আমি শুবাচ থেকে বলছি: শুবাচির পোস্ট/যযাতি; মন্তব্য, প্রশ্ন উত্তর বিবিধ ৪

 

ড. মোহাম্মদ আমীন

আমি শুবাচ থেকে বলছি: শুবাচির পোস্ট/যযাতি; মন্তব্য, প্রশ্ন উত্তর বিবিধ ৪

৪. পোস্টের সংযোগ:  https://draminbd.com/আমি-শুবাচ-থেকে-বলছি-শুবাচ-4/

শ্রাগ, শ্রাগ করা

শ্রাগ (Shrug) ইংরেজি শব্দ। ক্যামব্রিজ ইংলিশ ডিকশনারিমতে, Shrug  অর্থ— the  action  of  raising  and  lowering  ones  shoulders  to express something. এমন কাঁধ ঝাঁকানিতে দুই হাতও সাধারণত বিশেষ ভঙ্গিমায় আন্দোলিত হয়ে ওপরে ওঠে আসে। ইমোজিতে ভঙ্গিমাটি দেখুন।
 
বাংলায় শ্রাগ শব্দের  আভিধানিক অর্থ হতে পারে—  কাঁধ ঝাঁকানো, ঝাঁকি দেওয়া। তবে, এর দ্বারা সাধারণ কোনো কাঁধ ঝাঁকানো বোঝায় না। প্রায়োগিক শ্রাগ হলো— কোনো কিছু প্রকাশ করার লক্ষ্যে  দুই কাঁধ ঝাঁকানোর মাধ্যমে করা এক বিশেষ ধরনের রহস্যময় উত্তর প্রদানের বহুল প্রচলিত যোগাযোগীয় অঙ্গভঙ্গি।
 
এর মধ্য দিয়ে ভাষিক বাক্য ছাড়া কেবল অঙ্গভঙ্গির মাধ্যমে কোনো বিষয়ে অনাসক্তি বা কোনো প্রশ্নের উত্তর জানা নেই কিংবা জানা থাকলেও তা স্পষ্ট নয় বা প্রকাশ করা আদৌ সমীচীন হবে না, পরে বলা হবে, উপেক্ষা, এড়িয়ে যাওয়া, রাহস্যিক পরিবেশন প্রভৃতি অনুভূতি বন্ধুতাপূর্ণ উপায়ে প্রকাশ করা হয়।
 
শ্রাগ ভঙ্গিমায় উত্তর দেওয়ার কারণ হতে পারে বিবিধ। যেমন— শ্রোতৃবৃন্দকে রহস্যের আড়ালে রাখা, নিরাপদ উত্তর প্রদান, আত্মপক্ষ সমর্থনের উপায় অবারিত রাখা, ইচ্ছেমতো ব্যাখ্যা প্রদানের সুযোগ, মুদ্রাদোষ, মুখ অন্য কাজে ব্যস্ত থাকা প্রভৃতি। প্রকৃতপক্ষে  শ্রাগ এমন এক বিশেষ যোগাযোগীয় প্রতীক, যা বিশেষ কারণে বিশেষ কিছু প্রকাশের জন্য ভাষা কিংবা মুখের পরিবর্তে প্রয়োগ করা হয়।
 
কোনো প্রশ্ন উপেক্ষা করার সময়ও এটি ব্যবহার করা যেতে পারে। ভ্রু উঁচু করা, মুখ বাঁকানো, কিংবা চমকিত ভ্রু, এবং হাত উঁচু করা ইত্যাদি শ্রাগের সাথে যুক্ত হতে পারে। পাশ্চাত্য সংস্কৃতিতে শ্রাগ এবং শ্রাগ করা বেশ সাধারণ ও অতি পরিচিত একটি অঙ্গভঙ্দি। বাক্যহীন এই অঙ্গভঙ্গি বিভিন্ন চলচ্চিত্রে এবং জনপ্রিয় প্রচার মাধ্যমসমূহেও প্রচুর দেখা যায়।  পাশ্চাত্য সংস্কৃতিতে শ্রাগ বা শ্রাগ করা যোগাযোগের সাধারণ একটি প্রক্রিয়া। 
আশ্রম
 
আশ্রম: আশ্রম হলো  হিন্দুশাস্ত্রানুযায়ী নির্ধারিত মানবজীবনের চারটি স্তর। যথা:  ব্রহ্মচর্য, গার্হস্থ্য, বানপ্রস্থ ও সন্ন্যাস। ‘আশ্রম’ শব্দের আরও ব্যাপক অর্থ ছিল। যেমন, ‘আশ্রম’  শব্দের অন্য একটি বহুল প্রচলিত সাধারণ অর্থ: সংসার-ত্যাগীদের আবাসস্থল, সাধনা বা শাস্ত্রচর্চার কেন্দ্র। মুনি-ঋষিরা সেখানে সপরিবার বসবাস করতেন সেটিও আশ্রম।

ব্রহ্মচর্য আশ্রম: উপনয়নকৃত শিশু-বালক নিয়মনিষ্ঠ হয়ে গুরুগৃহে গিয়ে সেখানে অবস্থানপূর্বক বেদ প্রভৃতি শাস্ত্র অধ্যয়ন করত। এই অধ্যয়ন কালকে বলা হতো ব্রহ্মচর্য

গার্হস্থ্য আশ্রম: অধ্যয়ন সমাপ্ত হলে গুরুর আদেশ অনুযায়ী গার্হস্থ্যশ্রম শুরু হতো। বিবাহ, সন্তান উৎপাদন, পরিজনপোষণ, পালন, সামাজিকতা ইত্যাদি ছিল গার্হস্থ্য আশ্রমের কর্তব্য।
 
বানপ্রস্থ আশ্রম: পরিণত বয়সে গার্হস্থ্যবিষয়ক কর্তব্য সমাপন ও পৌত্রমুখ দর্শনের পর স্ত্রীকে পুত্রের কাছে রেখে কিংবা সঙ্গে নিয়ে বনে গিয়ে ঈশ্বরচিন্তা করার নাম বানপ্রস্থ। বানপ্রস্থকালে পূজার্চনা ছাড়া অতিথিসেবা, ভিক্ষাবৃত্তি ইত্যাদি কর্তব্য পালন করা হতো।
 
সন্ন্যাস আশ্রম: বয়স সত্তরে উপনীত হলে সবকিছু ত্যাগ করে কেবল ঈশ্বর চিন্তায় মগ্ন হওয়ার নাম সন্ন্যাস। এ সময়কে সন্ন্যাস আশ্রম বলা হয়। এই আশ্রমের কর্তব্য কেবল নির্জনে বসে ঈশ্বরচিন্তা করা।
 
চতুরাশ্রম: বর্ণিত চারটি স্তর বা আশ্রমকে একত্রে চতুরাশ্রম বলা হয়। চতুরাশ্রমের মধ্যে গার্হস্থ্যশ্রমকেই শ্রেষ্ঠ মনে করা হয়। কারণ ভিক্ষাজীবী, ব্রহ্মচারী সন্ন্যাসী সকলেই গৃহস্থের ওপর নির্ভরশীল। চতুরাশ্রমের মধ্যে গার্হস্থ্যশ্রমকেই শ্রেষ্ঠ মনে করা হয়। কারণ ভিক্ষাজীবী, ব্রহ্মচারী সন্ন্যাসী সকলেই গৃহস্থের ওপর নির্ভরশীল। গৃহস্থ তর্পণ দ্বারা পিতৃগণের, যজ্ঞ দ্বারা দেবগণের, অন্ন দ্বারা অতিথিগণের, বেদাধ্যয়ন দ্বারা মুনিগণের, অপত্যোৎপাদন দ্বারা প্রজাপতির, বলিকর্ম বা আনুষ্ঠানিক ভোজ্যদ্রব্য দান দ্বারা প্রাণিগণের এবং বাৎসল্য দ্বারা সমস্ত জগতের সন্তোষ বিধান করে থাকে। একমাত্র ব্রাহ্মণই চারটি আশ্রমের অধিকারী। ক্ষত্রিয় ও  বৈশ্য প্রথম তিনটিতে (মতান্তরে প্রথম দুটিতে) এবং  শূদ্র কেবল গার্হস্থ্যশ্রমের অধিকারী। রবীন্দ্রনাথ শান্তিনিকেতন প্রথম বিদ্যাশ্রম প্রথম শুরু করেছিলেন।  

সাধু-সন্ন্যাসী

সাধু: সংস্কৃত সাধু অর্থ (বিশেষেণে) ধার্মিক, ধর্মপরায়ণ, শিষ্ট, মার্জিত (সাধু মন্তব্য), উত্তম, যথাযথ এবং (বিশেষ্যে) ফকির, সন্ন্যাসী, বণিক। কয়েকটি সাধুযুক্ত শব্দ: সাধুগিরি, সাধুতা, সাধুপুরুষ, সাধুবাদ, সাধুভাষা, সাধুশীল, সাধুসংসর্গ, সাধুসঙ্গ, সাধুসন্ত, সাধুসম্মত, সাধু সাধু (বাহবা), সাধু সাবধান (ভবিষ্যৎ বিপদ সম্পর্কে সাবধান থাকার সতর্কবার্তা)।
 
সন্ন্যাস: সন্ন্যাস (সম্‌+নি+√অস্‌+অ) থেকে সন্ন্যাসী (সম্‌+নি+√অস্‌+ইন্‌)। সংস্কৃত ‘সন্ন্যাস’ অর্থ (বিশেষ্য) সংসার ত্যাগ করে ঈশ্বরচিন্তায় মগ্ন বা ধ্যানস্থ থাকার আশ্রম; চতুরাশ্রমের শেষটিকে সন্ন্যাস বলা হয়।
 
সন্ন্যাসী: সংস্কৃত ‘সন্ন্যাসী’ অর্থ (বিশেষ্যে) যে ব্যক্তি সংসার ধর্ম ত্যাগ করে সন্ন্যাস বা চতুর্থ আশ্রম গ্রহণ করেছে।
অভিধার্থ দেখলে মনে হবে, সাধু ও সন্ন্যাসী সমার্থক। আসলে তা নয়, উভয়ের মধ্যে পার্থক্য আছে। সন্ন্যাসী হতে হলে চতুরাশ্রম গ্রহণ অত্যাবশ্যক। কিন্তু সাধু হতে হলে চতুরাশ্রম গ্রহণ বাধ্যতামূলক নয়। সকল সন্ন্যাসীই সাধু, কিন্তু সকল সাধু সন্ন্যাসী নন। মহাত্মা গান্ধী, রবীন্দ্রনাথ ও নজরুলকে সাধু বলা যায়, কিন্তু সন্ন্যাসী বলা যায় না। শ্রীশ্রী রামকৃষ্ণ পরমহংস (১৮৩৬-১৮৮৬ খ্রি.) একই সঙ্গে সাধু ও সন্ন্যাসী।
 
ফলা ও যুক্তবর্ণ
ফলা ও যুক্তবর্ণ এক নয়। প্রকৃতিগতভাবে তাদের পার্থক্য আছে। পরপর দুটি ব্যঞ্জন মাঝখানে কোনো স্বরধ্বনি ছাড়া উচ্চারণ হলে তাকে যুক্ত ব্যঞ্জন বা যুক্তবর্ণ বলে।  যেমন—  বাচ্চা, অস্থিমজ্জা, বাট্টা, অল্প, আহ্লাদ, উল্লাস, ক্লাসিক, স্তব্ধ প্রভৃতি। যুক্তব্যঞ্জন সাধারণত প্রত্যেকটি স্বতন্ত্রভাবে উচ্চারণ হয়। তক্তা, উড্ডয়ন, পদ্ধতি প্রভৃতি। তবে ব্যতিক্রমও আছে। যেমন: আহ্বান (আওভান)।
 
স্বরের সংক্ষিপ্ত রূপ কার চিহ্নের মতো ব্যঞ্জনের সংক্ষিপ্ত রূপকে ফলা বলে। ফলা মোট ছয়টি। এই ফলাগুলোর বিশেষ বৈশিষ্ট্য ও উচ্চারণ বিধি আছে। এগুলো কখনো উচ্চারণ হয়, কখনো হয় না, উচ্চারণ না হলে দুই রকম কাজ করে। যেমন:
(১)  ফলাযুক্ত বর্ণটির উচ্চারণে দ্বিত্ব আনে। উদাহরণ— বিশ্বাস (বিশ্শাষ), আত্মীয় (আত্‌তীয়)।
(২) ফলাযুক্ত মূল বর্ণটি উচ্চারণে ঝোক/স্বরাঘাত দিয়ে থাকে। উদাহরণ— স্বাগতম (শাগতম নয় শা-গতম)। 

গড্ডরিকা প্রবাহ: গড্ডলিকা প্রবাহ

গড্ডর থেকে গড্ডরিকা। গড্ডর অর্থ: ভেড়া। গড্ডরিকা অর্থ অগ্রবর্তী ভেড়াকে অনুসরণকারী ভেড়ার পাল। গড্ডরিকা প্রবাহ অর্থ: অগ্রবর্তী যে ভেড়াকে অন্যান্য ভেড়া অনুসরণ করে। এটি একটি বাগ্‌ধারা। যার প্রায়োগিক অর্থ:বিচারবিবেচনা না করে অন্যের অন্ধ অনুকরণ, স্রোতে গা ভাসিয়ে দেওয়া, প্রচলিত ধারার অনুগামিতা প্রভৃতি।
সমার্থক
গড্ডর-এর সমার্থক গড্ডল
গড্ডরিকা-এর সমার্থক গড্ডলিকা
গড্ডরিকা প্রবাহ-এর সমার্থক গড্ডলিকা প্রবাহ
ভুল
গড্ডালিক, গড্ডালিকা প্রবাহ; গড্ডারিকা ও গড্ডারিকা প্রবাহ প্রভৃতি ভুল।
বাগ্‌ধারাটি কেন?
ভুলশুদ্ধ বিবেচনা না করে যারা গড্ডলিকা প্রবাহ/গড্ডরিকা প্রবাহ কথার পরিবর্তে গড্ডালিকা প্রবাহ/গড্ডারিকা প্রবাহ লিখেন তাদের জন্যই এই বাগ্‌ধারা। বাগ্‌ধারা বানানে গ-য়ে হসন্ত দেবেন। বাংলায় গড্ডালিকা বা গড্ডারিকা বানানের কেনো শুদ্ধ ও অর্থবোধক শব্দ নেই।

আহবান না কি আহ্বান

 
আহ্বান শব্দের ব্যুৎপত্তি= আ+√হ্বে+অন।
উচ্চারণ— আও্ভ.ান।
আহ্বান অর্থ— (বিশেষ্যে) নিমন্ত্রণ, আমন্ত্রণ; সম্বোধন, ডাক। সংস্কৃত আহ্বান শব্দটি হ্বে-ধাতুযোগে গঠিত। আহ্বান= আ+হ্‌+ব্‌+া+ন । সুতরাং, শুদ্ধ বানানে হ্ব (হ্‌+ব) অপরিহার্য।
অতএব, আহবান (আ+হ+ব+.া+ ন) ভুল।
লিখুন: আহ্বান। অনুরূপ: আহ্বায়ক।
রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন—
“ধ্বনিল আহ্বান মধুর গম্ভীর প্রভাত-অম্বর-মাঝে,
দিকে দিগন্তরে ভুবনমন্দিরে শান্তিসংগীত বাজে ॥”
ভূপেন হাজারিকা গেয়েছেন—
“নতুন দিনের আহ্বানে হাজার চোখের আগুনে
বজ্র মাদল গর্জনে পিশাচ তাড়ালে
ও পিশাচ তাড়ালে।”

উদ্যোগ শব্দের উচ্চারণ উদ্‌দোগ না কি উদ্‌জোগ্‌

বাংলায় উদ্যোগ শব্দের দুটি উচ্চারণ শোনা যায়। প্রথমটি — উদ্‌দোগ এবং দ্বিতীয়টি — উদ্‌জোগ। তবে বহুল প্রচলিত উচ্চারণ হচ্ছে— উদ্‌দোগ। প্রসঙ্গত, বাংলা একাডেমি আধুনিক বাংলা অভিধানমতে শব্দটির উচ্চারণ উদ্‌দোগ। ওই অভিধানে উদ্‌জোগ উচ্চারণ দেখানো হয়নি।
যারা উদ্‌যোগ উচ্চারণ করেন তাদের ব্যাখ্যা— উদ্যোগকে সংস্কৃতের মতো ভেঙে লিখলে উদ্‌যোগ রূপে লেখা হয়। সেক্ষেত্রে উচ্চারণ হয়—উদ্‌জোগ। তবে, আমাদের মনে রাখতে হবে, বাংলা সংস্কৃত নয়, সম্পূর্ণ আলাদা ভাষা। তাই, বাংলা শব্দ হিসেবে উদ্যোগ-এর উচ্চারণ উদ্‌দোগ হওয়া সমীচীন।
উদ্যোগ যদি উদ্‌জোগ হয় ; উদ্যম হবে উদ্‌জম্‌ এবং উদ্যান হবে উদ্‌জান্।
সূত্র: ব্যাবহারিক প্রমিত বাংলা বানান সমগ্র, ড. মোহাম্মদ আমীন, পাঞ্জেরী পাবলিকেশন্স লি.

সার্থক ও স্বার্থক নিমোনিক

সংস্কৃত ‘সার্থ (‘স+অর্থ)’ শব্দের অর্থ— (বিশেষণে) তাৎপর্যপূর্ণ, অর্থপূর্ণ, ধনবান; (বিশেষ্যে) বণিকদল। বিশেষ্য হিসেবে ব্যবহৃত সার্থ (√সৃ+থ) শব্দের অর্থ- সঙ্গী, সাথি, সমূহ, পশুর পাল প্রভৃতি।
সংস্কৃত ‘সার্থক (স+অর্থ+কপ্)’ শব্দের অর্থ— সফল, অর্থযুক্ত, সুসম্পাদিত।বিশেষ্য হিসেবে ব্যবহৃত সংস্কৃত ‘স্বার্থ (স্ব+অর্থ) শব্দের অর্থ— নিজ প্রয়োজনের বিবেচনা, নিজের মঙ্গল বা হিত প্রভৃতি।
‘সার্থক’ বানান লিখতে গিয়ে অনেকে লিখেনে ‘স্বার্থক’। ‘স’ আর ‘স্ব’ এর উচ্চারণ অভিন্ন হওয়ার কারণে এমন ভুল হয়। তাই স্মৃতিজাগানিয়া হিসেবে একটি সূত্র ব্যবহার করা যায়।
‘স্ব’ মানে নিজ এবং ‘স’ মানে সহ বা সবার। মনে করুন, ‘স্ব’ কেবল নিজের কল্যাণকে এবং ‘স’ সবার কল্যাণকে নির্দেশ করছে। যে কেবল নিজের কল্যাণ বা ‘স্ব’ নিয়ে ব্যস্ত থাকে সে সফল বা সার্থক হতে পারে না। তাই ‘সফল’ প্রসঙ্গে ‘সার্থক’ লেখার সময় ‘স্ব’ বর্জন করুন, লিখুন সার্থক
 
 আসলে= প্রকৃতপক্ষে, সত্যিকার অর্থে
 
‘এসে পড়লে’ অর্থে ‘আসলে’ লেখা হয় না। এটি ভুল। এই অর্থে ‘এলে’ লেখা হয়। যেমন: “আমাদের গ্রামে এলে কী কী পাবেন জেনে নিন।”
“আমাদের গ্রামে আসলে কী কী পাবেন জেনে নিন।” বাক্যের অর্থ হবে কেবল নিম্নরূপ:
“ আমাদের গ্রামে প্রকৃতপক্ষে কী কী পাবেন জেনে নিন।”
 
 
‘সমীভবন’; কিন্তু ‘বিষমীভবন’ কেন?
সমবাহু শব্দের বিপরীত শব্দ ‘বিসমবাহু’ না হয়ে ‘বিষমবাহু’ হওয়ার কারণ এবং ‘এ’ ধ্বনি ও ‘অ্যা’ ধ্বনি:
ষত্ব-বিধান অনুসারে উপসর্গ সাধিত হওয়ার একটি নিয়মের জন্য সমবাহু শব্দের বিপরীত শব্দ ‘বিসমবাহু’ না হয়ে ‘বিষমবাহু’ হয় । ‘বি’ একটি ‘ই-কারান্ত’ উপসর্গ। অর্থাৎ, এখানে বি= ব্+ই ব্যাকরণিক নিয়মানুসারে ‘ই-কারান্ত’ বা ‘উ-কারান্ত’ উপসর্গের পরে ‘দন্ত্য- স’ থাকলে সেটি পরিবর্তিত হয়ে ‘মূর্ধন্য- ষ’ হয়ে যায়। যেমন: বি+ সমীভবন= বিষমীভবন
বি+সমবাহু = বিষমবাহু।
অভি+সেক = অভিষেক। অনু+সঙ্গ = অনুষঙ্গ।
সু+সম = সুষম।
এজন্য, সমীভবন; কিন্তু বিষমীভবন।
হিসাব ও হিসেব শব্দের অর্থ ও প্রয়োগ
বাংলা একাডেমি আধুনিক বাংলা অভিধানমতে, বাক্যে বিশেষ্য হিসেবে ব্যবহৃত আরবি ‘হিসাব’ শব্দের অর্থ (১) গণনা, সংখ্যাকরণ (২) জমাখরচের বিবরণ, (৩) দর, (৪) কৈফিয়ত এবং (৫) বিচারবিবেচনা।
একই অভিধানমতে, বাক্যে বিশেষ্য হিসেবে ব্যবহৃত ‘হিসেব’ হচ্ছে আরবি ‘হিসাব’ শব্দের কথ্য রূপ। অতএব, উভয় শব্দের অর্থ অভিন্ন। এবার অভিধানে প্রদত্ত অর্থের প্রয়োগ দেখা যাক:
১. হিসাব/ হিসেব (গণনা, সংখ্যাকরণ): সাধু: হিসাব করিয়া দেখিলাম আমার আরও পাঁচ হাজার টাকা লাগিবে। কথ্য : হিসেব করে দেখলাম আমার আরও পাঁচ হাজার টাকা লাগবে। ২. হিসাব/হিসেব (জমাখরচের বিবরণ): সাধু: আমাকে অফিসের হিসাব ঠিক করিয়া বাড়ি যাইতে হইবে। কথ্য: আমাকে অফিসের হিসেব ঠিক করে বাড়ি যেতে হবে। ৩. হিসাব/হিসেব(দর): সাধু: হিসাব করিয়া বাজার করিবে। কথ্য: হিসেব করে বাজার করবে। ৪. হিসাব/হিসেব ( কৈফিয়ত) : সাধু: কর্তৃপক্ষ তাহার কৃতকর্মের হিসাব তলব করিল। কথ্য: কর্তৃপক্ষ তার কৃতকর্মের হিসেব তলব করল।

শনাক্ত না কি সনাক্ত; কোনটি প্রমিত

প্রমিত বানান শনাক্ত। বাংলা একাডেমি থেকে প্রকাশিত সর্বশেষ অভিধান ‘বাংলা একাডেমি আধুনিক বাংলা অভিধান’ গ্রন্থে তাই লেখা আছে। ওই গ্রন্থে সনাক্ত বানানের কোনো শব্দ নেই।
 
 
কৃষিশিক্ষা বইয়ে ব্যবহৃত পিপিএম এর পূর্ণরূপ কী
প্রতি মিলিয়ন ভাগে কত ভাগ বিদ্যমান। যেমন ১ লিটার দ্রবণে কত মিলিগ্রাম দ্রব বা ১ কেজি দ্রবণে কত মিলিগ্রাম দ্রব আছে তাহাই হলো পিপিএম (পার্টস পার মিলিয়ন)।

আরও আরো এবং কারও কারো

আরও’ এবং ‘আরো’ শব্দের বানান ভিন্ন হলেও অর্থ ও প্রয়োগ অভিন্ন। দুটোই শুদ্ধ এবং প্রচলিত। তাই ‘আরও’ বা ‘আরো’ যে কোনোটি লেখা যেতে পারে। তেমনি ‘কারও’ এবং ‘কারো’- উভয় বানানই শুদ্ধ। সুতরাং দুটোই লেখা যায়। কোনো কিছুতে জোর দেওয়ার ক্ষেত্রে ‘ই’ যোগ করতে হলে ‘আরো’ লিখতে হবে ‘আরোই’ এবং ‘আরও’ লিখতে হবে ‘আরোওই’। তেমনি ‘কারো’ লিখতে হবে ‘কারোই’ এবং ‘কারও’ লিখতে হবে ‘কারওই’। সাধারণ বিবেচনায় ‘আরওই’ বা ‘কারওই’ লেখার চেয়ে যেহেতু ‘আরোই’ বা ‘কারোই’ লেখা অধিকতর সুবিধাজনক, তাই ‘আরো’ বা ‘কারো’ লেখাই প্রথম পছন্দের হওয়া উচিত। এজন্য ‘আরও’ বা ‘কারও’-এর চেয়ে ‘আরো’ বা ‘কারো’ বেশি দেখা যায়।
সূত্র: কোথায় কী লিখবেন বাংলা বানান প্রয়োগ ও অপপ্রয়োগ, ড. মোহাম্মদ আমীন, পাঞ্জেরী পাবলিকেশন্স লি.
 
 
নিমোনিক
একশব্দে নিমোনিক (Mnemonic)-এর বাংলা কী হতে পারে?
ড. মোহাম্মদ আমীন স্যার এর বাংলা প্রতিশব্দ করেছেন- স্মৃতিজাগানিয়া।

বিবাহ অর্থ বিশেষরূপে বহন করা

সংস্কৃত বিবাহ (বি+√বহ্+অ) অর্থ (বিশেষ্যে) নারী-পুরুষের স্বামী-স্ত্রী পরিচয়ে একত্র জীবন যাপনের সামাজিক অনুমোদন, বিয়ে, পরিণয়, উদ্‌বাহ, শাদিয়ে মোবারক। বিবাহ শব্দের ব্যুৎপত্তিতে আছে বহ্ ধাতু। বহ্‌ অর্থ বহন করা। বহ্ এর আগে আছে বি। সে হিসেবে বিবাহ শব্দের ব্যুৎপত্তিগত অর্থ বিশেষরূপে বহন করা। পুরাকালে স্ত্রীকে জোরপূর্বক অপহরণ করে বহন করে নিয়ে যাওয়া হতো, অধিকন্তু স্বামীকে আমরণ স্ত্রীর ভরণপোষণ বহন করে যেতে হতো। তাই শাদিয়ে মোবারক মানে বিবাহ। বা বিশেষরূপে/বিশেষভাবে বহন করা। বধূ শব্দের ব্যুৎপত্তিতেও আছে বহ্ ধাতু। বধূ= √বহ্+উ। বধূ শব্দের ব্যুৎপত্তিগত অর্থ যাকে বহন করা যায়, বহনীয়,বহন করার যোগ্য। সুতরাং, এমন কাউকে বিয়ে করা উচিত যে বহনযোগ বা যাকে বহন করা যায়। এটি চিন্তা না করে বহন অযোগ্য কাউকে বিয়ে করলে কপালে খারাবি আছে। এই বহনীয় কথার শর্ত কিন্তু ভার বা ওজন নয়। লাখপতির ছেলে যদি কোটি পতির মেয়ে বিয়ে করে তখন আর বধূ বহনযোগ্য থাকে না। তারপর বয়ে যেতে হয়। ফলে কোমর ভেঙে যায়। অল্প বয়সে শুরু হয় ব্যাক-প্যাইন।আবার অতি হালকা বিয়ে করলেও সমস্য। সেক্ষেত্রে আপনার অবহেলার শিকার হতে পারে সে।
 

উত্তমমধ্যম বনাম প্রহার

‘উত্তমমধ্যম’ শব্দের অর্থ লাঞ্ছনাসহ প্রহার, বিস্তর পিটুনি, প্রচণ্ড প্রহার প্রভৃতি। বস্তুত এ সকল অর্থ প্রকাশে বাগ্‌ধারাটি ব্যবহার করা হয়। উত্তম ও মধ্যম শব্দের মিলনে উত্তমমধ্যম। উত্তম অর্থ ভালো, অত্যন্ত এবং মধ্যম অর্থ মাঝারি। সুতরাং, উত্তমমধ্যম অর্থ: ‘অত্যন্ত ও মাঝারি’। কিন্তু ‘উত্তমমধ্যম’ বাগ্‌ধারার প্রচলিত আভিধানিক অর্থ ‘অত্যন্ত ও মাঝারি’ নয়। অন্যান্য বাগ্‌ধারার ন্যায় এটিও তার বাহ্যিক অর্থ বিসর্জন দিয়ে নতুন অর্থ ধারণ করেছে। সেটি হচ্ছে লাঞ্ছনাসহ প্রহার।
 
কাউকে শুধু প্রহার করলে সেটি উত্তমমধ্যম বলা যাবে না। উত্তমমধ্যম বাগ্‌ধারার প্রকৃত অর্থের পরিস্ফুটন ঘটাতে হলে প্রহারের সঙ্গে অপমান থাকাও প্রয়োজন। (১) শিক্ষক ছাত্রটিকে দুষ্টামি করার জন্য প্রহার করলেন; (২) শিক্ষক ছাত্রটিকে দুষ্টুমি করার জন্য উত্তম-মধ্যম দিলেন। এখানে প্রথম বাক্য প্রকাশ করছে, শিক্ষক ছাত্রটিকে শুধু পিটুনি দিয়েছে এবং তা প্রচণ্ড নয়; কিন্তু দ্বিতীয় বাক্যে প্রকাশ করছে শিক্ষক ছাত্রটিকে শুধু মারেননি, অপমানও করেছেন; মানে মারধর করেছেন। হতে পারে সে অপমান কান ধরে দাঁড়িয়ে রাখা বা অন্যকিছু।
 
তবে প্রচণ্ড প্রহার, বিস্তর পিটুনি অর্থেও ‘উত্তমমধ্যম’ শব্দ প্রয়োগ করা হয়। এর কারণ আছে। প্রচণ্ড পিটুনি দিলে কাপড়চোপড় উলট-পালটসহ বিভিন্নভাবে অপমান এমনিতে ঘটে যায়। বাংলা একাডেমি আধুনিক বাংলা অভিধানমতে, বাংলা উত্তমমধ্যম অর্থ প্রচণ্ড প্রহার, মারধর।

কদর্য= কু+অর্য= কুৎসিত স্বামী

‘কদর্য’ শব্দের আভিধানিক অর্থ: কুৎসিত, বিশ্রী, গর্হিত, অশালীন, পাপময় প্রভৃতি। বাংলা ভাষায কু বা খারাপ অর্থে বিশেষণরূপে কদর্য শব্দটির বহুল ব্যবহার লক্ষণীয়।
‘কদর্য’ শব্দটি সংস্কৃত ভাষা থেকে সরাসির বাংলা ভাষায় প্রবেশ করলেও সে তার মূল সংস্কৃত অর্থ সঙ্গে করে নিয়ে আসতে সক্ষম হয়নি। তবে যে অর্থ এনেছে বা পেয়েছে তা মূল অর্থের সঙ্গে সঙ্গতিহীন এমনটি বলা যাবে না।
‘কু’ মানে কুৎসিত এবং ‘অর্য’ মনে স্বামী। সুতরাং, সংস্কৃতে কদর্য শব্দের অর্থ কুৎসিত স্বামী। তবে এ কুৎসিত কেবল শারীরিক নয়। যেসব স্বামী তার স্ত্রী-পুত্রকে নিপীড়ন করে ধনসঞ্চয় করত সংস্কৃতে তাদেরই কদর্য বলা হতো।
তবে বাংলা ভাষায় ‘কদর্য’ বলতে এখন শুধু স্বামী বোঝায় না। স্বামী হোক বা পিতা হোক কিংবা ছেলে হোক বা শালা হোক যা কিছু কুৎসিত, বেমানান, অশালীন, বিরূপতার পরিচায়ক, ঘৃণ্যময় সবটাই কদর্য।
বাকি অংশ: পায়খানা: পেছনের ঘর ও অন্যান্য।

পুরস্কার বানানে স কিন্তু পরিষ্কার বানানে ষ কেন?

ব্যতিক্রান্ত ক্ষেত্রসমূহ ব্যতীত অ/আ-কারের পর যুক্তবর্ণে স হবে। যেমন— তিরস্কার, তেজস্ক্রিয়, নমস্কার, পরস্পর, পুরস্কার, পুরস্কৃত, বয়স্ক, ভস্ম, ভাস্কর, ভাস্কর্য, মনস্ক, বৃহস্পতি, সংস্কার ইত্যাদি।
ব্যতিক্রম: বাষ্প ও বাষ্প-যুক্ত শব্দ এবং স্পৃশ্য, স্পর্ধা, স্পষ্ট, স্পন্দ, স্পন্দন, স্পর্শ, স্পৃষ্ট, স্পর্শী, স্মর, স্মৃত/স্মৃতি, স্মিত, স্মরণ, বিস্ময় দ্বারা গঠিত শব্দে স হবে। নিষ্ফল শব্দ ছাড়া অন্যান্য শব্দে ‘ফ’-এ ‘স’ হবে।
ই/ঈ-কার, উ/ঊ-কার, এ/ঐ-কার এবং ও/ঔ-কারের পর যুক্তবর্ণে ষ হবে। যেমন— আবিষ্কার, আয়ুষ্কাল, আয়ুষ্কর, আয়ুষ্মান, আয়ুষ্মতী, উষ্ম, কুষ্মাণ্ড, গ্রীষ্ম, গীষ্পতি, গোষ্পদ, চতুষ্কোণ, চতুষ্পার্শ্ব, চতুষ্পদ, জ্যোতিষ্ক, দুষ্কর্ম, দুষ্কর, দুষ্প্রাপ্য, নিষ্কাশন, নিষ্কণ্টক, নিষ্পাপ, নিষ্পত্তি, নৈষ্কর্ম্য, পরিষ্কার, পুষ্করিণী, পুষ্প, মস্তিষ্ক, শ্লেষ্মা, শুষ্ক ইত্যাদি।
ব্যতিক্রম: বিস্ময় শব্দে স হবে। একই কারণে বিস্ময় দ্বারা গঠিত শব্দসমূহেও স হবে।
সূত্র: ব্যাবহারিক প্রমিত বাংলা বানান সমগ্র, ড. মোহাম্মদ আমীন, পাঞ্জেরী পাবলিকেশন্স লি.

অধর্ম মিথ্যা দম্ভ মায়া লোভ ক্রোধ হিংসা কলি ভয় ও মৃত্যুর জন্মবৃত্তান্ত

ভারতীয় পুরাণমতে, দ্বাপরের অবসানে ব্রহ্মার পৃষ্ঠদেশ হতে অধর্মের সৃষ্টি হয়। অধর্মের স্ত্রীর নাম মিথ্যা। মিথ্যার গর্ভে ও অধর্মের ঔরসে দম্ভ নামের এক পুত্র জন্মগ্রহণ করেন। দম্ভ নিজ ভগিনী মায়াকে বিবাহ করেন এবং তাঁদের ‘লোভ’ নামের এক পুত্র জন্মগ্রহণ করেন। লোভ নিজের ভগিনী নিবৃতিকে বিয়ে করেন এবং তাঁদের ক্রোধ নামের এক পুত্র ও হিংসা নামের এক কন্যা জন্মগ্রহণ করেন। ক্রোধ নিজ ভগিনী হিংসাকে বিবাহ করেন। তাঁদের কলি নামের এক পুত্র জন্মগ্রহণ করেন। কলি নিজের ভগিনী দ্বিরুক্তিকে বিয়ে করেন। তাদের ‘ভয়’ নামের এক পুত্র এবং ‘মৃত্যু’ নামের এক কন্যার জন্ম হয়।
এ কলিই ‘কলি’ যুগের প্রতিষ্ঠাতা।‘কলি’ যুগপ্রবর্তক দেবতা। তাঁর নামানুসারে বর্তমান যুগের নাম কলিযুগ। পৃথিবী ৪,৩২,০০০ বছর এ দেবতার অধিকারে থাকবে। এ যুগের শেষে ভগবান বিষ্ণু কল্কিরূপে আবির্ভূত হবেন।
উৎস: বাংলা শব্দের পৌরাণিক উৎস, ড. মোহাম্মদ আমীন, পুথিনিলয়।
বাকি অংশ এবং অন্যান্য প্রশ্নের উত্তর দেখার জন্য নিচের লিংক

গৌরচন্দ্রিকা

‘গৌরচন্দ্রিকা’ শব্দের আভিধানিক অর্থ: ভূমিকা, ভণিতা, মূল কাজ শুরুর আগে সে সম্পর্কে সংক্ষিপ্ত বর্ণনা প্রভৃতি। ‘গৌরচন্দ্র’ ও ‘পালাকীর্তন’ থেকে বাগ্‌ধারাটির উদ্ভব। গৌরচন্দ্র হচ্ছে শ্রীচৈতন্যদেব। পালাকীর্তন শুরু করার পূর্বে গৌরচন্দ্রের বন্দনামূলক গান গাওয়া হয়। গৌরচন্দ্রের বন্দনা করে গাওয়া গীত বা গানকে বলা হতো গৌরচন্দ্রিকা। গৌরচন্দ্রিকা ছাড়া পালাগানের শুরু কল্পনাই করা যেত না। গায়ক-গায়িকাগণ পালাগান শুরু করার আগে সাধারণত গৌরচন্দ্রিকার মাধ্যমে পালাগানের আসরের সূচনা ঘটাতেন। গৌরচন্দ্রিকার এ সূচনামূলক ভূমিকা হতে গৌরচন্দ্রিকা শব্দটির উৎপত্তি। এখন এর অর্থ গৌরচন্দ্রের বন্দনা করে গাওয়া গান বোঝায় না; বোঝায় ভূমিকা, ভণিতা। গ্রন্থের ভূমিকাকে অনেক লেখক বলেন ‘ গৌরচন্দ্রিকা’।

তুঙ্গস্থান: বৃহ্সপতি এখন আমার তুঙ্গে

প্রত্যেকটি গ্রহের একটি করে উচ্চ বা তুঙ্গক্ষেত্র আছে। রবির তুঙ্গস্থান মেষরাশি; চন্দ্রের তুঙ্গস্থান বৃষরাশি; এভাবে, মঙ্গলের তুঙ্গস্থান মকর; বুধের তুঙ্গস্থান কন্যা; বৃহস্পতির তুঙ্গস্থান কর্কট; শুক্রের তুঙ্গস্থান মীন; শনির তুঙ্গস্থান তুলা; রাহুর তুঙ্গস্থান মিথুন ও কেতুর তুঙ্গস্থান ধনু। রাশির জন্য গ্রহ তুঙ্গে থাকা শুভফলপ্রদ।
বৃহস্পতি (শুভগ্রহ) কর্কট রাশিতে অবস্থান করলে এ রাশির জাতক বলতে পারে: ‘বৃহস্পতি আমার এখন তুঙ্গে’। মানে খুব ভালো অবস্থানে আছে, দিনকাল ভালো যাচ্ছে।
 

সফলতা বনাম সার্থকতা

সফলতা: বাংলা একাডেমি আধুনিক বাংলা অভিধানমতে, বাক্যে বিশেষণ হিসেবে ব্যবহৃত সংস্কৃত সফল (সহ+ফল) অর্থ— বিশেষণে ফলযুক্ত, ফলবান, কৃতকার্য (পরীক্ষায় সফল)। সফল থেকে সফলতা (সফল+তা)। বাক্যে বিশেষ্য হিসেবে ব্যবহৃত সফলতা অর্থ— কৃতকার্যতা, সার্থকতা, যুক্তিযুক্ততা। যেমন: বৃত্তিটা তার একাগ্র শ্রমের পরম সফলতা।
 
সার্থকতা: একই অভিধানমতে, বাক্যে বিশেষ্য হিসেবে ব্যবহৃত সংস্কৃত সার্থকতা (সার্থক+তা) অর্থ— সফলতা, যুক্তিযুক্ততা, কৃতকার্যতা প্রভৃতি। যেমন: বৃত্তিটা তার একাগ্র শ্রমের পরম সার্থকতা।
 
কেউ প্রত্যাশিত লক্ষ্য অর্জন করতে পারলে তাকে বলা হয় সফল এবং লক্ষ্য অর্জনটাই হচ্ছে সফলতা। অনুরূপভাবে, কেউ প্রত্যাশিত লক্ষ্য অর্জন করতে পারলে তাকে বলা হয় সার্থক এবং ওই অর্জনটাকে বলা হয় সার্থকতা। সফলতা ও সার্থকতা উভয়ে বিশেষ্য এবং তা-প্রত্যয়ে গঠিত। উভয়ের আভিধানিক অর্থও অভিন্ন। সফল হলে সার্থকতা আসে। সার্থক হলে বলা হয় সফলতা অর্জিত হযেছে।
অতএব, সফলতা ও সার্থকতা সমার্থক।
সূত্র: ড. মোহাম্মদ আমীন। কোথায় কী লিখবেন: বাংলা বানান: প্রয়োগ ও অপপ্রয়োগ, পাঞ্জেরী পাবলিকেশন্স লি.
 

শুদ্ধ বানান চর্চা (শুবাচ) প্রমিত বানানবিধি

 
‘দু’ এবং ‘দূ’: ১০০/৩
কোথায় ‘দু’ হবে আর কোথায় ‘দূ’ হবে এ জটিলতা অনেক সময় বানান ভুলের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। শুবাচের যযাতিতে এরূপ ভুল প্রায়শ দেখা যায়। আমরা জানি, দূরত্ব লিখতে ‘দূ’ লাগে। তাই যেসব শব্দে দূরত্ব বোঝায় না সেসব শব্দে উ-কার যোগে ‘দুর’ (উপসর্গ) বা ‘দু +র/রেফ’ হবে।
যেমন: দুরবস্থা, দুরন্ত, দুর্বার, দুরাকাঙ্ক্ষা, দুরারোগ্য, দুরূহ, দুর্গা, দুর্গতি, দুর্গ, দুর্দান্ত, দুর্নীতি, দুর্যোগ, দুর্ঘটনা, দুর্নাম, দুর্ভোগ, দুর্দিন, দুর্বল, দুর্জয়, দুঃসময় ইত্যাদি। যেসব শব্দে দূরত্ব বোঝায় সেসব শব্দে ঊ-কার যোগে ‘দূর’ হবে।
যেমন: দূর, দূরবর্তী, দূরদূরান্তর, দূরালাপন, দূরীকরণ, অদূর, দূরত্ব, দূরবীক্ষণ, দূরাগত, দূরদৃষ্টি ইত্যাদি। দূর দ্বীপবাসিনী চিনি তোমারে চিনি (নজরুল)। সূত্র: শুদ্ধ বানান চর্চা (শুবাচ) প্রমিত বানানবিধি

সফলতা বনাম সার্থকতা

সফলতা: বাংলা একাডেমি আধুনিক বাংলা অভিধানমতে, বাক্যে বিশেষণ হিসেবে ব্যবহৃত সংস্কৃত সফল (সহ+ফল) অর্থ— বিশেষণে ফলযুক্ত, ফলবান, কৃতকার্য (পরীক্ষায় সফল)। সফল থেকে সফলতা (সফল+তা)। বাক্যে বিশেষ্য হিসেবে ব্যবহৃত সফলতা অর্থ— কৃতকার্যতা, সার্থকতা, যুক্তিযুক্ততা। যেমন: বৃত্তিটা তার একাগ্র শ্রমের পরম সফলতা।
 
সার্থকতা: একই অভিধানমতে, বাক্যে বিশেষ্য হিসেবে ব্যবহৃত সংস্কৃত সার্থকতা (সার্থক+তা) অর্থ— সফলতা, যুক্তিযুক্ততা, কৃতকার্যতা প্রভৃতি। যেমন: বৃত্তিটা তার একাগ্র শ্রমের পরম সার্থকতা।
 
কেউ প্রত্যাশিত লক্ষ্য অর্জন করতে পারলে তাকে বলা হয় সফল এবং লক্ষ্য অর্জনটাই হচ্ছে সফলতা। অনুরূপভাবে, কেউ প্রত্যাশিত লক্ষ্য অর্জন করতে পারলে তাকে বলা হয় সার্থক এবং ওই অর্জনটাকে বলা হয় সার্থকতা। সফলতা ও সার্থকতা উভয়ে বিশেষ্য এবং তা-প্রত্যয়ে গঠিত। উভয়ের আভিধানিক অর্থও অভিন্ন। সফল হলে সার্থকতা আসে। সার্থক হলে বলা হয় সফলতা অর্জিত হযেছে।
অতএব, সফলতা ও সার্থকতা সমার্থক।
সূত্র: ড. মোহাম্মদ আমীন। কোথায় কী লিখবেন: বাংলা বানান: প্রয়োগ ও অপপ্রয়োগ, পাঞ্জেরী পাবলিকেশন্স লি.

রফতানি বনাম রপ্তানি

বাংলা একাডেমি আধুনিক বাংলা অভিধান অনুযায়ী, রপ্তানি ও রফতানি উভয় বানানই শুদ্ধ ও প্রমিত। ওই অভিধানে দুটোই যথাসম্মানে স্থান পেয়েছে। রপ্তানি ও রফতানি ফারসি উৎসের বাংলা শব্দ। বাক্যে সাধারণত বিশেষ্যে হিসেবে ব্যবহৃত রপ্তানি/রফতানি— অর্থ বিক্রয়ের উদ্দেশ্যে পণ্যদ্রব্য বিদেশে প্রেরণ।
পেশাব–পায়খানা
অনেকে পায়খানা শব্দটিকে অশালীন মনে করে৷ ঘুরিয়ে ফিরিয়ে বিভিন্নভাবে কথাটি বলে৷ অথচ শব্দটি চূড়ান্ত স্তরের একটি শালীন ও পরিশীলিত শব্দ৷ হাতেগোনা কিছু মানুষ ছাড়া প্রায় সবাই মনে করে পায়খানা মানে মল, হাগু! অথচ এর অর্থে এরকম কিছুই নেই৷
শব্দটি মূলত ফার্সি ভাষার৷ পায় অর্থ পেছনের দিকে, আর খানা অর্থ ঘর৷ = পায়খানা — পেছনের দিকের ঘর৷ সোজা কথা পায়খানা অর্থ টয়লেট বা বাথরুম৷ এই শব্দ দুটি কিন্তু আবার ইংরেজি! ফার্সির তরজমা করলাম ইংরেজি দিয়ে৷
 
এখনও বাংলা আসেনি৷ কারণ সাধারণ মানুষ এই শব্দের বাংলার সাথে তেমন পরিচিত না৷ ঢাকা শহরের ব্যাপক জনসমাগমের স্থানগুলোতে এর খাঁটি বাংলা কোথাও কোথাও চোখে পড়ে৷ যেখানে পাঁচ থেকে দশ টাকা দিয়ে ঢুকতে হয়৷ জ্বি, মনে পড়েছে হয়ত এতক্ষণে, শৌচাগার! তবে শৌচাগারের মূল অর্থের সাথে পায়খানার মিল নেই৷ এর অর্থ হল যেখানে শৌচ করা হয়৷ শৌচ বুঝেন? মানে ইস্তেঞ্জা! আবারও ঝামেলায় ফেললাম বোধ হয়৷ ইস্তেঞ্জা মানে কিন্তু হাগু-মুতু করা নয়! এর অর্থ হল, সেইসব কাজের পর পরিষ্কার ক্রিয়া৷ মানে, ঢিলা, কুলুখ (ফার্সি শব্দটি কুলুপ নয়) পানি ইত্যাদি দিয়ে মলমূত্রের স্থান পরিষ্কার করাকে আরবিতে ইস্তেঞ্জা বলে৷ তো বলছিলাম শৌচ মানে হল ইস্তেঞ্জা, অর্থাৎ যেটাকে বলে শুচু করা (আঞ্চলিক ভাষায় আরো অনেক রকম বলা হয়!)৷
 
এভাবে পেশাব শব্দটিও ফার্সি! পেশ (সামনে) + আব (পানি) = অর্থাৎ সামনের দিকের পানি! কতটা শালীন উপস্থাপনা চিন্তা করেছেন?!
বাথরুম (ইংরেজি) আর হাম্মাম (আরবি) অর্থ হল গোসলখানা৷ শব্দ দুটির অর্থ শৌচাগার নয় কিন্তু! তবে হাম্মাম শব্দে অতিরিক্ত আরেকটু অর্থ আছে৷ তা হল, যেখানে গরম পানি ব্যবহার করা হয়৷
পুনশ্চ গোসলখানাও কিন্তু বাংলা নয়!
গোসল (আরবি) + খানা (ফার্সি) = ধৌত করার ঘর!!
 
 
শুবাচ গ্রুপের লিংক: www.draminbd.com
 
 
 
 
 
— √
All Link: https://draminbd.com/আমি-শুবাচ-থেকে-বলছি-all-link/
৫.  পোস্টের সংযোগ: https://draminbd.com/আমি-শুবাচ-থেকে-বলছি-শুবাচ-5/
 
 
৩. পোস্টের সংযোগ https://draminbd.com/আমি-শুবাচ-থেকে-বলছি-শুবাচ-3/

২. পোস্টের সংযোগ: https://draminbd.com/আমি-শুবাচ-থেকে-বলছি-শুবাচ-2/

১. পোস্টের সংযোগ: https://draminbd.com/আমি-শুবাচ-থেকে-বলছি-শুবাচ/

error: Content is protected !!