ইজিপ্ট (Egypt) : ইতিহাস ও নামকরণ

ড. মোহাম্মদ আমীন

ইজিপ্ট (Egypt)

ইজিপ্ট এর বাংলা নাম মিশর। সরকারি নাম আরব রিপাবলিক অব ইজিপ্ট। এটি ভূমধ্যসাগরের উপকূলবর্তী দেশ। এর উত্তরপূর্বে গাজা ভূখণ্ড ও ইসরাইল, পূর্বে আকাবা উপসাগর, পূর্ব ও দক্ষিণে লোহিত সাগর এবং পশ্চিমে সুদান ও লিবিয়া। এটি বিশ্বের একমাত্র ইউরোআফ্রাশিয়ান (Eurafrasian) সংলগ্ন রাষ্ট্র, যার উত্তরপূর্ব কোণ আফ্রিকার সঙ্গে এবং দক্ষিণপশ্চিম কোণ স্থলসেতুর মাধ্যমে সিনাই উপদ্বীপের সঙ্গে যুক্ত।
মিশরের ইংরেজি নাম ইজিপ্ট (Egypt) প্রাচীন গ্রিক শব্দ অ্যাইজিপটোস (Aigypto) হতে উদ্ভুদ। তবে এটি সরাসরি ইংরেজি ভাষায় আসেনি। মধ্যযুগের ফ্রেঞ্চ (Egypte) ইজাইপ্ট ও ল্যাটিন অ্যাজাইপটাস (Aegyptus) হতে ইংরেজিতে এসেছে।
অনেকের মতে, প্রাচীন ইজিপ্ট বা ইজিপ্ট নামটি কেবল বর্তমান ইজিপ্ট ছিল না। ইজিপ্ট বলতে প্রাচীনকালে পুরো উত্তর আফ্রিকাকে নির্দেশ করা হতো। কিন্তু এখানে বর্ণিত ব্যাখ্যা বলে —তা ঠিক নয়। অধিকাংশ মিশরবিদ (Egyptologist) ও ইতিহাসবেত্তাদের ধারণা, গ্রিক শব্দ এজিপটোস (Aegyptos) হতে ইজিপ্ট নামের উদ্ভব হয়েছে। কেউ কেউ মনে করেন, এ ব্যাখ্যা ঠিক নয়। তাদের মতে, ইজিপটোস (Aegyptos) হচ্ছে গ্রিক পদ হাই- গি- পতস (Hi-Gi-Ptos) পদের সংক্ষিপ্তরূপ। হাই গি পতস (Hi-Gi-Ptos) হচ্ছে প্রাচীন গ্রিক পদ হেত-কা-পতাহ (Het-Ka-Ptah) এর লিপ্যন্তর। এখানে শব্দগুচ্ছে তিনটা শব্দ আছে। হেট (Hit,Hat) শব্দের অর্থ স্থান। অধিকাংশ মিশরবিদের মতে কা (ka) শব্দের অর্থ ‘আত্মার শারীরকি অভিক্ষেপণ (the physical projection of the soul), শরীরের নয়। যা ছিল খাত বা খেত (Khat or Khet), কিন্তু ব্যক্তিত্ব নিজে শরীরকে স্পন্দিত করে। পতাহ (path) হচ্ছে তথাকথি দেবতাগণের বা সৃষ্টিকর্তা গডগণের (Creator Gods) কোনো একজনের উপাধি বা নেটর (Neter)। আর এ স্কওয়ালার ডি লুবিচজ (R.A. Schwaller de Lubicz) এর অনুবাদ অনুযায়ী নেটর  শব্দের অর্থ ‘দেবত্বের বৈশিষ্ট্য, দেবত্বের প্রকৃতি বা দেবত্বের নীতি। এটি হচ্ছে ঈশ্বরের উদ্দেশ্য, দৃষ্টিভঙ্গী এবং সৃষ্টির সমাহিত স্বরূপ। গ্রিকগণ এ নেটর শব্দ হতে ন্যাচার (Nature) শব্দ অর্জন করেছে। এ জন্য প্রাচীন মিশরীয়দের নিকট প্রকৃতি ও ঐশ্বরিক (nature and the divine) সবসময় ছিল অভিন্ন।
হেত-কা পতাহ অর্থ (Place of the Projection of the Principle of Ptah) বা এমন স্থান যেখানে পতাহ অভিক্ষেপণ বিকশিত (Place where the Projection of Ptah Manifested) হয়। এ পদটি প্রাচীন মিশরের ধ্বংসপ্রাপ্ত রাজধানী মেমফিসের আধুনিক মিশরীয় গ্রাম মিত রাহায়নায় (Mit Rahaina) শিলাস্তম্ভে পাওয়া গিয়েছে। মেমফিস ছিল রাজধানী শহরটি গ্রিক নাম। এটি মিশরীয়দের নিকট মেন-নেফর (Men-Neferৎ) নাম পরিচিত ছিল। নেম- নেফর অর্থ প্রজন্মের সমন্বয় (The Generation of Harmony)।
সুতরাং হেত-কা-পতাহ কেবল একটি নির্দিষ্ট স্থান, নির্দিষ্ট শহর, যা ছিল মিশরীয় রাজবংশের প্রথম রাজধানী। কোনোভাবে তা পুরো দেশ বা সভ্যতা নয়। প্রাচীনকালের লোক তাদের দেশকে বলতেন কেএমটি (KMT)। যা খেমেত, খেমিত, খেম, আল খেম— প্রভৃতিরূপে লেখা হয়েছে। এর আক্ষরিক অর্থ কৃষ্ণ নগর বা কৃষ্ণ ভূমি ইংরেজিতে যাকে ব্ল্যাক ল্যান্ড বলা যায়। এ কৃষ্ণ ভূমি বলতে, সমৃদ্ধ এবং নিল নদের পলি-বিধৌত সঞ্চিত কালো মাটিকে নির্দেশ করা হয়েছে। যে মাটির উপর পৃথিবীর কৃষিকাজের সূচনার মাধ্যমে সভ্যতার সূত্রপাত ঘটে। মিশরীয় আদি ঐতিহ্য বলে যে, সভ্যতা ছিল খেমিত (Khemitরঃ) এবং অধিবাসী ও ভাষাকে বলা হতো খেমেতিয়ান (Khemitian)। ইজিপ্টের মোট আয়তন ১০,১০,৪০৪.৮৭ বর্গকিলোমিটার বা ৩,৮৭,০৪৮ বর্গমাইল। জলীয় ভাগের পরিমাণ ০.৬৩২%। ২০১৫ খ্রিস্টাব্দের হিসাবমতে মিশরের মোট জনসংখ্যা ৮,৯৮,৩৯,০০০ এবং প্রতি বর্গকিলোমিটারে জনসংখ্যার ঘনত্ব ৮৪ জন। আয়তন বিবেচনায় মিশর পৃথিবীর ৩০-তম বৃহত্তম দেশ কিন্তু মোট জনসংখ্যা বিবেচনায় ১৫-তম। আবার জনসংখ্যার ঘনত্ব বিবেচনায় এটি পৃথিবীর ১২৬-তম জনবহুল দেশ। ইজিপ্টের সরকারি ভাষা আরবি এবং জাতীয় ভাষা ইজিপ্সিয়ান আরবি। ইজিপ্টের অধিবাসীদের ইজিপ্সিয়ান বলা হয়। রাজধানী কায়রো। ১৯২২ খ্রিস্টাব্দের ২৮ ফেব্রুয়ারি দেশটি যুক্তরাজ্য হতে স্বাধীনতা লাভ করে। ২০১৪ খ্রিস্টাব্দের ১৮ জানুয়ারি বর্তমান সংবিধান গৃহীত হয়।
২০১৫ খ্রিস্টাব্দের হিসাবমতে ইজিপ্টের জিডিপি (পিপিপি) ৯৮৯.৮৮৬ বিলিয়ন ইউএস ডলার (২৪-তম) এবং সে হিসাবে মাথাপিছু আয় ১১,১৯৪ ইউএস ডলার (১০০-তম)। অন্যদিকে জিডিপি (নমিনাল) ৩২৪.২৬৭ বিলিয়ন ইউএস ডলার (৩৪-তম) এবং সে হিসাবে মাথাপিছু আয় ৩,৭২৪ ইউএস ডলার (১১৫-তম)। মুদ্রার নাম ইজিপ্সিয়ান পাউন্ড।
মিশর ছিল ফারাওদের শাসনের কেন্দ্র বিন্দু। ফারাওরা কখনও তাদের চুল দেখাতেন না। সবসময় নেমেস নামের তাজ বা টুপি দিয়ে ঢেকে রাখতেন। ডোরাকাটা কাপড়ে তৈরি তুতানখামেনের (Tutankhamen) সোনালি মুখোশ এখনও বিশ্বের মানুষের কাছে বিখ্যাত। তিনি ১৮ বছর বয়সে মারা গিয়েছিলেন। মাছি যাতে তার শরীরে না বসে, সে জন্য মিশরের দ্বিতীয় পেপি কয়েকজন উলঙ্গ ক্রীতদাসের শরীর মধু দ্বারা চর্চিত তার কাছাকাছি রাখতেন।
মিশরের পুরুষ-মহিলা উভয়ে মেকাপ পরতেন। চোখের পেইন্ট ছিল সবুজ এবং তা কপার হতে তৈরি বা সীসা দিয়ে তৈরি। মিশরয়িা বিশ্বাস করতেন, মেকাপের নিরাময় ক্ষমতা আছে। সৌন্দর্য বর্ধনের চেয়ে সূর্যের তাপমাত্র হতে চামড়াকে রক্ষার জন্য মেকাপ করা হতো। তের বছরের পূর্ব পর্যন্ত মিশরীয় শিশুরা কোনো জামাকাপড় পরত না। আবহাওয়াগত কারণে তার কোনো প্রয়োজনও আসলে ছিল না। বয়স্ক মেয়েরা স্কার্ট ও নারীরা ড্রেস পরতেন।
ইজিপ্টের সিনাই উপত্যাকা এশিয়া ও আফ্রিকা দুটি মহাদেশে বিস্তৃত। রাজধানী কায়রো বৃহত্তম জনবহুল শহর। এরপর আসে আলেকজান্দ্রিয়া ও গিজা। ইজিপ্ট অত্যন্ত শুষ্ক দেশ। দেশের অধিকাংশ এলাকা লিবিয়া মরুভূমি ও সাহার মরুভূমির পেটে। পৃথিবীর দীর্ঘতম নদী নিল, ইজিপ্টের উপর দিয়ে প্রবাহিত। ইজিপ্ট মানব সভ্যতার অন্যতম আদিভূমি। খ্রিস্টপূর্ব ৩০১৫ অব্দে এখানে মানব সভ্যতা গড়ে ওঠেছিল। গিজায় অবস্থিত মিশরের পিরামিড সপ্তাচার্যের একটি ছিল। তবে পৃথিবীর বৃহত্তম পিরামিড মেক্সিকোতে অবস্থিত, মিশরে নয়। সুদানেও পিরামিডের সংখ্যা মিশরের চেয়ে বেশি। শেষ ফারাও ক্লিউপেট্রা ছিলেন গ্রিক, মিশরীয় নয়। প্রাচীন মিশরে বিড়াল হত্যা করা, এমনকি দুর্ঘটনা বশত হলেও মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত করা হতো।
অধিকাংশ মুসলিম রাষ্ট্রের ন্যায় ইজিপ্টের রাজনীতিক অবস্থাও প্রায় সময় অস্থির থাকে। ২০১৫ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত সব মিশরীয় প্রেসিডেন্টকে অসময়ে দায়িত্ব ছাড়তে হয়েছে নতুবা হাজতে যেতে হয়েছে অথবা মৃত্যুবরণ করতে হয়েছে। মিশর ও সুদান সীমান্তে ২,০৬০ বর্গকিলোমিটার বা ৭৯৫ বর্গমাইল আয়তনের একটি ভূমি রয়েছে। যা কোনো দেশ দাবি করে না। ইজিপ্ট প্রথম দেশ, যা ১৯৭৯ খ্রিস্টাব্দে ইসরাইলের সঙ্গে শান্তিচুক্তি সম্পাদন করে। ফলে আনোয়ার সাদত ১৯৭৯ খ্রিস্টাব্দে শান্তিতে নোবেল পুরস্কার পান ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে যৌথভাবে। আনোয়ার সাদত পরে আততায়ীর হাতে নিহত হন। মিশরের সঙ্গে শান্তিচুক্তি করায় মিশরকে আরব লিগ হতে বহিষ্কার করা হয়। ১৯৮৯ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত মিশর আরব লিগের বাইরে ছিল।
তরল গ্যাস রপ্তানিতে ইজিপ্ট বিশ্বে ষষ্ঠ। আফ্রিকার একমাত্র সাবওয়ে হচ্ছে কায়রো। মিশরে রজশ্রবা স্ত্রী বা কন্যার সেবা করার জন্য পুরুষ কর্মস্থলের বাইরে থাকতে পারেন।
প্রাচীন মিশরের অধিবাসীদের ১৪০০ দেব-দেবী ছিল। পঞ্চম ও ষষ্ঠ শতকেও ইজিপ্টে খ্রিস্টান ছিল সংখ্যাঘরিষ্ট। প্রাচীন ইজিপ্সিয়ান কবরস্থানে পায়খানা দেখা যায়। পৃথিবীর সবচেয়ে প্রাচীন পোশাক পাওয়া গিয়েছে মিশরে। ওটি ছিল ৫০০০ বছরের পুরানো।মিশরের পিরামিড নির্মণ শ্রমিকদের প্রতিদিনের মজুরি হিসাবে এ গ্যালন বা ৪ লিটার বিয়ার দেওয়া হতো। সে সময় বিয়ার ছিল মিশরের জাতীয় মুদ্রা বা বিনিময় মাধ্যম। মিথ, গ্রিক ইতিহাসবেত্তা হিরোডোটাস এমনটি বলেছিলেন। স্টাচু অব লিবার্টি মিশরের জন্য অভিপ্রেত ছিল। হারিয়ে যাওয়া মিশরীয় শহর হেরাক্লেয়ন (Heracleion) ১২০০ বছর পর সমুদ্রের নিচে পাওয়া যায়। মিশরে প্রথম পাল তোলা নৌকা আবিষ্কার হয়েছিল। মিশর আরব বিশ্বের সবচেয়ে জনপ্রিয় দেশ এবং সবচেয়ে বেশি সংখ্যক আরবিভাষী এখানে বাস করে।

সূত্র : কীভাবে হলো দেশের নাম (আফ্রিকা), ড. মোহাম্মদ আমীন, পুথিনিলয়, বাংলাবাজার, ঢাকা।

রিপাবলিক অব দ্যা কঙ্গো

error: Content is protected !!