ইউক্রেন (Ukraine) : ইতিহাস ও নামকরণ

কীভাবে হলো দেশের নাম (ইউরোপ)

ড. মোহাম্মদ আমীন

ইউক্রেন (Ukraine)

ইউক্রেন বা উক্রাইন পূর্ব ইউরোপের একটি রাষ্ট্র। রাশিয়ার পরে এটি ইউরোপের দ্বিতীয় বৃহত্তম রাষ্ট্র। এর পশ্চিমে পোল্যান্ড, স্লোভাকিয়া ও হাঙ্গেরি,

প্রকাশক: পুথিনিলয়।

দক্ষিণ-পশ্চিমে রোমানিয়া ও মলদোভা, দক্ষিণে কৃষ্ণ সাগর ও আজভ সাগর, পূর্বে ও উত্তর-পূর্বে রাশিয়া এবং উত্তরে বেলারুশ। দক্ষিণে ক্রিমেয়া উপদ্বীপে অবস্থিত স্বায়ত্তশাসিত ক্রিমেয়া প্রজাতন্ত্র ইউক্রেনের সীমান্তের মধ্যে পড়েছে। কিয়েভ ইউক্রেনের রাজধানী ও বৃহত্তম শহর। ইউক্রেনের অধিকাংশ এলাকা কৃষিকাজের উপযোগী উর্বর সমভূমি। এটি খনিজ সম্পদে সমৃদ্ধ। এর অর্থনীতি উন্নত এবং কৃষি ও শিল্পখাত যথেষ্ট বড়।

প্রাক্তন সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে যে পনেরটি নতুন প্রজাতন্ত্র হয়েছে তন্মধ্যে ইউক্রেন অন্যতম। অন্যান্য প্রজাতন্ত্রগুলো হচ্ছে : রাশিয়া, জর্জিয়া, বেলরুশ, উজবেকিস্তান, আর্মেনিয়া, আজারবাইযান, কাজাখাস্তান, কিরগিজস্তান, মলদোবা, তুর্কমেনিস্তান, তাজিকিস্তান, লাতভিয়া, লিথুয়ানিয়া ও এস্তোনিয়া। উইক্রেনের ম্যাপ  দেখতে অনেকটা খচ্চরের মতো।

ক্ল্যশ্ল্যাভিক ক্র্যাজ বা ক্রাজনা ভাষা হতে ইউক্রেইন শব্দের উৎপত্তি। এর অর্থ ভূমি বা দেশ। অধিকাংশ গবেষক ও ইতিহাসবেত্তা মনে করেন আধুনিক ইউক্রেইন নামটি ইউক্র্যাইনা (ukraina) শব্দ হতে সৃষ্ট। এর অর্থ সীমান্ত বা সীমান্ত ভূমি কিংবা অগ্রযাত্রা। শব্দটি মূলত প্রোটো-শ্ল্যাভিক (Proto-Slavic) ভাষায় ব্যবহৃত একটি সর্বনাম ক্র্যাজব্ (krajь) হতে এসেছে। ক্র্যাজ শব্দের অর্থ প্রান্ত, সীমান্ত। সমসাময়িক রাশিয়ান ভাষায় উকরাইনা (okraina) শব্দের অর্থ শহরতলী এবং ক্র্যাজ (kraj) শব্দের অর্থ সীমান্ত জেলা। তাই অনেকে মনে করেন রাশিয়ান উকরাইনা শব্দ হতে ইউক্রাইন নামের উৎপত্তি হয়েছে।

ইউক্রেনের মোট আয়তন ৬,০৩,৫০০ বর্গকিলোমিটার বা ২,৩৩,০১৩ বর্গমাইল। তন্মধ্যে জলীয় ভাগের পরিমাণ ৭%। ২০১৫ খ্রিষ্টাব্দের হিসাবমতে ইউক্রেনের জনসংখ্যা ৪,৪৪,২৯,৪৭১ এবং প্রতি বর্গকিলোমিটারে জনসংখ্যা ৭৩.৮ জন। আয়তন বিবেচনায় ইউক্রেন পৃথিবীর ৪৬-তম বৃহত্তম দেশ কিন্তু জনসংখ্যা বিবেচনায় ৩২-তম। আবার জনসংখ্যার ঘনত্ব বিবেচনায় এটি পৃথিবীর ১১৫-তম জনবহুল দেশ। ইউক্রেনের রাজধানী কিয়েভ। সরকারি

প্রকাশক: পুথিনিলয়।

ভাষা ইউক্রানিয়ান। এ ছাড়া এখানে আরও ১৮টি ভাষা প্রচলিত আছে। ইউক্রেনের অধিবাসীদের ইউক্রাইনিয়ান বলা হয়। ২০০৬ খ্রিষ্টাব্দের এক হিসাব অনুযায়ী ইউক্রেনের ৭৫.২ ভাগ অধিবাসী ঈশ্বর ও ধর্মে বিশ্বাসী এবং ২২ ভাগ অধিবাসীর ঈশ্বরে কোনো বিশ্বাস নেই। ধর্মবিশ্বাসীদের অধিকাংশ খ্রিস্টান। এখানে ৫ লাখ মুসলিম ধর্মাবলম্বী রয়েছে।

২০১৫ খ্রিষ্টাব্দের হিসাবমতে ইউক্রেনের জিডিপি (পিপিপি) ৩৪১.৪৮৯ বিলিয়ন ইউএস ডলার এবং সে হিসাবে মাথাপিছু আয় ৭,৯৮৯ ইউএস ডলার। আবার জিডিপি (নমিনাল) ৯০.১৩৮ বিলিয়ন ইউএস ডলার এবং মাথাপিছু আয় ২,১৯৯ ইউএস ডলার। মুদ্রার নাম ইউক্রাইনিয়ার হৃভনিয়া।

৯ম শতক থেকে ইউক্রেনের উত্তর অংশ কিয়েভান রুশের অংশ ছিল। কিয়েভান রুশ ছিল প্রথম গুরুত্বপূর্ণ পূর্ব স্লাভীয় রাষ্ট্র। ১৩শ শতকে মোঙ্গল আক্রমণে এর পতন ঘটে। এর পর বহু শতক ধরে ইউক্রেন বিভিন্ন বিদেশি শক্তির পদানত ছিল। ১৯১৮ খ্রিষ্টাব্দে  ইউক্রেনে একটি বলশেভিক সাম্যবাদী সরকার প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৯২২ খ্রিষ্টাব্দে  সোভিয়েত ইউনিয়নের চারটি প্রতিষ্ঠাতা সদস্যের অন্যতম প্রজাতন্ত্র হিসাবে ইউক্রেন আত্মপ্রকাশ করে। ইউক্রেন ১৯৯১ খ্রিষ্টাব্দের ২৪ আগস্ট সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়ন হতে স্বাধীনতা ঘোষণা করে। ওই বছর  ডিসেম্বর মাসের ১ তারিখ এক গণভোটে স্বাধীনতার প্রতি জনগণ সমর্থন দেয়। ইউক্রেনের এই ঘোষণা সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনে একটি বড় ভূমিকা রাখে। ১৯৯২ খ্রিষ্টাব্দের ২৮ জানুয়ারি ইউক্রেইনের বর্তমান জাতীয় পতাকা গ্রহণ  করা হয়।

১৯৮৬  খ্রিষ্টাব্দের ২৬শে এপ্রিল ভোরের দিকে কর্মীরা চেরনোবিল পরমাণু কেন্দ্রের ৪ নম্বর চুল্লিতে পরীক্ষা চলাকালে একের পর এক বিস্ফোরণ ঘটতে থাকে। বিস্ফোরণের ফলে চুল্লির মারাত্মক তেজস্ক্রিয় উপাদান চারিদিকে ছড়িয়ে পড়ে। প্রতিবেশী বেলারুশ ও রুশ প্রজাতন্ত্র থেকে শুরু করে জার্মানিসহ পশ্চিম ইউরোপের বিস্তীর্ণ এলাকায় তেজস্ক্রিয়তার প্রতিক্রিয়া ধরা পড়ে। দুর্ঘটনার ফলে পরমাণু কেন্দ্রের দুই কর্মী মৃত্যুবরণ করে। ঘটনার কয়েক মাসের মধ্যে ২৮ জন কর্মী ও উদ্ধারকর্মী মারা যায়। তবে তৎকালীন সোভিয়েত সরকার প্রথম তিন দিন ঘটনাটি জানতে পারেনি। ১৯৮৬ ও ১৯৮৭ খ্রিষ্টাব্দে 

প্রকাশক: পুথিনিলয়।

সোভিয়েত ইউনিয়ন  চেরনোবিল ও সংলগ্ন এলাকা তেজস্ক্রিয়তা মুক্ত করার জন্য ৪ লাখের বেশি উদ্ধারকর্মী পাঠায়। ২০০৫ খ্রিষ্টাব্দে  বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও জাতিসংঘ জানায়, চেরনোবিলের তেজস্ক্রিয় বিকিরণের ফলে প্রায় ৪,০০০ মানুষের মৃত্যু হয়েছে। 

ইউক্রেন কৃষিসম্পদে ভরপুর। একসময় ইউক্রেনকে সোভিয়েত ইউনিয়নের ‘রুটির ঝুড়ি’ বলা হতো। ইউক্রেনে রয়েছে ৪ কোটি ২০ লক্ষ হেক্টর কৃষিজমি, যেটা পুরো ইউরোপের ২২ ভাগ। তবে জিডিপির ৬১ শতাংশ নিয়ন্ত্রণ করে মাত্র একশো জন ধনী ব্যক্তি।

ইউরোপ ও এশিয়া উভয় মহাদেশে বিস্তৃত রাশিয়া পৃথিবীর বৃহত্তম দেশ রাশিয়া ছাড়া একমাত্র ইউরোপ মহাদেশে অবস্থিত দেশসমূহের মধ্যে উইক্রেন ইউরোপের বৃহত্তম দেশ। তবে পৃথিবীর ৪৪-তম বৃহত্তম দেশ। তবে জনসংখ্যা ফ্রান্স ও জার্মানির চেয়ে কম। পাইলাপ ওরলারক (Pylyp Orlyk) ১৭১০ খ্রিষ্টাব্দে  ইউক্রেনের সংবিধান রচনা করেন। এটি বিশ্বের প্রাচীন লিখিত সংবিধানের অন্যতম। যেখানে ক্ষমতার বিভাজনকে রাষ্ট্রের কল্যাণে সুনির্দিষ্টভাবে প্রয়োগের বিধান রয়েছে।

ট্রেমবিতা (Trembita) কার্পাতিয়ান পর্বতে বসবাসকারী ইউক্রেনের হুতসুল নৃতাত্ত্বিক গোষ্ঠীর ব্যবহৃত একটি সংগীতযন্ত্র। এটি অনেক লম্বা একটা পাইপ দিয়ে তৈরি। ট্রেমবিতা পৃথিবীর সবচেয়ে দীর্ঘতম সংগীত যন্ত্র হিসাবে খ্যাত। পৃথিবীর গভীরতম মেট্রো স্টেশন আর্সেনালনা স্টেশন ইউক্রেনের কিয়েভ নামক স্থানে অবস্থিত। এটি মাটির ১০৫.৫ মিটার নিচে। কিয়েভ শহরের রাস্তায় নামলে অসম্ভব সুন্দরী রমণীদের দেখা মেলে। অনেক জরিপে ইউক্রেনের মেয়েদের সবচেয়ে সুন্দরী বলে আখ্যায়িত করা হয়েছে। সামরিক উদ্দেশ্যে এটি নির্মাণ করা হয়। ইউক্রেনের টানেল অব লাভ বা ভালবাসার টানেল উইক্রেনের ক্লেভেন শহরে অবস্থিত।

রোমানিয়া, রাশিা, লিথুয়ানিা, মলদোভা ও বেলারুশের পর বুজ-জাতীয় মদ্যপানে ইউক্রেন ষষ্ঠ। এখান মদ্য বা বুজ আসলেই সস্তা। মাত্র অর্ধ ইউএস ডলার দিয়ে এক বোতল বিয়ার পাওয়া যায়। যা বার হতে কিনতে হলে দিতে হয় ১.৫ ইউএস ডলার। এক বোতল উন্নত ভদকার দাম মাত্র ২ ইউএস

প্রকাশক: পুথিনিলয়।

ডলার। তো খাবে না কেন? তবে বিদেশি হুইস্কি বা বিয়ার বা মদের দাম বেশি।

কিয়েভ শহরে নির্মিত স্টে অ্যান্ড্রর গির্জ পৃথিবীর অনত্যম একটি স্থাপত্যকৌশল ও খ্রিস্টধর্মাবলম্বীদের কাছে পবিত্রস্থান হিসাবে পরিচিত। এর স্থাপত্যকৌশল সত্যি মুগ্ধকর। সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে যাওয়ার পর ইউক্রেন উত্তরধিকারসূত্রে প্রাপ্ত নিউক্লিয়ার অস্ত্রের কারণে বিশ্বের তৃতীয় শক্তিধর পারমাণবিক অস্ত্রের দেশে পরিণত হয়। ১৯৯৬ খ্রিষ্টাব্দে  ইউক্রেন স্বতস্ফূর্তভাবে নিজেকে পারমাণবিক অস্ত্রমুক্ত দেশ ঘোষণা করে।

২০১১ খ্রিষ্টাব্দের হিসাবমতে, ইউক্রেন পৃথিবীর তৃতীয় বৃহত্তম খাদ্যশস্য রপ্তানিকারক দেশ। এজন্য ইউক্রেনকে একসময় সোভিয়েত ইউনিয়নের রুটির ঝুড়ি বলা হতো। ইউক্রেন পৃথিবীর বৃহত্তম বিমান আবিষ্কারের জন্মস্থান হিসাবেও খ্যাত। (An-255 “Mriya) পৃথিবীর বৃহত্তম পণ্যবাহী বিমান। এটির আবিষ্কারক ইউক্রেন। উল্লেখ্য ম্রিয়া অর্থ ড্রিম বা স্বপ্ন। মহাকাশযান পরিবহণের জন্য এটি নির্মাণ করা হয়েছি। তবে এটি এখন মালামাল পরিবহণের জন্য ব্যবহার করা হয়।

পৃথিবীর সবচেয়ে ধাতব মুদ্রার অধিকারী ইউক্রেন। ২০০৬ খ্রিষ্টাব্দে স্বাধীনতার ১০ বছর পূর্তি উপলক্ষে ইউক্রেন ১ কেজি ওজনের ধাতবমুদ্রা বের করে। ১৫৭৬ খ্রিষ্টাব্দে  ইউক্রেনে প্রতিষ্ঠিত অস্ট্রোহ্ একাডেমি (Ostroh Academy) পশ্চিম ইউরোপের প্রাচীনতম বিশ্ববিদ্যালয়। পৃথিবীর বৃহত্তম স্যাম্পেন-গ্লাস নির্মাণের জন্যও ইউক্রেন পরিচিত। স্যাম্পেনের জন্মদিন উপলক্ষে ১.৫ মিটার লম্ব এবং ৭৫ বোতল ধারণক্ষমতা সম্পন্ন এ গ্লাস ২০১১ খ্রিষ্টাব্দে  তৈরি করা হয়। একটি জরিপে দেখা যায়, ৮০% ইউক্রেনিয়ান কখনও বিদেশ ভ্রমণ করেনি। ইউক্রেনিয়ানরা অমায়িক, বন্ধুবৎসল ও অতিথিপরায়ণ হলেও জনসমক্ষে হাসা হতে বিরত থাকে। তবে ঘনিষ্ঠজনদের সঙ্গে তার খুব উদারমনে হাসে।


স্লোভাকিয়া (Slovakia) : ইতিহাস ও নামকরণ

স্লোভেনিয়া (Slovenia) : ইতিহাস ও নামকরণ

স্পেন (Spain) : ইতিহাস ও নামকরণ

সুইডেন (Sweden) : ইতিহাস ও নামকরণ

সুইজারল্যান্ড (Switzerland) : ইতিহাস ও নামকরণ

তুরস্ক (Turkey) : ইতিহাস ও নামকরণ

 

সূত্র:  কীভাবে হলো দেশের নাম, ড. মোহাম্মদ আমীন, পুথিনিলয়, বাংলাবাজার, ঢাকা।

All Link

সাধারণ জ্ঞান সমগ্র

Knowledge Link

বাংলাদেশ ও বাংলাদেশবিষয়ক সকল গুরুত্বপূর্ণ সাধারণজ্ঞান লিংক

 

 

error: Content is protected !!