ই-কার ও ঈ-কার বিধি

ড. মোহাম্মদ আমীন

এই পোস্টের সংযোগ: https://draminbd.com/ই-কার-ও-ঈ-কার-বিধি/

ই-কার ও ঈ-কার বিধি

১। সংস্কৃত বা তৎসম ছাড়া বাকি সব শব্দে ই-কার হবে। যেমন: গাড়ি, সুখি, দাদি, গাভি, সরকারি, ফেব্রুয়ারি, ইমামতি, দিঘি, পাখি, চিমনি, ইদ, শহিদ, গির্জা। কোনো বিদেশি শব্দে ঈ-কার হবে না। যেমন: পুদিনা, মদিনা, জাহান্নামি, মসজিদ, দাখিল, খতিয়ান।
নিমোনিক: তৎসম কীভাবে চিনবেন? নিচে দেখুন লিংক আছে। এতসব পড়ার সময় না থাকলে কী করবেন?সংশ্লিষ্ট শব্দটির বানান জটিল বা প্যাঁচালো মনে হলে, ধরে নেবেন শব্দটি তৎসম হতে পারে। তারপরও যদি সংশয়ে পড়ে যান, ই-কার হবে না কি ঈ-কার হবে, অভিধান দেখারও সুযোগ না-থাকে, তখন কী করবেন? শব্দটি স্ত্রীবাচক কি না দেখুন। তারপর প্রাথমিক ধারণা প্রয়োগ করে ই-কার বসিয়ে দিন। শুদ্ধের ভাগে ৬২ পাবেন, আশা করা যায়।প্রথম বিভাগ।
২। ভাষা ও জাতির মূল বানান প্রায় সবগুলো অতৎসম। তাই সব ভাষা ও জাতির বানানে ই-কার দেবেন। যেমন: আরবি, ফরাসি, ফারসি, ইংরেজি, জাপানি, জর্মনি, বাঙালি, পাকিস্তানি, হিন্দুস্থান, আফগানিস্তান, হিন্দি। তবে, ঈয় প্রত্যয় যুক্ত হলে ভাষা ও জাতির বানানেও ঈ-কার হয়। যেমন: আরব+ঈয়=আরবীয়। অনুরূপ: ফরাসি>ফরাসীয়, ফারসি>ফারসীয়, ইংরেজি>ইংরেজীয়, জাপানি>জাপানীয়, জর্মনি/জর্মন>জর্মনীয়, বাঙালি>বাঙালীয়, হিন্দুস্থান>হিন্দুস্থানীয়, পাকিস্তান>পাকিস্তানীয়, আফগানিস্তান>আফগানিস্তানীয়। 
প্রশ্ন করতে পারেন: শ্রীলংকা, কাশ্মীর, মালদ্বীপ বানানে ঈ-কার কেন। কারণ এগুলো তৎসম। বহুল প্রচলনের কারণে চীন বানানে ঈ-কার রেখে দেওয়া হয়েছে। তাহলে ঈদ বানানে কেন ঈ-কার রাখা হয়নি? কারণ ঈ, ঋ, ণ ষ প্রভৃতি খাঁটি সংস্কৃত বর্ণ হিসেবে পরিচিত। এ বর্ণগুলো সংস্কৃত শব্দের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। তাই মধ্যপ্রাচ্যিক শব্দ বিবেচনায় ঈদ-সহ আরবি-ফারসি প্রভৃতি শব্দের বানান সংস্কৃত প্রভাবমুক্ত করে বাঙালি স্বকীয়তায় আনার জন্য ঈ/ঈ-কার দেওয়া হয় না।
৩। ব্যক্তির (প্রাণও বিবেচ্য) ক্ষেত্রে শব্দের শেষে সর্বদা -কারী, -চারী, -আরী হবে। যেমন: কর্মচারী, সহকারী, প্রস্তুতকারী, সহচারী, আকাশচারী, খগচারী, অধিকারী, উপকারী, নভোচারী, অহংকারী। ব্যক্তি না বুঝিয়ে অন্য কিছু বোঝালে -কারী, -চারী, -আরী যথাক্রমে -কারি, -চারি ও -আরি হয়ে যাবে। যেমন: রকমারি, তরকারি, দরকারি, পাইকারি, পায়চারি, সরকারি।
৪। কোনো শব্দের অন্ত্যে ঈ-কার থাকলে এবং ওই শব্দের শেষে বহুবচনজ্ঞাপক পদাংশ ‘-গণ, -পরিষদ, -বর্গ প্রভৃতি যুক্ত হলে, ঈ-কার, ই-কার হয়ে যাবে। যেমন :মন্ত্রী>মন্ত্রিগণ, কর্মচারী> কর্মচারিগণ, কর্মী> কর্মিগণ, প্রার্থী>প্রার্থিগণ, সহকারী>সহকারিগণ, কর্মজীবী>কর্মজীবিগণ, মন্ত্রিবর্গ, মন্ত্রিপরিষদ।
৫. পূজা-অর্চনা বা উপাসনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট দেবী, দেবীর নামে রাখা প্রাকৃতিক জলাশয়, স্থান কিংবা দেবীর নামের সঙ্গে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে সম্পৃক্ত শব্দের শেষে ঈ-কার হবে। যেমন: দেবী, শ্রীদেবী, লক্ষ্মী, কালী, চণ্ডী, সরস্বতী, ভাগীরথী।
৬. চন্দ্রবিন্দু থাকলে ওই শব্দে একদম ঈ-কার দেবেন না। কারণ চন্দ্রবিন্দু-যুক্ত সব শব্দই অতৎসম। যেমন: চিচিংফাঁক, ঘেঁষাঘেষি, ঝুঁকি, ফাঁকিবাজি, ফাঁসি। দাদি বলে রাঁধি, চন্দ্রবিন্দুয় ই-কার বসায় গাধি।
৭. শেষে ঈ-কার আছে এমন কোনো তৎসম শব্দকে ঈ-প্রত্যয় (-নী, -ণী ) যুক্ত করে স্ত্রীবাচক করতে গেলে ঈ-প্রত্যয় (-ণী/-নী) যেখানে বসবে তার আগের ঈ-কার, ই-কার করে দেবেন। যেমন: অধিকারী> অধিকারিণী, অধিবাসী> অধিবাসিনী, অধিরোহী> অধিরোহিণী, প্রতিযোগী> প্রতিযোগিনী, অনুরাগী> অনুরাগিনী, অনুসারী> অনুসারিণী, দুঃখী> দুঃখিনী, পঙ্কজিনী>পঙ্কজিনী, পালনকারী>পালনকারিণী।
ণ কেন? র থাকায় কয়েকটি শব্দের ন, ণত্ববিধিমতে, ণ হয়ে গেছে। এ নিয়ে ভাববেন না, র-এর পর ণ বসিয়ে দেবেন।
৮। কোনো শব্দের শেষে ঈ-কার থাকলে (সংস্কৃত ইন-প্রত্যয়ান্ত শব্দ) এবং এর শেষে -ত, -তা, -ত্ব, প্রত্যয় যুক্ত করলে প্রত্যয়ের আগের ঈ-কার, ই-কার করে দেবেন। যেমন: গন্ত্রী>গন্ত্রিত্ব, গন্ত্রিতা, গন্ত্রিত; যন্ত্রী>যন্ত্রিত, যন্ত্রিত্ব; স্থায়ী>স্থায়িত্ব, দায়ী>দায়িত্ব, মন্ত্রী>মন্ত্রিত্ব, নারী>নারিত্ব; কৃতী> কৃতিত্ব, নীতি>নেতৃত্ব, প্রার্থী>প্রার্থিতা, উপকারী>উপকারিতা, সহযোগী>সহযোগিতা, পরাধীন>পরাধিনতা, আত্মীয়>আত্মিয়তা।
সতীর সতিত্ব আর কৃতীর কৃতিত্ব ই-কার নিয়ে চলন্ত।
৯। কোনো বিশেষ্য বা বিশেষণের শেষে ঈ-কার থাকলে (সংস্কৃত ইন-প্রত্যয়ান্ত শব্দের ঈ-কারান্ত রূপ) এবং ওই শব্দটি সমাসবদ্ধ হলে ঈ-কার, ই-কার বানিয়ে দেবেন। যেমন: প্রাণী> প্রাণিতত্ত্ব, প্রাণিবিদ্যা, প্রাণিবিজ্ঞান; মন্ত্রী> মন্ত্রিপরিষদ, মন্ত্রিসভা, যন্ত্রী> যন্ত্রিবিদ্যা, যন্ত্রিশালা/যন্ত্রিশাল, গন্ত্রী>গন্ত্রিপরিষদ।
১০. ব্যতিক্রান্ত ক্ষেত্র ব্যতিরেকে -কৃত, -ভবন, -ভূত ও -করণ প্রভৃতি যুক্ত হলে বিশেষ্যের শেষের অ/আ/ই/ঈ-কার, ঈ-কার করে দেবেন। যেমন: সরল থেকে সরলীকরণ, ভস্ম থেকে ভস্মীকরণ, বক্র থেকে বক্রীকরণ, ব্যক্ত থেকে ব্যক্তীকরণ, বাজি থেকে বাজীকরণ এবং ঘন থেকে ঘনীকরণ, ঘনীকৃত, ঘনীভবন ও ঘনীভূত।
১১. অঞ্জলি যার সঙ্গে বসুক না, সর্বদা ই-কার হবে। অর্থাৎ পদের শেষে প্রত্যয় বা অঞ্জলি সর্বদা ই-কার বহন করে। যেমন: করঞ্জলি, মহঞ্জলি, গীতাঞ্জলি, জলাঞ্জলি, পুষ্পাঞ্জলি, শ্রদ্ধাঞ্জলি।
—————–

All Link

বিসিএস প্রিলি থেকে ভাইভা কৃতকার্য কৌশল

ড. মোহাম্মদ আমীনের লেখা বইয়ের তালিকা

বাংলা সাহিত্যবিষয়ক লিংক

বাংলাদেশ ও বাংলাদেশবিষয়ক সকল গুরুত্বপূর্ণ সাধারণজ্ঞান লিংক

বাংলা বানান কোথায় কী লিখবেন এবং কেন লিখবেন/১

বাংলা বানান কোথায় কী লিখবেন এবং কেন লিখবেন/২

বাংলা বানান কোথায় কী লিখবেন এবং কেন লিখবেন /৩

কীভাবে হলো দেশের নাম

ইউরোপ মহাদেশ : ইতিহাস ও নামকরণ লিংক

শুদ্ধ বানান চর্চা লিংক/১

দৈনন্দিন বিজ্ঞান লিংক

শুদ্ধ বানান চর্চা লিংক/২

শুদ্ধ বানান চর্চা লিংক/৩

শুদ্ধ বানান চর্চা লিংক/৪

কীভাবে হলো দেশের নাম

সাধারণ জ্ঞান সমগ্র

সাধারণ জ্ঞান সমগ্র/১

সাধারণ জ্ঞান সমগ্র/২

বাংলাদেশের তারিখ

ব্যাবহারিক বাংলা বানান সমগ্র : পাঞ্জেরী পবিলেকশন্স লি.

শুদ্ধ বানান চর্চা প্রমিত বাংলা বানান বিধি : বানান শেখার বই

কি না  বনাম কিনা এবং না কি বনাম নাকি

মত বনাম মতো : কোথায় কোনটি এবং কেন লিখবেন

ভূ ভূমি ভূগোল ভূতল ভূলোক কিন্তু ত্রিভুবন : ত্রিভুবনের প্রিয় মোহাম্মদ

মত বনাম মতো : কোথায় কোনটি এবং কেন লিখবেন

error: Content is protected !!