আস্তাকুঁড় না আঁস্তাকুড়

ইউসুফ খান

আস্তাকুঁড় না আঁস্তাকুড়

বাংলা একাডেমীর ব্যাবহারিক বাংলা অভিধানের ‘আঁস্তাকুড়’ আধুনিক বাংলা অভিধানে হয়েছে ‘আস্তাকুঁড়’। এই কথাটার ঠিক বানান ঠিক করতে হলে আমাদের একটু প্রাচীন বাংলার গ্রাম্য জীবনকে জানতে হবে।

আঁস
আঁস মানে আঁশ আঁষ আঁইষ আমিষ। আঁষ কোটার বঁটি হচ্ছে ‘আঁশবঁটি’। এককালে আঁষ-হেঁশেলে আঁষ-হাঁড়িতে আঁষ-তরকারি রাঁধতে হতো। আঁষটে গন্ধ

ইউসুফ খান

আছে তাই ‘আঁশফল’। ‘এখন আমায় মাছ কুটতে বলিস না, আমার চান হয়ে গেছে, আমি আঁশ-হাত করতে পারবো না’। এই আঁশ মানেও আঁষ আমিষ, মোটেও মাছের আঁশ scale নয়। শ্রাদ্ধের আগের কদিনের নিরামিষ খাওয়ার নিয়ম ভঙ্গ করা হয় শ্রাদ্ধের পরে জ্ঞাতিদের আমিষ খাইয়ে। একে বলে ‘আঁশছোঁয়ানি’ বা নিয়মভঙ্গ বা জ্ঞাত্‌ভোজন বা মৎস্যমুখী। মৎস্যমুখী কারণ আমিষ বলতে মূলত মাছই খাওয়ানো হয়, আর সাধ্য থাকলে তবে সঙ্গে পাঁঠার মাংস।

মাস
মাস মানে মাঁস মাংস। মাংসের অনুস্বারটা চন্দ্রবিন্দু হয়ে মাঁস হয়েছে। মাঁসের ম-তেই নাসিক্য ধ্বনিটা এসে যাচ্ছে বলে চন্দ্রবিন্দুটা বাহুল্যবোধে উঠে গিয়ে মাঁস হয়েছে মাস। আঁষ থেকে চন্দ্রবিন্দু লোপ হবার সেই কারণটা নেই। বাঙালির মাস মানেই মাছ। মানে মাছেভাতে বাঙালির পাতে মাংসের প্রধান সোর্স জলের মাছ। আদি বাঙালি অবশ্য মাসের আশ মেটাতে আরও অনেক কিছু খেতো – জলের গেঁড়ি গুগলি শামুক ঝিনুক আর বনের কুক্কুট মুরগি। এগুলো মূলত প্রান্তিক মানুষরাই খেতো। মাসের জন্য বাঙালি মোষও খেয়েছে তবে মাস লেভেলে নয়।

আঁস্তা
আমিষ আঁষ সম্পর্কিত যা কিছু তা আঁষতা আঁসতা আঁচতা আঁষটা আঁষটে আঁশটে। ‘আড় মাছের আঁশটে গন্ধ রাঁধলেও যায় না’। ‘হেডস্যারের সঙ্গে ইংলিশ ম্যামের একটা আঁষটে সম্পর্ক আছে’ – মানে সম্পর্কটা নিরামিষ নয়। মাছ কুটে তার নাড়ি-ভুঁড়ি-আঁশ-কাঁটা যা ফেলে দিতে হয় সেগুলোও আমিষ দ্রব্য তাই সেগুলো আঁষটা আঁসতা। কুক্কুট কেটে, গেঁড়ি গুগলি শামুক থেঁতলে, ঝিনুক খুলে মাঁসটা আলাদা করে নিয়ে যে সব গারবেজ ফেলে দিতে হয় সে সবও আমিষ-লাগা জিনিস তাই সেগুলোও আঁষটা আঁসতা। বাড়িতে-কাটা মুরগির ছাল চামড়া পালক এসবও গেরস্ত বাড়ির আঁষতা গারবেজ। খাওয়া দাওয়ার পর মাছ মাংসের যে এঁটোকাঁটা পাতে পড়ে থাকে সেগুলো হচ্ছে লেভেল টু গারবেজ, নাশতার পরের আঁষতা – আঁষ্টা এঁঠা এঁটো উচ্ছিষ্ট।

ওঁচলা ওঁৎলা
আমাদের মা কাকিমারা রান্না বসানোর আগে আলু লাউ পটল ডাঁটা আম আমড়া চেঁচে-ছিলে-ছুলে যে ছালগুলো ফেলে দেন, বা শাক-পাতা বেছে যে মরা-ঝরা পাতা উঁচলে ফেলে দেন তাকে বলে – ওঁচলা। আর উঠোন ঝেঁটিয়ে যে ঘাস পাতা আলগা-ধুলো জড়ো করা হয় তাকে বলে ওঁৎলা।

কুড়
মা কাকিরা বাড়ির সব আঁস্তা ওঁচলা ওঁৎলা বাড়ির বাইরে কোনও ফাঁকা ভুঁয়ের ওপর রোজ একই জায়গায় ফেলেন। এটাকে বলে রাশি করা গাদি করা ঢিপ করা কুড় করা। আর জায়গাটাকে বলে কুড় বা কুড়া। আগেকার দিনে অনেক গেরস্ত রোজ কলাপাতায় ভাত খেতো। এই কারণেই ‘বাড়িতে অনেক কটা পাত পড়ে’ কথাটা আছে। ভাতের এই পাতগুলোও ওই একই কুড়ে যেতো। রোজ যেখানে আঁস্তার ঢিপ করা হয় সেটা আঁস্তার কুড় – আঁস্তাকুড়। রোজ যেখানে গোবর লাদ লাদি জড়ো করা হয় সেটা গোবরকুড় বা সারকুড়, কারণ এই গোবর পচেই গোবরসার তৈরি হয়। জলের ধারে ঝোপের যে জায়গায় রোজ বাড়ির বউঝিরা বসে হাগতো তাকে বলতো গুকুড়। তুষের উনুনের ছাই পাঁশ যেখানে কুড় করা হয় তা পাঁশকুড় বা পাঁশকুড়া।
বাংলা কুড় প্রাকৃত কুড আর সংস্কৃত কুট একই কথা। মানে ঢিপি স্তুপ। কুড়ে রোজকার আঁস্তা বা গোবর ফেলার ফলে জায়গাটাতে ময়লার একটা উঁচু ঢিপি তৈরি হয়ে যায়। যারা সারকুড় দেখেছেন আর মোরগকে দেখেছেন সারকুড়ের মাথায় চড়ে ডাকতে তারা জানেন সারকুড় কেন কুড়। ছোটোবেলায় সাঁওতাল আর ভূমিজ-কামার পাড়ার বাঁশঝাড়ের মধ্যে ঝিনুক শামুক গুগলি খোলার ঢিপ করা আঁস্তাকুড়ও দেখেছি।

চন্দ্রবিন্দুর চাঁদ
আমিষ-এর ম চন্দ্রবিন্দু হয়ে আঁষ হয়েছে। পয়েন্ট টু বি নোটেড। এর নানান বানান দেখা গেছে – আঁষ আঁশ আঁস আঁচ আঁষটা আঁশটে আঁসতাকুড় আঁচতাকুড়। সবেতেই চন্দ্রবিন্দু আছে। তাই আঁস্তাকুড় বানানে চন্দ্রবিন্দুটার চাঁদটা আ-এর মাথাতেই থাকবে। জীবনে আঁস্তাকুড় সারকুড় গুকুড় সবই দেখেছি, কিন্তু কোনওদিন এই কুড়গুলোকে কুঁড় উচ্চারণ করতে শুনিনি।

একাডেমির আস্তাকুঁড়
পণ্ডিতরা আঁস্তাকুড়ের ব্যুৎপত্তি দিচ্ছেন আচতাকুঁড় < আচমন-কুণ্ড, মানে যে গর্তে আঁচানো হয়। কুণ্ড-র ণ চন্দ্রবিন্দু হয়ে কুঁড় হয়েছে। আঁশতাকুড়ে আঁশতা ফেলে মানুষ আর তার দিকে ফিরে তাকায় না, নোংরা বলে এড়িয়ে চলে। দীনবন্ধু মিত্রর বিয়ে পাগলা বুড়ো নাটকে আছে ‘আঁস্তাকুড়ের পাত কখন স্বর্গে যায়’। মানে কখনও যায় না, এতই নোংরা অচ্ছুৎ। বানানটা দেখুন।
মানুষ খেয়েদেয়ে হাত মুখ ধোয় দাওয়ার ধারিতে দাঁড়িয়ে বা বসে। মুখধোয়া কুলকুচো করা জল উঁচু থেকে নিচুতে উঠোনে পড়ে, ছিটকে গায়ে আসে না। খেয়েদেয়ে বাড়ির বাইরে উজিয়ে গিয়ে নোংরা আঁস্তাকুড়ে কেউ আঁচাতে যায় না, নোংরা থেকে জলের ছিটে গায়ে এসে পড়বে। আর কুণ্ড মানে গোল গভীর গর্ত। আঁস্তাকুড় সারকুড় কেউ কুয়োর মতো গর্ত খুঁড়ে তৈরি করে না। আর বনে গিয়ে বউ হাগবে বলে সেখানে কেউ গর্ত খুঁড়ে আসে না।
মুজতবা আলী বলতেন, পণ্ডিতদের সবই ভালো তবে দোষের মধ্যে এই যে ব্যাটারা বড়ো মূর্খ। শহুরে সংস্কার সংস্কৃতি আর সংস্কৃতে থাকা পণ্ডিতেরা গ্রাম্য অনুষঙ্গ না বুঝে বানানো ব্যুৎপত্তি দিয়ে বানান বদলে দিয়েছেন। আঁস্তাকুড়কে আস্তাকুঁড় বানিয়েছেন। একাডেমী ব্যবহারিক জ্ঞান হারিয়ে পণ্ডিতদের খোঁড়া গর্তে পড়ে আধুনিক হয়েছে। আস্তাকুঁড়ের স্থান আঁস্তাকুড়ে হোক।

উৎস:  আঁস্তাকুড় না আস্তাকুঁড়,  ইউসুফ খান, শুদ্ধ বানান চর্চা (শুবাচ)

কলকাতা, ২০২০ আগস্ট ১৩


শুবাচ গ্রুপের লিংক: www.draminbd.com
তিনে দুয়ে দশ: শেষ পর্ব ও সমগ্র শুবাচ লিংক
ইউসুফ খানের লেখা———–
error: Content is protected !!