আম জাতীয় ফল কেন

 ড. মোহাম্মদ আমীন

আমাদের জাতীয় বৃক্ষ কী?

শিক্ষকের প্রশ্নের উত্তরে প্রমিতা বলল, আম গাছ।

কিন্তু কেন? শিক্ষক জানতে চাইলেন।

প্রমিতা বলল : আম, শিশুদের, যুবদের, বুড়ো-বুড়ি আর কচাকচি সবার প্রিয়। যেমন মিষ্টি তেমন সর্বলভ্য; সারা দেশে পাওয়া যায়। খেলে কোনো অসুখ হয় না। জসীম উদ্দীন “আয় ছেলেরা আয় মেয়েরা” কবিতায়, আম খেয়ে সুখ পাওয়ার জন্য মামার বাড়ি যাবার কথা বলেছেন আমাদের :

“ঝড়ের দিনে মামার দেশে

আম কুড়াতে সুখ

পাকা জামের শাখায় উঠি

রঙিন করি মুখ।”

শিক্ষক বললেন, এ তো ‘আম’-এর কৃতিত্ব। আম গাছ কী করল?

প্রমিতা বলল : আমটা তো স্যার জন্মই দিয়েছে “আম গাছ”।

শিক্ষক বললেন, ছেলের দায় তো বাপকে দেওয়া যায় না। তোমরা দুনিয়াটা উলটে দেবে বুঝি, মা?

ফরিদ বলল: মেয়েরা, স্যার, সববময় দুনিয়াটা উলটে দিতে চায়; যত্তো সব!

প্রমিতা বলল : ১৯৭১ খ্রিষ্টাব্দের ১০ই এপ্রিল যশোর জেলার কুষ্টিয়া মহকুমার ভবেরপাড়া গ্রামের আমের বাগানে, মুকুলিত আম গাছের ছায়ায়, আম গাছ থেকে ঝরে-পড়া শুকনো পাতার উপর বসে, আম গাছের পাতার হাওয়া খেয়ে আমাদের কৃতি সন্তানগণ বাংলাদেশের অস্থায়ী সরকার গঠন করেছিলেন। আম গাছ আমাদের দেশের প্রথম সরকার গঠনে ছায়া দিয়েছিল, আশ্রয় দিয়েছিল, বাতাস দিয়েছিল, বিছানা দিয়েছিল, অন্য গাছ কি দিয়েছে? এখন ওই আমবাগানই মুজিবনগর, জাতির পিতার নামে নামায়িত। তাই “আম গাছ’ আমাদের জাতীয় বৃক্ষ। সৃষ্টি, ঐতিহ্য আর সমৃদ্ধের ঐশ্বর্য।

ফরিদ বলল : না স্যার; সে ঠিক বলেনি। আমার বাবা বলেন —-

শিক্ষক : তোমার বাবা কী বলেন?

মেয়েরা সবসময় বেশি কথা বলে। আম গাছ নিয়ে মাজেদা যা করল-এত কথা কী স্যার!

তুমি বলো, তাহলে? শিক্ষক বললেন।

ফরিদ বলল : বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের “আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালোবাসি”- গানটি আমাদের জাতীয় সংগীত। এখানে, “আম গাছের” কথা আছে। বিশ্বকবি কিন্তু, ১৯৭১ খ্রিষ্টাব্দের বহু আগে আম গাছের গুণকীর্তন করে গেছেন। কেবল আম-বনের ঘ্রাণই বিশ্বকবিকে পাগল করে দিয়েছিলেন। গাইব কি স্যার, ক-লাইন?

গাও, শিক্ষক বললেন।

“আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালোবাসি।

চিরদিন তোমার আকাশ, তোমার বাতাস, আমার প্রাণে বাজায় বাঁশি।

ও মা, ফাগুনে তোর আমের বনে ঘ্রাণে পাগল করে,

মরি হায়, হায় রে—।”

প্রমিতা বললেন, রবীন্দ্রনাথ আরও গেয়েছেন :

“ও মঞ্জরী, ও মঞ্জরী, আমের মঞ্জরী ,

আজ হৃদয় তোমার উদাস হয়ে

পড়ছে কি ঝরি

ঝরি ঝরি ঝরি।”

শিক্ষক বললেন : তোমাদের সবার কথা ঠিক; তবে, আরও কারণ আছে।

কী স্যার? শিক্ষার্থীরা সমস্বরে চিৎকার দিলেন।

শিক্ষক বললেন : মুক্তিযুদ্ধে শপথেও আম গাছের কথা উল্লেখ আছে। ১৭৫৭ খ্রিষ্টাব্দের ২৩জুন জুন পলাশির আমের বাগানে লর্ড ক্লাইভের কাছে নবাব সিরাজউদ্দৌলার পতনের পর আমাদের স্বাধীনতার সূর্য অস্ত গিয়েছিল। এই অস্তমিত সূর্যই আবার ১৯৭১ খ্রিষ্টাব্দের ১০ই এপ্রিল মুজিবনগরে জেগে ওঠার হাসিতে চোখ মেলেছিল উদয়মান সূর্যের লালাভ মাধুর্যে। তাই, আম গাছ আমাদের জাতীয় বৃক্ষ।

ফরিদ বলল : তখন ছিল জুন মাস। গাছে-পাকা আম। আমগুলো ঝরে পড়ছিল গাছ থেকে, আম নয়, যেন পলাশির যুদ্ধে শাহাদাতবরণকারী একেক জন সৈন্য।

প্রমিতা বলল, আর স্যার দেখুন, এপ্রিল মাসে গঠিত হয়েছিল মুজিবনগর সরকার; তখন আম গাছ ছিল মুকুলে মুকুলে ছেয়ে, নুইয়ে। মুকুল নয়, যেন আমাদের স্বাধীনতার সূর্যের অগণিত পরিস্ফুটন।

Total Page Visits: 18 - Today Page Visits: 1

Leave a Comment

Your email address will not be published.

Language
error: Content is protected !!