ইংরেজি শব্দের বাংলা রূপে শ আর স: পাশ বানানের পরীক্ষায় পাশ

এবি ছিদ্দিক

‘ইংরেজি ও ইংরেজির মাধ্যমে আগত বিদেশি s ধ্বনির জন্য স এবং -sh, -sion, -ssion, -tion প্রভৃতি বর্ণগুচ্ছ বা ধ্বনির জন্য শ ব্যবহৃত হবে।’— প্রমিত বাংলা বানানের ২.৮ নম্বর নিয়মের এই অংশটির কারণে বাংলা ভাষায় কৃতকার্য হওয়া অর্থে ব্যবহৃত ইংরেজি ‘pass’ শব্দটির বাংলা বানান কীরকম হবে, সেটি নিয়ে নানান জনের মধ্যে মতভেদ দেখা যায়। একদল বাংলা একাডেমি আধুনিক বাংলা অভিধানের রেফারেন্স দিয়ে ‘পাশ’ বানানটি প্রমিত বলে দাবি করেন। আবার, অন্য দলটি বাংলা একাডেমিরই প্রণীত প্রমিত বাংলা বানানের নিয়ম উল্লেখ করে ‘কৃতকার্য’ অর্থে ‘পাস’ বানান ‘দন্ত্য-স’ দিয়ে প্রমিত বলে উল্লেখ করেন। এই দুইটি মতের মধ্যে কোনটি সংগততর, তা স্পষ্ট করবার জন্যে শুরুতে উল্লেখ-করা নিয়মটির কিছু আনুষঙ্গিক বিষয় সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা থাকা উচিত৷ আর তাই, আমার আলোচনার পরবর্তী ধাপে সেগুলো সংক্ষেপে আলোচনা করে আগানোর চেষ্টা করেছি।
 
উদ্ধৃতির নিয়মটি ভালোভাবে বুঝতে হলে প্রথমে ধ্বনি ও বর্ণ সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা থাকা উচিত। কেননা, ধ্বনি আর বর্ণ এক বিষয় নয়। ভাষাবিজ্ঞানের আলোচনায় ‘ধ্বনি’ আর ‘বর্ণ’ বিশাল ক্ষেত্রে। কিন্তু আমি সে বিস্তৃত আলোচনার দিকে পা বাড়িয়ে এই লেখাটির আকার দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর করব না। অতি সংক্ষেপে বললে, কোনো ভাষার উচ্চারণের ক্ষুদ্রতম এককই হচ্ছে ধ্বনি বা আওয়াজ। অর্থাৎ, কোনো ভাষার যে-কোনো শব্দকে বিশ্লেষণ করলে যে ক্ষুদ্রতম একক পাওয়া যায়— আওয়াজ পাওয়া যায়, তাই (তা-ই) হচ্ছে ওই ভাষার ধ্বনি। যেমন: বাংলা ভাষার ‘কলা’ শব্দটি বিশ্লেষণ করলে করলে ক্ষুদ্রতম ‘ক্’, ‘অ’, ‘ল্’ আর ‘আ’ একক ও আওয়াজ পাওয়া যায়। তাই, [ক্], [অ], [ল্] ও [আ] হচ্ছে বাংলা ভাষার ধ্বনি।
 
অপরদিকে, নির্দিষ্ট কোনো ভাষার নির্দিষ্ট কোনো ধ্বনিকে ওই ভাষাভাষী যে সাংকেতিক চিহ্নের সাহায্য প্রকাশ করে, তাই (তা-ই) হচ্ছে ওই ভাষার বর্ণ। যেমন: বাঙালিরা [p] আওয়াজ বা ধ্বনিকে ‘প’ চিহ্নটির সাহায্যে প্রকাশ করে। তাই, ‘প’ হচ্ছে বাংলা ভাষার একটি বর্ণ। ‘কলা’ শব্দটিতে ‘ক’ আর ‘ল’ দুটি বর্ণ, এবং ‘আ-কার’ হচ্ছে একটি কার-চিহ্ন। ‘ঘর’ শব্দটিতে ‘ঘ’ আর ‘র’ হচ্ছে দুটি বর্ণ।
এবার [s] আর [ʃ] ধ্বনির প্রসঙ্গে আসা যাক। শুরুতে উদ্ধৃতিচিহ্নের ভেতরে উল্লেখ-করা নিয়মটি যথাযথভাবে রপ্ত করতে [s] এবং [ʃ] ধ্বনি বলতে ঠিক কোন দুটি ধ্বনিকে বোঝানো হয়, তা স্পষ্টভাবে বোঝা খুবই দরকার। ইংরেজি [s] ধ্বনি আর বাংলা [স্] ধ্বনি হুবহু একই, এবং ইংরেজি [ʃ] ধ্বনি আর বাংলা [শ্] ধ্বনিও হুবহু একই। তাই, [স্] আর [শ্] ধ্বনি নির্ণয় করতে পারলে বিনা দ্বিধায় [s] আর [ʃ] ধ্বনিও নির্ণয় করা যাবে। এক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে— ধ্বনি নির্ণয় করতে হয় উচ্চারণ থেকে, বানান দেখে নয়। কেননা, কিছু কিছু বর্ণ শব্দের মধ্যে ব্যবহৃত হলে ধ্বনিরূপ বদলেও যেতে পারে। তাই, কোনো শব্দের মধ্যে কোনটি [s] ধ্বনি আর কোনটি [ʃ] ধ্বনি, তা নির্ণয় করতে হলে ওই শব্দটির যথাযথ উচ্চারণ জানতে হবে। এবার কয়েকটি শব্দের মধ্যে [স্] আর [শ্] ধ্বনি নির্ণয় করে দেখিয়ে [স্] আর [শ্] ধ্বনি বলতে ঠিক কোন দুটি ধ্বনিকে বোঝানো হয়, তা স্পষ্ট করবার চেষ্টা করছি:
 
ক. প্রমিত উচ্চারণে ‘স্নাতক’ শব্দের শুরুর ‘স’-এর জন্যে যে আওয়াজটি পাওয়া যায়, সেটিই হচ্ছে [স্] বা [s] ধ্বনি। অর্থাৎ, স্নাতক = /স্নাতক্ snat̪ɔk/
 
খ. প্রমিত উচ্চারণে ‘শ্রেণি’ শব্দের শুরুর ‘শ’-এর জন্যে যে আওয়াজটি পাওয়া যায়, সেটিই হচ্ছে [স্] বা [s] ধ্বনি। অর্থাৎ, শ্রেণি = /স্রেনি sreni/।
 
গ. প্রমিত উচ্চারণে ‘আস্তে’ শব্দের ‘স’-এর জন্যে যে আওয়াজটি পাওয়া যায়, সেটিই হচ্ছে [স্] বা [s] ধ্বনি। অর্থাৎ, আস্তে = /আস্‌তে ast̪e/।
 
ঘ. প্রমিত উচ্চারণে ‘শ্রদ্ধা’ শব্দের শুরুর ‘শ’-এর জন্যে যে আওয়াজটি পাওয়া যায়, সেটিই হচ্ছে [স্] বা [s] ধ্বনি। অর্থাৎ, শ্রদ্ধা = /স্রোদ্‌ধা srod̪d̪ʰa/।
 
ঙ. প্রমিত উচ্চারণে ‘সালাম’ শব্দের শুরুর ‘স’-এর জন্যে যে আওয়াজটি পাওয়া যায়, সেটিই হচ্ছে [স্] বা [s] ধ্বনি। অর্থাৎ, সালাম = /সালাম্ salam/।
 
চ. শ্রাবণ, আশ্রয়, শ্রমিক, মিশ্র, স্কুল, বস্তা, স্যার, মিসেস প্রভৃতি শব্দের ‘শ’ ও ‘স’ বর্ণের জন্যে যে আওয়াজ পাওয়া যায়, তাই (তা-ই) [স্] বা [s] ধ্বনি।
 
ছ. প্রমিত উচ্চারণে ‘সাল’ (বছর) শব্দের শুরুর ‘স’-এর জন্যে যে আওয়াজটি পাওয়া যায়, সেটিই হচ্ছে [শ্] বা [ʃ] ধ্বনি। অর্থাৎ, সাল = /শাল্ ʃal/
 
জ. প্রমিত উচ্চারণে ‘শাড়ি’ শব্দের শুরুর ‘শ’-এর জন্যে যে আওয়াজটি পাওয়া যায়, সেটিই হচ্ছে [শ্] বা [ʃ] ধ্বনি। অর্থাৎ, শাড়ি = /শাড়ি ʃaɽi/।
 
ঝ. প্রমিত উচ্চারণে ‘আসল’ শব্দের ‘স’-এর জন্যে যে আওয়াজটি পাওয়া যায়, সেটিই হচ্ছে [শ্] বা [ʃ] ধ্বনি। অর্থাৎ, আসল = /আশোল্ aʃol/।
 
ঞ. প্রমিত উচ্চারণে ‘বাষ্প’ শব্দের ‘ষ’-এর জন্যে যে আওয়াজটি পাওয়া যায়, সেটিই হচ্ছে [শ্] বা [ʃ] ধ্বনি। অর্থাৎ, বাষ্প = /বাশ্‌পো baʃpo/
 
ট. প্রমিত উচ্চারণে ‘স্বাস্থ্য’ শব্দের প্রথম ‘স’-এর জন্যে যে আওয়াজটি পাওয়া যায়, সেটিই হচ্ছে [শ্] বা [ʃ] ধ্বনি, এবং মধ্যখানের ‘স’-এর জন্যে যে আওয়াজটি পাওয়া যায়, সেটি হচ্ছে [স্] বা [s] ধ্বনি। অর্থাৎ, স্বাস্থ্য = /শাস্‌থো ʃast̪ʰ/।
 
এবার মূল প্রসঙ্গে আসা যাক। বাংলাভাষীরা যখন কোনো ইংরেজি ভাষার বা ইংরেজি ভাষার মাধ্যমে আগত অন্য কোনো ভাষার শব্দ নিজেদের শব্দভান্ডারে আত্তীকরণের মাধ্যমে গ্রহণ করে, তখন ওই শব্দটির উচ্চারণ নিজেদের মতো করে বদলে নেয়। পরিবর্তিত শব্দটির বানান ঠিক সেভাবে লেখা হয়, যেভাবে তারা প্রমিত রীতিতে উচ্চারণ করে।যেমন:
 
১. প্রমিত বাংলা ভাষায় কথা বলার সময় ইংরেজি ‘table’ শব্দটি বাঙালিরা /টেবিল্/ উচ্চারণে বদলে ফেলেছে। তাই, ‘টেবিল’ বানান এভাবে প্রমিত।
 
২. প্রমিত বাংলা ভাষায় কথা বলার সময় ‘চিকিৎসক’ অর্থে ব্যবহৃত ইংরেজি ‘doctor’ শব্দটি বাঙালিরা /ডাক্‌তার্/ উচ্চারণে বদলে ফেলেছে। তাই, ‘চিকিৎসক’ অর্থে ‘ডাক্তার’ বানান এভাবে সংগত।
 
‘number’ থেকে নম্বর; ‘jam’ থেকে জাম; ‘adventure’ থেকে অ্যাডভেনচার প্রভৃতি এরূপ পরিবর্তনের প্রকৃষ্ট উদাহরণ।
ইংরেজি ভাষা থেকে আত্তীকৃত এরূপ কোনো শব্দের প্রমিত উচ্চারণে কোনো বর্ণ বা বর্ণগুচ্ছ [স্/s] ধ্বনি হিসেবে উচ্চারিত হলে ওই শব্দটির বানান ইংরেজিতে কোন বর্ণ বা বর্ণগুচ্ছ দিয়ে লেখা হয়েছে, তা না-দেখেই বাংলা বানান নির্দ্বিধায় ‘দন্ত্য-স’ দিয়ে; এবং কোনো বর্ণ বা বর্ণগুচ্ছ [শ্/ʃ] উচ্চারিত হলে ‘তালব্য-শ’ দিয়ে লিখতে হবে। যেমন:
 
ক. ‘কৃতকার্য বা উত্তীর্ণ হওয়া’ অর্থে ব্যবহৃত ইংরেজি ‘pass’ শব্দটি বাঙালিরা নিজেদের প্রমিত ভাষায় /পাশ্/ উচ্চারণে বদলে ফেলেছে। প্রমিত ভাষায় কথা বলার সময় বাঙালিরা বলে: /আফ্‌সানা পোরিক্‌খায়্ পাশ্ কোরেছে/। প্রমিত রীতিতে বাঙালিরা বলে না: /আফ্‌সানা পোরিক্‌খায়্ পাস্ কোরেছে/। তাই, কৃতকার্য বা উত্তীর্ণ হওয়া অর্থে ‘পাশ’ বানান এভাবেই প্রমিত।
 
খ. বাংলাভাষীরা ইংরেজি ‘pressure’ শব্দটি প্রমিত বাংলায় /প্রেশার্/ হিসেবে উচ্চারণ করে। তাই, ‘চাপ’ অর্থে ‘প্রেশার’ বানান এভাবেই লিখতে হবে।
 
গ. বাংলাদেশিরা ইংরেজি ‘police’ শব্দটি নিজেদের প্রমিত ভাষায় /পুলিশ্/ উচ্চারণ করে। তাই, ‘পুলিশ’ বানান এভাবে প্রমিত।
 
ঘ. প্রমিত বাংলা ভাষায় কথা বলার সময় বাঙালিরা ইংরেজি ‘association’ শব্দটি ‘অ্যাসোসিয়েশন্’ উচ্চারণে উচ্চারিত করে৷ তাই, উক্ত ইংরেজি শব্দটির প্রমিত বানান হবে ‘অ্যাসোসিয়েশন’।
 
একইভাবে,
anesthesia > /অ্যানিস্‌থিশিআ/ > অ্যানিস্থিশিয়া;
press > /প্রেস্/ > প্রেস;
sure > /শিউর্/ > শিউর;
mission > /মিশন্/ > মিশন;
share > /শেয়ার্/ > শেয়ার;
class > /ক্লাস্/ > ক্লাস;
cell > /সেল্/ > /সেল;
attache > /অ্যাটাশে/ > /অ্যাটাশে/;
cash > /ক্যাশ্/ > ক্যাশ;
facebook > /ফ়েস্‌বুক্/ > /ফেস্‌বুক্/ > ফেসবুক প্রভৃতি।
 
[ জ্ঞাতব্য: কোনো ইংরেজি শব্দ বা বাক্যের উচ্চারণ বাংলায় লেখার ক্ষেত্রে শব্দের বানান ইংরেজি উচ্চারণ অনুযায়ী লিখতে হবে। যেমন: i. She has passed = শি হ্যাস পাসড = /শি হ্যাস্ পাস্‌ড্/।
 
ii. Building number 10 = বিল্ডিং নাম্বার 10 = /বিল্‌ডিং নাম্‌বা(র্) টেন্/। ]
 
২. আমার জানামতে ‘হাসপাতাল’ ইংরেজি ভাষা থেকে আত্তীকৃত একমাত্র শব্দ, যেটির প্রমিত বাংলা উচ্চারণে [ʃ] ধ্বনি থাকলেও বানানে ‘স’ লেখা হয়েছে। অবশ্য এর পেছনে কিছু কার্যকারণও রয়েছে। ]
 
 
 
এই পোস্টের লিংক: https://draminbd.com/ইংরেজি-শব্দের-বাংলা-রূপে/
error: Content is protected !!