আম: নামকরণ প্রবাদ উৎপত্তি ও বিকাশ: ফজলি আম, ফকিরভোগ, ল্যাংড়া: পৃথিবীর সবচেয়ে দামি আম: আলফানসো

ড. মোহাম্মদ আমীন

ফজলি আম ও ফকিরভোগ: নামকরণ প্রবাদ উৎপত্তি ও বিকাশ

সংযোগ: https://draminbd.com/আম-নামকরণ-প্রবাদ-উৎপত্তি/

আম-জাত:  ভারত ও বাংলাদেশে প্রায় ২০০ জাতের আম পাওয়া যায়। তন্মধ্যে বাংলাদেশে পাওয়া যায় প্রায় দেড়শ জাতের আম। এরমধ্যে  কিছু আম উন্নত। তবে অধিকাংশ দেশি গুটি আম হিসেবে পরিচিত। কিছু আম এসেছে পাকিস্তান থেকে আবার কিছু এসেছে ফিলিপাইন, থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া

ড. মোহাম্মদ আমীন

মিয়ানমার প্রভৃতি দেশ থেকে। উন্নত জাতের আমের মধ্যে রয়েছে আলফানসো, ফজলি, আম্রপলি,  ল্যাংড়া, হিমসাগর, বোম্বাই, কৃষাণভোগ, গোপালভোগ, খিরসাপাত, মোহনভোগ, কোহিতুর, গোলাপখাস, মল্লিকা, গোবিন্দভোগ, সুরাট বোম্বাই, ক্ষীরমোহন, দাদাভোগ, আলমশাহী, জামাইপছন্দ, আশ্বিনা, জগৎমোহিনী, রানিভোগ, বাতাসা, রাজভোগ, লতাবোম্বাই ও চোষা। এ ছাড়া রয়েছে মিশ্রিদানা, কালোপাহাড়, রাজলক্ষ্মী, গোল্লাছুট, স্বর্ণলতা, বউভুলানী, মিসরিমালা, মোহনবাসি, রাজভোগ, মধুকুলকুলি, হাঁড়িভাঙা, লক্ষ্মণভোগ, কালিদাসবাবু খায়, মাধুরী, আচাররাজ, ফালুয়া, বেগমবাহার, রত্না, লুবনা, মিক্সড স্পেশাল, বারি-৪, গৌড়মতি, সূর্যডিম, কমলাভোগ, বেলখাস, বিশ্বনাথ, বনখাসা, ভারতি, রাখালভোগ, নাকফজলি, নাগফজলি, মনোহারা, সিঁদুরে, গুটুলে, নিলাম্বরী, তোতামুখী, রসখাজা, তিলে বোম্বায়, আলতাবানু, সাহেব খাস, চম্পা, শীতলপাটি, দুধস্বর, উড়িআম, সিন্ধু, মহানন্দা, বৃন্দাবনি, ছাটিয়াকরা প্রভৃতি।  পাকিস্তান থেকে  এসেছে আনোয়ার আতাউল; মিয়ানমার থেকে এসেছে রাঙ্গু আই বুকসেলাই আম; ফিলিপাইন থেকে এসেছে সুপার সুইট, থাইল্যান্ড থেকে এসেছে বারোমাসি কাঁচামিঠা, ব্যানানা ম্যাংগো এবং মালয়েশিয়া থেকে এসেছে লুবনা।

ফজলি: ফজলি অতি পরিচিত বিশেষ জাতের একটি আম-নাম। জন্মস্থান মালদহ। তখন মালদহ ছিল রাজশাহীর একটি অঞ্চল। মালদহে জন্ম বলে এটি মালদহি আম নামেও পরিচিত। ফজলি নামে পরিচিত আমকে চট্টগ্রামে আমরা ছোটোবেলায় মালদারি আম বলতাম।  ফজলি আমের নামকরণের সঙ্গে উদ্ভিদ বিজ্ঞানী ড. বি হ্যামিলটনের কীর্তি জড়িত। ফজলি নামকরণ নিয়ে একাধিক প্রবাদ রয়েছে। তবে হ্যামিলটন প্রবাদটি ঐতিহাসিক ভিত্তির কারণে সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য  মনে করা হয়। ফজলি নামকরণ বিষয়ে কয়েকটি প্রবাদ নিচে  উল্লেখ করা হলো:

প্রথম প্রবাদ:  গৌড়ে অবস্থিত  বাংলার স্বাধীন সুলতানদের ধ্বংসপ্রাপ্ত  প্রাসাদের বহিরাংশের একটি কক্ষে ফজলি বিবি নামের এক মহিলা বাস করতেন।ওই কক্ষের পাশে একটি আমগাছ ছিল।  যাতে ঢাউশ আকারের বড়ো বড়ো আম ধরত। ১৮১৩ খ্রিষ্টাব্দে পূর্ণিয়া, দিনাজপুর ও রাজশাহীর জেলার কিয়দংশ নিয়ে ড. বি হ্যামিলটনের( ১৮০৮ – ১৮০৯) নেতৃত্বে  নতুন জেলা মালদহ গঠন প্রক্রিয়া চলছে।

প্রসঙ্গত, স্কটিশ চিকিৎসাবিজ্ঞানী ড. বি হ্যামলিটন (১৫ই ফেব্রুয়ারি ১৭৬২ – ১৫ই জুন ১৮২৯) ভারতে অবস্থানকালীন ভূগোলবিদ, জরিপ-বিশারদ, জীববিজ্ঞানী ও উদ্ভিদবিজ্ঞানী হিসেবে অপরিসীম ভূমিকা রেখেছেন। ড. বি হ্যামিলটন (Dr. B. Hamilton) ভূগোলবিদ ও জীব-উদ্ভিদবিজ্ঞানী হিসেবে Dr Francis Buchanan,  Francis Hamilton ও Francis Buchanan-Hamilton প্রভৃতি নামেও পরিচিত।

নতুন জেলা প্রতিষ্ঠার বিষয়ে ভৌগোলিক অবস্থা আর জনমত গ্রহণের উদ্দেশ্যে  হ্যামিলটন সরেজমিন এলাকা পরিদর্শনে এসে ফজলি বিবির কক্ষের কাছে প্রাচীন সুলতান-প্রাসাদে শিবির  স্থাপন করেন। ফজলি বিবির  ডাক নাম ছিল ফজলি। ১৮০৮ খ্রিষ্টাব্দের আষাঢ় মাসের শেষ সপ্তাহের এক বিকেলে বৃদ্ধা ফজলি তাঁর গাছের কয়েকটি আম নিয়ে ড. বি হ্যামিলটনের শিবিরে যান। হ্যামিলটন তখন শিবিরের বারান্দায় বসে কয়েকজন অফিসারকে নিয়ে দাপ্তরিক আলোচনা করছিলেন। হাতে থলে নিয়ে এক বৃদ্ধাকে শিবিরের দিকে এগিয়ে আসতে দেখে পাহারাদারগণ বাধা দিলেন। হ্যামিলটনের নির্দেশে বৃদ্ধাকেভেতরে আসার অনুমতি দেওয়া হলো। আম আর বৃদ্ধার স্নেহার্দ্র দান দেখে মুগ্ধ হলেন বিশ্বখ্যাত উদ্ভিদ বিজ্ঞানী ড. বি হ্যামিলটন।

ড. বি হ্যামিলটন বললেন, তোমার নাম কী?
বৃদ্ধা বললেন, ফজলি।
আমের নাম কী? জানতে চাইলেন ড. বি হ্যামিলটন।
বৃদ্ধা বললেন, জানি না।

হ্যামিলটন মনে মনে সিদ্ধান্ত নিয়ে নিলেন তক্ষুনি, আমটির নাম হবে ফজলি।  ফজলি বিবি বখশিশ নিয়ে সন্তুষ্টচিত্তে চলে গেলেন। এরপর ড. বি হ্যামিল্টন ফজলির দেওয়া আম হতে বড়ো আকারের  একটি আম নিয়ে  শিবিরের পরিদর্শন কক্ষের টেবিলে রেখে পাশে  একটি কাগজে লিখে দিলেন: ফজলি আম। দ্রুত ছড়িয়ে পড়ল ফজলি, আম হয়ে; আম-নামে সর্বত্র। এরপর হ্যামিলটন ফজলি বিবির আমগাছ দেখতে যান। সে হতে ঢাউস সাইজের আমটির নাম হয়ে গেল ফজলি। প্রাক্তন মালদহ জেলার অংশ রাজশাহী অঞ্চল ফজলির জন্য বিখ্যাত।  হ্যামিলটন বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি প্রয়োগ করে এই আম জাতটির আরও উন্নতি ঘটান।

ফকির ভোগ: ফজলির আরেক নাম ফকির ভোগ। ফজলি বিবির তাঁর কক্ষের পাশে অবস্থিত  এই গাছের  আম দিয়ে ফকির-সন্ন্যাসীদের আপ্যায়ন করতেন বা ভোগের জন্য দিতেন। তাই এর আরেক নাম ফকিরভোগ। 

ফজলি আম গড়ে লম্বায় ১৩.৮ সে.মি. পাশে ৯.৫ সে.মি.  উচ্চতায় ৭.৮ সে.মি.  এবং ওজনে  ৬৫৪.৪ গ্রাম। পাকা আমের ত্বকের রং সবুজ ও হালকা হলুদাভ মিশেল। আঁশবিহীন রসালো সুগন্ধযুক্ত সুস্বাদু ও মিষ্টি ফজলি আমের মিষ্টতার পরিমাণ ১৭.৫ শতাংশ। আষাঢ়-শ্রাবণ মাসে ফজলি আম পাকে। 

দ্বিতীয় প্রবাদ:  কথিত হয়, সুলতান ইউসুফ আদিল শাহের (১৪৫০–১৫১০ খ্রিষ্টাব্দ)  প্রিয় নর্তকী ফজলি বিবি বা ফজলি হতে আম্রনাম হিসেবে ফজলি নামের উদ্ভব। সুলতান ইউসুফ আদিল শাহ তাঁর রাজকীয় ভবনের নিকটে অবস্থিত আম্রকাননে  ফজলির  আনন্দ-ফুর্তি ও আরাম আয়েশের জন্য একটি বিশাল ভবন নির্মাণ করে দেন।  আরাম আয়েশে থাকতে  কয়েক বছরের মধ্যে ফজলবিবি বেঢপ মোটা হয়ে যান। বিশালাকৃতির ফজলি বিবির বিশাল ভবনের লাগোয়া আমগাছেও ফলত বিশালকার আম। তাই লোকজন আমের সঙ্গে ফজলির তুলনা টেনে ব্যঙ্গ করে বড়ো সাইজের আমকে ফজলি আম বলতে শুরু করে। ফলে আমটির নাম হয়ে যায় ফজলি আম।

তৃতীয় প্রবাদ: এটি গল্প বা কাল্পনিক প্রবাদ নামেও পরিচিত। বলা হয়, ১৮০০ খ্রিষ্টাব্দে মালদহের কালেক্টর মিস্টার র‌্যাভেনস অবকাশ যাপনে এসে ফজলি বিবির বাড়ির পাশে শিবির স্থাপন করেন। একদিন ফজলি বিবি তাঁর গাছের আম নিয়ে কালেক্টর র‌্যাভেনসের  সঙ্গে দেখা করতে যান। আম দেখে এবং খেয়ে মুগ্ধ র‌্যাভেনস  ফজলি বিবিকে বললেন, “What is the name of this mango?”  ফজলি বিবি ইংরেজি বুঝতেন না। মনে করলেন, কালেক্টর সাহেব তাঁর নাম জানতে চাইছেন। বললেন, ফজলি। কালেক্টর সাহেব বুঝলেন, আমটির নাম ফজলি। ফজলি বিবি বখশিশ নিয়ে চলে গেলেন। এরপর কালেক্টরের কাছে এত বড়ো আকারের আম দেখে অনেকে  নাম জানতে  চাইলেন। কালেক্টর সবাইকে বললেন, ফজলি আম। সে হতে আমটির নাম হয়ে গেল ফজলি। এটি আসলে নিছক প্রবাদ এবং এর কোনে ঐতিহাসিক ভিত্তি নেই। কারণ, ১৮০০ খ্রিষ্টাব্দে মালদহ জেলা গঠন হয়নি।   জেলা গঠিত হয়নি। মালদহ জেলা গঠনের ঘোষণা দেওয়া হয় ১৮০০ খ্রিষ্টাব্দে। ১৮৩২ খ্রিষ্টাব্দে সৃজন করা হয় পৃথক ট্রেজারি। ১৮৫৯ খ্রিষ্টাব্দে কালেক্টর নিয়োগ করা হয়। তাছাড়া বর্ষাকালে প্রাচীন পরিত্যক্ত প্রাসাদের কাছে শিবির স্থাপন করে অবকাশ যাপনের কথা হাস্যকর। দেখুন: মালদহ জেলা

চতুর্থ প্রবাদ: এটি আমি আমার পিতামহের কাছে শুনেছি। তিনি ছিলেন কলকাতা আলিয়া মাদ্রাসার শিক্ষক। অবিভক্ত বাংলার প্রথম প্রধানমন্ত্রী এ কে ফজলুল হক (২৬ অক্টোবর ১৮৭৩-২৭ এপ্রিল ১৯৬২) থেকে ফজলি নামের উদ্ভব। ঢাউস আকারের আমটি ছিল ফজলুল হক সাহেবের খুব প্রিয়। আমের মৌসুমে কোথাও গেলে আপ্যায়নে এই আম দিলে তিনি খুব খুশি হতেন। একাই একসঙ্গে বিশটি আম সাবাড় করে দিতেন। তাই আমটির নাম হয়ে যায় ফজলি আম।

ল্যাংড়া: নামে কী যায় আসে যায়? হোক না ল্যাংড়া, তবু ল্যাংড়াই ছিল সম্রাট আকবরের প্রিয় আম।  এটি যেমন সুস্বাদু তেমনি মিষ্টি। ল্যাংড়ার  জন্মস্থান ভারতের বেনারস এবং দাঁড়াভাঙা।  ওখান থেকে এটি ক্রমশ ভারতবর্ষের অনেক জায়গায় ছড়িয়ে পড়ে।  যশোর, সাতক্ষীরা অঞ্চলে বড়ো আকৃতির সাদাটে এই আম দাঁড়াভাঙা ল্যাংড়া নামে পরিচিত। রাজশাহী অঞ্চলেও প্রচুর  উন্নতজাতের ল্যাংড়া ফলে।  কথিত হয়, বেনারসের একজন ল্যাংড়া ফকির এই প্রজাতির কয়েকটি আম গাছের নিচে বাস করতেন। ফলে আমটির নাম হয়ে যায় ল্যাংড়া।  এই আমের খোসা পাতলা। আঁটি ছোটো। শাঁস হলুদাভ, সুগন্ধি, সুস্বাদু, সুমিষ্ট ও আঁশবিহীন। গড়ে ৯.৭ সে.মি. লম্বা, ৭.৩ সে.মি. চওড়া ও ৫.২ সেমি উঁচু।  গড় ওজন ৩১৪.১ গ্রাম। মিষ্টতার পরিমাণ ১৯.৭ শতাংশ। জ্যৈষ্ঠের শেষদিকে এই আম পাকতে শুরু করে। পুরো আষাঢ় জুড়ে ল্যাংড়া পাওয়া যায়।
আলফানসো:পৃথিবীর সবচেয়ে দামি ও জনপ্রিয় আম আলফানসো। জনেক পর্তুগিজ সামরিক বিশেষজ্ঞ আলফানসো ডি আলবাকারকি’-এর নামানুসারে আমের এই বিশেষ জাতের নাম রাখা হয় আলফানসো। আলফানসোর জন্ম গোয়ায়।  তিনি ভারতের গোয়া রাজ্যে দুটি ভিন্ন জাতের আমের চারার কলম থেকে জাতটি উৎপাদন করেন। তাই তার নামানুসারে আমটির নাম রাখা হয় আলফানসো। জন্মস্থান গোয়া হলেও বর্তমানে মহারাষ্ট্রের রত্নাগিরিতে উৎপাদিত আলফানসো সর্বোৎকৃষ্ট। আলফানসোর স্থানীয় নাম ‘কাকডি হাপুস’। কাকডি হাপুস অর্থ কাগজের মতো পাতলা খোসা যার। আলফানসো আমের খোসা কাগজের মতো পাতলা। তাই নাম স্থানীয় নাম কাকডি হাপুস।   মহারাষ্ট্রের পুনে, উড়িষ্যার দেবগড়, গুজরাটের বলসাদ, কর্ণাটকের বেঙ্গালুরু এবং পশ্চিমবঙ্গের মালদা, মুর্শিদাবাদ ও পুরুলিয়ায় বাণিজ্যিকভাবে আলফানসো চাষ করা হয়। এখন আরও অনেক এলাকায় আলফানাসোর চাষ হচ্ছে। বর্তমানে চাঁপাইনবাবগঞ্জ, ঠাকুরগাঁও ও কুষ্টিয়া জেলায় কিছু কিছু এলাকায় ক্ষুদ্র পরিসরে আলফানসো আমের চাষ করা হচ্ছে। কুষ্টিয়াতেও সীমিত পরিসরে আলফানসোর চাষ করা হচ্ছে।
ভারতে এক কেজি আম্রপলি  হিমসাগর বা ল্যাংড়ার দাম যেখানে ৩০ রুপি সেখানে এক কেজি আলফানসোর দাম জাতভেদে  ৮০০ রুপি থেকে ১২০০ রুপি পর্যন্ত হয় । আঁশবিহীন আলফানাসো সুগন্ধ এত আকর্ষণীয় ও তীব্র যে, উন্নত জাতের একটি পাকা আলফানসো এক মিনিট হাতে রাখলে  হাতও সুগন্ধে ভরে যায়। ভারতে উৎপাদিত অধিকাংশ আলফানসো বিদেশে রপ্তানি করা হয়।  আলফানসো  গাছ আকারে মাঝারি এবং ফল প্রায় গোলাকার। পাকলে বাহিরে-ভেতরে হলুদ রং ধারণ করে। মিষ্টি, ব্যতিক্রমি সুগন্ধ আর স্বাদের জন্য আলফানসো বিশ্বব্যাপী খ্যাত।  এপ্রিলের মাঝামাঝি থেকে শুরু করে জুন মাসের শেষ পর্যন্ত আলফানসো আম পাওয়া যায়। এ জাতের আম গোলাকার ও ডিম্বাকৃতির।
error: Content is protected !!