ইংরেজি শব্দের বাংলা আত্তীকরণ

মোর্শেদ হাসান

বাংলা ভাষায় ইংরেজির উদার অনুপ্রবেশ আজকের নয়, এবং শুধু ইংরেজি নয়, বাংলা ভাষা ১০ হাজারের মতো আরবি-ফার্সি শব্দও নিয়েছে। এ রকম শব্দ নেওয়ার চর্চা সব ভাষাতেই আছে। ইংরেজি নিয়েছে লাতিন, ফরাসি এমনকী হিন্দি-উর্দু থেকে, ফরাসি নিয়েছে ইংরেজিসহ অন্যান্য ভাষা থেকে। এই গ্রহণপ্রক্রিয়া ভাষার সমৃদ্ধ হয়ে উঠার একটি উপাদান। কিন্তু এই গ্রহণ এমন কোনো পর্যায়ে ভাষাকে নিয়ে যায় না, যেখানে ভাষার মৌল চরিত্রই বদলে যায় বা ভাষা বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে, মিশ্র ভাষায় রূপ নেয়। ইংরেজি শব্দ তিনভাবে বাংলা ভাষায় প্রবেশ করেছে।

অনেকটা ইংরেজি উচ্চারণে : কলেজ, টিন, নভেল, নোট, ইউনিভার্সিটি, ইউনিয়ন, পাউডার, পেন্সিল, ব্যাগ, ফুটবল, মাস্টার, লাইব্রেরি, বিয়ারিং, কোচিং, নার্সিং, ড্রয়িং, মিটিং, রিপোর্টিং, বোলিং, ওয়েটিং, শুটিং, ট্রেনিং, বোর্ডিং, বাইন্ডিং, ব্যাংক, স্কুল, স্টল, স্টাইল, স্টিমার, স্টুডিও, স্টেশন, স্টোর ইত্যাদি।

পরিবর্তিত উচ্চারণে : অফিস (Office), আফিম (Opium), ইস্কুল (School), বোতল (Bottle), বাক্স (Box), হাসপাতাল (Hospital) ইত্যাদি।

মিশ্র শব্দ : হেড-মৌলভী (ইংরেজি + ফারসি), হেড-পণ্ডিত (ইংরেজি + তৎসম), খ্রিষ্টাব্দ (ইংরেজি + তৎসম), ডাক্তার-খানা (ইংরেজি + ফারসি), পকেট-মার (ইংরেজি + বাংলা)

একটি প্রশ্ন, এই শব্দগুলো কি এখন ইংরেজি শব্দ? এর উত্তর না। বাংলা ভাষার শব্দ পাঁচ প্রকার। যথা : তৎসম, অর্ধ তৎসম, তদ্ভব, দেশি ও বিদেশি শব্দ। ইংরেজি ভাষার এই শব্দগুলো এখন বাংলা ভাষায় অন্তর্ভূক্ত বিদেশি শব্দ। তবে শব্দের উৎস অবশ্যই ইংরেজি ভাষা।

পৃথিবীতে প্রচলিত প্রধান ভাষাগুলোর একটি সম্পর্ক লক্ষ করে ভাষাবিজ্ঞানীরা এদের পরিবারভুক্ত করেছেন। এই ধারায় আমাদের বাংলাসহ গ্রিক, ল্যাটিন, ইংরেজি, হিন্দি, ফারসি, ফরাসি, ডাচ, নেপালি ইত্যাদি ভাষা হচ্ছে ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষাবংশের অন্তর্ভুক্ত। (সৌরভ সিকদার : মানব ভাষার গল্প)।

ফরাসিরা ইংরেজি ভাষা থেকে বেশ কিছু শব্দ নিয়েছেন। কীভাবে নিয়েছেন আমরা একটু দেখি— “active” শব্দের উচ্চারণ হবে ‘অ্যাকটিভ’ কিন্তু আদতে ফরাসি ভাষায় হয় ‘আকতিফ। absent-এর উচ্চারণ ‘অ্যাবসেন্ট’ না হয়ে হয় ‘আপসঁ’, accent-এর উচ্চারণ ‘অ্যাক্সেন্ট’ না হয়ে হয় ‘আকসঁ’, temple-এর উচ্চারণ ‘টেম্পল’ না হয়ে হয় ‘তঁপল’, question-এর উচ্চারণ ‘কোয়েশ্চেন’ না হয়ে হয় ‘কেস্তিওঁ’, second-এর উচ্চারণ ‘সেকেন্ড’ না হয়ে হয় ‘সগঁ’। certain-এর উচ্চারণ ‘সার্টেন’ না হয়ে হয় ‘সেরতঁ’, warrant-এর উচ্চারণ ‘ওয়ারেন্ট’ না হয়ে হয় ‘ভাগঁ’, courage-এর উচ্চারণ ‘কারেজ’ না হয়ে হয় ‘কুরাজ’।

হুবহু উচ্চারণের কোনো আলামত কিন্তু দেখা গেল না; কিন্তু তাই বলে ফরাসিদের মান-ইজ্জত চলে গেছে বলে কোথাও লেখা নেই। আমরা একটি বিদেশি শব্দ লক্ষ করি কীভাবে সেটি পরিবর্তিত হয়ে বাংলা ভাষায় অনুপ্রবেশ করে :

নিখাদ আরবি শব্দ ‘ওহি’ থেকেই বই শব্দের উৎপত্তি। কিভাবে? দেখুন তাহলে- বই শব্দটির পূর্বরূপ হলো বহি। এখনো সাধু ভাষায় এটা প্রচলিত। ওহি থেকে বহি শব্দের উৎপত্তি। আরবি ওয়াও বর্ণটি ‘ব’-এর মত উচ্চারিত হয়। সুতরাং বই > বহি > ওহি। বাংলায় এসে ওহি শব্দটির মূল অর্থ ‘প্রত্যাদেশ’ও পরিবর্তন হয়ে যায়। এমনই ঘটে থাকে। এক ভাষা থেকে অন্য ভাষায় শব্দ এসে অনেক সময় কিঞ্চিত বা সম্পূর্ণ পরিবর্তিত হয়ে যায় এর অর্থ বা শব্দের রূপ কিংবা দুটোই। বই শব্দটির প্রতিশব্দ পুস্তক। এটিও বিদেশি ফারসি শব্দ। অপর প্রতিশব্দ ‘গ্রন্থ’ সংস্কৃত শব্দ। এভাবে বিভিন্ন ভাষা থেকে, নানা উৎসমূল থেকে শব্দ এসে আমাদের ভাষা হয়েছে সমৃদ্ধ। এখন বাংলা ভাষা প্রায় দেড় লক্ষ শব্দের মালিক।

বাংলা একাডেমির প্রমিত বানানের নিয়মে অ–তৎসম এবং বিদেশি শব্দের বেলায় ণত্ববিধি ও ষত্ববিধি মানা হয় নি। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বাংলা ভাষায় হেন কোনো স্থান নেই যেখানে তিনি হাত দেন নি। বাংলা ব্যাকরণে কি ও কী-র ব্যবহার রবিবাবুই প্রচলিত করেন। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ১৮৭৮ থেকে ১৮৮০ সাল পর্যন্ত ইংল্যান্ডে থেকে পড়ালেখা করেছেন। যদিও কোনো প্রাতিষ্ঠানিক সনদ তাঁর ছিল না। তিনি ইংরেজি ভাষায় অসংখ্য প্রবন্ধ লিখে গেছেন। তাঁর একটি বিখ্যাত ছোট গল্পের নাম “পোস্টমাস্টার”।

মেকলে ১৮৩৫ সালে তাঁর ঔপনিবেশিত ভারতের শিক্ষাব্যবস্থা সম্পর্কে স্মারকলিপিতে স্বল্পসংখ্যক ভারতীয়দের ইংরেজি–মাধ্যম যে শিক্ষাব্যবস্থার প্রস্তাব করেন তার প্রত্যক্ষ উদ্দেশ্য ছিল : “এই মুহূর্তে আমরা অবশ্যই এমন একটা শ্রেণী গড়ে তুলতে যথাসাধ্য চেষ্টা করব যারা হবে যে লক্ষ লক্ষ মানুষকে আমরা শাসন করি তাদের আর আমাদের মধ্যে দোভাষি, এমন একটা শ্রেণীর মানুষ যারা হবে রক্তে আর গায়ের রঙে ভারতীয়, কিন্তু রুচি, মতামত, নৈতিকতা আর বিচারবুদ্ধিতে ইংরেজ।”

 সূত্র :  মোর্শেদ হাসান, শুদ্ধ বানান চর্চা (শুবাচ)

গবেষণা, প্রাতিষ্ঠানিক অধ্যয়ন, মাতৃভাষা জ্ঞান, প্রাত্যহিক প্রয়োজন, শুদ্ধ বানান চর্চা এবং বিসিএস-সহ যে-কোনো প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার জন্য অতি প্রয়োজনীয় কয়েকটি লিংক :

শুবাচ লিংক

শুবাচ লিংক/২

শুদ্ধ বানান চর্চা লিংক/১

শুদ্ধ বানান চর্চা লিংক/২

শুদ্ধ বানান চর্চা লিংক/৩

 

Language
error: Content is protected !!