আলবেনিয়া (Albania) : ইতিহাস ও নামকরণ

কীভাবে হলো দেশের নাম

ড. মোহাম্মদ আমীন

আলবেনিয়া (Albania)

আলবেনিয়া দক্ষিণ-পূর্ব ইউরোপের বলকান উপদ্বীপের উত্তর-পশ্চিম প্রান্তে ইতালি থেকে ৭৬ কিলোমিটার ব্যবধানে অবস্থিত। এর মাঝখানে রয়েছে আড্রিয়াটিক সাগর। আলবেনিয়ার সমুদ্রতটরেখার দৈর্ঘ্য ৩৬২ কিলোমিটার। এর সামুদ্রিক বিস্তার ১২ নটিকাল মাইল। ২৭৫৪ মিটার উচ্চতাবিশিষ্ট গোলেম কোরাব আলবেনিয়ার সর্বোচ্চ পর্বতশৃঙ্গ। আলবেনিয়ার প্রায় ৭০ ভাগ পার্বত্যভূমি। বাকিটুকু সমুদ্র-উপকূলীয় সমভূমি। কিন্তু সমভূমি হলেও  অল্পাংশই কৃষি কাজের যোগ্য।

আলবেনিয়া শব্দের বাংলা অর্থ আলবেনিয়ানদের দেশ। ১০৮০ খ্রিষ্টাব্দে প্রকাশিত মাইকেল অ্যাটেলিয়েটসের (Michael Attaliates) লেখা ইতিহাসে আলবেনিয়া নামের উৎপত্তি ও উৎসগত একটি বিবরণ পাওয়া যায়। আলবেনিয়া শব্দের মূল উৎস ল্যাটিন। বাইজানটাইন গ্রিক ভাষায় আলাবানিয়া অর্থ বিদ্রোহী আলবানিওদের দেশ। সম্রাট প্রথম আলেক্সিয়াসের কন্যা আন্না কোমনেনা (Anna Comnena)-এর লেখা অলেক্সিয়াডে (Alexiad) নামক ইতিহাস গ্রন্থেও মাইকেল অ্যাটেলিয়াটসের বক্তব্যের সমর্থন পাওয়া যায়। অলেক্সিয়াডে উল্লেখ আছে যে, আলোচ্য স্থানে বসতি স্থাপনকারীগণ আলবানোন বা আরবানোন নামে পরিচিতি ছিল। মাইকেল অ্যাটোলিয়াটেস ও আন্না কমনেনা ইলাইরিয়ান Illyrian tribe) উপজাতিগোষ্ঠীর স্বর্ণযুগে জীবিত ছিলেন।

১৫০ খ্রিষ্টাব্দে টলেমির বিবরণে দেখা যায়, আলাবানিরা আধুনিক ডুরেস এলাকার উত্তর-পশ্চিমাংশে অবস্থিত আলবানোপোলিশ এলাকায় বসবাস করত। কথিত হয়, ল্যাটিন ‘আলবা’ নাম হতে ‘আলাবানি’ নামের উৎপত্তি। ল্যাটিন ‘আলবা’ শব্দের বাংলা প্রতিশব্দ সাদা। আবার অনেকে মনে করেন, আলবা প্রোটো-ইন্দো-ইউরোপিয়ান শব্দ, যার অর্থ পাহাড় অথবা জল। তবে শব্দটি যে ভাষার হোক, আলবা শব্দ হতে যে, আলাবানি বা আলবেনিয়া শব্দের উৎপত্তি সে বিষয়ে ইতিহাসবেত্তাদের কোনো দ্বিমত দেখা যায় না।

অনেকের মতে, এ জনগোষ্ঠীর লোকেরা প্রথম যে স্থানে বসত গাড়ে তুলেছিলেন সে স্থানে আলবা (পাহাড়) এবং আলবা (জল) ছিল। তাই জনগোষ্ঠীটি ক্রমশ আলবানি নামে পরিচিতি পায়। এর অর্থ পাহাড়-জলের অধিকারী। পাহাড়-জলের অধিকারী হলে এলাকাটিকে সমৃদ্ধ মনে করা হতো। সেকালে এ দুটির সমন্বয় ছিল অত্যন্ত মূল্যবান। আলবানিয়ান একটি ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষা। আলবেনিয়া, কসোভো, বলকান এলাকা এবং রিপাবলিক অব মেসিডোনিয়া, দক্ষিণ মন্টেনেগ্রো, বসনিয়া ও ইটালিতে অবস্থতি আলবানিয়ানসহ প্রায় ৭.৪ মিলিয়ন লোক আলবানিয়ান ভাষায় কথা বলে।

আলবেনিয়া মধ্যযুগীয় ল্যাটিন নামের একটি দেশ। তখন দেশটি মূলত অধিবাসীদের কাছে স্কিপেরি (Shqiper) নামে পরিচিত ছিল। গ্রিকগণ এটাকে বলত আলবানিতিয়া বা আরবানিতিয়া। টলেমির বিবরণ দৃষ্টে  দেখা যায় Ñ সম্ভবত, ইলিরিয়ান ভাষার শ্বদ আলবানি হতে নামটির উদ্ভব। আলেকজান্দ্রিয়ার জ্যোতির্বিদ ও ভূগোলবিদ টলেমি ১৫০ খ্রিস্টাব্দে এ অঞ্চলের একটি মানচিত্র অঙ্কণ করেন। ওই মানচিত্রে ডুরেস এর উত্তর-পূর্বে আলবানোপোলিশ নামের একটা শহর নির্দেশ করা হয়। বিশেষজ্ঞদের অভিমত, বর্তমান আলেবিনায়ই হচ্ছে সে শহর। বাইজানটাইন ইতিহাসবেত্তা মিখাইল অ্যাটেলিয়েটস প্রথম লিখেন যে, আলবেনিয়ান লোকেরাই ১০৪৩ খ্রিস্টাব্দে প্রথম কন্সটান্টিনোপল (Constantinople) এর বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করে। মধ্যযুগে আলবেনিয়রা তাদের দেশকে আরবেরি বা আরবেনি এবং নিজেদেরকে আরবেরেশ বা আরবেনেশ বলত। মূলত Shqiptare নামটি পরিবর্তিত হয়ে আরবেরিয়া বা আরবেরেশ নামে পরিণত হয়। এ পদ দুটির যে অর্থ সর্বজনীন বলে গ্রাহ্য সে দুটি অর্থ হচ্ছে : (১) ঈগলের দেশ এবং (২) ঈগলের বাচ্চা। আসলে কন্সটান্টিনপোল এর মতো বিশাল সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে যারা বিদ্রো করেছে, করার সাহস  দেখিয়েছে এবং তারপরও টিকেছিল একটা ভূখণ্ডেÑ সত্যি তারা ঈগল এবং তাদের দেশ ঈগলের দেশ। যারা এ কাজ করেছে, তারা তো ঈগলের বাচ্চা। যে ছো মেরে সহস্র প্রতিকূল অবস্থার মধ্যেও নিজের শিকারটি নিয়ে আসে। হয়তো, আফ্রিকায় হলে তাদের বলা হতো সিংহের বাচ্চা আর উপমহাদেশে হলে বাঘের বাচ্চা।

আলবেনিয়ার মোট আয়তন ২৮,৭৪৮ বর্গকিলোমিটার বা ১১,১০০ বর্গমাইল। মোট আয়তনের ৪.৭% জলীয় অংশ। ২০১৫ খ্রিস্টাব্দের হিসাবমতে, আলবেনিয়ার জনসংখ্যা ২৮,৯৩,০০৫ এবং প্রতি বর্গকিলোমিটারে জনসংখ্যার ঘনত্ব ৯৮। আয়তন বিবেচনায় আলবেনিয়া পৃথিবীর  ১৪৩-তম বৃহত্তম রাষ্ট্র কিন্তু জনসংখ্যার ঘনত্ব বিবেচনায় ৬৩-তম জনবহুল দেশ। তিরানা দেশটির রাজধানী ও বৃহত্তম শহর। সরকারিভাষা আলবেনিয়ার অধিবাসীদের আলবেনিয়ান বলা হয়। আলবেনিয়ার সরকারি ভাষা আলবেনিয়ান। ঘেগ ও তোস্কের মিলিত রূপই হচ্ছে আলবেনিয়ান ভাষা। এখানে সংখ্যালঘু গ্রিকদের ভাষাও প্রচলিত। পাশাপাশি সার্বিয়ান, মেসিডোনিয়ান, রোমানি এবং অ্যারোমেনিয়ান ভাষা চালু আছে। সিআইএ ওয়ার্ল্ড ফ্যাক্টবুকের তথ্যমতে, আলবেনিয়ার ৭০ শতাংশ মুসলিম, ২০ শতাংশ অর্থোডক্স এবং ১০ শতাংশ রোমান ক্যাথলিক।

১৯১২ খ্রিষ্টাব্দের ২৮ নভেম্বর দেশটি অটোমান সাম্রাজ্য হতে স্বাধীনতা লাভ করে।  ১৯৩৯ খ্রিষ্টাব্দের ৭ এপ্রিল থেকে ১৯৪৪ খ্রিষ্টাব্দের ২৯ নভেম্বর পর্যন্ত এটি ইতালি, নাজি জার্মানির দখলে ছিল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে ইতালি ও জার্মানির পরাজয়ের পর ১৯৪৬ খ্রিষ্টাব্দের ১১ জানুয়ারি এটি পিপলস রিপাবলিক অব আলবেনিয়ায় পরিণত হয়। ১৯৯৮ খ্রিষ্টাব্দের ২৮ নভেম্বর বর্তমান সংবিধান গৃহীত হয়। ২০১৫ খ্রিষ্টাব্দের হিসাবমতে, আলবেনিয়ার জিডিপি (পিপিপি) ৩২.২৫৯ বিলিয়ন ইউএস ডলার এবং সে হিসাবে মাথাপিছু আয় ১১,৭০০ ইউএস ডলার। অন্যদিকে, জিডিপি (নমিনাল) ১৪.৫২০ বিলিয়ন ইউএস ডলার এবং মাথাপিছু আয় ৫,২৬১ ইউএস ডলার। মুদ্রার নাম লেক।

১৫শ শতকে আলবেনিয়া উসমানীয় সাম্রজ্যের অধীনে আসে এবং ১৯১২ খ্রিস্টাব্দের পূর্ব পর্যন্ত  স্বাধীনতা লাভ করেনি। ১৯৪৪ খ্রিষ্টাব্দ থেকে ১৯৯০ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত এটি একটি সাম্যবাদী রাষ্ট্র ছিল। ১৯৯১ খ্রিষ্টাব্দে  দেশটি গণতন্ত্র ও বাজার অর্থনীতি ব্যবস্থায় রূপান্তর শুরু করে। তিরানা আলবেনিয়ার বৃহত্তম শহর ও রাজধানী। মুদ্রার নাম লেক। ১৯৯২ খ্রিস্টাব্দের ৭ এপ্রিল বর্তমান পতাকা গৃহীত হয়। তবে এ দেশের পতাকা প্রথম গৃহীত হয় ১৯১২ খ্রিষ্টাব্দে।

ইউরোপ মহাদেশের প্রেক্ষাপট বিবেচনায়, আলবেনিয়া দরিদ্র তবে এশিয়া ও আফ্রিকার মহাদেশের অধিকাংশ দেশের চেয়ে ধনী।  দেশটিতে পেট্রোলিয়াম ও প্রাকৃতিক গ্যাসের খনি রয়েছে। তবে তেল উৎপাদনের হার খুব কম। মাত্র ছয় হাজার ৪২৫ ব্যারেল। এছাড়া এখানে কয়লা, বক্সাইট, কপার এবং লোহার খনি রয়েছে। আলবেনিয়ার ৫৮ শতাংশ লোক কৃষিকাজে নিয়োজিত কিন্তু জিডিপিতে তাদের অবদান মাত্র ২১ শতাংশ ।

১৯৭৯ খ্রিষ্টাব্দে শান্তিতে নোবেল পুরস্কার বিজয়ী মাদার তেরেসার পুরো নাম অ্যাগনেজ গোনক্সহা বোজাক্সহিওকে (Agnes Gonxha Bojaxhiu) আলবেনিয়ান বলে দাবি করা হয়। যদিও তিনি ১৯১০ খ্রিষ্টাব্দে বর্তমান মেসিডোনিয়া এবং তৎকালীন অটোমান সাম্রাজ্যে জন্মগ্রহণ করেন। তিরানা আন্তর্জাতিক বিমান বন্দর ২০০১ খ্রিষ্টাব্দে মাদার তেরেসার নামে নামকরণ করা হয়েছে। এর পুরো নাম Tirana International Nene Tereza)। আলবেনিয়ানরা যদি কোনো বিষয় মাথা উপরে-নিচে নাড়ে তাহলে বুঝতে হবে না এবং ডানে-বামে নাড়লে বুঝতে হবে হ্যা। ইউরোপীয়ান দেশসমূহের মধ্যে কেবল আলবেনিয়া, আর্মেনিয়া ও ভ্যাটিকান সিটিতে ম্যাকডোনাল্টের কোনো শাখা নেই। আলবেনিয়ায় যত আলবেনিয়ান আছেন, তার চেয়ে বেশি বাস করেন আলবেনিয়ার বাইরে। এ দেশের রেল ও সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থা খুব খারাপ।

অন্যান্য মুসলিম সংখ্যাগুরু দেশের ন্যায় এখানেও সার্বিক ব্যবস্থাপনা বেশ নাজুক। সংকীর্ণ স্বার্থচিন্তা প্রবল। মধ্যপ্রাচ্য, আফ্রিকা ও  এশিয়ার দেশের মতো ধর্মীয় হানাহানি না থাকলেও সংকীর্ণতার গণ্ডী ছাড়িয়ে সর্বজনীন কল্যাণে নিবেদিত হওয়ার মানসিকতা তাদেরকে ইউরোপের সবচেয়ে গরীরব, দুর্বল ও অনুন্নত দেশে পরিণত করেছে। এখনও আলবেনিয়ার বিভিন্ন অংশে ৭,৫০,০০০ এর মতো কংক্রিট বাংকার রয়েছে। তবে প্রকৃতি দিয়েছে আলবেনিয়াকে উজাড় করে। মানুষ কিন্তু তা সাজাতে পারছে না। তিরানা খুব সুন্দর, সবুজ ও রঙবেরঙের ফুলেফলে ভর্তি একটি শহর। মার্কেটিঙের ক্ষেত্রে ইউরোপেও এর সুনাম রয়েছে। গরীব তিরানাবাসী অল্প লাভ হলেই পণ্য বিক্রি করে দেয়।

কীভাবে হলো দেশের নাম

ইসরায়েল (Israel) : ইতিহাস ও নামকরণ

বার্মা (Burma) : ইতিহাস ও নামকরণ

সূত্র:  কীভাবে হলো দেশের নাম, ড. মোহাম্মদ আমীন, পুথিনিলয়, বাংলাবাজার, ঢাকা।

error: Content is protected !!