আমেরিকার প্রেসিডেন্ট নির্বাচন: ইলেকটোরাল ভোটার পপুলার ভোটার বিবিধ

ড. মোহাম্মদ আমীন

বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী ও আমেরিকার পেসিডেন্ট নির্বাচন: মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনকে অনেক অত্যন্ত জটিল মনে করেন। তবে প্রক্রিয়াটি আপতদৃষ্টিতে জটিল মনে হলেও অত্যন্ত জটিল নয়। অনেকটা বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী নির্বাচনের মতো। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর ন্যায়  মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টও জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটে  নির্বাচিত হন না। পরোক্ষ ভোটে নির্বাচিত হন।  অর্থাৎ বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী নির্বাচনের মতো মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনেও জনগণের প্রত্যক্ষ ভূমিকা নেই

কীভাবে? বাংলাদেশে যে দল জনগণের বেশি ভোট পায় সে দল বিজয়ী হয়ে প্রধানমন্ত্রী নিয়ে  সরকার গঠন করতে পারবে— এমন কোনো নিশ্চয়তা নেই। বরং যে দল সংসদের সংখ্যাঘরিষ্ঠ আসন লাভ করে  সে দল জনগণের ভোট কম পেলেও বিজয়ী ঘোষিত হয়ে দলীয় প্রধানমন্ত্রী নিয়ে  নিশ্চিত সরকার গঠন করতে পারে।  

বিষটি আরও বিশ্লেষণ করা যাক:  ধরুন, কোনো এক  নির্বাচনে বাংলাদেশের জাতীয় সংসদে মোট আসন ৩০০। কোনো দলকে সংখ্যাঘরিষ্ঠ অর্জন করতে হলে কমপক্ষে ১৫১টি আসন লাভ করতে হবে।   নির্বাচনে   এবং বি নামের দুটি দল অংশগ্রহণ করল। মোট ভোটার ছিল ১০ কোটি।   ৩০০ আসনের মধ্যে দল ১৫৫টি  এবং বি দল ১৪৫টি আসনে  জয়ী হলো। ১০ কোটি ভোটারের মধ্যে  দলের ১৫৫ জন এমপি  ৪.৫ কোটি এবং বি দলের ১৪৫ জন এমপি ৫.৫ কোটি ভোট পেল। কিন্তু সংসদে সংখ্যাঘরিষ্ঠ আসন পাওয়ায় জনভোট বা পপুলার ভোট কম পাওয়া সত্ত্বেও দল  বিজয়ী ঘোষিত হয়ে সরকার গঠন করল। অন্যদিকে, বি দল সরকার গঠন করতে পারল না। অর্থাৎ ৫০ লাখ ভোট কম পেয়েও সংসদে  বেশি আসন পাওয়ায় দল বিজয়ী হয়ে সরকার গঠন করল। আমেরিকার নির্বাচনও অনুরূপ। পপুলার ভোট বেশি পেলেও প্রেসিডেন্ট পদে জয়ী হওয়া যায় না। ইলেকটোরাল ভোটই প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত করে। ঠিক যেমন, বাংলাদেশে প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত করে সংসদ সদস্যবৃন্দ।

মার্কিন সংসদ:  মার্কিন সংসদের দুটি কক্ষ। নিম্ন কক্ষের নাম হাউজ অব রিপ্রেজেনটেটিভ  এবং উচ্চ কক্ষের নাম সিনেট।  হাউজ অব রিপ্রেজেনটেটিভ-এর সংখ্যা ৪৩৮। তন্মধ্যে  ডিসি (ডিস্ট্রিক্ট অব কলাম্বিয়া) থেকে নির্ধারিত ৩ জন এবং ৫০টি অঙ্গরাজ্য থেকে নির্বাচিত হয় ৪৩৫।

হাউজ অব রিপ্রেজেনটেটিভ ও সিনেট:   মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ৫০টি রাজ্যের প্রতিটির জনসংখ্যা অনুপাতে জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটে নির্বাচিত ৪৩৫ জন প্রতিনিধি বা সদস্য এবং একইভাবে ডিসি হতে নির্বাচিত ৩ জন-সহ মোট ৪৩৮ জন প্রতিনিধি নিয়ে হাউজ অব রিপ্রেজেনটেটিভ গঠিত। প্রতিটি প্রতিনিধি গড়ে প্রায় ৭.১০ লাখ নাগরিকের প্রতিনিধিত্ব করে। অন্যদিকে, ৫০টি রাজ্যের  প্রতিটি রাজ্য থেকে প্রত্যক্ষ ভোটে নির্বাচিত দুজন করে মোট ১০০ জন প্রতিনিধি নিয়ে সিনেট গঠিত। সিনেট-এর সদস্যকে বলা হয় সিনেটর।  এ হিসেবে উভয় কক্ষের সদস্য সংখ্যা ৫৩৮। কোন রাজে কতটি ইলেকটোরাল ভোটার রয়েছে তা নিচের টেবিলে দেখুন।

ইলেকটোরাল ভোট ও পপুলার ভোট: হাউজ অব রিপ্রেজেনটেটিভ ও সিনেট-এর ৫৩৮জন প্রতিনিধির ভোটে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়। এই ৫৩৮ জন প্রতিনিধিকে বলা হয়  ইলেকটোরাল ভোটার  বা ইলেকটোরাল কলেজ ভোটার।  নির্বাচনে জনগণ প্রত্যক্ষভাবে প্রেসিডেন্টকে যে ভোট দিয়ে থাকেন তাকে  পপুলার ভোট বলা হয়। পপুলার ভোট প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে প্রত্যক্ষভাবে কোনো ভূমিকা রাখে না।  

প্রেসিডেন্ট হতে হলে ২৭০ ইলেকটোরাল ভোট কেন?  ৫৩৮-এর অর্ধেক হলো ২৬৯। কাজেই যে প্রেসিডেন্ট পদপ্রাথী ২৬৯ এর বেশি অর্থাৎ, কমপক্ষে ২৭০টি ইলেকটোরাল ভোট পাবেন তিনিই হন প্রেসিডেন্ট।

গ-মানে গণতন্ত্র, গ মানে গর্দভ: তবে এখানে কিছুটা জটিলতা আছে। ক্যালিফোর্নিয়ায় ইলেকটোরাল ভোটের সংখ্যা ৫৫। মনে করুন এই ৫৫ ইলেকটোরাল ভোটের ২৮টি ডেমোক্র্যাট দলের প্রেসিডেন্ট প্রার্থীর অনুকূলে চলে গেল। সেক্ষেত্রে , বাকি ২৭টি ভোট রিপাবলিকান দলের প্রেসিডেন্টের জন্য থাকার কথা। কিন্তু তা হবে না। ক্যালিফোর্নিয়ার পুরো ৫৫টি ভোটই ডেমোক্র্যাট দলের প্রেসিডেন্টের পক্ষে চলে যাবে। কারণ তিনি অধিক ভোট পেয়েছেন। উইনার টেকস ইট অল। একটি ভোট বেশি পেলেও পুরো ভোট পেয়েছে গণ্যে বিজয়ী ঘোষণা করা হয়। বিশ্বের প্রায় সব দেশের সব নির্বাচনে এমন গর্দভ নীতি অনুসৃত হয়।

কোনো বিল পাস হতে হলে সেটাকে প্রথমে হাউজ অব রিপ্রেজেনটেটিভ-এ উত্থাপন করা হয়। তারপর সিনেট-এ পাশ হতে হবে। সিনেট-সভায় পাশ হওয়ার পর প্রেসিডেন্ট ওই বিলে স্বাক্ষর করবেন। প্রেসিডেন্টের ভেটো ক্ষমতা আছে। যদ্দ্বারা তিনি কোনো বিল নাকচ করে দিতে পারেন। তবে  দুই-তৃতীয়াংশ ভোট পেয়ে পাশ হয়ে আসা কোনো বিলে প্রেসিডেন্ট ভেটো দিতে পারেন না।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে প্রেসিডেন্ট ও অন্যান্য নির্বাচন: ভোট হয় প্রতি ৪ বছরে একবার। হাউস অফ রিপ্রেজেনটেটিভ প্রতি ২ বছরে একবার এবং সিনেটরদের ভোট হয় প্রতি ৬ বছর অন্তর। সবার একসঙ্গে ভোট হয় না। তবে প্রায়  এক তৃতীয়াংশ প্রতিনিধি এই চার বছরের ভোটাভুটিতে ঝরে যায়।

রাজ্যভিত্তিক ইলেকটোরাল ভোটার

ইলেকটোরাল ভোট×অঙ্গরাজ্যঅঙ্গরাজ্যের নাম ও ইলেকটোরাল ভোটের সংখ্যামোট ইলেকটোরাল ভোটার
৫৫×১=৫৫ক্যালিফোর্নিয়া (California)৫৫
৩৮×১=৩৮টেক্সাস (Texas)৩৮
২৯×২=৫৮ফ্লোরিডা, নিই ইয়র্ক (Florida, New York)
প্রতিটি অঙ্গরাজ্যে ২৯টি করে ইলেকটোরাল ভোট।
৫৮
২০×২=৪০ইলিনয়স, পেনসিলভ্যানিয়া (Illinois, Pennsylvania)
প্রতিটি অঙ্গরাজ্যে ২০টি করে ইলেকটোরাল ভোট।
৪০
১৮×১=১৮অহিও (Ohio) ১৮
১৬×২=৩২ জর্জিয়া, মিসিগান (Georgia, Michigan)
প্রতিটি অঙ্গরাজ্যের ১৬টি করে ইলেকটোরাল ভোট।
৩২
১৫×১=১৫নর্থ ক্যারোলিনা (North Carolina)১৫
১৪×১=১৪ নিউ জার্সি (New Jersey)১৪
১৩×১=১৩ভার্জিনিয়া (Virginia)১৩
১২×১=১২ওয়াশিংটন ( Washington)
১২টি ইলেকটোরাল ভোট।
১২
১১×৪=৪৪অরিজোনা, ইন্ডিয়ানা, ম্যাসাচুসেটস, টেনেসি (Arizona, Indiana, Massachusetts, Tennessee)
প্রতিটি অঙ্গরাজ্যের ১১টি করে ইলেকটোরাল ভোট।
৪৪
১০×৪=৪০ম্যারিল্যান্ড, মিনিসোটা, মিসৌরি, উইসকনসিন (Maryland, Minnesota, Missouri, Wisconsin)
প্রতিটি অঙ্গরাজ্যে ১০টি করে ইলেকটোরাল ভোট।
৪০
৯×৩=২৭ আলবাম, কোলোরাডা, সাউথ ক্যারিলোনা (Alabama, Colorado, South Carolina)
প্রতিটি অঙ্গরাজ্যে ৯টি করে ইলেকটোরাল ভোট।
২৭
৮×২=১৬কেনটাকি, লুইজিয়ানা (Kentucky, Louisiana)
প্রতিটি অঙ্গরাজ্যে ৮টি করে ইলেকটোরাল ভোট।
১৬
৭×৩=২১কানেকটিকাট, ওকলাহোমা, অরিগন (Connecticut, Oklahoma, Oregon)
প্রতিটি অঙ্গরাজ্যে ৭টি করে ইলেকটোরাল ভোট।
২১
৬×৬=৩৬আরকানসাস, আইওয়া, কানসাস, মিসিসিপি, নেভাডা, উটাহ (Arkansas, Iowa, Kansas, Mississippi, Nevada, Utah)
প্রতিটি অঙ্গরাজ্যে ৬টি করে ইলেকটোরাল ভোট।
৩৬
৫×৩=১৫ নেব্রাস্কা, নিউ মেক্সিকো, ওয়েস্ট ভার্জিনিয়া (Nebraska, New Mexico, West Virginia)।
প্রতিটি অঙ্গরাজ্যে ৫টি করে ইলেকটোরাল ভোট।
১৫
৪×৫=২০হাওয়াই, ইডাহেডা, মাইনি, নিউ হামসপিয়ার, রোড আইল্যান্ড (Hawaii, Idaho, Maine**, New Hampshire, Rhode Island)।
প্রতিটি অঙ্গরাজ্যে ৪টি করে ইলেকটোরাল ভোট।
২০
৩×৮=২৪আলাস্কা, ডেলাওয়ারে, ডিস্ট্রিক্ট অব কলাম্বিয়া, মোনটানা, নর্থ ডাকোটা, সাউথ ডাকোটা, ভারমন্ট, অউমিং (Alaska, Delaware, District of Columbia*, Montana, North Dakota, South Dakota, Vermont, Wyoming.)
প্রতিটি অঙ্গরাজ্যে ৩টি করে ইলেকটোরাল ভোট।
২৪
মোট মোট অঙ্গরাজ্য: ৫০, মোট ইলেকটোরাল ভোট: ৫৩৮৫৩৮

মার্কিন  নির্বাচন কমিশন জারিকৃত ২০২০-এর নির্বাচনে রাজ্যভিত্তিক ইলেকটোরাল ভোটের তালিকা

US StateElectoral VotesUS StateElectoral Votes
Alabama9Montana3
Alaska3Nebraska5
Arizona11Nevada6
Arkansas6New Hampshire4
California55New Jersey14
Colorado9New Mexico5
Connecticut7New York29
Delaware3North Carolina15
Florida29North Dakota3
Georgia16Ohio18
Hawaii4Oklahoma7
Idaho4Oregon7
Illinois20Pennsylvania20
Indiana11Rhode Island4
Iowa6South Carolina9
Kansas6South Dakota3
Kentucky8Tennessee11
Louisiana8Texas38
Maine4Utah6
Maryland10Vermont3
Massachusetts11Virginia13
Michigan16Washington12
Minnesota10West Virginia5
Mississippi6Wisconsin10
Missouri10Wyoming3

আমেরিকার প্রেসিডেন্ট নির্বাচন: ইলেকটোরাল ভোটার পপুলার ভোটার বিবিধ

আমেরিকার প্রেসিডেন্ট নির্বাচন: ইলেকটোরাল ভোটার ও পপুলার ভোটার

লিংক: https://draminbd.com/আমেরিকার-প্রেসিডেন্ট-নির/

error: Content is protected !!