আমি শুবাচ থেকে বলছি: শুবাচির পোস্ট/যযাতি; মন্তব্য, প্রশ্ন উত্তর বিবিধ ৬

ড. মোহাম্মদ আমীন

এই পেজের লিংক: https://draminbd.com/আমি-শুবাচ-থেকে-বলছি-শুবাচ-6/

ড. মোহাম্মদ আমীন

আমি শুবাচ থেকে বলছি: শুবাচির পোস্ট/যযাতি; মন্তব্য, প্রশ্ন উত্তর বিবিধ ৬

অনেক বনাম খুব

অনেক: অনেক (ন+এক) সংস্কৃত উৎসের শব্দ। বাংলায় যাকে বলা হয় তৎসম। বিশেষণে অনেক শব্দের অর্থ—
একাধিক, নানা: বাজারে অনেক লোক দেখলাম। অনেক কথা শুনলাম।
প্রচুর, ঢের, বিস্তর: অনেক কথা যাও যে বলে কোনো কথা না বলি। তুমি অনেক কষ্ট করে আমায় দুঃখ দিতে চেয়েছ। অনেক কথা হয়েছে, এবার থামো।
সর্বনামে অনেক শব্দের অর্থ:
বহুলোক: অনেকে মনে করেন, “অর্থই অনর্থের মূল”।

খুব: খুব ফারসি উৎসের শব্দ। এটি বাক্যে সাধারণত বিশেষণ ও ক্রিয়াবিশেষণ হিসেবে ব্যবহৃত হয়।

বিশেষণে খুব শব্দের অর্থ:
  • অতিশয়: রান্নাটা খুব ভালো হয়েছে। খুব জানতে ইচ্ছে করে।
  • যথোচিত: খুব শিক্ষা পেয়েছে। খুব শিক্ষা দিয়ে দিলাম।
ক্রিয়াবিশেষণে খুব শব্দের অর্থ:
  • যথেষ্ট: খুব হয়েছে, এবার একটু থামো।
  • নিশ্চয়: পারব না কেন? খুব পারব।
 
পার্থক্যটি দেখুন নিচের গান থেকে
“খুব জানতে ইচ্ছে করে,
তুমি কি সেই আগের মতোই আছ
না কি অনেকখানি বদলে গেছ।
খুব জানতে ইচ্ছে করে- – -।”
 
 
 
 
যে-কোনো যেকোনো যে কোনো
শুদ্ধ কোনটি? আমি কোনটি লিখব? (শুবাচির প্রশ্ন)
সবগুলো শুদ্ধ। আপনার যেটি মনে হয় সেটি লিখতে পারেন। তবে, একই রচনায় বা একই গ্রন্থে অভিন্ন রূপের সমতাবিধান বাঞ্ছনীয়।
বাংলা একাডেমি আধুনিক বাংলা অভিধানে ভুক্তি হিসেবে যে-কোনো শব্দটি দেওয়া আছে। তবে এই অভিধানের নানা ভুক্তিতে যে কোনো কথাটি বেশি ব্যবহার করা হয়েছে। অতএব, যে-কোনো ও যে কোনো দুটোই শুদ্ধ। যে-কোনো এবং যেকোনো অভিন্ন শব্দ। হাইফেন কেবল উচ্চারণ কিংবা অর্থবিভ্রাট নির্দেশকের কাজ করে।
— — — — — — — — — — — —
বাকি অংশ ও অন্যান্য:
সূত্র: ব্যাবহারিক প্রমিত বাংলা বানান সমগ্র, ড. মোহাম্মদ আমীন, পাঞ্জেরী পাবলিকেশন্স লি.
 
আকাশ পাতাল না কি আকাশপাতাল
‘আকাশ পাতাল’ নয়, আকাশপাতাল। আধুনিক বাংলা অভিধানমতে, আকাশপাতাল শব্দই প্রমিত। কেন তা নিচে নিমোনিক বিধিতে দেখুন—
সাধারণ বিধি: সমাসবদ্ধ হলে ‘আকাশ’ শব্দটি সাধারণত ক্রিয়া বা ক্রিয়াবিশেষ্য ছাড়া অন্যান্য ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট শব্দ/পদ বা শব্দাংশের সঙ্গে সেঁটে বসবে। যেমন: আকাশকুসুম, আকাশচারী, আকাশচিত্র, আকাশচুম্বী, আকাশছোঁয়া, আকাশজাত, আকাশদীপ, আকাশদুহিতা, আকাশপট, আকাশপথ, আকাশপ্রদীপ, আকাশবিহার, আকাশভ্রমণ, আকাশকণ্ডল, আকাশযান, আকাশযুদ্ধ প্রভৃতি।
বাক্য: আকাশপ্রদীপ জ্বলে দূরের তারার পানে চেয়ে, আমার নয়ন দুটি –
বিশেষ বিধি: তবে আকাশ শব্দের পর ক্রিয়া বা ক্রিয়াবিশেষ্য কিংবা ক্রিয়ার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট শব্দ বা পদ থাকলে তা ফাঁক রেখে বসবে। যেমন: আকাশ থেকে পড়া, আকাশ ধরা, আকাশ ভেঙে পড়া, আকাশ হাতে পাওয়া, আকাশে তোলা প্রভৃতি।
বাক্য: আকাশ মেঘে ঢাকা শাওন ধারা ঝরে – – -।
এখানে মেঘ শব্দটি ঢাকা ক্রিয়ার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট। তাই আকাশ শব্দের সঙ্গে সেঁটে না বসে পৃথক বসেছে।
 
‘আসা যাওয়া’ না কি ‘আসা-যাওয়া’
বাংলা একাডেমি আধুনিক বাংলা অভিধান লিখেছে আসা-যাওয়া। এটাই এখন প্রমিত রূপ। এটি বাংলা শব্দ। বাক্যে বিশেষ্য হিসেবে ব্যবহৃত আসা-যাওয়া শব্দের অর্থ গমনাগমন, যাতায়াত। যেমন: আসা-যাওয়ার পথের ধারে গান গেয়ে মোর কেটেছে দিন (রবীন্দ্রনাথ)। মেলামেশা অর্থ প্রকাশেও শব্দটি ব্যবহার করা হয়। যেমন: তাদের মধ্যে আসা-যাওয়া নেই। ক্রিয়াবিশেষণে আসা-যাওয়া শব্দটির অর্থ ক্ষতিবৃদ্ধি হওয়া। যেমন: তাতে কিছু আসে যায় না।
আকলমন্দ
আকলমন্দ একটি মিশ্র শব্দ। আরবি আকল ও ফারসি মন্দ শব্দের সমন্বয়ে আকলমন্দ শব্দটি গঠিত। বাক্যে বিশেষণ হিসেবে ব্যবহৃত আকলমন্দ শব্দের অর্থ— বুদ্ধিমান, বিজ্ঞ, বুদ্ধিমত্তার অধিকারী, জ্ঞানের অধিকারী। প্রসঙ্গত, ফারসি মন্দ্‌ অর্থ— অধিকারী এবং  আরবি আকল অর্থ— (বিশেষ্যে) বুদ্ধি, জ্ঞান। অভিযোগ: আকল ভুক্তিতে বলা হয়েছে:  আকল আরবি শব্দ। আকলমন্দ ভুক্তিতে বলা হয়েছে: আকল সংস্কৃত শব্দ।
 
ভুয়া: ভুয়া বানানে ঊ-কার, উ-কার নয় কেন?
ভুয়া অতৎসম (দেশি) শব্দ। অতৎসম শব্দে সাধারণত ঊ-কার হয় না। তাই ভুয়া বানানে ঊ-কার নেই। বাক্যে ভুয়া শব্দটি বিশেষণ হিসেবে ব্যবহৃত হয়। এর অর্থ: মিথ্যা, ভিত্তিহীন, জাল, অসার, ভুল। যেমন: ভুয়া খবর, ভুয়া দলিল, ভুয়া কথা।
নিমোনিক: মনে করুন, ভুল বানানে উ-কার। তাই ভুল অর্থ-দ্যোতক ভুয়া বানানেও উ-কার।
 
 
যখন যখনই যখনতখন: সংস্কৃত যৎক্ষণ থেকে উদ্ভূত এবং বাক্যে ক্রিয়াবিশেষণ হিসেবে ব্যবহৃত যখন অর্থ  যে সময়ে, যে কালে। “যখন পড়বে না  মোর পায়ের চিহ্ন এই বাটে (রবীন্দ্রনাথ)।” যখন  শব্দটি যেহেতু অর্থ প্রকাশেও ব্যবহৃত হয়। যেমন: যখন তুমি এলে না, তখন আমি চলে এলাম। শব্দটির উচ্চারণ জখোন্। বাক্যে ক্রিয়াবিশেষণ হিসেবে ব্যবহৃত যখনই অর্থ যেইমাত্র যে মুহূর্তে। যখনই তাকে দেখতে পাও তখনই আমাকে খবর দেবে। শব্দটির উচ্চারণ জখোন্‌ই। প্রসঙ্গত, যখনতখন অর্থ— সময়অসময় বিচারবিবেচনা না করে, যে-কোনো সময়; প্রায়ই। বিশেষণে শব্দটির অর্থ— মুমূর্ষু। রোগীর যখনতখন অবস্থা।

বাংলা একাডেমি জানতে চাই: আকল নিবাস কোথায়?

বাংলা একাডেমি আধুনিক বাংলা অভিধানের ১২৬ পৃষ্ঠায় আকল ভুক্তিতে বলা হয়েছে— বাক্যে বিশেষ্য হিসেবে ব্যবহৃত আকল আরবি শব্দ। অর্থ— বুদ্ধি, জ্ঞান। আকল হতে উদ্ভূত আকলমন্দি শব্দেও বুদ্ধিমত্তা অর্থে বলা হয়েছে আকল আরবি উৎসের শব্দ। ১২৮ পৃষ্ঠায় আক্কেল ভুক্তিতেও বলা হয়েছে আকল আরবি শব্দ। অন্যদিকে, একই অভিধানের ১২৬ পৃষ্ঠায় বিদ্যমান আকলমন্দ ভুক্তিতে বুদ্ধিমান অর্থে উল্লেখ করা হয়েছে — আকল সংস্কৃত শব্দ। 
 
অথচ, বর্ণিত অভিধানে জ্ঞান ও বুদ্ধি অর্থে আকল বানানের কোনো সংস্কৃত শব্দের অস্তিত্ব নেই।
বাংলা একাডেমি দয়া করে বলবেন কি আকল প্রকৃতপক্ষে কোন উৎসের শব্দ?
এটি কি মুদ্রণপ্রমাদ?
মুদ্রণপ্রমাদ হলে ঠিক করা হয়নি কেন?
এর মধ্যে একাধিক সংস্করণ প্রকাশিত হয়েছে।
আমাদের এত বিভ্রাটে রাখার কারণ কী?
 
ধ্যাত ধ্যাৎ
ধ্যাত শালা’ কথার অর্থ— ধ্যান করা হয়েছে বা কামনা করা হয়েছে বা স্মরণ করা হয়েছে এমন শালা কিংবা প্রত্যাশিত কেউ; স্মরণে নন্দিত অতি প্রিয় শালা বা প্রিয়জন— যাকে পাওয়ার জন্য বা দেখার জন্য মনে সর্বদা ঝড় বয়ে যায়; অতি পূজনীয় কেউ।
এখন দেখা যাক, ধ্যাত শব্দের অর্থ।
ধ্যাত: অভিধানমতে, সংস্কৃত ধ্যাত ( √ধ্যৈ+ত) শব্দের অর্থ— (বিশেষণে) ধ্যান করা হয়েছে এমন, স্মরণ করা হয়ছে এমন, মনে করা হয়েছে এমন। এর উচ্চারণ ধ্যাতো। সে তো আমার ধ্যাতো, খ্যাতির চেয়ে খ্যাত।
ধ্যাৎ: ধ্যাৎ বাংলা শব্দ। এর উচ্চারণ: ধ্যাত্‌। ধ্বন্যাত্মক  ধ্যাৎ অর্থ— (অব্যয়ে) বিরক্তি, অবজ্ঞা, অসম্মতি, অবিশ্বাস প্রভৃতি ভাবপ্রকাশক শব্দ। ধ্যাৎ, এ ক্যাচটাও ক্যাচ করতে পারল না! ধ্যাৎ শালা।
‘ধ্যাৎ শালা’ কথার অর্থ: কারও প্রতি অবজ্ঞা, বিরক্তি, অসহিষ্ণুতা, অবিশ্বাস প্রভৃতি প্রকাশ। অধিকন্তু, ঘনিষ্ঠ বন্ধুদের প্রতিও মজা করেও এই উক্তিটি করা হয়।
 
ভুলচুক
ভুলচুক মিলে ভুলচুক। সংস্কৃত ভ্রংশ থেকে উদ্ভূত চুক অর্থ— (বিশেষ্যে) বিস্মৃতি বা ভ্রান্তিজনিত ত্রুটিবিচ্যুতি; স্খলন। সাধারণভাবে বলা যায় চুক অর্থ— নগণ্য ভুল, এমন ভুল যা তেমন দূষণীয় বা ক্ষতিকর নয়।  অন্যদিকে, সংস্কৃত ভ্রম থেকে উদ্ভূত ভুল অর্থ— (বিশেষ্যে) ভুল ভ্রান্তি প্রমাদ; বিস্মৃতি; প্রলাপ এবং (বিশেষণে) ভ্রান্ত; অসত্য; যথার্থ নয়। অভিধানমতে, ভুলচুক অর্থ— (বিশেষ্যে) ভুলত্রুটি, ছোটোখাটো ভুল। ভুল-এর সঙ্গে যুক্ত হলে চুক শব্দটি ভুলকেও ছোটোখাটো ত্রুটিতে পরিণত করে।
 
অলাতচক্র
সংস্কৃত অলাতচক্র (অলাত+চক্র) অর্থ— (বিশেষ্যে) জ্বলন্ত বস্তুকে ঘোরালে চক্রাকারে যে অগ্নিবলয় দেখা যায়, বহ্নিবলয়। অনুরূপ শব্দ— অলাতশিলা।অলাত অর্থ— (বিশেষ্যে) জলন্ত কয়লা বা অঙ্গার। আলাত অর্থ— (বিশেষ্যে) জ্বলন্ত অঙ্গার; (বিশেষণে) জ্বলন্ত অঙ্গারসম্বন্ধীয়। আহমদ ছফার একটি উপন্যাসের নাম: অলাতচক্র।
ওঙ্কার
 
ওঙ্কার সংস্কৃত ওঙ্কার (ওম্‌+√কৃ+অ) অর্থ— (বিশেষ্যে) ঈশ্বরবাচক ধ্বনি, বাদ্যযন্ত্রবিশেষ। সনাতন ধর্মাবলম্বীদের বিশ্বাস এটি পৃথিবীর আদি শব্দ। শব্দই ব্রহ্ম। এটি ব্রহ্ম শব্দ। হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের ঈশ্বরবাচক প্রতীক হিসেবে ব্যবহৃত অ-উ-ম্ বা ওম= প্রণব=ওঙ্কার। বৈদিক সাহিত্যে মেঘের শব্দের(মেঘধ্বনি) দেবী সরস্বতী –মাধ্যমিকা বাক্ প্রভৃতিও ওঙ্কার হিসেবে চিহ্নিত।

 —  —  — —  —  —  — —  —  —  — —  —  —  — —  —  —  — —  —  —  —

 
 
শুবাচ গ্রুপের লিংক: www.draminbd.com
 
 
 
 
 
— √
All Link: https://draminbd.com/আমি-শুবাচ-থেকে-বলছি-all-link/
৬. পেজের লিংক: https://draminbd.com/আমি-শুবাচ-থেকে-বলছি-শুবাচ-6/
 
৫.  পোস্টের সংযোগ: https://draminbd.com/আমি-শুবাচ-থেকে-বলছি-শুবাচ-5/
 
 
৩. পোস্টের সংযোগ https://draminbd.com/আমি-শুবাচ-থেকে-বলছি-শুবাচ-3/

২. পোস্টের সংযোগ: https://draminbd.com/আমি-শুবাচ-থেকে-বলছি-শুবাচ-2/

১. পোস্টের সংযোগ: https://draminbd.com/আমি-শুবাচ-থেকে-বলছি-শুবাচ/

error: Content is protected !!