ই-কার ও ঈ-কার বিধি: ই-কার ও ঈ-কার সমগ্র: বানানে কখন ই-কার কখন ঈ-কার

ড. মোহাম্মদ আমীন

ই-কার ও ঈ-কার বিধি: ই-কার ও ঈ-কার সমগ্র: বানানে কখন ই-কার কখন ঈ-কার

বাংলা একাডেমী প্রমিত বানান বিধি
‘সকল অ-তৎসম অর্থাৎ তদ্ভব, দেশি, বিদেশি ও মিশ্র শব্দে প্রযোজ্যমতে কেবল ‘হ্রস্ব-ই’/হ্রস্ব-উ অথবা হ্রস্ব ই-কার /হ্রস্ব উ-কার ব্যবহৃত হবে। এমনকি স্ত্রীবাচক ও জাতিবাচক শব্দের ক্ষেত্রেও এ নিয়ম প্রযোজ্য হবে। যেমন:- গাড়ি, চুরি, দাড়ি, বাড়ি, ভারি, শাড়ি, তরকারি, বোমাবাজি, দাবি, হাতি, বেশি, খুশি, হিজরি, আরবি, ফারসি, ফরাসি, বাঙালি, ইংরেজি, জাপানি, জার্মানি, সিন্ধি, ছুরি, টুপি, সরকারি, মালি, পাগলামি, পাগলি, দিঘি, রেশমি, পশমি, ফরিয়াদি, আসামি, বে-আইনি, কুমির, নানি, দাদি, মামি, চাচি, মাসি, পিসি, দিদি, বুড়ি, নিচু, চুন, ভুখা, পুজো, উনচিল্লশ ইত্যাদি।
‘আলি’ প্রত্যয়যুক্ত শব্দে ‘হ্রস্ব ই-কার’ হবে। যেমন: মেয়েলি, খেয়ালি, মিতালি, বর্ণালি, সোনালি, হেঁয়ালি। তবে কোন কোন স্ত্রীবাচক শব্দের শেষে ‘ঈ-কার’ দেয়া যেতে পারে। যেমন: পরী, গাভী, রানী।

ই-কার ও ঈ-কার-বিধি/১

 
১। সংস্কৃত বা তৎসম ছাড়া বাকি সব শব্দে ই-কার হবে। যেমন: গাড়ি, সুখি, দাদি, গাভি, সরকারি, ফেব্রুয়ারি, ইমামতি, দিঘি, পাখি, চিমনি, ইদ, শহিদ, গির্জা। কোনো বিদেশি শব্দে ঈ-কার হবে না। যেমন: পুদিনা, মদিনা, জাহান্নামি, মসজিদ, দাখিল, খতিয়ান।
নিমোনিক: তৎসম কীভাবে চিনবেন? নিচে দেখুন লিংক আছে। এতসব পড়ার সময় না থাকলে কী করবেন?সংশ্লিষ্ট শব্দটির বানান জটিল বা প্যাঁচালো মনে হলে, ধরে নেবেন শব্দটি তৎসম হতে পারে। তারপরও যদি সংশয়ে পড়ে যান, ই-কার হবে না কি ঈ-কার হবে, অভিধান দেখারও সুযোগ না-থাকে, তখন কী করবেন? শব্দটি স্ত্রীবাচক কি না দেখুন। তারপর প্রাথমিক ধারণা প্রয়োগ করে ই-কার বসিয়ে দিন। শুদ্ধের ভাগে ৬২ পাবেন, আশা করা যায়।প্রথম বিভাগ।
২। ভাষা ও জাতির মূল বানান প্রায় সবগুলো অতৎসম। তাই সব ভাষা ও জাতির বানানে ই-কার দেবেন। যেমন: আরবি, ফরাসি, ফারসি, ইংরেজি, জাপানি, জর্মনি, বাঙালি, পাকিস্তানি, হিন্দুস্থান, আফগানিস্তান, হিন্দি। তবে, ঈয় প্রত্যয় যুক্ত হলে ভাষা ও জাতির বানানেও ঈ-কার হয়। যেমন: আরব+ঈয়=আরবীয়। অনুরূপ: ফরাসি>ফরাসীয়, ফারসি>ফারসীয়, ইংরেজি>ইংরেজীয়, জাপানি>জাপানীয়, জর্মনি/জর্মন>জর্মনীয়, বাঙালি>বাঙালীয়, হিন্দুস্থান>হিন্দুস্থানীয়, পাকিস্তান>পাকিস্তানীয়, আফগানিস্তান>আফগানিস্তানীয়। (হিন্দুস্থান বানানে স্থান, কিন্তু আফগানিস্তান ও পাকিস্তান বানানে স্তান।) কেন জানতে চাইলে খুঁজে দেখুন শুবাচে।
প্রশ্ন করতে পারেন: শ্রীলংকা, কাশ্মীর, মালদ্বীপ বানানে ঈ-কার কেন। কারণ এগুলো তৎসম। বহুল প্রচলনের কারণে চীন বানানে ঈ-কার রেখে দেওয়া হয়েছে।
তাহলে ঈদ বানানে কেন ঈ-কার রাখা হয়নি? কারণ ঈ, ঋ, ণ ষ প্রভৃতি খাঁটি সংস্কৃত বর্ণ হিসেবে পরিচিত। এ বর্ণগুলো সংস্কৃত শব্দের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। তাই মধ্যপ্রাচ্যিক শব্দ বিবেচনায় ঈদ-সহ আরবি-ফারসি প্রভৃতি শব্দের বানান সংস্কৃত প্রভাবমুক্ত করে বাঙালি স্বকীয়তায় আনার জন্য ঈ/ঈ-কার দেওয়া হয় না।
৩। ব্যক্তির (প্রাণও বিবেচ্য) ক্ষেত্রে শব্দের শেষে সর্বদা -কারী, -চারী, -আরী হবে। যেমন: কর্মচারী, সহকারী, প্রস্তুতকারী, সহচারী, আকাশচারী, খগচারী, অধিকারী, উপকারী, নভোচারী, অহংকারী।
ব্যক্তি না বুঝিয়ে অন্য কিছু বোঝালে -কারী, -চারী, -আরী যথাক্রমে -কারি, -চারি ও -আরি হয়ে যাবে। যেমন: রকমারি, তরকারি, দরকারি, পাইকারি, পায়চারি, সরকারি।
৪। কোনো শব্দের অন্ত্যে ঈ-কার থাকলে এবং ওই শব্দের শেষে বহুবচনজ্ঞাপক পদাংশ ‘-গণ, -পরিষদ, -বর্গ প্রভৃতি যুক্ত হলে, ঈ-কার, ই-কার হয়ে যাবে। যেমন :মন্ত্রী>মন্ত্রিগণ, কর্মচারী> কর্মচারিগণ, কর্মী> কর্মিগণ, প্রার্থী>প্রার্থিগণ, সহকারী>সহকারিগণ, কর্মজীবী>কর্মজীবিগণ, মন্ত্রিবর্গ, মন্ত্রিপরিষদ।

ই-কার ও ঈ-কার-বিধি/২

৫. পূজা-অর্চনা বা উপাসনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট দেবী, দেবীর নামে রাখা প্রাকৃতিক জলাশয়, স্থান কিংবা দেবীর নামের সঙ্গে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে সম্পৃক্ত শব্দের শেষে ঈ-কার হবে। যেমন: দেবী, শ্রীদেবী, লক্ষ্মী, কালী, চণ্ডী, সরস্বতী, ভাগীরথী।
৬. চন্দ্রবিন্দু থাকলে ওই শব্দে একদম ঈ-কার দেবেন না। কারণ চন্দ্রবিন্দু-যুক্ত সব শব্দই অতৎসম। যেমন: চিচিংফাঁক, ঘেঁষাঘেষি, ঝুঁকি, ফাঁকিবাজি, ফাঁসি।
দাদি বলে রাঁধি, চন্দ্রবিন্দুয় ই-কার বসায় গাধি।
৭. শেষে ঈ-কার আছে এমন কোনো তৎসম শব্দকে ঈ-প্রত্যয় (-নী, -ণী ) যুক্ত করে স্ত্রীবাচক করতে গেলে ঈ-প্রত্যয় (-ণী/-নী) যেখানে বসবে তার আগের ঈ-কার, ই-কার করে দেবেন। যেমন: অধিকারী> অধিকারিণী, অধিবাসী> অধিবাসিনী, অধিরোহী> অধিরোহিণী, প্রতিযোগী> প্রতিযোগিনী, অনুরাগী> অনুরাগিনী, অনুসারী> অনুসারিণী, দুঃখী> দুঃখিনী, পালনকারী>পালনকারিণী।
ণ কেন? র থাকায় কয়েকটি শব্দের ন, ণত্ববিধিমতে, ণ হয়ে গেছে। এ নিয়ে ভাববেন না, র-এর পর ণ বসিয়ে দেবেন।
৮। কোনো শব্দের শেষে ঈ-কার থাকলে (সংস্কৃত ইন-প্রত্যয়ান্ত শব্দ) এবং এর শেষে -ত, -তা, -ত্ব, প্রত্যয় যুক্ত করলে প্রত্যয়ের আগের ঈ-কার, ই-কার করে দেবেন। যেমন: গন্ত্রী>গন্ত্রিত্ব, গন্ত্রিতা, গন্ত্রিত; যন্ত্রী>যন্ত্রিত, যন্ত্রিত্ব; স্থায়ী>স্থায়িত্ব, দায়ী>দায়িত্ব, মন্ত্রী>মন্ত্রিত্ব, চমৎকারী>চমৎকারিত্ব; কৃতী> কৃতিত্ব, নীতি>নেতৃত্ব, প্রার্থী>প্রার্থিতা, উপকারী>উপকারিতা, সহযোগী>সহযোগিতা, পরাধীন>পরাধিনতা, আত্মীয়>আত্মিয়তা।
সতীর সতিত্ব আর কৃতীর কৃতিত্ব ই-কার নিয়ে চলন্ত।
৯। কোনো বিশেষ্য বা বিশেষণের শেষে ঈ-কার থাকলে (সংস্কৃত ইন-প্রত্যয়ান্ত শব্দের ঈ-কারান্ত রূপ) এবং ওই শব্দটি সমাসবদ্ধ হলে ঈ-কার, ই-কার বানিয়ে দেবেন। যেমন: প্রাণী> প্রাণিতত্ত্ব, প্রাণিবিদ্যা, প্রাণিবিজ্ঞান; মন্ত্রী> মন্ত্রিপরিষদ, মন্ত্রিসভা, যন্ত্রী> যন্ত্রিবিদ্যা, যন্ত্রিশালা/যন্ত্রিশাল, গন্ত্রী>গন্ত্রিপরিষদ।
১০. ব্যতিক্রান্ত ক্ষেত্র ব্যতিরেকে -কৃত, -ভবন, -ভূত ও -করণ প্রভৃতি যুক্ত হলে বিশেষ্যের শেষের অ/আ/ই/ঈ-কার, ঈ-কার করে দেবেন। যেমন: সরল থেকে সরলীকরণ, ভস্ম থেকে ভস্মীকরণ, বক্র থেকে বক্রীকরণ, ব্যক্ত থেকে ব্যক্তীকরণ, বাজি থেকে বাজীকরণ এবং ঘন থেকে ঘনীকরণ, ঘনীকৃত, ঘনীভবন ও ঘনীভূত।
(আজ এ পর্যন্ত থাক। বাকি অংশের জন্য অপেক্ষা করুন।)
 
শব্দের শেষে কখন ই-কার এবং কখন ঈ-কার হয়?
অতৎসম শব্দে সাধারণত ই-কার হয়। যেমন: সরকারি, শাড়ি, বাড়ি, দিশারি। তৎসম শব্দে সংস্কৃত বানানবিধি অনুযায়ী ই-কার ও ঈ-কার দুটোই হয়। যেমন: নদী, বৃষ্টি।
কোন তৎসম শব্দে ই-কার আর কোন তৎসম শব্দে ঈ-কার হবে তা জানার এবং আয়ত্তে আনার জন্য অনুশীলন করতে হবে। এর কোনো বিকল্প নেই। ইংরেজি শেখার জন্য যে অনুশীলন করা হয় তার অর্ধেক করলেও হবে। যদিও মাতৃভাষা হিসেবে বাংলাকে আয়ত্তে আনার জন্য বিদেশি ভাষার চেয়ে অধিক একাগ্রতা ও শ্রম প্রদান একজন আদর্শ মানুষের দায়িত্ব ও কর্তব্য। এবং মাতৃভাষা অনুরূপ আচরণ প্রত্যাশা করতে পারে। কারণ, অন্যের মায়ের চেয়ে প্রত্যেকের নিজের মায়ের প্রতি অধিক শ্রদ্ধা, মমতা আর যত্ন নিবেদিত করা আদর্শ মানুষ হওয়ার অন্যতম শর্ত।
তৎসম-অতৎসম শব্দ চেনার জন্যও অনুশীলন আবশ্যক। এর বিকল্প নেই। তবে সহজে কিছু শব্দের উৎস-স্বরূপ আয়ত্তে আনার জন্য নিচের লিংকটি দেখতে পারেন:

ব্যাকরণ ছাড়া প্রমিত বাংলা বানান শেখার কৌশল

————————————————————————
প্রথমে বলে রাখি, নিমোনিক কোনো বিধিবদ্ধ ব্যাকরণ বিধি নয়। স্মৃতিজাগানিয়া উপায়ে সহজে প্রমিত বানান রপ্ত করার একটি কৌশল মাত্র। আমাদের মতো সাধারণ বাংলাভাষীর জন্য এসব প্রণীত। অতএব ব্যাকরণবিদগণ এগুলো এড়িয়ে যেতে পারেন। যাঁরা সহজ উপায়ে বাংলা বানান শিখতে চান,তাঁদের জন্য নিমোনিকগুলো হয়তো কাজে লাগতে পারে।
——————————————————————————
হরিণ ও হরিনাম: হরিণ একটি চঞ্চল, কিন্তু নিরীহ বন্যপশু। এর বানানে ‘মূর্ধন্য-ণ’ আবশ্যক। কিন্তু ‘হরিনাম’ বানানে ‘দন্ত্য-ন’। কারণ, হরিনাম করতে হরিণ লাগে না। ‘হরি’ আর ‘নাম’ হলেই চলে। অধিকন্তু, বাঘের আক্রমণ থেকে বাঁচার জন্য হরিণের লম্বা পা লাগে। মূর্ধন্য-ণ’-এর পা ‘দন্ত্য-ন’ এর চেয়ে লম্বা।
হরীতকী: হরীতকী একটি ভেষজ গুণসম্পন্ন ফল। এটি হরি নয়, হরী। তাই বানানে ‘ঈ-কার’।হরিনামের ‘হরি’ শব্দের সঙ্গে ‘হরীতকী’র ‘হরী’ গুলিয়ে যেতে পারে, তাই বৈয়াকরণগণ এ ফলটির বানান রেখেছেন ‘হরীতকী’। এখানে দুটোই ঈ-কার। এটি একটি কষজাতীয় ফল। তাই খেতে দীর্ঘসময় লাগে।এজন্য বানানে ‘ঈ-কার’ আবশ্যক হয়ে পড়েছিল।
হর্ম্য: ‘হর্ম্য’ অর্থ প্রাসাদ। শব্দটির বানানে ‘য-ফলা’ অনিবার্য। কেননা, প্রাসাদ শক্তপোক্ত করতে হলে ‘য-ফলা’র মতো জটিল ও শক্ত ভিত লাগে। লোহাকে বাঁকাতে হয়।
হস্তী— ‘হস্তী’ তৎসম। তাই বানানে ‘ঈ-কার’। হাতি বানানে ই-কার, এটি অতৎসম। বঙ্গদেশের জমিদারগণ হাতির পিঠে ছাতা দিয়ে চলত। তাই হাতি বানানে ছাতা মানে ‘ই-কার’।
 
 
হ্রস্ব ই-কার ও হ্রস্ব উ-কার ব্যবহার:(২০/১০০)
‘সকল অ-তৎসম অর্থাৎ তদ্ভব, দেশি, বিদেশি ও মিশ্র শব্দে প্রযোজ্যমতে কেবল ‘হ্রস্ব-ই’/হ্রস্ব-উ অথবা হ্রস্ব ই-কার /হ্রস্ব উ-কার ব্যবহৃত হবে। এমনকি স্ত্রীবাচক ও জাতিবাচক শব্দের ক্ষেত্রেও এ নিয়ম প্রযোজ্য হবে। যেমন:- গাড়ি, চুরি, দাড়ি, বাড়ি, ভারি, শাড়ি, তরকারি, বোমাবাজি, দাবি, হাতি, বেশি, খুশি, হিজরি, আরবি, ফারসি, ফরাসি, বাঙালি, ইংরেজি, জাপানি, জার্মানি, সিন্ধি, ছুরি, টুপি, সরকারি, মালি, পাগলামি, পাগলি, দিঘি, রেশমি, পশমি, ফরিয়াদি, আসামি, বে-আইনি, কুমির, নানি, দাদি, মামি, চাচি, মাসি, পিসি, দিদি, বুড়ি, নিচু, চুন, ভুখা, পুজো, উনচিল্লশ ইত্যাদি।
‘আলি’ প্রত্যয়যুক্ত শব্দে ‘হ্রস্ব ই-কার’ হবে। যেমন: মেয়েলি, খেয়ালি, মিতালি, বর্ণালি, সোনালি, হেঁয়ালি।
একশ বছরের অধিককাল যাবত হ্রস্ব ই-কার, দীর্ঘ ঈ-কার, হ্রস্ব উ-কার, দীর্ঘ ঊ-কার প্রভৃতির প্রয়োগ নিয়ে বিতর্ক চলছে। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ও কিছু তদ্ভব শব্দে হ্রস্ব ই-কার ও কিছু শব্দে দীর্ঘ ঈ-কার দেওয়ার বিধান দেয়। এ বিধান বানানের ক্ষেত্রে বিদ্যমান বিভ্রান্তিকে আরও বাড়িয়ে দেয়। হ্রস্ব ই-কার ও দীর্ঘ ই-কার প্রসঙ্গে রবীন্দ্রনাথ ও বানান সংস্কার কমিটির কর্ণধার সুনীতি কুমার চট্টোপাধ্যায় ছিলেন পরস্পর বিপরীতমুখী। রবীন্দ্রনাথ একমাত্র সর্বনাম ‘কী’ ছাড়া তদ্ভব বা প্রাকৃত বাংলা শব্দে দীর্ঘ ঈ-কার লেখার ছাড়্পত্র দেননি। তিনি সংস্কৃত ঘটী ও নীচ বানানও লিখেছেন যথাক্রমে ঘটি ও নিচ। স্ত্রীলিঙ্গে দীর্ঘ ঈ-কার প্রয়োগকেও তিনি স্বীকৃতি দেননি। অন্যদিকে সুনীতি কুমার ছিলেন দীর্ঘ ঈ-কার এর পক্ষে। তাঁরমতে, দীর্ঘ ঈ-কার লেখা সহজ। অধুনা তদ্ভব, অর্ধতৎসম, ভারতীয় অন্যান্য ভাষার শব্দ ও বিদেশি শব্দের বানানে ঈ, ঈ-কার, ঊ, ঊ-কার বর্জন করা হচ্ছে।
যখনই আপনার মনে ই-কার ও ঈ-কার এবং উ-কার ও ঊ-কার নিয়ে বিন্দুমাত্র সন্দেহ হবে, তখনই ই-কার এবং উ-কার ব্যবহার করুন; বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই আপনার বানান শুদ্ধ হওয়ার সম্ভাবনা কিছুটা বেশি থাকবে। আর শুদ্ধতা সব সময় নিশ্চিত করতে চাইলে, আপনাকে অভিধান সাথে রাখতে হবে এবং সন্দেহ হলেই অভিধান দেখে প্রতিটি শব্দের শুদ্ধতা যাচাই করে নিতে হবে।
 
-কারী ও -কারি; -গণ যুক্তে ঈ-কার নাশ: ৩২/১০০
ব্যক্তির ক্ষেত্রে ‘-কারী’ বা ‘-আরী’- শব্দাংশে ঈ-কার হয়। যেমন : সহকারী (সহ+কারী), উপকারী(উপ+কারী); আবেদনকারী, পথচারী, হত্যাকারী, অনিষ্টকারী, কর্মচারী, প্রদানকারী, সাহায্যকারী, প্রবেশকারী ইত্যাদি। শুধু ‘-কারী’ নয়; ‘-চারী’ বা ‘-আরী’ যুক্ত হলেও ব্যক্তির ক্ষেত্রে ‘ঈ-কার’ হবে। যেমন : অত্যাচারী, নভোচারী, ব্যভিচারী, আকাশচারী, সহচারী ইত্যাদি। ‘-যোগী’ বা ‘-চরী’ যুক্ত হলেও ব্যক্তির ক্ষেত্রে ‘ঈ-কার’ হবে। যেমন : সহযোগী, সহচরী। অর্থাৎ এসব তৎসম শব্দের বানানের অর্থ ব্যক্তি প্রকাশের ক্ষেত্রে ‘ঈ-কার’ হবে।
ব্যক্তি ছাড়া অন্যান্য ক্ষেত্রে ‘ই-কার’ হবে। যেমন : সরকারি, দরকারি, তরকারি, বাহারি ইত্যাদি। তবে, অতৎসম শব্দে ‘ই-কার’ হবে। যেমন : বাহাদুরি (তুর্কি বাহাদুর+ফারিস ই); শিকারি (ফারসি), শাঁখারি(অতৎসম) প্রভৃতি শব্দ ব্যক্তি প্রকাশ করলেও অতৎসম হওয়ায় বানানে ‘ই-কার’ হয়েছে। আর একটা বিষয়, ইন্-প্রত্যয়ান্ত শব্দের সঙ্গে ‘–গণ’ যুক্ত হলে ই-কার হবে। যেমন— সহকারী > সহকারিগণ, কর্মচারী> কর্মচারিগণ, আবেদনকারী> আবেদনকারিগণ, কর্মী> কর্মিগণ, মন্ত্রী>মন্ত্রিসভা ইত্যাদি।
নিমোনিক: ব্যক্তি না হলে সেসব শব্দের বানানে সাধারণত তরকারি বানানের ‘-কারি’ দেবেন। যেমন: পাইকারি, পায়চারি, সরকারি, দরকারি, তরকারি। এসব শব্দ ব্যক্তি বোঝায় না। তাই তরকারি বানানের -কারি। ব্যক্তি প্রকাশ করলে ‘-কারী’ দিতে হবে। কারণ, ব্যক্তির সঙ্গে তরকারি দিলে খেয়ে ফেলবে। তাই ব্যক্তি প্রকাশে ‘-কারি’ হয় না; ‘কারী’ হয়। যেমন: সহকারী, উপকারী, কর্মচারী, দরখাস্তকারী, হঠকারী, নভোচারী, অন্যায়কারী।

ঈয় ও অনীয় প্রত্যয় নিমোনিক

-ঈয়/-অনীয় প্রত্যয়-যুক্ত হলে মূল শব্দের শেষে ঈ-কার হবে। যেমন:
ইউরোপ+ঈয়= ইউরোপীয়।
মিশর+ঈয়=মিশরীয়।
জাতি+ঈয়= জাতীয়।
দেশ+ঈয়= দেশীয়।
প্রয়োজন+অনীয়= প্রয়োজনীয়।
সম্মান+অনীয় = সম্মাননীয়।
ব্যতিক্রম: ইন্দ্র+ঈয়= ইন্দ্রিয়।

নিমোনিক: মনে করুন, যেসব প্রত্যয়যুক্ত শব্দের শেষে ‘ইয়ো’ উচ্চারিত হয় সেসব শব্দের শেষে -ঈয়/-অনীয় প্রত্যয় যুক্ত হয়েছে। তাই ঈ-কার দিন। যেমন :অকরণীয়, অকল্পনীয়, অখণ্ডনীয়, অগণনীয়, অগ্রহণীয়, অঘটনীয়, করণীয়, গোপনীয়, তুলনীয়, পালনীয়, বরণীয়, বায়বীয়, ভারতীয়, মাননীয়, রাজকীয়, লক্ষণীয়, শোচনীয়, স্মরণীয়, স্থানীয় ইত্যাদি।

স্মর্তব্য: ইন্দ্র+ইয়= ইন্দ্রিয়। তাই ইন্দ্রিয় যুক্ত শব্দসমূহ ঈয়ো’ উচ্চারিত হওয়া সত্ত্বেও বানানে ই-কার। যেমন: অজিতেন্দ্রিয়, অন্তরিন্দ্রিয়। ‘ঈয়ো’ উচ্চারণ হওয়া সত্ত্বেও বানানে ই-কার।
ব্যতিক্রম: অচিরক্রিয়।
 
 
মুমূর্ষু পিপীলিকা :
‘মুমূর্ষু’ শব্দে প্রথমে উ-কার, দ্বিতীয় ঊ-কার এবং তৃতীয় উ-কার। অর্থাৎ ১২১। কিন্তু কেন? এর কারণ আছে। বর্ণমালার সজ্জা অনুযায়ী উ-কার এক(১) ও ঊ-কার দুই(২) দ্বারা চিহ্নিত করার পর অনুরূপ উচ্চারণের আর কোনো বর্ণ নেই বলে বানান চক্রকে আবার প্রথম থেকে শুরু করতে হয়। তাই বানান ক্রমটি হয়ে যায়: ই ঈ ই= ই-কার ঈ-কার ই-কার= ১২১। অর্থাৎ প্রথমে উ-কার, দ্বিতীয় ঊ-কার এবং তৃতীয় আবার উ-কার= মুমূর্ষু=১২১।
 
‘পিপীলিকা’ শব্দে প্রথমে ই-কার, দ্বিতীয় ঈ-কার এবং এরপর সমোচ্চারিত আর কোনো বর্ণচিহ্ন নেই বলে পুনরায় প্রথম থেকে শুরু করা হয়েছে। তাই পিপীলিকা বানানের প্রথম ই-কার, দ্বিতীয়ত ঈ-কার এবং তৃতীয় স্থানে আবার ই-কার= পিপীলিকা= ১২১। এরূপ ১২১ বানান ক্রমের আরও কিছু শব্দ হলো: উপচিকীর্ষা, নির্মীলিত, নিপীড়িত, পরিবীক্ষিত, বিভীষিকা, নিশীথিনি পিরীতি, চিকীর্ষিত, নিরীক্ষিত, পরিকীর্তিত।
এরূপ আরও শব্দ জানা থাকলে জানান।

বাংলায় ব্যবহৃত বিদেশি শব্দের বানানে ঈ-কার যখন অত্যাবশ্যক

বাংলায় ব্যবহৃত বিদেশি শব্দের বানানে সাধারণত ‘ঈ-কার’ হয় না, ই-কার হয়। তবে, ঈয়-প্রত্যয় যুক্ত হলে বিদেশি শব্দের বনানেও ঈ-কার দিতে হয়। কারণ, ঈয়-প্রত্যয় যুক্ত হলে প্রত্যয়ের পূর্বের বর্ণ ঈ-কার লাভ করে। যেমন: জাতি+ঈয়= জাতীয়, ভারত+ঈয়= ভারতীয়।
আফ্রিকা, ইতালি, এশিয়া, তুর্কি, ফরমালিন, বেঞ্চি, গায়েবি, ইউরোপিয়ান, শহিদ, আরবি, সিন্ধি, রাশিয়া, গ্রিক, বিহারি, ইসলামি, মসজিদ প্রভৃতি বিদেশি শব্দ। কিন্তু ‘-ঈয়’ প্রত্যয় যুক্ত হলে এসব বিদেশি শব্দের বানানেও ‘ঈ-কার’ দিতে হবে। যেমন:
আফ্রিকা+ঈয়= আফ্রিকীয়,
ইতালি+ ঈয়= ইতালীয়,
ইংরেজ+ঈয়= ইংরেজীয়
এশিয়া+ঈয়= এশীয়,
তুর্কি+ঈয়= তুর্কীয়,
ফরমালিন+ঈয় = ফরমালিনীয়,
বেঞ্চি+ঈয়= বেঞ্চীয়,
গায়েব+ঈয়= গায়েবীয়,
ইউরোপ+ঈয়= ইউরোপীয়,
শহিদ+ঈয়= শহিদীয়,
আরব+ঈয়= আরবীয়,
সিন্ধি+ঈয়= সিন্ধীয়,
রাশিয়া+ঈয়= রাশীয়,
আয়ন+ঈয়= আয়নীয়,
বিহারি+ঈয়= বিহারীয়,
গ্রিক+ঈয়= গ্রিকীয়,
বেহেশত+ঈয়= বেহেশতীয়,
অনুরূপ: আসামীয় (অভিযুক্ত ব্যক্তি অর্থে), ইরানীয়, ইমানীয়, কাহিনীয়, ফরাসীয়, ফারসীয়, ফিরিঙ্গীয়, হিজরীয়, আইনীয়, মসজিদীয়, নামাজীয়, মহব্বতীয়, বেগুনীয়, আর্মেনীয়, খ্রিষ্টীয়, মিশরীয়, হিন্দীয়,পাকিস্তানীয়, জাপানীয় প্রভৃতি।
 
 
 
পিপীলিকা নিমোনিক:
 
পিপীলিকা [পিপীলক+আ টোপ)] শব্দের অর্থ -দলবদ্ধ হয়ে বাস করে এমন ছয় পা-বিশিষ্ট ডানাহীন ক্ষুদ্র পরিশ্রমী সামাজিক ও সুশৃঙ্খল কীটবিশেষ। শব্দটির বানান লিখতে অনেকের ভুল হয়। ভুল হয়ে যায় – কোথায় হবে ই-কার এবং কোথায় হবে ঈ-কার। এমন সংশয় দূর করার জন্য একটি নিমোনিক মনে রাখুন : বর্ণমালায় প্রথমে ই এবং তারপর ঈ। তাই পিপীলিকা বানানেও প্রথমে ই-কার এবং পরে ঈ-কার। তারপর আবার ই-কার হয়ে আ-কারে গিয়ে শেষ হয়।
 
খুশি ও সুখী নিমোনিক :
পোস্টটি আমার মতো যাদের বাংলা বানানে সংশয় হয় তাদের জন্য। বিশেজ্ঞদের পড়ার প্রয়োজন নেই।
ফারসি ‘খুশি’ শব্দের আভিধানিক অর্থ আনন্দ, সন্তোষ, ইচ্ছা, মর্জি প্রভৃতি। সংস্কৃত ‘সুখী (সুখ+ইন্)’ শব্দের আভিধানিক অর্থ সন্তুষ্ট, সুখভোগে অভ্যস্ত প্রভৃতি। বিদেশি শব্দ বলে ‘খুশি’ বানানে হ্রস্ব-ইকার এবং তৎসম বলে ‘সুখী’ বানানে ঈ-কার। তৎসম-অতৎস বা দেশি-বিদেশি নিয়ে অত জানার সুযোগ আমাদের মতো সাধারণ লোকের নেই। এগুলো বিশেষজ্ঞ পর্যাযের বিষয়। তাই শব্দদুটোর কোনটিতে ই-কার এবং কোনটিতে ঈ-কার হবে তা নিয়ে নিয়ে আমার সংশয় লেগে যায়। সংশয় কাটানোর জন্য আমি মনে মনে একটা কৌশল ঠিক করেছি। যেমন : সখী বানানে ঈ-কার। সখী থেকে ধরে নিলাম সুখী। তাই সুখী বানানেও ঈ-কার।
 

অকালি ও মাকালী

অকালি, কিন্তু মাকালী— একটা ল-য়ে ‘ই-কার’ এবং আরেকটায় ‘ঈ-কার’, কিন্তু কেন?
‘অকালি’ একটি সম্প্রদায়ের নাম। শিখ সম্প্রদায়ের যেসকল অনুসারী অকাল-পুরুষ উপাসনা করেন তাদের অকালি বলা হয়।ভারতে এরা বিশেষভাবে ‘অকালি’ হিসেবে পরিচিত। এটি অতৎসম শব্দ। এজন্য শব্দটির বানানে দীর্ঘ-ঈ অনাবশ্যক।
‘কালী’ বা ‘মা-কালী’ একজন হিন্দু দেবী। তাঁর অপর নাম শ্যামা বা আদ্যাশক্তি। শাক্ত সম্প্রদায়ের লোকেরা মা কালীর পূজা করে থাকে। এটি তৎসম শব্দ। তাই এর বানানে দীর্ঘ ঈ-কার আবশ্যক। বাঙালি হিন্দু সমাজে কালীর মাতৃরূপের পূজা বিশেষ জনপ্রিয়। তাই কালীকে মা কালী বা মা-কালী বলা হয়। প্রসঙ্গত, যারা শক্তির উপাসনা করেন, তাদের শাক্ত বলা হয়।

কাহিনি বাহিনী এবং অক্ষৌহিণী

অক্ষৌহিণী: অক্ষৌহিণী (অক্ষ+ ঊহিণী) তৎসম শব্দ। পুরাণমতে পদাতি, অশ্ব, হস্তী ও রথ মিলিয়ে ২,১৮,৭০০ সৈন্যে এক অক্ষৌহিণী। তন্মধ্যে ১০৯৩৫০ পদাতি, ৬৫৬১০ অশ্ব, ২১৮৭০ হস্তী,২১৮৭০ রথ; এই সংখ্যক চতুরঙ্গ সেনাদলকে একত্রে এক অক্ষৌহিণী বলে।
বাহিনী: বাহিনীর দুটি পৃথক ভুক্তি। সংস্কৃত বাহিনী (বাহ+ইন্+ঈ) অর্থ (বিশেষ্যে) সৈন্যদল; পৌরাণিক ৮১টি হাতি, ৮১টি রথ, ২৪৩টি ঘোড়া এবং ৪০৫ জন পদাতিক নিয়ে গঠিত সেনাসমাবেশ। বস্তুত, পৌরাণিক এই সেনাসমাবেশ থেকে বাহিনী শব্দের উদ্ভব।সেনাসমাবেশ ছাড়ও আর একটি বাহিনী আছে। এই বাহিনী (বাহ+ইন্+ঈ) অর্থ (বিশেষ্যে) প্রবাহিণী, নদী।
কাহিনি-বাহিনী: হিন্দি কাহানি থেকে কাহিনি শব্দের উদ্ভব। এটি অতৎসম শব্দ। তাই ই-কার। বাহিনী সংস্কৃত শব্দ। মূল সংস্কৃত বানানে ‘নী’ আছে। তাই বাহিনী বানানে ঈ-কার।
error: Content is protected !!