আহ্লাদে আটখানা কেন

ইউসুফ খান

অট্টহাসি
অট্ট আগে বিশেষণ হিসেবে ব্যবহার হতো, যার মানে – মাত্রা ছাড়িয়ে বেশিবেশি বাড়িয়ে পেরিয়ে। হাসি যেমন হয় হাসি তেমনই, কিন্তু হাসি যখন বাড়াবাড়ি মাত্রাছাড়া হয় তখন তাকে বলে অট্টহাস অট্টহাসি অট্টহাস্য। অট্টকে এরকম বিশেষণ হিসেবে বাংলায় শেষ ব্যবহার করেছেন বোধহয় রবীন্দ্রনাথ – অট্টকলহাস্য অট্টগরজ অট্টবিদ্রূপ এসব শব্দ উনি তৈরি করে ব্যবহার করেছেন।
মুখের কথায় এখনও অট্ট আছে। ‘ফুলবৌদি দেখতে সুন্দর তাই বলে অত অট্ট অট্ট করার মতোও কিছু নয়’। ‘ছেলে তো এই একবারই ক্লাসে ফার্স্ট হলো, তাতেই পুতুল কাকীমা এমন অট্ট অট্ট করে বেড়াচ্ছে যেন আর কারও ছেলে কোনোদিন ফার্স্ট হয়নি’। এই অট্ট অট্টকে পুরনো দিনে লেখা হতো অট্টঅট্ট অট্টট্ট। বাংলা ভাষার সাধুবাবারা অট্টকে উচ্চ বলে অনুবাদ করছেন – অট্টহাস্য মানে উচ্চহাস্য উচ্চকিত হাসি। অট্টকলস্বর অট্টনাদ অট্টনিনাদ অট্টরব অট্টরোল এসব এখনকার বাজারী বাংলা ডিকশনারিগুলো হাঁটকালেও পাওয়া যাবে। সুকুমার রায় লিখেছেন –
খুড়োর যখন অল্প বয়স – বছর খানেক হবে –
উঠল কেঁদে ‘গুংগা’ বলে ভীষণ অট্টরবে।
 
অট্টালিকা
অট্ট দিয়ে বাঙালী আর একটা কথা জানে – অট্টালিকা। ঘরের ওপর ঘর, একতলা ছাড়িয়ে যে আর একটা ওপর তলা তাকে বলতো অট্টাল অট্টালী। মানে দোতলাটা অট্টালী – উঁচুর তলা। যে বিল্ডিংএ অট্টালী আছে সেটাকে বলে অট্টালক অট্টালিক অট্টালিকা। তাই আসল মানেতে ধরলে একতলা হলে প্রাসাদও কিন্তু অট্টালিকা নয়।
মনে হচ্ছে অট্টালীর আদি মানে ছিলো অ্যাটিক, কারণ হিন্দিতে অ্যাটিককে বলে অটারি; আর মোগল পাঠান আসার আগে এদেশে দোতলা তেতলা দালান কোঠা অট্টালিকার ধারণা ছিলো না। কিন্তু ছাউনির নিচে বাঁশ কাঠ বিছিয়ে অ্যাটিক ছিলো। তাই অট্টালী-কে অটারী অ্যাটিক মনে হচ্ছে।
 
অট্‌ঠখেল
মা যখন তার বুলি না ফোটা বাচ্চার নাকে নাক ঘষে বা পেটে বিলি কাটে তখন বাচ্চা যে ভাবে হাসে তাকে বলে খিলখিল হাসি বা খলখল হাসি। স্কুলের মেয়েরা একসঙ্গে পথ চলতে চলতে যেভাবে হাসে সে হাসিও খিলখিল গিগ্‌ল্‌। উচ্চকিত খিলখিল হাসি অট্টখিল অট্টখেল। অট্টহাসির মতো অট্টখিল। প্রাকৃতে অট্ঠখেল অট্ঠখেল্ল অঠখেলী। শিশুর সশব্দ হাসাকে তাই হিন্দিতে বলে অঠখেলীয়াঁ কর্‌না। মায়ের সঙ্গে খেলতে খেলতে শিশু আহ্লাদে খিলখিল করে হাসে মানে – আহ্লাদে অঠখেল করে। আরবুঝো বাঙালী এটাকে দাঁড় করিয়েছে – আহ্লাদে আটখানা হয়।
পাতালঘরের ধাঁধা ‘আহ্লাদে আটখানা / সাতে পাঁচে নেই’ – এর মধ্যে একটাও সংখ্যা নেই!
 
খিল্লি করা
তিন নম্বর গার্লফ্রেণ্ডের কাছেও ছ্যাঁকা খেয়ে ব্যাঁকা হয়ে এলে ঠেকের বন্ধুরা আর আহা উহু করে না, খিলখিল করে হাসে আর নানা রকম বলে টিজ় করে। খিলখিল খিকখিক হিহি করে হেসে লেগপুলিং এর নাম তাই খিল্লি করা। হাজার হাজার বছর পরেও মূল মানেটা প্রবাহিত হয়ে এসে এতদিন পরে খিল্লি শব্দটা তৈরি হয়েছে।
 
খিলখিল আওয়াজ করে যে খিল্লি করা সেটাকে হিন্দিতে বলে খিল্লী উড়ানা। তেমনি অঠখেলিয়াঁ কর্‌না কথাটা থেকে এখন হিন্দিতে এসেছে অটখেলিয়াঁ সুঝ্‌না মানে আনন্দ হাসি খিল্লি করার বিষয় মনে হওয়া। ‘তুঝে অঠখেলিয়ঁ সুঝী হৈঁ হম বেজার বৈঠে হৈঁ’ – আমি ব্যাজার হয়ে বসে আছি আর তোর মনে ফুর্তি জেগেছে!
 
 

কিছু প্রয়োজনীয় লিংক: 

error: Content is protected !!