ইথিওপিয়া (Ethiopia) : ইতিহাস ও নামকরণ

ড. মোহাম্মদ আমীন

ইথিওপিয়া (Ethiopia)

ইথিওপিয়া উত্তর-পূর্ব আফ্রিকার একটি প্রজাতান্ত্রিক রাষ্ট্র। এর সরকারী নাম ইথিওপীয় সরকারী গণপ্রজাতন্ত্র। ইথিওপিয়ার উত্তর-পূর্বে ইরিত্রিয়া এবং জিবুতি, পূর্বে ও দক্ষিণ-পূর্বে সোমালিয়, দক্ষিণ-পশ্চিমে কেনিয়া এবং পশ্চিম ও উত্তর-পশ্চিমে সুদান। দেশটি নয়টি প্রাশাসনিক অঞ্চলে বিভক্ত। প্রতিটি অঞ্চলে একটি করে প্রধান জাতিগত গোষ্ঠী বাস করে।

ইথিওপিয়ার প্রাচীন নাম আবিসিনিয়া (Abyssinia)। আরবি আল-হাবসাহ (al-Ḥabasah) এবং পতুর্গিজ আরবীয় অপভ্রংম আবাসিয়া হতে আবসিনিয়া নামের উদ্ভব। যারা অর্থ ধুপ-উৎপাদনকারী অঞ্চলের বিদেশি। বা ধুপ-উৎপাদক দেশে অবস্থানকারী বিদেশি।

ইথিওপিয়া একটি প্রাচীন নাম ও প্রাচীন জনপদ। গ্রিক নাম এইথিওপস (Aithiops)| )। নামটি ৩ বার ইলিয়াড (Iliad )-মহাকাব্যে এবং ৩ বার ওডিসি (Odyssey) মহাকাব্যে বর্ণিত হয়েছে। গ্রিক ইতিহাসবেত্তা হেরোডোটাস (Herodotus) সুনির্দিষ্টভাবে সুদান ও আধুনিক ইথিওপিয়াসহ পুরো দক্ষিণ মিশরের সকল ভূখ- বুঝানোর জন্য নামটি ব্যবহার করেছেন। প্লিনি দ্য অ্যাল্ডার (Pliny the Elder) বলেছেন, ভলকান (Vulcan) নামে পরিচিত হেপহেস্টাস (Hephaestu) এর একজন পুত্রের নাম ছিলেন ইথিওপিয়াস (Aethiops)। তাঁর মতে ইথিওপিয়াস হতে  ইথিওপিয়া নামের উদ্ভব।

পঞ্চদশ শতকের গেজেট বুক অব আক্সুম (Book of Aksum)-এ উল্লেখ করা হয়েছে, ইতইওপিস (Ityopp’is) হতে ইথিওপিয়া নামের উদ্ভব। ইতইওপিস হচ্ছে কুশ (Cush) এর সন্তান এবং কুশ হাম (Ham) এর জ্যেষ্ঠ সন্তান। তারা ছিলেন বাইবেলের অন্যতম চরিত্র নুহ (Noah) নবীর পুত্র। কুশ এর ভাইগণ ছিলেন ইজিপ্টের মিজরাইম (Mizraim), কানান দেশের কানান (ঈধহধধহ), পুত (চযঁঃ) এবং বাইবেলের চরিত্র নমরুদের (Nimrod) পিতা।

ল্যাটিন এথিওপিয়া (Æthiopia) এর অর্থ কৃষ্ণাঙ্গদের দেশ বা (Land of the Blacks) এবং গ্রিক এ্যইথিওপিয়া (Aithiopía) শব্দের অর্থ পোড়া মুখ। কথিত হয়, এ দুটি শব্দ হতে ইথিওপিয়া নামের উদ্ভব। উভয়ের শব্দের অন্তর্নিহিত অর্থ অভিন্ন এবং তা হচ্ছে কৃষ্ণাঙ্গদের দেশ (Land of the Blacks)। প্রকৃতপক্ষে তৎকালে আফ্রিকার পুরো সাব-সাহারা অঞ্চলকে ইথিওপিয়া নাম দ্বারা নির্দেশ করা হতো।

একজন ইউরোপীয় প-িত বলেছেন, গ্রিক শব্দ ইথো (aitho) শব্দের অর্থ আমি পোড়া (I burn) এবং অপস (ops) শব্দের অর্থ মুখ। শব্দ দুটো যুক্ত হয়ে গঠন হয়েছে ইথিওপিয়া যার অর্থ পোড়ামুখ বা আমার পোড়ামুখ।

ইথিওপিয়া আফ্রিকার প্রাচীনতম স্বাধীন রাষ্ট্র। প্রথম শতকে এখানে আকসুম নামের একটি শক্তিশালী খ্রিস্টান সাম্রাজ্যের পত্তন হয়। ১৬শ শতকের পরে ইথিওপিয়া অনেকগুলি ক্ষুদ্র রাজ্যে বিভক্ত হয়ে যায়। ১৮৮০-র দশকে রাজা ২য় মেনেলিক-এর অধীনে এগুলি পুনরায় একত্রিত হয়। ১৯৫০-এর দশক থেকে ইরিত্রিয়া জনপদটি ইথিওপিয়ার একটি অংশ ছিল, কিন্তু ১৯৯৩ খ্রিস্টাব্দে এটি বিচ্ছিন্ন হয়ে স্বাধীন রাষ্ট্র গঠন করে। আদ্দিস আবাবা ইথিওপিয়ার রাজধানী ও বৃহত্তম শহর। উঁচু পর্বত আর ঊষর মরুভূমির এ রুক্ষ দেশটিতে ৭০টিরও বেশি জাতিগত ও ভাষাগত গোষ্ঠীর মানুষের বাস। বিংশ শতক পর্যন্তও দেশটি আবিসিনিয়া নামে পরিচিত ছিল।

ইথিওপিয়ার মোট আয়তন ১১,০৪,৩০০ বর্গকিলোমিটার বা ৪,২৬,৩৭১ বর্গমাইল। তন্মধ্যে জলীয় ভাগের পরিমাণ ০.৭%। ২০১৫ খ্রিস্টাব্দের হিসাবমতে, ইথিওপিয়ার জনসংখ্যা ১০ কোটি এবং প্রতি বর্গকিলোমিটার লোকসংখ্যা ৮২.৫৮ জন । আয়তন বিবেচনায় ইথিওপিয়া পৃথিবীর ২৭-তম বৃহত্তম দেশ এবং জনসংখ্যা বিবেচনায় ১৪-তম। তবে জনসংখ্যার ঘনত্ব বিবেচনায় এটি পৃথিবীর ১২৩-তম জনবহুল দেশ।

২০১২ খ্রিস্টাব্দের হিসাবমতে, ইথিওপিয়ার জিডিপি (পিপিপি) ১৩২.০০০ বিলিয়ন ইউএস ডলার এবং মাথাপিছু আয় ১,৪৫৫ ইউএস ডলার। অন্যদিকে, জিডিপি (নমিনাল) ৫২.০০০ বিলিয়ন ইউএস ডলার এবং মাথাপিছু আয় ৫৭০ ইউএস ডলার। মুদ্রার নাম বির (Birr)। রাজধানী আদ্দিস আবাবা। সরকারিভাবে ইথিওপিয়ার অধিবাসীদের ইথিওপিয়ান বলা হয়। ১৯৯৫ খ্রিস্টাব্দের আগস্ট মাসে ইথিওপিয়ার বর্তমান সংবিধান গৃহীত হয়। দেশের সরকারি ভাষা আমহারিক (Amharic)। এছাড়া এখানে আরও বহু আঞ্চলিক ও নৃতাত্ত্বিক ভাষা প্রচলিত আছে।

ইথিওপিয়া পৃথিবীর একমাত্র দেশ, যেখানে ১৩ মাসে বছর গণনা করা হয়। গ্র্যাগরিয়ান সেপ্টেম্বর মাসের ১১ তারিখ ইথিওপিয়ানেরা নববর্ষ পালন করে। ইথিওপিয়ায় সূর্যোদয় হতে সময় গণনা শুরু হয় এবং ঘড়ির উল্টো দিক হতে সময় গণনা করা হয়। তার মানে, গ্র্যাগরিয়ান পঞ্জিকার ২০১৪ খ্রিস্টাব্দ ইথিওপিয়ান পঞ্জিকায় ২০০৬। ইথিওপিয়া আফ্রিকা মহাদেশের একমাত্র দেশ, যার নিজস্ব বর্ণমালা রয়েছে। এরা আবুগিদা (abugida) বর্ণমালা ব্যবহার করে। এটাকে আলফা-সিলাবারি (alpha-syllabary) বলা হয়। এ ভাষায় ২০৯টি বর্ণ ও ২৫টি বিকল্প বানান রয়েছে।

ইথিওপিয়া আফ্রিকা মাহদেশের একমাত্র জাতি, যা কখনও কোনো শক্তি অধিকার করে উপনিবেশ করতে পারেনি। ইতালি দুইবার ইথিওপিয়া অধিকার করার চেষ্টা করেছিল। রাশিয়াও ইথিওপিয়া দখল করার চেষ্টা করেছে। উভয়ে ব্যর্থ হয়েছে।

ইথিওপিয়ান শিক্ষার্থীকে বাধ্যতামূলকভাবে নিজস্ব উপজাতীয় ভাষা ও সরকারি আমহারিক (Amharic) ভাষা শিখতে হয়। মাধ্যমিক স্কুলে প্রবেশের পর শিখতে হয় ইংরেজি। বার বছর ও তার অধিক বয়সী শিক্ষার্থীদের অধ্যয়ন-প্রতিষ্ঠানে ইংরেজি শেখান হয়। এখানে ৮০টি ভিন্ন ভাষা রয়েছে। তন্মধ্যে অরোমো (Oromo) ও আমহারিক সর্বাধিক প্রচলিত। তবে পর্যটকদের সুবিধা এ যে, এখানে আরবি ও ইংরেজিও ব্যাপকভাবে প্রচলিত।

পৃথিবীর প্রথম খ্রিস্টান-রাষ্ট্র ইথিওপিয়া। ৩২৪ খ্রিস্টাব্দে এটি খ্রিস্টান রাষ্ট্র ঘোষিত হয়। ইথিওপিয়া কফির জন্মভূমি হিসাবে খ্যাত। এটি হোমিনিডের জন্মভূমি হিসাবেও পরিচিত। এখানে পাওয়া গিয়েছে ৩.২ মিলিয়ন বছরের পুরানো হোমিনিড (hominid) কঙ্কাল। তাই ইথিওপিয়াকে মানুষ সৃষ্টির প্রথম জনপদ বলা হয়। বাইবেলে ৪০-৬০ বারা ইথিওপিয়ার নাম আছে। খ্রিস্টান ইতিহাসের অন্যতম স্থান ইথিওপিয়া। কিংবদন্তির টেন কমান্ডমেন্টস একটি সিন্দুকে ভর্তি করে নিরাপদ হেফাজতে সুরক্ষিত একটি গির্জায় রাখা হয়েছিল। সে গির্জাটি ইথিওপিয়ার আক্সুমে অবস্থিত। তবে এটি কোন গির্জা তার সন্ধান প্রকৃতপক্ষে এখনও যথার্থভাবে পাওয়া যায়নি। তবে অনেকে এটি দেখেছেন বলে দাবি করেছেন।

কোরআন শরিফেও ইথিওপিয়ার কথা উল্লেখ আছে। ইলিয়াড ও ওডিসি মহাকাব্যেও ইথিওপিয়ার নাম দেখা যায়। আরবের বাইরে ইথিওপিয়াতে প্রথম মসজিদ স্থাপিত হয়। এখানকার আল নেজাসি মসজিদ আরবের বাইরে স্থাপিত প্রথম মসজিদ। যখন সবাই ইসলামের প্রতিষ্ঠাতা ও তাঁর অনুসারীকে নির্যাতন করছিলেন, কটুবাক্য নিক্ষেপ করছিলেন তখন ইথিওপিয়া একমাত্র দেশ, যে দেশর জনগণ ও রাষ্ট্রপ্রধান তাঁকে সান্ত¦না দিয়েছিলেন, সাহস দিয়েছিলেন।

কীভাবে হলো দেশের নাম

ইরিত্রিয়া (Eritrea) : ইতিহাস ও নামকরণ

সূত্র : কীভাবে হলো দেশের নাম, ড. মোহাম্মদ আমীন, পুথিনিলয়, বাংলাবাজার, ঢাকা।

error: Content is protected !!