শী, বিশেষজ্ঞ প্রভৃতি।
 
অন্তস্তল শব্দের অর্থ — মনোমধ্যে, মন, হৃদয় প্রভৃতি।এই অর্থ প্রকাশে ‘অন্তস্থল’ লেখা ভুল। অতএব অন্তস্থল লিখবেন না।
 
এতদ্বারা (এত+দ্বারা) ভুল, শুদ্ধ হচ্ছে এতদ্দ্বারা (এতদ্+দ্বারা)।
 
অন্তরীক্ষ নয়, অন্তরিক্ষ (আকাশ) লিখুন।
 
অন্তরীণ নয়, অন্তরিন (গৃহবন্দি) লিখুন।[অন্তরিন ইংরেজি intern হতে উদ্ভূত বিদেশি শব্দ]
 
এক কুড়ি (বিশটি), কিন্তু একহালি(চারটি)।
 
এক নলা (গ্রাস; এক নলা ভাত), কিন্তু একনলা (এক নলবিশিষ্ট)।
 
দুকুল (পিতার বংশ ও মাতার বংশ), কিন্তু দুকূল (দুই তীর), দু-কূল (রেশমি কাপড়)
 
সে ভাবে (সে চিন্তা করে), কিন্তু সেভাবে ( সেরূপে, সেরকম)।

বিসিএস বাংলা সাধারণ জ্ঞান:

বিসিএস-সহ গুরুত্বপূর্ণ চাকরির পরীক্ষায় আসা গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের উত্তর/৫

১২১। What Bengal thinks today, the rest of India thinks tomorrow– এ বিখ্যাত উক্তিটি করেছেন: গোপালকৃষ্ণ গোখলে (মে ৯, ১৮৬৬ – ফেব্রুয়ারি ১৯, ১৯১৫)।গোপালকৃষ্ণ গোখলে ছিলেন ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের প্রথমদিকের স্বনামধন্য রাজনৈতিক নেতা এবং খ্যাতিমান সমাজ সংস্কারক। ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের এ প্রবীণ নেতা সার্ভেন্টস অফ ইন্ডিয়া সোসাইটির প্রতিষ্ঠাতা।
১২২. দারিদ্রতা শব্দটি অশুদ্ধ – প্রত্যয়জনিত কারণে। পুরোনো চাল ভাতে বাড়ে- এটি একটি প্রবচন।
১২৩, বাংলা সাহিত্যের ‘রসরাজ’ কে? উত্তর : নাট্যকার অমৃতলাল বসু ( ১৮৫৩-১৯২৯)।
১২৪. নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর অনুরোধে নজরুল যে কবিতাটি লিখেছিলেন তার নাম : কাণ্ডারী হুঁশিয়ার।
১২৫. রবীন্দ্রনাথের রাজনীতিক উপন্যাসটির নাম : গোরা।
উত্তম পুরুষের উদাহরণ – আমি, আমরা, আমাদের, আমাদিগকে।
১২৬. দিনের আলো ও সন্ধ্যার আঁধারে মিলন – গোধূলি।
১২৭. যা দীপ্তি পাচ্ছে – দেদীপ্যমান।
১২৮.ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ সম্পাদিত পত্রিকার নাম ছিল: আঙুর।
১২৯. দেশি শব্দ – চাল, চুলা।
১৩০. সন্ধি শব্দের বিপরীত শব্দ – বিয়োগ।

দেয়া বনাম দেওয়া: দেওয়া অর্থে দেয়া লেখা সংগত কি না

ড. মোহাম্মদ আমীন
অভিধানমতে, ‘দেয়া’ শব্দের অর্থ দেওয়া (give) নয়, ‘দেয়া’ শব্দের অর্থ মেঘ, আকাশ প্রভৃতি। কিন্তু প্রয়োগমতে, দেওয়া শব্দের অর্থ হিসেবে দেয়া হরদম ব্যবহার হচ্ছে বাংলাভাষীর মুখে আর কলমে।
রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন :
“ছায়া ঘনাইছে বনে বনে,গগনে গগনে ডাকে দেয়া।
কবে নবঘন-বরিষণে, গোপনে গোপনে এলি কেয়া।”
কাজী নজরুল ইসলাম লিখেছেন:
“রিম্ ঝিম্ রিম্‌ঝিম্‌ ঘন দেয়া বরষে
কাজরি নাচিয়া চল, পুর-নারী হরষে।”
ফররুখ আহমদ লিখেছেন:
“নদীতে নাই খেয়া যে,
ডাকল দূরে দেয়া যে।”
বাক্যে ক্রিয়া হিসেবে ব্যবহৃত ‘দেওয়া’ শব্দের অর্থ হচ্ছে : give, কোনোকিছু প্রদান করা, উপহার প্রদান প্রভৃতি। যেমন: তাকে একটি বই দেওয়া হলো। আঞ্চলিক বা কথ্য ভাষায় ‘দেওয়া’ অর্থে ‘দেয়া’ শব্দের ব্যবহার করা হয়। অভিধানে প্রদত্ত অর্থ বিবেচনা করলে প্রমিত রীতিতে ‘দেওয়া’ অর্থে ‘দেয়া’ লেখা সংগত নয়। কোনোকিছু বহন করা বা গ্রহণ করা, ক্রয় করা প্রভৃতি অর্থ প্রকাশে ‘নেওয়া’ শব্দটি ব্যবহৃত হয়। যেমন : আমার কিছু বই নেওয়া দরকার। বিমানের টিকেট নেওয়া হলো। অন্যদিকে ‘নেয়া’ হচ্ছে ‘নেওয়া’ শব্দের আঞ্চলিক রূপ, যা প্রমিত রীতিতে ব্যবহার করা অসংগত।
দেওয়া ও নেওয়া অর্থে যথাক্রমে দেয়া ও নেয়া শব্দের বহুল ব্যবহার লক্ষণীয়। এখন প্রশ্ন হচ্ছে দেওয়া অর্থে দেয়া শব্দে ব্যবহার সংগত কি না। আঞ্চলিক বা ধ্বনি বিপর্যয়ের কারণে দেওয়া ও নেওয়া থকে যথাক্রমে দেয়া ও নেয়া শব্দের সৃষ্টি। অনেকে বলেন ‘নেয়া’ হচ্ছে ‘নেওয়া’ শব্দের আঞ্চলিক রূপ, যা প্রমিত রীতিতে ব্যবহার করা অসংগত।
অসংগত হলেও চলিত রীতিতে—-

কল্পবিজ্ঞানীর গল্প

ভারতীয় নাগরিক এসকে পান্ডে সুস্মান বিজ্ঞানে অক্সফোর্ড থেকে ডিগ্রি নিয়ে এসে বানালেন অত্যাধুনিক স্যাটেলাইট। আর আমাদের বিজ্ঞানী জাফর ইকবাল ক্যলিফোর্নিয়া ইউনিভার্সিটি অব টেকনোলজিতে থেকে ডিগ্রি নিয়ে দেশে এসে বানালেন “ভূতের বাচ্চা সোলাইমান”। ভারতীয় বিজ্ঞানী এপিজে আবদুল কালাম বানান ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র, আর আমাদের বিজ্ঞানী জাফর ইকবাল বানান ভূতস্ত্র।
 
শ্রীলংকার নাগরিক এমএনএস বর্ধনে পাতওয়ারি অক্সফোর্ড থেকে কম্পিউটার শিখে দেশে এসে লিখেন— ঘরে বসে মহাবিশ্বের যেকোনো বিন্দুর দূরত্ব ও অবস্থান নির্ণয়কারী সফ্‌টওয়্যার; আর আমাদের বিজ্ঞানী জাফর ইকবাল লিখেন— হাজার বছর আগের পৌরাণিক রূপকথার লেখকদের লেখা হতে নেওয়া কল্পকাহিনি।
 
যদি সত্য কথা বলি, তো অনেকে বলেন মেয়েটা বেয়াদব। বেয়াদব বলুন আর যাই বলুন; বাংলাদেশে অক্সফোর্ড ফেরত এমন বিজ্ঞানী প্রয়োজন যিনি এপিজে আবদুল কালামের মতো ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র বানান, ভূতের লেখক হওয়ার জন্য অক্সফোর্ড-হার্ভাড যেতে হয় না।

বাক্যে নাই নেই নি-এর প্রয়োগনীতি সমগ্র

( Mohammed Amin, Taher AlmahdiAb Chhiddiq)
 
একসময় (২০১৬ খ্রিষ্টাব্দের পূর্বেও) বাংলা একাডেমির নীতি ছিল: “ক্রিয়াপদের সঙ্গে ‘না, নাই ইত্যাদি ‘না-বাচক’ শব্দ যুক্ত হলে তা
পৃথক বসবে। যেমন: যাব না, খাব না, পাব না, হাসি না, দেখি নাই, বলি নাই, দেখি না, মারি না।” ‘নেই’ শব্দের চলিতরূপ ‘নি’। আনন্দবাজার অনুসৃত বাংলা বানান বিধিতে ক্রিয়াপদের সঙ্গে ‘নেই’ শব্দের চলিত রূপ ‘নি’ সংশ্লিষ্ট শব্দের সঙ্গে সেঁটে বসানোর পক্ষে বলা হয়েছে । কিন্তু বাংলা একাডেমী পৃথক বসানোর পক্ষে।
২০১৬ খ্রিষ্টাব্দের পূর্ব পর্যন্ত বাংলা একাডেমীর এ নীতি বহাল ছিল। হঠাৎ একদিন বাংলা একাডেমির নজর পড়ল আনন্দবাজার অনুসৃত নীতির দিকে। সঙ্গে সঙ্গে বাংলা একাডেমি ‘নি’-কে শব্দের সঙ্গে সেঁটে লেখার ফরমান জারি করে দিল। যেমন: খাননি, দেননি, পাননি, বলিনি, খেলিনি ইত্যাদি।
না ও নি লেখার আধুনিক প্রমিত নিয়ম: না-বাচক ‘না’ এবং ‘নি’ এর প্রথমটি (না) স্বতন্ত্র এবং দ্বিতীয়টি (নি) সমাসবদ্ধ পদ হিসেবে ব্যবহৃত হবে। যেমন : করি না, কিন্তু করিনি।
এছাড়া শব্দের পূর্বে না-বাচক উপসর্গ ‘না’ উত্তরপদের সঙ্গে যুক্ত থাকবে। যেমন: নাবালক, নাহক, নারাজ ইত্যাদি। অর্থ পরিস্ফুট করার জন্য কোনো কোনো ক্ষেত্রে প্রয়োজন অনুভূত হলে ‘না’ এর পরে হাইফেন ব্যবহার করা যাবে। যেমন : না-গোনা পাখি, না-বলা বাণী, না-শোনা কথা। (বাংলা একাডেমি প্রমিত বাংলা বানানের নিয়ম। সংস্করণ -২০১৬ খ্রি.)।
অতএব, এখন প্রমিত হলো: খাননি, যাননি, বসেননি, বলেননি, করেননি, দেখেননি, চাননি, পাননি, বলিনি, করিসনি। কিন্তু ‘নাই’ হলে লিখতে হবে: লিখি নাই, করি নাই, বলি নাই, দেখি নাই, যাই নাই, দেখ নাই, লেখ নাই, করিস নাই, বলিস নাই ইত্যাদি।
———————————————————————
বাকি লেখকগণের অংশ দেখার জন্য নিচের সংযোগ:

বঙ্কিমসাহিত্যে মুসলিম সম্প্রদায়

সাম্প্রদায়িক, উগ্রবাদী, মুসলিম বিদ্বেষী প্রভৃতি হিসেবে বঙ্কিমচন্দ্রের যতই সমালোচনা করা হোক না কেন, তিনি তাঁর লেখায় পরম সাহসিকতা ও গভীর নিষ্ঠার সঙ্গে ঊনবিংশ শতকের মুসলিম সম্প্রদায়ের চেতনা এবং আর্থসামাজিক অবস্থার প্রকৃত চিত্রই কেবল তুলে ধরেছেন। একই সঙ্গে তুলে ধরেছেন মুসলিম সম্প্রদায়ের প্রতি হিন্দু সম্প্রদায়ের দৃষ্টিভঙ্গির অতলতা। তখনকার মুসলিম সম্প্রদায়ের সার্বিক অবস্থার এত নিখুঁত ও সত্যগ্রাহ্য বিবরণ আর কোথাও পাওয়া যায় না। লজ্জার হলেও এটি অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই। সত্য কথা নিখুঁতভাবে তুলে ধরার জন্য তাঁকে গালি দিতে পারি, কিন্তু ইতিহাসের ইতিকথা পরিবর্তন করতে পারি না।
বঙ্গাব্দ পঞ্জিকা বর্ষের প্রবর্তক
অনেকে বলেন প্রথম বাঙালি সম্রাট ও প্রথম স্বাধীন বাংলা নৃপতি শশাঙ্ক (রাজত্ব: ৫৯০ খ্রি. – ৬২৫ খ্রি.) বঙ্গাব্দ বর্ষপঞ্জির জনক। আবার অনেকে মনে করেন, ৩য় মোঘল সম্রাট আকবর (রাজত্ব: ১১ ফেব্রুয়ারি ১৫৫৬ – ২৭ অক্টোবর ১৬০৫) বঙ্গাব্দ বর্ষপঞ্জির জনক।
বলা হয়, ইরানীয় জ্যোতির্বিজ্ঞানীআমির ফতুল্লাহ শিরাজির সহায়তায় আকবর এই বর্ষপঞ্জি প্রবর্তন করেন।যদি সম্রাট আকবর বঙ্গাব্দ বর্ষপঞ্জির প্রবর্তক হয়ে থাকেন, তাহলে বঙ্গাব্দের মাসগুলোর নাম ভারতীয় পুরাণ প্রভাবিত কেন? কেন প্রচলিত বঙ্গাব্দ, শশাঙ্ককালীন বর্ষপঞ্জির অনুরূপ মাস-নাম ধারণ করে?
[ অপ্রাসঙ্গিক মন্তব্য করবেন না। জনশ্রুতিনির্ভর মন্তব্যও করবেন না। ]

দরিদ্র, দরিদ্রতা, দারিদ্র্য, দীন দীনতা, দৈন্য

ড. মোহাম্মদ আমীন
সংস্কৃত দরিদ্র (√দরিদ্রা+অ) অর্থ (বিশেষণে) অভাবগ্রস্ত, দীন। দরিদ্রতা (দরিদ্র+তা) অর্থ (বিশেষ্যে) দারিদ্র্য। দারিদ্র্য (দরিদ্র+য) অর্থ (বিশেষ্য) দরিদ্রতা, দীনতা, দরিদ্র অবস্থা; অভাব।
দরিদ্র শব্দের সঙ্গে -ত ও -য প্রত্যয় যুক্ত হলে বিশেষ্য হিসেবে যথাক্রমে দরিদ্রতাদারিদ্র্য গঠন হয়। অনুরূপভাবে গঠিত হয় দীনতা (দীন+তা) ও দৈন্য (দীন+য)। দরিদ্রতা, দীনতা, দারিদ্র্য ও দৈন্য সমার্থক।
কোনো বিশেষণ প্রত্যয় যুক্ত করে একবার বিশেষ্য করলে তার সঙ্গে প্রত্যয় যুক্ত করে পুনরায় বিশেষণ করা বাহুল্য। তাই য-প্রত্যয় যুক্ত দারিদ্র্য শব্দের সঙ্গে পুনরায় তা প্রত্যয় যুক্ত করে দারিদ্র্যতা তৈরি ব্যাকরণসম্মত নয়।
দরিদ্রের বিশেষ্য হিসেবে লিখুন দরিদ্রতা অথবা দারিদ্র্য। দীন থেকে সৃষ্ট বিশেষ্য হিসেবে লিখুন দীনতা অথবা দৈন্য। য-প্রত্যয় যুক্ত হয়ে গঠিত দৈন্য শব্দের সঙ্গে পুনরায় প্রত্যয় যুক্ত করা বৈধ নয়। একটা পশু কয়বার জবাই কর যায়?
প্রয়োগ: হে দারিদ্র্য তুমি মোরে করেছ মহান (নজরুল)।
২. এই দীনতা ক্ষমা করো প্রভু (রবীন্দ্রনাথ)।
৩. দরিদ্রতা ভয়ংকর অভিশাপ।
৪. দৈন্য জীবনকে ধন্যহীন করে দেয়।
৫. দরিদ্র লোকটি সাহায্য চাইছে।
৬. দীনে দয়া করো।
দারিদ্র্য সহযোগে গঠিত শব্দ: দারিদ্র্যপীড়িত, দারিদ্র্যমোচন, দারিদ্র্যসীমা।
দরিদ্র শব্দের স্ত্রীবাচক: দরিদ্রা।
দীন শব্দের স্ত্রীবাচক: দীনা।
ব্যাকরণ: য-প্রত্যয় যুক্ত হলে শব্দের শেষ বর্ণে সাধারণত য-ফলা হয় এবং প্রথম বর্ণে অ/আ থাকলে আ-কার; ই/ঈ থাকলে ঐ-কার এবং উ/ঊ থাকলে ঔ-কার হয়।। যেমন:
দরিদ্র+য= দারিদ্র্য।
দীন+য= দৈন্য।
কুলীন+য= কৌলিন্য।

আগুনকে বহ্নি বলা হয় কেন?

ড. মোহাম্মদ আমীন
একটি শব্দের অনেকগুলো প্রতিশব্দ থাকতে পারে। প্রত্যেকটি প্রতিশব্দ মূল শব্দটির বাচ্যার্থের অসংখ্য বৈশিষ্ট্যের এক বা একাধিক বৈশিষ্ট্যকে নির্দেশ করে নির্মাণ করা হয়। আগুনে যেসব আহুতি দেওয়া হয় অগ্নি তা বহন করে দেবতাদের কাছে নিয়ে যায়। তাই অগ্নি বা আগুনের অপর নাম বহ্নি।
বায়ু-যুক্ত হলে অগ্নি প্রাণবন্ত হয়, প্রাণ পায়। তাই তার আরেক নাম বায়ুসখ— বায়ু সখা যার। কৃপীটযোনি অগ্নির আরেক নাম। আগে কাষ্ঠে কাষ্ঠ ঘষে আগুন জ্বালানো হতো। তাই আগুনের আরেক নাম কৃপীটযোনি— কৃপীট (কাষ্ঠে) যোনি (জন্মস্থান) যার; কাঠে যার জন্ম।
অগ্নি নাম হলো কেন? অগ্নি অর্থ — যা ঊর্ধ্বদিকে গমন করে। অগ্নির আরেক প্রতিশব্দ তনুনপাৎ; যার অর্থ তনুকে পতিত করে না যে। অর্থাৎ যা নিচু দিয়ে যায় না তাই তনুনপাৎ বা অগ্নি। অগ্নির দাহিকা শক্তি আছে। তাই তাকে দহন ও জ্বলন নামেও ডাকা হয়। উজ্জ্বল বলে তার আরেক নাম বিভাবসু এবং সুন্দর ও কিরণদায়ক বলে অগ্নির আরেক প্রতিশব্দ চিত্রভানু।
 
শুবাচ গ্রুপের লিংক: www.draminbd.com

উৎপত্তি বনাম ব্যুৎপত্তি

সংস্কৃত উৎপত্তি (উৎ+√পদ্‌+তি) অর্থ— (বিশেষ্যে) উৎস, উদ্ভব, শুরু, জন্ম, সূচনা, প্রকাশ, অভ্যুদয়। যেমন:
বিশ্বের উৎপত্তি, প্রাণের উৎপত্তি, পানির উৎপত্তি, মানুষের উৎপত্তি, ভাষার উৎপত্তি, রাষ্ট্রের উৎপত্তি, বিজ্ঞানের উৎপত্তি, ধর্মের উৎপত্তি, বাংলাদেশের উৎপত্তি, সাগরের উৎপত্তি; অগ্নিপরীক্ষা কথার উৎপত্তি, ব্যাকরণের প্রভৃতি।
ব্যুৎপত্তি মূলত একটি ব্যাকরণিক শব্দ।বাংলা একাডেমি আধুনিক বাংলা অভিধান মতে ব্যুৎপত্তি (বি+উদ্‌+√পদ্‌+তি) অর্থ (ব্যা.) প্রকৃতি-প্রত্যয়াদি বিশ্লেষণদ্বারা শব্দের গঠনবিচার’; যেমন:
অগ্নিপরীক্ষা শব্দের ব্যুৎপত্তি— [স. অগ্নি+পরীক্ষা]’;
ব্যুৎপত্তি শব্দের ব্যুৎপত্তি—[স. বি+উদ্‌+√পদ্‌+তি];
প্রত্যেক শব্দের ব্যুৎপত্তি— [স. প্রতি+এক];
ব্যূহ শব্দের ব্যুৎপত্তি— [স. √বি+ঊহ্‌+অ]।
মনে রাখুন, য-ফলা পরের বিষয়। ভাষার উৎপত্তির পর শব্দের ব্যুৎপত্তি। তাই উৎপত্তিতে য-ফলা নেই, ব্যুৎপত্তিতে আছে।
সূত্র: কোথায় কী লিখবেন বাংলা বানান: প্রয়োগ ও অপপ্রয়োগ, ড. মোহাম্মদ আমীন, পাঞ্জেরী পাবলিকেশন্স লি.

লেখালেখি নয়, লেখালিখি।

পড়াশুনা ও পড়াশোনা দুটোই লিখতে পারেন। পড়াশুনা শব্দটি পড়াশোনা শব্দের সাধু রূপ।

বাংলা একাডেমি আধুনিক বাংলা অভিধান।

না কি বনাম নাকি

না কি: কিছু জানার বা ব্যাখ্যা চাওয়ার প্রশ্নে না কি লিখুন।বাক্যে এটি অর্থবহ পদ। যেমন:
১. তুমি এখন কক্সবাজার না কি চট্টগ্রাম?
২. কাঁঠাল না কি আনারস?
৩. তুমি না কি আমি?
ওপরের বাক্যসমূহ (১ ২ ৩) থেকে না কি তুলে নিলে বাক্যের অর্থ পরিবর্তন হয়ে যাবে।
নাকি: নাকি আলংকারিক পদ। প্রকৃতপক্ষে বাক্যে এর কোনো অর্থ থাকে না। তাই নাকি শব্দটি বাক্য হতে তুলে নিলেও অর্থের পরিবর্তন ঘটে না।যেমন:
৪. সে নাকি বিদেশ যাবে।
৫. তুমি নাকি আমার সঙ্গে যাবে না?
৬. তার ভাই নাকি পরীক্ষায় প্রথম হয়েছে।
৪ ৫ ও ৬ নং বাক্য থেকে নাকি তুলে নিলেও বাক্যের অর্থের পরিবর্তন হবে না।
এই সাধারণ নিয়মগুলো মনে রাখলে আশা করি আর ভুল হবে না।

অপভ্রংশ

অপভ্রংশ হলো— মধ্য ইন্দো-আর্য ভাষার অর্থাৎ প্রাকৃত ও পালি ভাষার পরবর্তী ধাপ। অন্যভাবে বলা যায়— মধ্যভারতীয় আর্যভাষা পালি-প্রাকৃতের শেষ স্তর হলো অপভ্রংশ। ‘অপশব্দ’ বা ‘অপভ্রষ্ট’ শব্দ থেকে অপভ্রংশ শব্দের উদ্ভব।
 
সংস্কৃত ব্যাকরণবিদ পতঞ্জলির মহাভাষ্য গ্রন্থে সর্বপ্রথম ‘অপভ্রংশ’ শব্দটির উল্লেখ পাওয়া যায়। তিনি সংস্কৃত থেকে উদ্ভূত কিছু অশিষ্ট শব্দকে নির্দেশ করার জন্য অপভ্রংশ শব্দটি ব্যবহার করেছিলেন। পতঞ্জলি যাকে অপভ্রংশ বলতেন, বর্তমানে তা পালি ও প্রাকৃত ভাষা নামে পরিচিত।
সকল প্রাকৃত ভাষারই শেষস্তর অপভ্রংশ, যা থেকে বিভিন্ন নব্যভারতীয় আর্যভাষার উৎপত্তি হয়েছে। এই মতবাদ অনুযায়ী পূর্বভারতে প্রচলিত মাগধী প্রাকৃত থেকে পূর্বী অপভ্রংশ আর তা থেকে ভোজপুরি, মগহী ও মৈথিলী— এ তিন বিহারি ভাষা এবং বাংলা, অসমিয়া ও উড়িয়া— এ তিন গৌড়ীয় ভাষার উদ্ভব ঘটে। অন্যদিকে, পশ্চিমা শৌরসেনী অপভ্রংশ থেকে সৃষ্টি হয়— হিন্দি প্রভৃতি ভাষা। অপভ্রংশ ভাষার কাল আনুমানিক খ্রিষ্টপূর্ব থেকে খ্রিষ্টীয় ১৭শ অব্দ। এই ভাষা নিম্নশ্রেণির বলে কথিত লোকদের মধ্যে প্রচলিত ছিল।
 
অপভ্রংশ ভাষার অধিকাংশ গ্রন্থই জৈনদের দ্বারা রচিত। তাঁরা বিভিন্ন চরিতকাব্য, নীতিকাব্য, কথানক কাব্য, এমনকি জৈনদর্শন পর্যন্ত অপভ্রংশ ভাষায় রচনা করেছেন। চরিতকাব্যের মধ্যে সর্বাপেক্ষা প্রাচীন স্বয়ম্ভূদেবের (৭ম/৮ম শতক) পউমচরিউ। এতে ৫৬টি সন্ধি এবং ১২,০০০ শ্লোকে রামচন্দ্রের কাহিনি বর্ণিত হয়েছে। এ ছাড়া আরও কয়েকটি উল্লেখযোগ্য চরিতকাব্য হলো: ধাহিলের (বা দাহিলের) পউমসিরিচরিউ (১০ম শতক), পুষ্পদন্তের (১০ম শতক) মহাপুরাণ, জসহরচরিউ ও নয়কুমারচরিউ, হরিভদ্রের নেমিণাহচরিউ (১১৫৯ খ্রি), পদ্মকীর্তির পার্শ্বপুরাণ (১৪শ শতক) ইত্যাদি। মহাভারতের কৃষ্ণ-বলরাম এবং কুরু-পাণ্ডবের কাহিনি অবলম্বনে রচিত আরেকটি উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ হলো ধবলকবির হরিবংশপুরাণ।
 
জৈনদের এ গ্রন্থাবলি পশ্চিমী ও দক্ষিণী অপভ্রংশে রচিত। পূর্বী অপভ্রংশে যাঁরা সাহিত্যচর্চা করেছেন তাঁরা ছিলেন মূলত বাঙালি বৌদ্ধ। তাঁদের মধ্যে কাহ্নপা (৭ম শতক), সরহপা (১০ম শতক) প্রমুখ অন্যতম। কাহ্নপা ও সরহপার দোঁহাকোষ সাধনসংকেতমূলক গ্রন্থ। এটি উপদেশাত্মক হলেও এতে প্রভূত কবিত্বশক্তির নিদর্শন আছে। ডাকার্ণবতন্ত্রও এ শ্রেণির গ্রন্থ। এঁরাই প্রথম কবিতায় অন্ত্যমিল বা অন্ত্যানুপ্রাসের প্রচলন করেন এবং এ থেকেই দেশীয় ভাষার ছন্দে মিলের উদ্ভব ঘটে। পিঙ্গলাচার্যের (আনু. ১৪শ শতক) প্রাকৃতপৈঙ্গল এবং বৈষ্ণব কবি বিদ্যাপতির (১৫শ শতক) কীর্তিলতা পূর্বী অপভ্রংশের আরও দুটি উৎকৃষ্ট গ্রন্থ। প্রাকৃতপৈঙ্গলে মাত্রাবৃত্ত ও বর্ণবৃত্ত উভয় জাতীয় ছন্দেরই আলোচনা আছে। পিঙ্গল উদাহরণসহ যেসব ছন্দের আলোচনা করেছেন সে সবের মধ্যে মাত্রাবৃত্তে গাহা, বিগ্গাহা, উগ্গাহা, দোঁহা, রোলা, ছপ্পঅ, কববলক্খণ, দোঅই (দ্বিপদী) প্রভৃতি এবং বর্ণবৃত্তে পঞ্চাল, মন্দর, মালতী, মল্লিকা, রূপমালা, তোটক, চাসর, চ্চচরী প্রভৃতি উল্লেখযোগ্য।

দিন ও দিন

বাংলা একাডেমি আধুনিক বাংলা অভিধানে ‘দিন’ শব্দের দুটি ভিন্ন ভুক্তি দেখা যায়। প্রথম ভুক্তিমতে, বাক্যে বিশেষ্য হিসেবে ব্যবহৃত সংস্কৃত ‘দিন(√দো+ইন্)’ অর্থ— সূর্যোদয় থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত সময়, দিবস, দিবা। চব্বিশ ঘণ্টাকাল, অহোরাত্র। আয়ু (দিন ফুরিয়ে এল)। জ্যোতি (চন্দ্রকলার তিথি)। সময়, কাল (দুর্দিন, সুদিন)। দীন বানানের একটি শব্দও আছে। এ বিষয়ে জানতে চাইলে দেখতে পারেন: দিন, দীন আর দ্বীন।
দ্বিতীয় ভুক্তিমতে, বাক্যে বিশেষ্য হিসেবে ব্যবহৃত আরবি ‘দিন’ অর্থ ধর্ম (দিনদার)। ‘দিন’ শব্দের আর একটি অর্থ আছে। সেটি হলো দেওয়া। কেবল বাক্যে প্রযুক্ত হলে ‘দিন’ শব্দের এ অর্থ দৃশ্যমান হয়। যেমন: ঢোল মার্কায় ভোট দিন। লোকটিকে কিছু টাকা দিন। দিন, ভাই কিছু চাল, ভাত খায়নি কতকাল।দেশটাকে উন্নতি হতে দিন।
দিন শব্দটি অন্য বাক্যের আগে যুক্ত হয়ে নানা অর্থ প্রকাশ করে। যেমন: কতদিন, সুদিন, নিশিদিন, রাতদিন, প্রতিদিন প্রভৃতি।
সূত্র: ব্যাবহারিক প্রমিত বাংলা বানান সমগ্র, ড. মোহাম্মদ আমীন, পাঞ্জেরী পাবলিকেশন্স লি.।

ফোন এর বাংলা

জনাব বন্ধন দাসগুপ্তজানতে চেয়েছেন,“ফোন এর বাংলা কী?”
উত্তর: ফোন গ্রিক শব্দ। এর বাংলা (বিশেষ্যে) তারের সাহায্যে বা বেতারে দূরবর্তী কারো সঙ্গে কথা বলার সরঞ্জাম, দূরালাপনী, দূরভাষ, টেলিফোন, দূরকথন, দূরালাপ।
সূত্র: বাংলা একাডেমি আধুনিক বাংলা অভিধান।
২. নিমোনিক প্রমিত বাংলা বানান অভিধান, ড. মোহাম্মদ আমীন।

সাহেব

সাহেব শব্দটি সম্ভ্রান্ত ব্যক্তি, মহাশয়, কর্তা, প্রভু, ইউরোপীয়, ইংরেজ, ক্ষমতাবান প্রভৃতি। বাংলা একাডেমি আধুনিক বাংলা অভিধানমতে, আরবি উদ্ভূত সাহেব অর্থ (বিশেষ্যে) সম্ভ্রান্ত ব্যক্তি, মহাশয়, শ্বেতাঙ্গ পুরুষ।
‘সাহেব’ মূলত আরবি ‘সাহব’ থেকে উদ্ভূত। তবে আরব থেকে শব্দটি সরাসরি বাংলায় আসেনি। ইরান হয়ে ইরানের ভাষা-নাগরিকত্ব গ্রহণ করে ইরানিদের মাধ্যমে ফারসি হয়ে বাংলায় এসেছে।
আরবি ‘সাহব’ শব্দের অর্থ— সহচর, সঙ্গী বা সাথি। আরবিতে এ ‘সাহব’ শব্দ থেকে তৈরি হয়েছে ‘সাহাবি’। বাংলা ‘সাহেব’ ও আরবি ‘সাহব/সাহাবি’ শব্দ সম্পর্কের দিক থেকে অভিন্ন হলেও দেশভেদে দুটোর অর্থের বিশাল ব্যবধান লক্ষ করা যায়। বাংলার ‘সাহেব’ কখনো আরবি ‘সাহবে’ এর মতো মানুষের সঙ্গী বা সাথি হতে পারেনি। ইরানি কায়দায় বাংলা ‘সাহেব’ প্রথমে হয়েছে প্রভু, তারপর হয়েছে সম্ভ্রান্ত মুসলমান বা মুসলমান ভদ্রলোক এবং আরও পরে হয়েছে ইউরোপ বা আমেরিকান সাদা চামড়ার অভিজাত। বর্তমানে যেকোনো ক্ষমতাবান ব্যক্তিই ‘সাহেব’। এত পরিবর্তনের পরও ‘সাহেব’ কিন্তু তার পুরো চরিত্র অবিকল রেখে দিয়েছে— হয়তো প্রভাবের জোরে।
সূত্র: বাংলা শব্দের পৌরাণিক উৎস, ড. মোহাম্মদ আমীন, পুথিনিলয়, বাংলাবাজার, ঢাকা।

বাংলায় দেশি শব্দের সংখ্যা

ড. মুহাম্মদ এনামুল হকের মতে বাংলা ভাষার ২৫% শব্দ তৎসম, ৫% শব্দ অর্ধ-তৎসম, ৬০% শব্দ তদ্ভব, ৮% শব্দ বিদেশি এবং মাত্র ২% শব্দ দেশি। অর্থাৎ বাংলা ভাষায় বাংলাদেশি (দেশি) শব্দ মাত্র ২%। অভিধানভূক্ত প্রায় ১,২০,০০০ শব্দের মধ্যে দেশি শব্দ পাওয়া যেতে পারে ২,৪০০। একজন বাঙালি যদি প্রতিদিন একশ শব্দ ব্যবহার করেন তন্মধ্যে দেশি শব্দ থাকার সম্ভাবনা মাত্র দুটি।

ড. মুহম্মদ এনামুল হক ১৯০২ খ্রিষ্টাব্দের ২০শে সেপ্টেম্বর চট্টগ্রামেরফটিকছড়ি থানার (বর্তমান উপজেলা) বখতপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ১৯২৯ খ্রিষ্টাব্দে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলায় এমএ পরীক্ষায় প্রথম শ্রেণিতে প্রথম স্থান অধিকার করে স্বর্ণপদক লাভ করেন।
১৯৭৩ খ্রিষ্টাব্দে তাঁকে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের সার্বক্ষণিক সদস্য করা হয়। ১৯৭৫ খ্রিষ্টাব্দে তিনি জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হন। ১৯৮১ খ্রিষ্টাব্দে তিনি ঢাকা জাদুঘরে আমৃত্যু সিনিয়র রিসার্চ ফেলো পদে যোগ দেন।
 
আরাকান রাজসভায় বাঙ্গালা সাহিত্য (গবেষণামূলক, আব্দুল করিম সাহিত্যবিশারদের সঙ্গে যৌথভাবে রচিত), ১৯৩৫; চট্টগ্রামী বাংলার রহস্য ভেদ, মুসলিম বাংলা সাহিত্য, মণীষামঞ্জুষা প্রভৃতি তাঁর উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ।
 
তিনি ১৯৬২ খ্রিষ্টাব্দে ‘সিতারা-ই-ইমতিয়াজ’ খেতাব; ১৯৬৪ খ্রিষ্টাব্দে বাংলা একাডেমী পুরস্কার; ১৯৬৬ খ্রিষ্টাব্দে প্রেসিডেন্ট পুরস্কার; ১৯৭৯ খ্রিষ্টাব্দে একুশে পদক; ১৯৮০ খ্রিষ্টাব্দে শেরে বাংলা সাহিত্য পুরস্কার; ১৯৮১ খ্রিষ্টাব্দে মুক্তধারা ও আব্দুল হাই সাহিত্য পুরস্কারে ভূষিত হন। বাংলা একাডেমি তাঁর নামে ‘মুহম্মদ এনামুল হক সাহিত্য পদক’ প্রচলন করে।
[*বাংলা একাডেমী এখন বাংলা একাডেমি]
——————————–
সূত্র: বাংলা সাহিত্য ও ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস, ড. মোহাম্মদ আমীন, আগামী প্রকাশনী, বাংলাবাজার, ঢাকা।

জিহাদ

অভিধানমতে, আরবি জিহাদ অর্থ (বিশেষ্যে) সত্য ও ন্যায় প্রতিষ্ঠার লড়াই, ধর্ম রক্ষার নামে অন্যায় যুদ্ধ, crusade (ক্রুসেড)।
জিহাদ শব্দের অর্থ নিয়ে অনেকে জানতে চেয়েছেন— একটি শব্দ একই সঙ্গে বিপীরত অর্থ ধারণ করতে পারে কি না। পারে। পৃথিবীর বিভিন্ন ভাষায় এরূপ অনেক শব্দ আছে। শব্দের অর্থ নির্ভর করে বাক্যের ওপর। সোনা মানে একটি স্বর্ণ, কিন্তু সোনার বাংলা মানে বাংলাদেশ, আমার লক্ষি সোনা মানে স্বর্ণ নয় আদুরে খোকা।
একটি শব্দের একাধিক অর্থ থাকতে পারে এবং তা বিপরীতার্থকও হতে পারে। যেমন অপরূপ অর্থ অতি সুন্দর, সুশ্রী, মনোহর। আবার অপরূপ অর্থ অপ বা খারাপ রূপ, কুশ্রী, কুৎসিত, কদর্য। তেমনি জিহাদ শব্দের একাধিক অর্থ রয়েছে। পাকিস্তানিরা ধর্ম রক্ষার নামে বাংলাদেশ ও বাংলাদেশিদের ওপর যা করেছে তা কোনো বিবেচনায় ন্যায় রক্ষার যুদ্ধ ছিল না।
অহংকার একটি খারাপ শব্দ, কিন্তু যখন বলা হয় আমার দেশ আমার অহংকার। আমার ভাষা আমার অহংকার, তখন এটি আর খারাপ থাকে না। গর্ব করা ভালো নয়, কিন্তু দেশের জন্য গর্ব, মেধাবী প্রিয়জনের জন্য গর্ব খারাপ বিষয় নয়। পড়া মানে শুধু বই পড়া বোঝায় না, আগুনে পড়াও বুঝায়, প্রেমে পড়াও বোঝায়। কালো সাধারণভাবে কুৎসিত, কিন্তু কালো চুল সৌন্দর্যের প্রতীক। অস্ত্র কারো হাতে শাস্তির বিষয়। আবার দেশের নিরাপত্তা বাহিনী, প্রতিরক্ষা বাহিনী অস্ত্র নিয়ে ঘুরে বেড়ায়। হাজার হাজার কোটি টাকা ব্যয় করে অস্ত্রে, অস্ত্র সংগ্রহে।
শব্দের অর্থ মূলত ব্যবহার, উদ্দেশ্য ও বাক্যের গঠন প্রভৃতির ওপর নির্ভর করে। আগ্নেয়াস্ত্রের স্বরূপ ও প্রকৃতি নির্ধারণ করে তার প্রয়োগ। তেমনি শব্দও। এজন্য শব্দকে বলা হয় ব্রহ্ম। ‘আমার ছেলেটা খুব দুষ্ট হয়েছে, খুব শয়তানি করে’ এক ভাব, কিন্তু যখন অন্য কাউকে এমন বলা হবে – তখন কী হবে? অধিকন্তু কারও কাছে যা ন্যায় তা অন্যের কাছে চরম অন্যায়ের বিষয় হতে পারে।
প্রত্যেকে কেবল তার চেতনা বিবেচনায় কোনো বিষয়ে সিদ্ধান্তে আসার চেষ্টা করে। এজন্য অভিধানে একটি শব্দের যত ব্যবহার হতে পার তার সবগুলো সম্ভাব্য অর্থ দেওয়া থাকে। ক্রুসেড এক পক্ষের জন্য ন্যায় অন্য পক্ষের জন্য অন্যায় হিসেবে চিহ্নিত ছিল। সবাই স্ববিবেচনায় ন্যায়ের যুক্তি এনে ন্যায়ের জন্য যুদ্ধ করে, যদিও অন্য পক্ষের জন্য তা অন্যায় বা জুলুম।

পারিভাষিক শব্দ

বাংলা ভাষায় ব্যবহৃত কতগুলো বিদেশি শব্দের সরাসরি কোনো প্রতিশব্দ না থাকায় ওই শব্দগুলোকে প্রকাশের জন্য যেসব বাংলা শব্দ ব্যবহার করা হয়, সেগুলোকে পারিভাষিক শব্দ বলে। ‘পরিভাষা’ শব্দটি ইংরেজি ‘Terminology’ শব্দের প্রতিশব্দ। তবে পরিভাষা শব্দের আক্ষরিক অর্থ হলো ‘বিশেষ ভাষা’। বাংলা ভাষায় প্রচলিত বিদেশি শব্দের ভাবানুবাদমূলক প্রতিশব্দকে পারিভাষিক শব্দ বলা হয়। অর্থাৎ, কোনো ভাষায় বিশেষ অর্থে ব্যবহারযোগ্য শব্দই পারিভাষিক শব্দ।মূল শব্দের মৌলিক অর্থ ও ভাবের সঙ্গে সংগতি রক্ষা করে এক ভাষার শব্দকে অন্য ভাষায় রূপান্তরিত করে যে অবয়ব প্রদান করা হয় তাকে পরিভাষা বলে এবং শব্দটিকে বলা হয় পারিভাষিক শব্দ। যেমন: ইংরেজি ‘Linguistics’ শব্দের বাংলা ভাবানুবাদমূলক প্রতিশব্দ— ‘ভাষাবিজ্ঞান’, Cabinet শব্দের বাংলা পরিভাষা মন্ত্রিপরিষদ।
বাংলা ভাষা ব্যবহারকারী প্রত্যেক ব্যক্তি দৈনন্দিন জীবনে অনেক পারিভাষিক শব্দ ব্যবহার করে থাকে। যেমন: Nurse – সেবিকা, Map – মানচিত্র, Notice – বিজ্ঞপ্তি, File – নথি, Pension – অবসরকালীন ভাতা, Volcano – আগ্নেয়গিরি ইত্যাদি।
রাজশেখর বসু চলন্তিকা অভিধানে বলেছেন, “যে শব্দের দ্বারা সংক্ষেপে কোনও বিষয় সুনির্দিষ্টভাবে ব্যক্ত করা যায় তা পরিভাষা—- সাধারণত ‘পরিভাষা’ বললে এমন শব্দ বা শব্দাবলি বোঝায় যার অর্থ পণ্ডিতগণের সম্মতিতে স্থিরীকৃত হয়েছে এবং যা দর্শন বিজ্ঞানাদির আলোচনায় প্রয়োগ করলে অর্থবোধে সংশয় ঘটে না।”
পরিভাষা বনাম শব্দ
পরিভাষা ও শব্দের মধ্যে কিছু পার্থক্য রয়েছে। যেমন: পরিভাষা দ্বারা বিশেষায়িত ক্ষেত্রের বৈশিষ্ট্যজ্ঞাপক ধারণার নাম বোঝায়, পক্ষান্তরে শব্দ দ্বারা ভাষার ব্যবহৃত যে-কোনো অর্থবোধক ধ্বনি বা ধ্বনিসমষ্টিকে বোঝায়। মূলত পারিভাষিক শব্দগুলো জ্ঞান-বিজ্ঞানের সুনির্দিষ্ট অর্থে ব্যবহৃত হয়ে থাকে। তাই সব পারিভাষিক শব্দই সাধারণ শব্দ, কিন্তু সব শব্দই পারিভাষিক শব্দ নয়।
পারিভাষিক শব্দ বনাম বিদেশি শব্দ
পারিভাষিক শব্দ হলো বিশেষ শাস্ত্রের বা শাস্ত্রবিষয়ক মূল শব্দের ভাবানুবাদমূলক প্রতিশব্দ, যার দ্বারা বিষয়টি সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়। বিদেশি শব্দ হলো কোনো ভাষার মূল শব্দ, যেটি অপরিবর্তিত বা আংশিক ভিন্ন অবস্থায় অন্য ভাষাতে পাওয়া যায়। যেমন: আনারস, আল্লাহ্, চা, চিনি এগুলো আমাদের ভাষায় অপরিবর্তিতভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে। আবার ‘botany’, ‘cartoon’, ‘capital’ এসব শব্দের বাংলা করা হয়েছে উদ্ভিদবিদ্যা, ব্যঙ্গচিত্র, মূলধন বা রাজধানী— এগুলো পারিভাষিক শব্দ।

কে কখন আলাদা ও কখন পৃথক বসে?

“আপনাকে যেতে বলেছে কে?” এই বাক্যে প্রথম কে, বিভক্তি এবং দ্বিতীয় কে, সর্বনাম। কে কে দেশের জন্য জীবনকে উৎসর্গ করতে চাও?” এই বাক্যে কে কে সর্বনাম এবং জীবন-এর সঙ্গে যুক্ত কে বিভক্তি। অনুরূপ: তাকেকে এখানে আসতে বলেছে?
নিমোনিক:
(১) সর্বনাম হিসেবে ব্যবহৃত হলে কে আলাদা বসে। যেমন: তোমার বাবা কে তা আমি জানতাম না। এখানে কে শব্দটি সর্বনাম হিসেবে ব্যবহৃত হওয়ায় বাবা থেকে পৃথক বসেছে।
সাধারণত প্রশ্নবোধক বাক্যে কে শব্দটিকে পূর্ববর্তী শব্দ থেকে ফাঁক রেখে লেখার বহুল প্রয়োগ লক্ষণীয়। যেমন: আপনি কে? তোমরা কে কে যাবে? তুমি কে?
(২) প্রশ্নবোধক হোক বা না হোক বিভক্তি হিসেবে ব্যবহৃত হলে -কে পূর্ব শব্দের সঙ্গে সেঁটে বসে। যেমন: আপনাকে যেতে হবে। তোমাকে আমার চাই। মা, আমাকে ডাকছ? দেশকে ভালোবাস, জাতিকে সেবা দাও। মামাকে দেখতে যাবে না হাসপাতালে? আপাকে ডাকব?
সূত্র: নিমোনিক প্রমিত বাংলা বানান অভিধান, ড. মোহাম্মদ আমীন।

পাকিস্তান, আফগানিস্তান, হিন্দুস্থান

‘স্তান’ ফারসি শব্দ এবং ‘স্থান’ সংস্কৃত শব্দ। পাক-ই-স্তান = পাকিস্তান এবং আফগান-ই-স্তান = আফগানিস্তান। তাই উৎস বিবেচনায় এই দুই শব্দের বানানে ‘স্থান’ লেখা সমীচীন নয়। যদিও শব্দের ব্যবহার, প্রয়োগ, প্রচলন বা জনপ্রিয়তা শব্দের উৎস কিংবা উৎপত্তির ধার ধারে না। অনেকে ‘আফগানিস্থান’ লিখে থাকেন। সৈয়দ মুজতবা আলী ‘বড়বাবু’ গ্রন্থে লিখেছেন, “ইরানের সঙ্গে আফগানিস্থানের মনের মিল নেই, এদিকে তেমনি আফগান পাকিস্তানীতে মন-কষাকষি চলছে।” সৈয়দ মুজতবা আলী কেন ‘পাকিস্তান’ ও ‘আফগানিস্তান’ নামের দুই দেশের নামের বানানে একটিতে ‘স্তান’ এবং অন্যটিতে ‘স্থান’ লিখেছেন তার কোনো ব্যাখ্যা আমার কাছে নেই। যদিও ফারসি ‘স্তান’ এবং সংস্কৃত ‘স্থান’ প্রায় সমার্থক।
সুভাস ভট্টাচার্যের মতে, “তবু ইসলামি দেশনামে ‘স্তান’ লেখাই রীতি এবং হিন্দুস্থান শব্দে ‘স্তান’ লেখা সমীচীন নয়। ‘হিন্দুস্থান’ নামের উর্দু উচ্চারণ ‘হিন্দোস্তাঁ’ হলেও দীর্ঘ কাল ধরে হিন্দুস্থান’ বানানই বাংলায় বহুল প্রচলিত।” হয়তো ‘হিন্দু’ আর ‘স্থান’ শব্দের অভিন্ন উৎসই এর অন্যতম কারণ।

High School অর্থে উচ্চবিদ্যালয় ও উচ্চ বিদ্যালয়: কোনটি প্রমিত?

বাংলা একাডেমি আধুনিক বাংলা অভিধান অনুযায়ী, বাক্যে বিশেষ্য হিসেবে ব্যবহৃত সংস্কৃত ‘উচ্চবিদ্যালয় (উচ্চ+বিদ্যালয়)’ শব্দের অর্থ— যে শিক্ষায়তনে মাধ্যমিক স্তর পর্যন্ত পড়ানো হয়, high school। অর্থাৎ, ইংরেজিতে যেটি high school বাংলায় সেটি উচ্চবিদ্যালয়। এই অর্থ প্রকাশে `উচ্চ’ ও `বিদ্যালয়’ পরস্পর সেঁটে বসানো হয়েছে।

উচ্চ মানে উঁচু। সে হিসেবে ‘উচ্চ বিদ্যালয়’ কথার অর্থ হয়— উঁচুতে অবস্থিত যে বিদ্যালয় বা উঁচুতে অবস্থিত যে শিক্ষায়তন। ‘উচ্চ বিদ্যালয়’ উঁচু স্থানে অবস্থিত বিদ্যালয় হলেও ‘উচ্চবিদ্যালয়’ প্রকৃতপক্ষে উঁচুতে অবস্থিত বিদ্যালয় নয়।

বাংলা একাডেমির ওই অভিধানে ইংরেজি high school অর্থে একমাত্র ‘উচ্চবিদ্যালয়’ বানানকে প্রমিত নির্দেশ করেছে। তাই high school অর্থে ‘উচ্চবিদ্যালয়’ বানানটিই একমাত্র প্রমিত।

প্রসঙ্গত, বাংলা একাডেমি আধুনিক বাংলা অভিধানে ‘উচ্চ বিদ্যালয়’ বানানের কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পাওয়া যায় না। এখানে পাওয়া যায় কেবল ‘উচ্চবিদ্যালয়’। অথচ পুরো দেশ উচ্চ বিদ্যালয়ে সয়লাব। কোথায় যাব আমরা? কী লিখব— ‘উচ্চ বিদ্যালয়’ না কি ‘উচ্চবিদ্যালয়’?
বলুন তো বাংলা একাডেমি?
————————————————————————-
সূত্র: বাংলা একাডেমি আধুনিক বাংলা অভিধান, পরিবর্ধিত ও পরিমার্জিত সংস্করণের তৃতীয় পুনর্মুদ্রণ: পুনর্মুদ্রণ উপবিভাগ, বৈশাখ ১৪২৫/ এপ্রিল ২০১৮।পৃষ্ঠা : ১৯০

অতৎসম চীনা অসংগত নয়, অতৎসম ঈদ অসংগত হবে কেন

চিনা না কি চীনা? চিনদেশ না কি চীনদেশ? বাংলা একাডেমি আধুনিক বাংলা অভিধান এবং অন্যান্য আরও অনেক অভিধানমতে চীন সংস্কৃত শব্দ। তবে, শব্দটির আদি উৎস বা মূল সংস্কৃত ছিল না। গবেষণায় দেখা যায়— শব্দটি আনুমানিক আড়াই হাজার বছর আগে চায়না থেকে সংস্কৃত ভাষায় ঢুকে সংস্কৃত ভাষার শব্দের ন্যায় সংস্কৃতে অঙ্গীভূত/একীভূত হয়ে গেছে। ফলে তা সংস্কৃত শব্দ গণ্যে সংস্কৃত ব্যাকরণের অনুগত হয়ে পড়ে।
বলা হয়— শব্দটি সংস্কৃতে যখন আসে তখনই চীন নামে প্রতিবর্ণীকৃত হয়। প্রাচীন সংস্কৃত গ্রন্থেও শব্দটির বানান ঈ-কার দিয়ে চীন লেখা— এমন দেখা যায়। মনুসংহিতা এবং মহাভারতে শব্দটির বানান করা হয়েছে চীনা। সংস্কৃতে মিহি পশমি বস্ত্রকে চীনাংশুক বলা হতো। চীনাংশুক আসত চীন থেকে, তাই এমন নাম।
প্রাচীনকালে চীনদেশের রেশম বিশ্বখ্যাত ছিল। সিল্করুট তার ঐতিহাসিক প্রমাণ। অংশুক অর্থ আঁশযুক্ত তন্তু। অংশু অর্থ সূর্য, সূর্যের কিরণ। অতি মমৃণ বলে চীনা তন্তুকে সূর্যের কিরণের সঙ্গে তুলনা করা হতো। তাই সূর্য কিরণের মসৃণতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে চীনাংশুক শব্দটির উদ্ভব। অংশুক শব্দের সঙ্গে চীন সন্ধিবদ্ধ হয়ে গঠন করে চীনাংশুক (=চীন+অংশুক)।
এবার দেখা যাক, আমাদের কাছে বাংলা বানানে চীনদেশ নামে পরিচিত দেশটির নাম চিন হলো কী করে। বিখ্যাত চৈনিক ভাষাবিদ থান য়ুন শানের মতে, নামটি এসেছে তৎকালীন বর্তমান মূল চীনের একটি করদ রাজ্য থেকে। স্থানীয় ভাষায় করদ রাজ্যটির নাম ছিল চিন। চৌ বংশের রাজত্বকালে চিন নামের করদ রাজ্যটি শক্তিশালী হয়ে আশেপাশের অন্যান্য রাজ্যগুলো একে একে জয় করে খ্রিষ্টপূর্ব অষ্টম শতকের প্রথমে বিশাল এক রাজ্যের নিয়ন্ত্রক হয়ে যায়।
প্রাক্তন এই অঙ্গরাজ্য থেকে পুরো দেশের নাম রাখা হয় চিন বা জিং। সে হিসেবে নামটির বানান চিন হওয়াই ছিল সমীচীন। কিন্তু সংস্কৃতে অঙ্গীভূত করার সময় প্রতিবর্ণীকরণে চীন লেখা হয়।
বাংলা একাডেমি আধুনিক বাংলা অভিধানে চীন বানানের পৃথক কোনো ভুক্তি নেই। তবে চীনা ভুক্তিতে বলা হয়েছে এটি অতৎসম- – -।
সূত্র:
১. আধুনিক চীন, শান, থান য়ুন, প্রকাশক: কলকাতা, বিশ্বভারতী গ্রন্থালয়।
২. বাংলা একাডেমি আধুনিক বাংলা অভিধান, প্রকাশক বাংলা একাডেমি।

ডাকাতের মতো বুক যার: ডাকাবুকা ও ডাকাবুকো

ডাকাবুকাডাকাবুকো সমার্থক। ডাকাবুকো হচ্ছে ডাকাবুকা শব্দের কথ্য রূপ। বলা হয়, সাহস থাকে বুকে। মানুষের মধ্যে ডাকাতি পেশায় নিয়োজিতদের বলা হতো দুর্দান্ত সাহসী। সাহসী ও শক্তিশালী লোকরা ডাকাতি করত। বুকে দুর্বার সাহস না থাকলে ডাকাতি করা যায় না। সেই অনুষঙ্গে ডাকাত ও বুক শব্দের মিলনে ডাকাবুকা শব্দের সৃষ্টি হয়েছে। যার আক্ষরিক অর্থ : ডাকাতের বুক, ডাকাতের মতো বুক। যার বুকের সাহস বা বুকের পাটা ডাকাতের মতো তাকে বলা হতো ডাকাবুকা বা ডাকাবুকো।
 
বাংলা একাডেমি আধুনিক বাংলা অভিধানমতে, বাক্যে বিশেষ্য হিসেবে ব্যবহৃত ডাকাবুকা অর্থ ডাকাতের মতো অসম সাহসী, নির্ভীক, অকুতোভয়।
 
শব্দটির উৎসকালে কাউকে ডাকাবুকা বা ডাকাবুকো হতে হলে তার বুকের পাটা বা সাহাস ডাকাতের মতো হতে হতো।অধুনা শব্দটি এই নেতিবাচক বিবেচনায় ব্যবহার করা হয় না। এখন যাদের ডাকাবুকো বা ডাকাবুকা বলা হয় তারা ডাকাত নয়, অসম সাহসী, নির্ভীক এবং অকুতোভয়।

যেমন: আমার পিতামহ আহমদ হোসেন বীরপ্রতীক ছিলেন এক প্রচণ্ড ডাকাবুকো বীর।

ক্রীড়মান কিন্তু ক্রিয়মাণ, ক্রমমাণ ও ভ্রাম্যমাণ কেন?

বানানে মূর্ধন্য-ণ আসার কারণ হলো র-ফলা।
একই পদের মধ্যে প্রথমে ঋ ঋৃ র ষ-এর পরে যদি স্বরবর্ণ, ক-বর্গ, প-বর্গ, য-ব-হ এবং অনুস্বারের ব্যবধান থাকে তাহলে পরবর্তী ন, ণ হয়ে যায়। যেমন: অপেক্ষমাণ, ভ্রাম্যমাণ, বক্ষ্যমাণ, রুক্মিণী, স্পৃহণীয়, ম্রিয়মাণ, ক্রিয়মাণ, ভ্রমণ।
 
 

বাংলা ভাষার আদিগ্রন্থ

হরপ্রসাদ শাস্ত্রী ও দীনেশচন্দ্র সেনের মতে ‘ডাকার্ণব’ বাংলা ভাষার আদিগ্রন্থ।তিব্বতি ভাষায় ডাকার্ণব মানে জ্ঞানসাগর। এটি কৃষি, জ্যোতিষশাস্ত্র, গণস্বাস্থ্য এবং প্রাত্যহিক জীবন সংক্রান্ত প্রাজ্ঞিক-বচনাদিতে সমৃদ্ধ একটি অমূল্য গ্রন্থ। এখানে আবহাওয়াবার্তা, কৃষি, ফল ও ফসল, পশুপালন, গণস্বাস্থ্য, জ্যোতিষশাস্ত্র, বর্ষফল, যাত্রালগ্ন, বিধিনিষেধ, পরমায়ুগণনা, নারীর লক্ষণ, গর্ভস্থ সন্তান, প্রশ্নগণনা প্রভৃতিবিষয়ক শ্লোক রয়েছে। ডাকার্ণব গ্রন্থটি ডাকের বচনের সমাহার।
১. বাংলার লোকসংস্কৃতির বিশ্বকোষ, দুলাল চৌধুরী, আকাদেমি অব ফোকলোর, কলকাতা: ৭০০০৯৪, প্রথম প্রকাশ:২০০৪, পৃষ্ঠা: ২৫৫-২৫৬।
২. Maria Edward Leach (ed), Standard Dictionary of Mythology, Folklore and Legends, Vols. I, II, New York, 1949;
৩. বাংলাপিডিয়া।

ডাকের বচন/১

ড. মোহাম্মদ আমীন
এটি একটি ডাকের বচন। এর অর্থ:আদর্শ গৃহের পূর্বে থাকবে জলাশয়; পশ্চিমে থাকবে গাছ-গাছালি, উত্তরে থাকবে সুরক্ষার বন্দোবস্ত এবং দক্ষিণে থাকবে খোলামেলা। এসব বৈশিষ্ট্যপূর্ণ বাড়িই আদর্শ বাড়ি। গ্রাম বাংলায় ঘর বাড়ি তৈরি করার সময় এখনো ডাকের এই প্রবচনটি সাধ্যমতো অনুসরণ করা হয়। কথিত হয়, ডাককে স্বয়ং বিধাতা এই উপদেশটি দিয়েছিলেন।বচনটি অসমিয়া ও বাংলা উভয় ভাষায় বিদ্যমান।
ডাক নামের ব্যক্তিটি কে?
ডাক পুরুষ নামে খ্যাত ডাক প্রাচীন বাংলার একজন বচনকার। খ্রিষ্টীয় অষ্টম থেকে একাদশ শতক পর্যন্ত উত্তর ভারতে খনার বচনের চেয়েও ডাকের বচন অধিক জনপ্রিয় ছিল।প্রচলিত মত ও কয়েকজন গবেষকের অভিমত, ডাক ছিলেন একজন গোপ। স্বর্গধামে গমন করে স্বর্গ থেকে প্রয়োজনীয় উপদেশ এবং জ্ঞান নিয়ে পুনরায় পৃথিবীতে ফেরত আসতেন বলে তাঁর অপর নাম ‘ডাক পুরুষ’। অসমিয়া সাহিত্যে বুরুঞ্জি লেখকের মতে, মহাপ্রাজ্ঞ হিসেবে খ্যাত ডাক, উত্তর-পূর্ব ভারতের কামরূপ জেলার বরপেটা মহকুমার অন্তর্গত লোহি ডাঙ্গরা নামক গ্রামে বসবাস করতেন। বাংলা ভাষার আদিগ্রন্থ ডাকার্ণব তার বচন নিয়ে রচিত। ডাকার্ণব অর্থ তিব্বতি ভাষায় জ্ঞানের সাগর, বাংলায় ডাক-এর সাগর।
বাকি অংশ দেখার জন্য ক্লিক করতে পারেন নিচের সংযোগে:

শুভদৃষ্টি রুসুমাত

রুসুমাত আরবি হতে আগত। বাক্যে বিশেষ্যে হিসেবে ব্যবহৃত রুসুমাত শব্দের অর্থ (মুসলমানদের বিবাহ অনুষ্ঠানে) বর-কনের প্রথম পরস্পর মুখ দেখার সংস্কার; শুভদৃষ্টি।অর্থাৎ শুভদৃষ্টি ও রুসুমাত পরস্পর সমার্থক।
সূত্র: বাংলা একাডেমি আধুনিক বাংলা অভিধান, পৃষ্ঠা: ১১৮৫
বাকি অংশ এবং অন্যান্য প্রশ্নের উত্তর দেখার জন্য নিচের লিংক

সাতটি প্রশ্ন

১. শহর আর নগর কি একই ?
২. প্রাচ্যের ডান্ডি বলা হয়— নারায়ণগঞ্জ। ‘ডান্ডি’ কী?
৩. ধীবরের দেশ— নরওয়ে। ‘ধীবর’ মানে কী?
৪. ম্যাপল পাতার দেশ— কানাডা। ‘ম্যাপল’ কী?
৫. বৃহওম মঠ-তিব্বতের ভুবুং। ‘মঠ’ কী?
৬. ভাটির দেশ— বাংলাদেশ। ‘ভাটি’ কী?
৭. সমুদ্রের বধূ— গ্রেট ব্রিটেন। ‘বধূ’ কী?

প্রশ্নগুলোর উত্তর জানতে চেয়েছেন জনাব SAKIB ANSARI। কিছু অসংগতি ও মুদ্রণপ্রমাদ থাকায় তা শুদ্ধ করে প্রকাশ করা হলো। এখানেও ভুল থাকতে পারে। জানালে বাধিত হব।

কৃতী বনাম কৃতি

 
কৃতি ও কৃতী দুটোই শুদ্ধ, কিন্তু অর্থ ভিন্ন। ‘কৃতী’ বিশেষণ। ‘কৃতি’ বিশেষ্য। কৃতিজনের গুণাবলি প্রকাশে ‘কৃতী’ শব্দ ব্যবহৃত হয়। পক্ষান্তরে, ব্যক্তি প্রশংসাযোগ্য যা করে তা ওই ব্যক্তির ‘কৃতি’ এবং ওই ‘কৃতি’ ব্যক্তিকে প্রকাশের লক্ষ্যে ‘কৃতী’ বিশেষণ ব্যবহার করা হয়।
উদাহরণ: ‘বুদ্ধিবৃত্তির নতুন বিন্যাস’ কৃতী লেখক আহমদ ছফার শ্রেষ্ঠ কৃতি
কৃতিকৃতী দুটোই শুদ্ধ, কিন্তু অর্থ ভিন্ন।
সম্মানিত শুবাচি জনাব তৌহিদ অন্তর কিছুক্ষণ আগে অনবধানতাবশত কৃতি শব্দকে ভুল দেখিয়ে যে পোস্ট দিয়েছেন তা মুছে দেওয়া হলো।
এমন অনিচ্ছাকৃত ভুলের জন্য দুঃখ প্রকাশ করছি।
ধন্যবাদ।

— — — — — — — — — — — — — — — — — — — — — — — — —  — — — — — — — — — — — — — — — — — — — — — — — — — — — —

শুবাচ গ্রুপের লিংক: www.draminbd.com
 
 
 
 
 
— √
All Link: https://draminbd.com/আমি-শুবাচ-থেকে-বলছি-all-link/
 
৪. পোস্টের সংযোগ: https://draminbd.com/আমি-শুবাচ-থেকে-বলছি-শুবাচ-4/
 
৩. পোস্টের সংযোগ https://draminbd.com/আমি-শুবাচ-থেকে-বলছি-শুবাচ-3/

২. পোস্টের সংযোগ: https://draminbd.com/আমি-শুবাচ-থেকে-বলছি-শুবাচ-2/

১. পোস্টের সংযোগ: https://draminbd.com/আমি-শুবাচ-থেকে-বলছি-শুবাচ/

error: Content is protected !!