ইংরেজি: নিকৃষ্ট ইংরেজির উৎকৃষ্ট হওয়ার কারণ: গরিব মা সন্তানের আবর্জনা: মা তুই এখন যা

ড. মোহাম্মদ আমীন
সংযোগ: https://draminbd.com/ইংরেজি-নিকৃষ্ট-ইংরেজির-উ/
ভাষা নয়, ভাষাবাসীর আর্থরাষ্ট্রীক ক্ষমতা আর বৈশ্বিক প্রভাবই ভাষাকে সহজ জনপ্রিয় বিজ্ঞানোৎকৃষ্ট ছন্দময় সৃজনশীল ও মূল্যবান করে তোলে। ভাষাভাষীর মধ্যে এসব গুণ থাকলে  নিকৃষ্ট ভাষাও  উৎকৃষ্ট হয়ে যায়। না থাকলে ঘটে উলটো। ধনীর দুলালী কখনও বিশ্রী হয় না। নিকষ কালো হলেও কুচবরণ, অতি দামি কৃষ্ণহীরা কিংবা চোখের মণি।  নইলে ইংরেজির মতো একটি অবৈজ্ঞানিক ছন্দহীন নিকৃষ্ট জটিল নীরস খিচুড়ি ভাষা বিশ্বব্যাপী এত জনপ্রিয়তা অর্জন করতে পারত না। ব্যতিক্রম বাদ দিলে অফুরন্ত ভালেবাসার আধার ছিন্ন চীরবেশী মাকে অবহেলা করে ধনী প্রেমিকার জননির দামি জুতোয় মাথা নত করে সারমেয়ের মতো লালাভ চুমোয় আপ্লুত হওয়া মানুষের স্বাভাবিক স্বভাবের সাধারণ বৈশিষ্ট্য। এর একমাত্র উদ্দেশ্য থাকে আর্থ-সামাজিক সমৃদ্ধির লোলুপ প্রার্থনা। এই লোলুপতাই বিশ্বব্যাপী  ঔপনিবেশিক শক্তির প্রসারের অন্যতম কারণ। এই লোলুপতাই এখনও  মাতৃভাষাকে নিকৃষ্ট আখ্যায়িত করে  বিদেশি ভাষাকে শ্রেষ্ঠ ভাষার একমাত্র কারণ। যে জাতি এন চিন্তাক্লিষ্ট লোকে ভরপুর সে জাতির সার্বিক উন্নয়ন অসম্ভব।
 যার প্রভাব যত বেশি তার কথার গুরত্ব তত বেশি। বক্তব্য নয়, বক্তাই মুখ্য। আর্তনাদ নয়, অর্থপাদই আসল বিষয়। যে ভাষা শিখলে অর্থের নিশ্চয়তা বেশি সেটির কদরও বেশি। এটি কার ভাষা তাতে কিছু যায় আসে না। প্রয়োজনে নিজের ভাষাকে অবহেলা করে হলেও তাকে পূজো করতে হবে।  মা মাটি মাতৃভাষা চুলোয় যাক লাকড়ি হয়ে, সিদ্ধ হবে ভাত। পেট ভরলেই হলোআমাদের বিবেক মাথায় নয়, পেটে। একজন সরকার-প্রধান যত সাধারণ কথাই বলুন না কেন, ব্যক্তির প্রভাব আর অবস্থান ওই সাধারণ কথাকে অসাধারণ করে তোলে।  প্রভুর ভাষা-কথা যতই নীরস হোক, তা নী-হীন হয়ে রস রসে টুইটম্বুর হয়ে যায় বরেণ্য আতিথেয়তার ফুলেল মাদকতায়।
বিদেশি ভাষা শেখা ভালো। যত বেশি ভাষা শেখা যায় তত ভালো। এতে তত বেশি আসবে সমৃদ্ধি প্রসার আর প্রভাব, কিন্তু তা কোনো অবস্থাতে মাতৃভাষাকে অবহেলা করে নয়। যত ইচ্ছে অতিথিকে খাওয়ান, কিন্তু মায়ের থালাকে শূন্য করে নয়। যত ইচ্ছে অন্যকে আদর করুন, শ্রদ্ধা করুন; কিন্তু জননিকে অশ্রদ্ধা করে নয়। তাহলে আপনার আম ছালা দুটোই যাবে। আঁটিটাও পাবেন না রাস্তায় নিজের হতাশায় মাথা কুটতে।
ইংরেজিকে বলা হতো ইউরোপের নিকৃষ্ট ভাষা। এর নিজস্ব কোনো বর্ণও ছিল না। মোট শব্দ ভান্ডারের মাত্র এক শতাংশ ইংরেজি। বাকি নিরানব্বই শতাংশ বিদেশি ভাষা হতে গৃহীত। তারপরও ইংরেজি এখন বিশ্বের শ্রেষ্ঠ প্রভাবশালী ভাষা হিসেবে গৃহীত আদৃত এবং কারও কারও কারও কাছে মাতৃভাষার চেয়ে অধিক মর্যাদায় লালিত। কিন্তু কেন? কীভাবে নিকৃষ্ট ভাষাটি উৎকৃষ্ট হয়ে গেল? উপনিবেশ সৃষ্টি করে প্রভাব বলয় সৃষ্টির আগের কথা ভেবে দেখুন। তখন শেকসপিয়র দূরে থাক ইউরোপের বাইরে  ইংরেজি ভাষাটাও ছিল প্রায়  অজ্ঞাত। তখন উপমহাদেশে সংস্কৃত আর সারা বিশ্বে ফারসিই ছিল সৃজনশীল ভাষা হিসেবে শ্রেষ্ঠভাষাসমূহের অন্যতম।
অষ্টাদশ শতক হতে ইংরেজরা দেশের পর দেশ জয় করতে শুরু করে। জয়ের পর শাসিত দেশে নিজেদের ভাষাকে প্রতিষ্ঠা করাই ছিল তাদের প্রধান লক্ষ্য। এজন্য তারা যা প্রয়োজন তার সব বিনা দ্বিধায় করেছে সুকৌশলে অতি ধূর্ততার সঙ্গে।  যেসব স্বদেশি ইংরেজি  জানত শিখত বলত তাদের কাছে প্রভুদের কদর ছিল বেশি। চাকুরি দিত, ব্যাবসায় দিত, দিত পদক, উপাধি— খান খানবাহাদুর রাজা মজুমদার চৌধুরি এবং আরও কত কী!  অনেকটা প্রভুর  ইশারা-অনুগত  কুকুরের প্রতি ব্যবহারের মতো । ফলে পরাজিত দেশের নাগরিকগণ নিজেদের স্বকীয়তা বিবসর্জন দিয়ে বিজেতা প্রভুর ভাষাকে আয়ত্তে আনতে শুরু করে অবলীলায়। আত্মমর্যাদাহারা স্বদেশিদের কাছে প্রভুর ভাষা হিসেবে ইংরেজির মর্যাদা  সমৃদ্ধি অর্থ প্রভাব আর ভবিষ্য-কল্যাণের সমার্থক হয়ে যায়। এর মধ্যে দেখতে পায় তাদের অন্ন। পেট আর অন্ন ছাড়া বাকি সব তাদের কাছে অর্থহীন হয়ে যায়। প্রতিবাদ আনুগত্য আর দাসত্বের সারিতে এসে গৃপালিত পশু হয়ে যায় পুরোদস্তুর।
আর্থসামাজিক শ্রীবৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে মাতৃভাষার সম্পর্ক হয়ে যায় ক্ষীণ। মাতৃভাষা হয়ে যায় অথর্ব আর মুমূর্ষু মায়ের মতো অবহেলার বস্তু। ছুঁড়ে দিতে পারলে যেন বাঁচে। এমন অধম হয়ে যায় অনেকে। মাতৃভাষাকে পুষ্ট করার সব রসদ গিয়ে বর্তায় বিদেশি ভাষায়। অসহায় মায়ের খালি থালা ভরে উঠতে থাকে সন্তানের অবহেলজনিত অশ্রুজলে। অন্যদিকে, ইংরেজি হয়ে যায় ধন-লালসার ভান্ডার নিয়ে বসে থাকা শ্রীমতী কলাবধূ। এভাবে সারাবিশ্বে ব্রিটিশ শাসিত অর্ধপৃথিবীর দেশসমূহের স্বদেশি ভাষা হয়ে যায় অনেকটা অপাঙ্‌ক্তেয়।
 অনুরূপ ফারসি আর পোর্তগিজ ভাষার ক্ষেত্রেও। যদিও তাদের উপনিবেশি ছিল ব্রিটিশদের চেয়ে কম।
প্রভুকে সন্তুষ্ট করার জন্য প্রভু-ভাষা হয়ে যায় স্বদেশিদের মরিয়া ধ্যানজ্ঞান। অর্থ প্রভাব আর মর্যাদা অর্জনে ইংরেজি ভাষা মাতৃভাষাকে পেছনে ফেলে দিয়ে নিজেই শ্রেষ্ঠত্বের আসনে বসে যায়। এভাবে ইংরেজরা দেশমাটি দখলের সঙ্গে সঙ্গে স্বদেশিদের আত্মা-সত্তাকেও দখল করে নেয়। যার রেশ এসব দেশসমূহে এখনও চলছে। এখনও অনেকের মুখে শোনা যায়,  বাংলার চেয়ে ইংরেজি অনেক সহজ। (ক্রমশ)
— — — — — — — — — — — — — — — — — — — — — — — — — — — — — — — — — — — — — — — — — — — — — — — — — — — — — — — — — — — —
জানা অজানা অনেক মজার বিষয়: https://draminbd.com/?s=অজানা+অনেক+মজার+বিষয়
শুবাচ গ্রুপের সংযোগ: www.draminbd.com
শুবাচ যযাতি/পোস্ট সংযোগ: http://subachbd.com/
আমি শুবাচ থেকে বলছি
error: Content is protected !!