ইউসুফ খানের পোস্ট: ইউসুফ খান পোস্ট: শুবাচ

ইউসুফ খান

ইউসুফ খানের পোস্ট: ইউসুফ খান পোস্ট: শুবাচ

এই পোস্টের লিংক: https://draminbd.com/ইউসুফ-খানের-পোস্ট-ইউসুফ-খ/

ইউসুফ খান

এখানে পাবেন

সূচি

পোয়া সোয়া পৌনে

plagiarism কুম্ভিলক-বৃত্তি নয়

 
ব্রত ব্রতী ব্রাত্য
 
অসি ও মসি-র গল্প
 
সাপের হাঁচি
 
না ঘরকা না ঘাটকা-র গল্প
 
ঢাকাই বুলি: কলকাতার চিঠি
 
পদ্মাপারের পদবি
 
ঈশ্বরচন্দ্র কেন শর্ম্মা
 
ঘেটো লেটো নজরুল
 
বাঁকুড়া থেকে বগুড়া
 
বেশ্যারা প্রস্টিটিউট নয়
 
ইত্যাদি প্রভৃতি প্রমুখ
 
আস্তাকুঁড় না আঁস্তাকুড়
 
বাঁশের চেয়ে কঞ্চি দড়
 
পিলসুজ  মানে ল্যাম্পস্ট্যান্ড নয়
 
টনক ও টনকো ২

নয়নজুলি না নয়ানজুলি

বড়োবাড়ির বিরাদরি
 
ভিন্নমত মতানৈক্য মতদ্বৈধ মতবিরোধ
 
মিস্টার অ্যান্ড মেসার্স
 
জিভ-জ্যাবড়া / তোতাকথা
 
 
 
ইউসুফ খানের লেখা ওয়েব লিংক
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
পোয়া সোয়া পৌনে
 
 
১. পোআ পোয়া
গোটা খাট চারপায়া, গোটা জন্তু চারপেয়ে। মানে চারটে পা পায়া পদ পাদ হলে তবে পূর্ণ। চার পা-এর মধ্যে একটা সম্পূর্ণতার ভাব আছে। তাই এক পা>পায়া>পোয়া হলো একটা ভগ্নাংশ – এক চতুর্থাংশ। চারভাগের একভাগ বোঝাতে তাই এক পোয়া। ‘রোজ পোয়াটাক গোরুর দুধ খেলে গায়ে বল পাবি।’ পোয়াটাক মানে সিকি অফ এক সের। ‘দু পোয়া বেলা হয়ে গেলো, গয়লা মিনশেটা এখনও দুধ দিয়ে গেলো না’। গ্রাফ পেপারকে আমরা চারভাগ করে বলি – প্রথম পাদ, দ্বিতীয় পাদ, তৃতীয় পাদ, চতুর্থ পাদ; four quadrants। পাদ মানে পোয়া, চারভাগের এক ভাগ। ‘পঞ্চপাদং পিতরম্‌’ মানে পাঁচপোয়া পিতৃভূমি। ঢেঁকির দুই পায়া একেকটা পোয়া।
 
চারপোয়া মানে সম্পূর্ণ। চারপোয়া চাল, মানে চার পোয়া-সের চাল, মানে এক সের চাল। ‘তোর বাড় বেড়ে চারপোয়া হয়েছে, এবার তোর পতন হলো বলে’। ‘কলির চারপোয়া এসে গেলো, আরও কত কী যে দেখবো’। বিন্তি খেলায় যদি সুবিধেজনক তাস হাতে পড়ে তাহলে বারো পয়েন্ট না হলেও বারো পয়েন্ট পেয়ে পায়। তাকে বলে পোয়া-বারো হওয়া।
 
২. সওয়া সোয়া
স-বান্ধব মানে বন্ধু সমেত। ‘সবংশে ধ্বংস হবি’ মানে বংশকে নিয়ে ধ্বংস হবি। স-পোয়া মানে, প্লাস এক পোয়া।
স-পোয়া>সওয়া>সোয়া। ‘ঠিক সোয়া দশটায় পৌঁছে যাবি’ মানে দশটা প্লাস সিকি ঘন্টায়, মানে ১০টা বেজে ১৫ মিনিটে। ‘করোনায় সওয়া লাখ লোক মারা গেছে’ মানে এক লাখ পঁচিশ হাজার লোক মরেছে।
হিন্দিতে ‘সের পে সৱা সের’ মানে তুমি কি আর বড়ো হনু, আমি তারও বাড়া।
সাঁওতালি ভাষাতেও এক-চতুর্থাংশ বোঝাতে পাও পওআ সওআ কথাগুলো আছে।
 
৩. পওনে পৌনে
উন মানে কম। ‘উনো ভাতে দুনো বল, নিত্য উনো রসাতল’ = কম খেলে শক্তি বেশি, রোজ কম হলে শক্তিনাশী। সংস্কৃতে ‘একেণ উন বিংশতি’ মানে ১ কম বিশ। উন-বিশ>উন্নিশ>উনিশ। উনত্রিশ উনচল্লিশ … উননব্বই – সবেতেই এক কম পরের সংখ্যাটা।
পাদ-উন>পোয়া-উন>পৌন>পৌনে = পোয়া-কম, মানে এক পোয়া কম এতটা। পৌনে দুই, মানে এক পোয়া কম পুরো দুই। ‘অদ্য পৌনে তিন ঘটিকায়’ মানে আজ সিকি ঘন্টা কম তিনটেয়, মানে ২টো বেজে ৪৫ মিনিটে।
এই রকম সব মাপেরই খাপে খাপ ব্যাখ্যা আছে। দেড় আড়াই আধলা সিক্কা বিরাশি-সিক্কা-থাপ্পড় … সব কিছুর। এর মধ্যে সিক্কার গল্পটা লম্বা।
 
ইউসুফ খান, কলকাতা, ২০২০ জুন ১২
 
 

 

plagiarism কুম্ভিলক-বৃত্তি নয়
 
plagiarism
যে বউয়ের বাচ্চা দেবার ক্ষমতা নেই, দিনরাত শাশুড়ির গঞ্জনা খাচ্ছে, সে হাসপাতাল থেকে অন্যের ছেলে চুরি করে নিয়ে এসে নিজের বাচ্চা বলে চালাতে চাইছে, এমন খবর মাঝে মাঝে খবরের কাগজে আসে। একে বলে ছেলে চুরি। প্লেজারিজ়ম plagiarism এর আক্ষরিক মানে ছেলে চুরি করা। কারও সন্তান-তুল্য লিখিত সৃষ্টি চুরি করাকে প্লেজারিজ়ম বলা চালু হয়েছিলো রোমে, সেই প্রথম শতাব্দীতে। ইংরেজ সেটা বলতে শেখে সতেরো শতাব্দীতে। যার নিজের লেখার ক্ষমতা নেই সে অন্যের লেখা চুরি করে সেটাকে নিজের লেখা বলে পোস্ট করে দিচ্ছে এমন ঘটনা ফেসবুকে এখন প্রতি মিলিসেকেন্ডে হচ্ছে। এই চুরিতরঙ্গ রোধ করার কোনো উপায় আপাতত নেই। তবে থিওরেটিক্যালি উপায় বার করা সম্ভব, যাতে পোস্টিং এর সময়ই আটকে যায়।
 
কুম্ভিলক
লম্বা আকৃতির ঝোলা লাউকে বলা হয় কুম্ভ।  গোল লাউ হচ্ছে তুম্ব। চালানি গোলকুমড়োকেও  তুম্ব বলা হতো। লম্বাটে লাউ আকৃতির কলসিও তাই কুম্ভ। গোদে ফোলা পা হচ্ছে কুম্ভপদ। গাঁট ফোলা কামলা মানে জন্ডিস রোগের নাম কুম্ভ-কামলা। আরো অনেক এরকম আরো অনেক যৌগিক শব্দ আছে। অলমিতি বিস্তরেণ। যার মুখের খোঁদলটা কুম্ভের মতো সে কুম্ভিল, মানে  কুমির। এর তৎসম রূপ  কুম্ভীর। কুমির জলে বা ডাঙায় প্রায় নিশ্চুপ হয়ে  ভেসে বা বসে থাকে। কিন্তু শিকার দেখলে খুব  ধীরে ধীরে এবং নিঃশব্দে এগিয়ে যেতে  থাকে। তারপর একসময় খপ করে শিকারের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে শিকারের ঘাড় কামড়ে জলের নিচে চলে যায়। কুম্ভিলের মতো মানে কুমিরের মতো যে নিঃশব্দে লুকিয়ে লুকিয়ে যায় সে কুম্ভিলক। কুম্ভিলক কথাটা অতি প্রাচীন, মগধ থেকে শুরু করে পূর্বভারতের সর্বত্র অভিন্ন অর্থে প্রচলিত ছিল। খ্রিষ্টপূর্ব যুগের নাট্যকার শূদ্রক তাঁর মৃচ্ছকটিকম্‌ নাটকে কুম্ভিলক বলে একটা চরিত্র রেখেছেন। নাটকের লোকেরা বলতে পারবেন কুম্ভিলক লুকিয়ে লুকিয়ে যাতায়াত করা চোর বা চর ছিলেন কি না। যে সব পুরুষ বা মহিলা পরকীয়া করতে যেতো লুকিয়ে লুকিয়ে তারাও কুম্ভীর। পরের দিকে লুকিয়ে লুকিয়ে আসা সিঁধেল চোর বোঝাতেই কুম্ভিলক কথাটা দাঁড়িয়ে যায়।
 
কুম্ভিলকবৃত্তি
আগেকার দিনে নাট্যকার পুঁথিকাব্যের-কবি পদাবলীর-পদ্যকার কীর্তনের-কর্তা খুব কম লোকেই হতো। যে দু চারজন হতো তারা সবাই বিখ্যাত হতো। তাদের পদ লোকের মুখে মুখে ফিরত। সে যুগে ক্যামেরা জ়েরক্স পিডিএফ ইত্যাদি ছিল না। তাই লোকে মূল পুঁথি কয়েক মাসের জন্য ধার নিয়ে নিজে বা লিপিকর দিয়ে তালপাতার পুঁথিতে কপি করে নিত। এই লিপিকারগণ কখনো কিছু কথা বুঝতে না পারলে নিজের কথা বসিয়ে দিত। সেখান থেকে আবার কপি হলে দ্বিতীয় কপিতে  আরো কিছু পরিবর্তন হতো। এরকম চলতেই থাকত। নকলের এই অবিরাম প্রক্রিয়া  বোঝাতে একটা প্রবাদ আছে – সাত নকলে আসল খাস্তা। আবার  কিছু অতি উৎসাহী পণ্ডিম্মন্য লিপিকর দুচারটে পদ নিজেই লিখে ঢুকিয়ে দিত। মানে চুপি চুপি ট্রোজ়ান হর্স ঢুকিয়ে দেওয়া। যাকে পণ্ডিতরা বলে প্রক্ষিপ্ত পদ। মূল লেখার সুরে সুর মিলিয়ে লেখা বলে সবাই তা ধরতে পারত না। লিপিকর, তার লেখাটাকে লোকে আসল পদকর্তার লেখা বলে ভাবছে, তার মানে আমিও ওই প্রজ্ঞার লেখক, এই আনন্দে মশগুল হয়ে থাকত। ততোধিক উৎসাহীরা সম্পূর্ণ পদাবলী লিখে তাতে নিজের নাম না দিয়ে বিখ্যাত পদকর্তার নামে চালিয়ে দিত। যেমন, চণ্ডীদাস বিখ্যাত হলে আরও তিনজন নিজেদের লেখা পদ চণ্ডীদাসের নামে বাজারে ছেড়ে দেয়। তাতে তাঁদের নিজের নাম হচ্ছে না, কিন্তু তিনি যে চণ্ডীদাসের সমান মাপের লেখক এটা নিজের কাছে প্রমাণ করতে পেরে আত্মতৃপ্তি পেতেন।  এখন সেসব পদকর্তাদের  বড়ু চণ্ডীদাস, দ্বিজ চণ্ডীদাস, দীন চণ্ডীদাস প্রভৃতি নামে প্রচার করা হচ্ছে।  বলা হয় বড়ু চণ্ডীদাসই আসল চণ্ডীদাস। সে যুগে বিখ্যাত লোকের লেখা সংখ্যায় এত কম এবং প্রচারে এত বেশি ছিল যে, তাদের লেখা টুকে নিজের বলে চালানো অসম্ভব ছিল। তাই এদেশে লুকিয়ে চুরিয়ে নিজের লেখা বিখ্যাত লোকের নামে চালানোর নাম ছিলো কুম্ভিলক-বৃত্তি আর বিদেশে লুকিয়ে চুরিয়ে বিখ্যাত লোকের লেখা নিজের নামে চালানোর নাম ছিলো প্লেজারিজ়ম। দুটো উল্টো ব্যাপার।
বিদেশি বদগুণ এখন আমরাও শিখেছি, তাই কুম্ভিলক বৃত্তি তার আসল মানে হারিয়ে এখন প্লেজারিজ়মই হয়ে গেছে।
(ত্রুটি মার্জনীয়, শুদ্ধি প্রার্থনীয়)
ইউসুফ খান, কলকাতা, ২০২০ জুন ২৯
 
ব্রত ব্রতী ব্রাত্য
 
ৱরত্‌ word – দুটোই একই শব্দ, একই বানান, একই মানে – বলা। ‘বুড়োটা সারাদিন কী যে বিড়বিড় করে, বোঝা যায়না’। ‘বললাম কথাটা চেপে রাখ, না বড়বড় করে সবাইকে বলে দিলি’। ‘পুলিশের জেরায় বৌটা সব ভড়ভড় বলে দিলো’।
 
যাদের কথা বোঝা যায় না, কী যেন সব বর্‌বর্‌ করে বলে, তারা বর্বর জাতি। এরা গাছের গোড়ায় নুড়ি রেখে, গাছটাকে কী যেন সব বলে। বর্বরগুলোর পূজাতে মূরত্‌ নেই, শুধু বরত্‌ আছে। বহিরাগতদের কাছে এই হচ্ছে আদিম অধিবাসীদের ব্রত।
 
যে ব্রত করে সে ব্রতী। পতির মঙ্গলে নিবেদিতপ্রাণা হচ্ছে পতিব্রতা, দেশোদ্ধারের শপথ নেওয়া মহাপ্রাণ হচ্ছে দেশব্রতী, ইত্যাদি।
 
আসলে অরণ্যনিবাসী আদিবাসীরা প্রকৃতি উপাসক ছিলো, প্রকৃতির মূর্ত রূপ তারা বৃক্ষের মধ্যে দেখতে পেতো। এই সব মানুষদের গাছের তলে বাস, আর গাছের ফলে আশ। তাই তারা বৃক্ষ-উপাসক ছিলো। গাছের গোড়ায় একক বা যৌথ ভাবে বসে প্রকৃতির, ব্যক্তির এবং কৌমের মঙ্গল কামনায় আদিবাসীরা ওথ উচ্চারণ করতো। এই সোচ্চার ওথ-কেই বলে ব্রত করা। ‘শপথ রাখা’র মতো বলে ‘ব্রত রাখা’। গুরুসদয় দত্ত যে ব্রতচারী চালু করেছিলেন সেখানেও কিন্তু ওথগুলো যৌথ উচ্চারণে বলা হতো।
 
আদিবাসীরা চাষবাস শিখলে তাদের গাছপুজো ধীরে ধীরে শুধু শস্যপুজোয় রূপান্তরিত হয়। তাই চাষের বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন ব্রতের উদ্‌যাপন হয়। আদিতে ব্রতর সঙ্গে দেবদেবী সংস্রব ছিলোনা। মূর্তিপূজকদের প্রভাবে পড়ে পরে এতে দেবদেবীর কল্পনা ঢুকেছে, কিন্তু তাঁরা খুবই ঘরোয়া লৌকিক দেবদেবী। আধুনিক ব্রতকথার বইগুলোতে তাদের ছবিও আঁকা হয়! আর ব্রতর সেই বড়বড়ানি পরে ছড়ার রূপ নেয়।
কিন্তু আদিবাসীদের ব্রতর মূল যে ধারণা প্রকৃতিপুজো, সেটা মূর্তিপুজোর মধ্যে ঢুকে বসে আছে – নবপত্রিকা, কলাবউ, ধানের শিষ, গাছের গোড়ায় কোনও না কোনও মন্দির গড়ে তোলা প্রভৃতির মধ্য দিয়ে।
 
যারা ব্রত করে তারা তো জংলি মানুষ, তাদেরকে তো আর জাতে নেয়া যায়না। তাই তাদেরকে দূরে সরিয়ে রাখা হয়। তাই তারা ব্রাত্য জন। প্রান্তিক মানুষ।
ইউসুফ খান, কলকাতা, ২০২০ জুন ০৪
 
 
 
 
 

error: Content is protected !!