ইঁদুর কপালে কথাটির উদ্ভব বৃত্তান্ত

ড. মোহাম্মদ আমীন

ইঁদুর কপালে
ইঁদুরের কপাল কথাটির শাব্দিক অর্থ— ইঁদুরের ভাগ্য, ইুঁদরের ললাট, ইুঁদরের ভবিষ্যৎ। ইুঁদর কপালে অর্থ— ইুঁদরের মতো খারাপ ভাগ্য, ইঁদুরের মতো খারাপ ভবিষ্যৎ। আলংকারিক অর্থ — মন্দ ভাগ্য, অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ। প্রশ্ন হলো: মন্দ ভাগ্যের সঙ্গে ইঁদুরের সম্পর্ক স্থাপিত হলো কীভাবে এবং কেন?
 
পৃথিবীর যে কয়টি দৃশ্যমান প্রাণীকে মানুষ নিজেদের জন্য ক্ষতিকর মনে করে ইঁদুর তার একটি। মানুষ মনে করে
পাঞ্জেরী পাবলিকেশন্স লি.
— ইঁদুর তাদের কোনো উপকার করে না, কেবল ক্ষতি করে আর ক্ষতি করে। তাই ইুঁদরের প্রতি মানুষের বিন্দুমাত্র সহানুভূতি পরিলক্ষিত হয় না। ইঁদুরকে যেখানে পায় সেখানে মারে। অথচ ইঁদুরের চেয়ে অনেক বেশি ক্ষতিকর প্রাণী আছে, যারা মানুষের এমন নিন্দা আর ঘৃণায় পতিত নয়। ভাগ্য খারাপ না হলে কি এমন হয়?
 
ইঁদুর অনেক কষ্টে খাদ্য সংগ্রহ করে বাসায় নিয়ে আসে। কিন্তু সংগৃহীত খাদ্যের ওপর কোনো অধিকার থাকে না। ওই খাদ্য যে-কোনো মুহূর্তে লুণ্ঠন  হয়ে যেতে পারে। মানুষ তা ডাকাতি করে নিয়ে যায়। অন্য প্রাণী খেয়ে ফেলে। দেখুন, কপাল কত খারাপ। নইলে কি মুখের খাবার এভাবে জিহ্বাচ্যুত হয়?
 
ইঁদুর মাটির নিচে বসবাস করে। মানুষ তাদের  বাসভবনের ওপর  শস্য ফলায়। জমির মালিক হিসাবে ইঁদুর নিশ্চয় কিছু বর্গা দাবি করতেই পারে। বর্গাভাগ আনতে গেলে  বলে— মার ব্যাটা ইুঁদরকে, চোর সে। মন্দ ভাগ্য না হলে কি নিজের জমির ফসল থেকে বঞ্চিত হয়?
 
অথচ মানুষ ইচ্ছা করলে ইঁদুরকে ভূমিকম্পের পূর্বাভাস জানার কাজে ব্যবহার করতে পারেন। হাজার হাজার ইঁদুর মানুষের অনেক গবেষণায় আত্মত্যাগ করছে প্রতিদিন। অকৃতজ্ঞ মানুষ তা মনে রাখে না। একটা চাল-ডাল খেলে মনে করে পুরো পৃথিবী খেয়ে ফেলছে ইঁদুর।
 
মানুষের কার্যক্রমের কারণে ইুঁদরকে সর্বদা তটস্থ থাকতে হয়। কোথাও স্থির হয়ে বাস করতে পারে না। প্রাকৃতিক দুর্যোগে বসতবাটি এবং মজুত খাদ্যসামগ্রী ধ্বংস হয়ে যায়। কেউ এক মুঠো শস্য দেয় না। ছেলেপেলে আর বউ-মা নিয়ে না খেয়ে থাকতে হয়। সে কোনো ভালো জায়গায় থাকতে পারে না, থাকতে দেয় না। থাকতে হয় ভাগাড়ে। খেতে হয় পচাগলা জিনিস। লুকিয়ে থাকতে হয়। দেখামাত্র মারার জন্য তাড়া করে— মানুষ-বিড়াল।  যাতে খাদ্যসংগ্রহ করতে না পারে সেজন্য ঘরে আর দোকানপাটে  বিড়াল পুষে। মারার জন্য ফাঁদ বসিয়ে রাখে। খাদ্যে বিষ মিশিয়ে ছড়িয়ে দেয় যত্রতত্র। কত জ্বালা। সাপের ভয় তো আছেই। চারদিকে এত বিপদ যার তার ভাগ্য মন্দ না তো কার ভাগ্য মন্দ!
 
 ইঁদুর অনেক বিষাক্ত ও ক্ষতিকর প্রাণী এবং আবর্জনা খেয়ে মানুষের উপকার করে। কিন্তু কেউ তার এই উপকারটুকু ঘুণাক্ষরেও স্বীকার করে না। সবাই বলে— শুধু ক্ষতি করে। সবচেয়ে লজ্জার কথা মানুষ উঁইপোকার মতো বজ্জাত  পোকাটার সঙ্গে মনুষ্য চরিত্রকে মিলিয়ে নিন্দাসূচক কবিতা লিখেছে—
“উঁই আর ইুঁদরের দেখো ব্যবহার
যাহা পায় তাহা কেটে করে ছারখার।
কাঠ কাটে বস্ত্র কাটে কাটে সমুদয়
সুন্দর সুন্দর দ্রব্য কেটে করে তারা ক্ষয়।
এমন কিছু মানুষ আছে— অতি হিংস্র মতি
উই-ইঁদুরের মতো শুধু, করে সবার ক্ষতি।
 
ইঁদুর একটি নীরিহ প্রজাতির চঞ্চল প্রাণী, কিন্তু কারো কাছে কাঙ্ক্ষিত নয়, সর্বত্র অবাঞ্ছিত।  ইগলেও খায়, সাপেও খায়; মানুষেও মারে আবার বিড়ালেও মারে। বাঘেও নাকি ইঁদুর খায়। সে তার প্রত্যাশা অনুযায়ী কিছুই পায় না। সে পৃথিবীর একটি জীব। তবু সবাই মনে করে পৃথিবীতে তার বাঁচার, থাকার, খাওয়ার অধিকার নেই। শারীরিক গঠন বিবেচনায় তার কপালটাও দৃশ্যমান নয়। এত বিড়ম্বনা যার, পদে পদে যার এত বিপদ তার ভাগ্য যে মন্দ—  তা বলতেই হয়। ইুঁদরের এই মন্দ ভাগ্যের কথা বাগ্‌ধারা হয়ে চলে এসেছে মানুষে।অথচ মানুষ ইচ্ছা করলে ইঁদুরকে ভূমিকম্পের পূর্বাভাস জানার কাজে ব্যবহার করতে পারে।  
 
লিংক: https://draminbd.com/ইঁদুর-কপালে-কথাটির-উদ্ভব/

শুবাচ গ্রুপের লিংক: www.draminbd.com

error: Content is protected !!