ইউনাইটেড আরব আমিরাত (United Arab Emirates) : ইতিহাস ও নামকরণ

কীভাবে হলো দেশের নাম (এশিয়া)

ড. মোহাম্মদ আমীন

ইউনাইটেড আরব আমিরাত (United Arab Emirates)

ইউনাইটে আরব আমিরাত মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চলে আরব উপদ্বীপের দক্ষিণ-পূব কোণে অবস্থিত সাতটি স্বাধীন রাষ্ট্রের একটি ফেডারেশন। এগুলি একসময় ট্রুসিয়াল স্টেটস নামে পরিচিত ছিল। প্রতিটি আমিরাত একটি উপকূলীয় জনবসতিকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠেছে এবং ওই লোকালয়ের নামে স্টেটসটির নামকরণ করা হয়। সংযুক্ত আরব আমিরাতের সাতটি আমিরাতের নাম হল আবু ধাবি, আজমান, দুবাই, আল ফুজাইরাহ, রাআস আল খাইমাহ, আশ শারিকাহ এবং উম্ম আল ক্বাইওয়াইন। আবু ধাবি শহর ফেডারেশনের রাজধানী এবং দুবাই দেশের বৃহত্তম শহর। সংযুক্ত আরব আমিরাতের রাজধানী আবু ধাবি আয়তনে বাকি ৬টি আমিরাতের যুক্ত আয়তনের চেয়ে বড়।

আমিরাতের শাসনকর্তার পদবি আমির। আমির হতে এমিরাত। আরব আমিরাত মানে আরবের আমিরাত। আমিরাত অর্থ রাজ্য বা দেশ বা প্রদেশ। আরব আমিরাত মানে আরবের রাজ্য। সাতটি আরব রাজ্য সংযুক্ত করে দেশটি গঠন করা হয়েছে। তাই এর নাম ইউনাইটেড আরব আমিরাত বা সংযুক্ত আরব আমিরাত।

দেশটির মোট আয়তন ৮৩,৬০০ বর্গ কিলোমিটার বা ৩২,২৭৮ বর্গমাইল। জলীয় ভাগের পরিমাণ নগন্য। মোট জনসংখ্যা ২০১৩ খ্রিষ্টাব্দের হিসাবমতে, ৯৩,৪৬,১২৯ এবং প্রতি বর্গকিলোমিটারে জনসংখ্যার ঘনত্ব ৯৯। আয়তনের দিক হতে সংযুক্ত আরব আমিরাত পৃথিবীর ১১৬-তম বৃহত্তম দেশ কিন্তু জনসংখ্যার দিক হতে ৯৩-তম বৃহত্তম রাষ্ট্র। জনসংখ্যার ঘনত্ব বিবেচনায় ১১০-তম জনবহুল দেশ। দেশটির জিডিপি(পিপিপি) ৬৪৩.৮৪৬ মিলিয়ন ইউএস ডলার (৩২-তম) এবং মাথাপিছু আয় ৬৫,০৩৭ (৭ম) ইউএস ডলার। অন্যদিকে জিডিপি (নমিনাল) ৪৪০.১৮১ বিলিয়ন ডলার (২৮-তম) এবং মাথাপিছু আয় ৪৪,৭৭০ ইউএস ডলার (১৯-তম)। মুদ্রার নাম দিরহাম। ১৯৭১ খ্রিষ্টাব্দের ২ ডিসেম্বর সংযুক্ত আরব আমিরাতের পতাকা গৃহীত হয়।

১৯৬৬ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত সংযুক্ত আরব আমিরাতের নাম ছিল ট্রুসিয়াল স্টেটস। তখন এর মুদ্রার নাম ছিল গালফ রুপি। ভারত সরকার ও রিজার্ভ ব্যাংক অব ভারত এ মুদ্রা জারি করত। যার মূল্যমান ছিল ভারতীয় মুদ্রার সমান। তবে এ মুদ্রা কেবল ভারতের বাইরে প্রচলন করা যেত। এটি কোনো ভারতীয় মুদ্রা ছিল না। ১৯৬৬ খ্রিষ্টাব্দ হতে ১৯৭৩ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত আবু ধাবি ব্যবহার করত বাহরাইনি দিনার এবং অন্যান্য আমিরাতগুলো কাতার ও দুবাই রিয়াল ব্যবহার করত। ১৯৭৩ খ্রিষ্টাব্দে ইউএই দিরহাম চালু করা হয়। আবুধাবিতে ব্যক্তিগত করের প্রচলন নেই। যে যত আয় করে, সবটা কোনো প্রকার কর পরিশোধ ব্যতীত নিজের অধিকারে নিয়ে যেতে পারে।

১৯৭১ খ্রিষ্টাব্দের ২ ডিসেম্বর দেশটি যুক্তরাজ্য হতে স্বাধীনতা লাভ করে। সংযুক্ত আরব আমিরাতের রাজধানী আবু ধাবি এবং বৃহত্তম শহর দুবাই। ২০১৩ খ্রিষ্টাব্দে পরিচালিত ‘কোথায় জন্মগ্রহণ করবেন সূচক’ (Where-to-be-born Index ) অনুযায়ী সংযুক্ত আরব আমিরাতের স্থান বিশ্বে ১৮-তম হয়েছিল। এ সূচক অনুযায়ী এটি যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্স থেকে এগিয়ে এবং মধ্যপ্রাচ্যের শ্রেষ্ঠতম রাষ্ট। এ দেশে কোনো নদী নেই। ভূগর্ভস্থ জলও লবণাক্ত। পানীয় জলের একমাত্র উৎস সমুদ্রের লবণাক্ত জল। লবণাক্ত জলকে লবণ মুক্ত করে পানের উপযোগী করা হয়। গিনিস ওয়ার্ল্ড রেকর্ড অনুসারে সংযুক্ত আরব আমিরাতে পৃথিবীর সবচেয়ে বেশি সংখ্যক খেজুর গাছ রয়েছে। ২০০৯ খ্রিষ্টাব্দের হিসাব অনুযায়ী এ দেশে খেজুর গাছের সংখ্যা ৪২ মিলিয়ন। আবু ধাবিতে বিশ্বের চতুর্থ দীর্ঘতম পতাকাদণ্ড অবস্থিত।

সংযুক্ত আরব আমিরাত মরুময় দেশ। এর উত্তরে পারস্য উপসাগর, দক্ষিণ ও পশ্চিমে সৌদি আরব এবং পূর্বে ওমান ও ওমান উপসাগর। ১৯৫০-এর দশকে পেট্রোলিয়াম আবিষ্কারের পূব পর্যন্ত সংযুক্ত আরব আমিরাত ব্রিটিশ সরকারের অধীন কতগুলো অনুন্নত এলাকায় বিভক্ত ছিল। তেল শিল্পের বিকাশের সঙ্গে সঙ্গে এলাকাগুলো দ্রুত উন্নতি লাভ করতে শুরু করে। ফলে ১৯৭০-এর দশকের শুরুতে আমিরাতগুলো ব্রিটিশ নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে আসতে সক্ষম হয়। দেশের খনিজ তেলের বেশির ভাগ আবু ধাবিতে পাওয়া যায়। তাই এটি সাতটি আমিরাতের মধ্যে সবচেয়ে ধনী ও শক্তিশালী। দুবাইয়ে অপরাধের পরিমাণ বলতে গেলে নেই। বিগত কয়েক বছরের হিসাবমতে প্রায় শূণ্য। এজন্য দুবাইকে পৃথিবীর কয়েকটি নিরাপদতম শহরের অন্যতম একটি বলা হয়। এখানকার আইন খুব শক্ত। অধিবাসীরাও উুঁচ নৈতিকতা রক্ষা করে চলে।

সংযুক্ত আরব আমিরাতে প্রথম মানব বসতির সন্ধান পাওয়া যায় খ্রিস্ট-পূর্ব ৫৫০০ শতক থেকে। এটি একটি মুসলিম দেশ। এ দেশে বসবাসরত প্রতি ১১ জনের মধ্যে কেবল একজন আমিরাত বা স্থানীয় নাগরিক। এ হিসাবে আমিরাতের জনগণের ৯১ ভাগই বিদেশি। বিদেশিদের মধ্যে ভারতীয়দের সংখ্যা সর্বাধিক এবং এর সংখ্যা একত্রে প্রায় ভারতের অঙ্গরাজ্য কেরেলা ও তামিল নাড়ুর জনসংখ্যার সমান।

গগনচুম্বী অট্টালিকা বিবেচনায় সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাই বিশ্বের তৃতীয় সেরা দেশ। এখানে ১৪৮টি গগনচুম্বী অট্টালিকা রয়েছে। অন্যদিকে আবু ধাবি ২৭-তম। এখানে রয়েছে ৩০টি গগনচুম্বী অট্টালিকা। এ পর্যন্ত নির্মিত পৃথিবীর সর্বোচ্চ অট্টালিকা বুরুজ খলিফা দুবাই আমিরাতে অবস্থিত। অনুপম কৌশলে নির্মিত অপূর্ব সৌন্দর্য নিয়ে বিস্তৃত দুবাইয়ের ‘ক্যাপিট্যাল গেট’ পৃথিবীর সবচেয়ে বেশি আনত বা বাঁকা ভবন। বুরুজ খালিফা (Burj Khalifa) নির্মাণের প্রাক্কালে নাম ছিল বুরুজ দুবাই। আবু ধাবির শেখ খালিফা দুবাইকে বিশাল ঋণ হতে মুক্ত করার জন্য প্রচুর অর্থ দিয়েছিলেন। তাই এর পূর্ব নাম পরিবর্তন করে বুরুজ খালিফা রাখা হয়। ১৬০টি আবাসিক তলা বিশিষ্ট ভবন বুরুজ খালিফা প্রায় অর্ধ কিলোমিটার উঁচু। যারা ১৫০ তলায় বসবাস করে, তারা সূর্য এত বেশিক্ষণ দেখে যে, নিচে যারা আছে তাদের সঙ্গে রমজানের ইফতার করতে পারে না। তাদেরকে আরও কয়েক মিনিট পর ইফতার করতে হয়।

আবু দাবির নিকটে প্রতিষ্ঠিত মাসদার সিটি পৃথিবীর প্রথম কার্বনমুক্ত শহর। এ শহরে কার্বন-নির্গমনকারী কোনো জ্বালানি ব্যবহার করা হয় না। এ শহরে কেবল নবায়নযোগ্য (renewable) জ্বালানি ব্যবহার করা হয়। এ শহরে আন্তর্জাতিক নবায়নযোগ্য জ্বালানি এজেন্সি (International Renewable Energy Agency) অবস্থিত। দুবাই আমিরাতে অবস্থিত ‘The Palm islands and The World’ মানুষের তৈরি বিশ্বের বৃহত্তম দ্বীপ। এ দ্বীপ দুবাইয়ের ৫০০ কিলোমিটার দীর্ঘ তটরেখাকে যুক্ত করেছে।

সংযুক্ত আরব আমিরাতের শারজাহ স্টেটসে উপসাগরীয় অঞ্চলের প্রথম বিমানবন্দর প্রতিষ্ঠা করা হয়। দুবাই আন্তর্জাতিক বিমান বন্দর যাত্রীর সংখ্যা বিবেচনা পৃথিবীর ৭ম ব্যস্ততম বিমান বন্দর কিন্তু আন্তর্জাতিক যাত্রী বিবেচনায় পৃথিবীর দ্বিতীয় ব্যস্ততম বিমান বন্দর। টার্মিনাল-৩ পৃথিবীর বৃহত্তম বিমান বন্দর টার্মিনাল। দুবাই-ভিত্তিকএমিরাতস এয়ার লাইন আন্তর্জাতিক যাত্রী বহন বিবেচনায় বিশ্বের চতুর্থতম এবং রাজস্ব আয়, বিমানের আয়তন ও যাত্রী সংখ্যা বিবেচনায় মধ্যপ্রচ্যের বৃহত্তম।

শেখ যায়েদ গ্র্যান্ড মসজিদ পৃথিবীর কয়েকটি বৃহত্তম মসজিদের অন্যতম। এখানে রয়েছে পৃথিবীর তৃতীয় বৃহত্তম ঝাড়বাতি (chandelier)। এটি মসজিদে স্থাপিত বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম ঝাড়বাতি। এখানে বিছানো রয়েছে ইরানে নির্মিত বিশ্বের বৃহত্তম মনুষ্য-নির্মিত কার্পেট। এ মসজিদে একসঙ্গে ৪০ হাজার লোক নামাজ আদায় করতে পারে। বিশ্বের উচুতম হোটেল জে ডব্লিউ ম্যারিয়ট মার্কুইস (JW Marriott Marquis) দুবাই আমিরাতে অবস্থিত। উল্লেখ্য, পৃথিবীর সবচেয়ে উচু ৫টি হোটেলই দুবাই আমিরাতে অবস্থিত। আরও আশ্চর্যের বিষয় হচ্ছে, পৃথিবীর ১০টি সুউচ্চ হোটেলের ৭টিই দুবাইয়ে অবস্থিত। দুবাইয়ের বুরুজ-আল-আরব পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর ও বিলাসবহুল হোটেলের অন্যতম একটি। এটি বিশ্বের তৃতীয় সুউচ্চ হোটেল। আবু ধাবি আমিরাতের ইয়াস দ্বীপে অবস্থিত ফারারি ওয়ার্ল্ড (Ferrari World) থিমড চিত্তবিনোদন পার্ক বিশ্বের বৃহত্তম ইনডোর চিত্তবিনোদন পার্ক।

৭৫ কিলোমিটার দীর্ঘ দুবাই মেট্রো পৃথিবীর প্রথম চালক-বিহীন স্বয়ক্রিয় মেট্রো রেল নেটওয়ার্ক। দুবাইয়ে অবস্থিত ১০১ তলা বিশিষ্ট প্রিন্সেস টাওয়ার পৃথিবীর দীর্ঘতম আবাসকি ভবন। দুবাই ম্যারিনা পৃথিবীর সর্বোচ্চ ব্লক। পৃথিবীর দশটি সুউচ্চ আবাসকি ভবনের ৭টিই দুবাইয়ে অবস্থিত। ৩.৯ মিলিয়ন বর্গফুট আয়তনের দুবাই মল হচ্ছে আয়তনের দিক হতে পৃথিবীর বৃহত্তম মল। এখানে পৃথিবীর দ্বিতীয় বৃহত্তম অ্যাকুরিয়াম অবস্থিত। ২০১১ ও ২০১২ খ্রিষ্টাব্দের হিসাব অনুযায়ী কেনাকাটা ও বিশ্রামের জন্য দুবাই মলে সবচেয়ে বেশি লোক আগমন করেছিল। দুবাইয়ে অবস্থিত চায়ান টাওয়ার হচ্ছে ৯০ ডিগ্রি কোণে  মুচড়ানো (twist) পৃথিবীর সর্বোচ্চ ভবন।

দুবাইর পুলিশ ফোর্স সরকারি আয়ের বিশাল এক অংশ ব্যয় করে। দুবাই পুলিশ দায়িত্ব পালনে যে সকল গাড়ি ব্যবহার করে তন্মধ্যে ফেররারি এফএফ ( মূল্য ৫,০০,০০০ ইউএস ডলার), লাম্বোরগিনি অ্যাভেনট্যাডর (মূল্য ৩,৯৭,০০০ ইউএস ডলার) এবং অ্যস্টন মার্টিন ওয়ান -৭৭( মূল্য ১.৭৯ মিলিয়ন ইউএস ডলার) অন্যতম। অথচ নিউ ইয়র্কের সবচেয়ে দামি কলেজে চার বছর পড়ার জন্য খরচ হয় মাত্র ২,৪৭,৯০৮ ইউএস ডলার।

বিশ্বের দীর্ঘতম স্বর্ণের চেইন দুবাইয়ে। ১৯৯৯ খ্রিষ্টাব্দে ২২ কেজি স্বর্ণ দিয়ে নির্মিত এ চেইনের দৈর্ঘ্য ছিল ৪.২ কিলোমিটার। ৯,৬০০ লোক একত্রে চেইনটি কিনে ব্যাবহারের জন্য ব্র্যাসলেট ও নেকলেস হিসাবে খণ্ড খণ্ড করে নেয়। ২০১৪ খ্রিষ্টাব্দের এক হিসাবে দেখা যায়, শরীরে ব্যবহারের জন্য ব্যবহৃত বিশ্ব স্বর্ণ বাজারের ৪০% সম্পাদিত হয়েছে দুবাইয়ে। যা ওজন করলে ৩৫৪টি হাতির ওজনের চেয়ে বেশি হবে।

মনুষ্য-নির্মিত বিশ্বের শ্রেষ্ঠ অবকাঠামোতে ভরপুর এ শহর। প্রাকৃতিক সৌন্দর্যকেও অপরূপ করে গড়ে তোলা হয়েছে। কিন্তু আপনি একশ বছর দুবাইয়ে বাস করলেও ওই দেশের নাগরিক হতে পারবেন না। অবশ্য, বাস করারও প্রয়োজন নেই। আবু ধাবির প্রতিষ্ঠাতা জনক শেখ রশিদকে দুবাইয়ের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি বলেছিলেন, আমার পিতামহ উটে চড়তেন, আমার পিতাও উটে চড়তেন। আমি মার্সিডিজ চালাই, আমার ছেলে চালাবে ল্যান্ড রোভার, তার ছেলেও চালাবে ল্যান্ড রোভার কিন্তু তার ছেলে চড়বে আবার সেই উটে।

থাইল্যান্ড (Thailand) : ইতিহাস ও নামকরণ

পূর্ব-তিমুর বা তিমুর লেস্টে (Timor-Leste) : ইতিহাস ও নামকরণ

তুরস্ক (Turkey) : ইতিহাস ও নামরণ

তুর্কমিনিস্তান (Turkmenistan) : ইতিহাস ও নামকরণ

সূত্র:  কীভাবে হলো দেশের নাম, ড. মোহাম্মদ আমীন, পুথিনিলয়, বাংলাবাজার, ঢাকা।

Language
error: Content is protected !!