ঈশ্বরচন্দ্র কেন শর্ম্মা

ইউসুফ খান

ঈশ্বরচন্দ্র কেন শর্ম্মা

গায়ের রং ফর্সা হলে আর ছেলেকে দামী ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলে ভর্তি করে দিলে, জেলে বউ ভাবে – ছেলের সঙ্গে আমরাও হাই সোসাইটির লোক হয়ে গেলাম, তেলি বউয়ের সঙ্গে কথা বললে আমার স্টেটাস নেমে যাবে না? ওদিকে ওয়ান্না-বি তেলি বউও ভাবে – আমিও বাপু অনেক তিল পিষি, আমারও কি তিলিস্‌মাত কম নাকি?
আশ্রম মানে স্কুল, সেখানে ছাত্ররা শ্রমে ব্যস্ত থাকে কিছু না কিছু শিখতে। শিক্ষক হচ্ছেন শ্রমণ শর্ম্মণঃ। আশ্রমে শ্রমণের কাছে যে কিছু শিখেছে, সে আশ্রম>শর্‌ম্‌ ফেরত, তাই শর্মা।
আশ্রমে ফর্সা ফর্সা আর্যগুরু ফর্সা ফর্সা বাচ্চাদের বেদ আর ব্রহ্মজ্ঞান দিতো। গাই পুষতো, দুধ-ঘি আর বনের ফলমূল খেতো। বাকি

ইউসুফ খান

কাজকর্মের সঙ্গে কোনও লেনাদেনা নেই। এটাই ব্রহ্মচর্যাশ্রম। আশ্রম থেকে বেরিয়ে আসা সবাই শর্মা। এরা ব্রহ্মবিদ্যাচর্চাকারী ব্রাহ্মণ। সমাজে তাদের ভাবই আলাদা।
এদিকে আর্যদের চেয়ে উন্নত, বিশ্বের সব কর্মে দক্ষ কেলোকুলো অনার্য জাতির বিশ্বকর্মারা – মেটালার্জি জানা কর্মকার-লোহার, কার্পেন্ট্রি জানা সুতার, জড়িবুটির চিকিৎসা জানা বৈদ্য-বেদিয়া-বেদে, এরা বললো আমাদেরও তো বাপু এসব শিখতে স্কুলিং লাগে, তাহলে আমরাও শিখে শর্মা। তোমাদের আশ্রম থিওলজিক্যাল আর আমাদের ফ়িজিক্যাল। তোমরা শ্বেতবর্ণ, আমরা কৃষ্ণবর্ণ। তোমাদের আশ্রম, আমাদের পরিশ্রম। এই হচ্ছে বর্ণভেদী আশ্রম, বর্ণাশ্রম।
উত্তর ভারতের বিশ্ব-কর্মারা তাই নিজেদের শর্মা বলতে লাগলো। ওদিকে ঘুরে ঘুরে বিজনেস করা (ৱিশ্‌ = ভ্রমণ) বৈশ্য ব্যাপারীরাও বললো আমরাও শর্মা। এখন এই একুশ শতাব্দীতে বিহারি শূদ্ররাও নিজেদের সারনেমে বেশরম শর্মা লাগাচ্ছে। কিন্তু আজ পর্যন্ত কোনও ব্রাহ্মণ-শর্মা ব্রহ্মশর্ম্মণঃ বাকি শর্মাদের শর্মা বলে পাত্তাই দেয় না।
বাংলাতে বর্ণাশ্রমের কোনও গল্পই ছিলো না। উত্তর ভারত আজ পর্যন্ত কোনোদিন বাংলাকে কোনও হিসেবের মধ্যেই আনেনি। বলে – বাঙালিরা কিচিরমিচির করে পাখির মতো, বায়াংসি। মছ্‌লি খাতা হ্যায়। বিহার-ঘেঁষা বাংলায় অস্ট্রিক কোল মুণ্ডা হাড়ি বাউরি গোণ্ড জাতির বাস। বাংলায় কোনও ব্রাহ্মণই ছিলোনা। আদিশূরের গল্পে পণ্ডিতরা প্রচুর গুল্প খুঁজে বার করেছেন। কিন্তু ওই যে ওয়ান্না-বি! বাজারে ব্রাহ্মণদের ভাও বেশি দেখে, তেলি বউয়ের মতো বাংলার ঘরে ঘরে স্বঘোষিত ব্রাহ্মণ গজিয়ে উঠলো। (ব্রাহ্মণ এসে থাকলেও, ব্রাহ্মণী তো আসেনি)।
সে যুগে মানুষের সারনেম পদবী হতো না। রাম রাবণ দুর্যোধন নামগুলো এখানেই শেষ। শর্মা ছিলো ডিগ্রি আর বন্দ্যোপাধ্যায় চট্টোপাধ্যায় হচ্ছে অর্বাচীন নব্য-সংস্কৃত, কালকের বানানো কথা। কোন্‌ গাঁয়ের মাস্টারমশাই সেই ঠিকানা জানানোর জন্য নামের শেষে গাঞী পরিচয় লাগানো লেজেন্ড। বিদ্যাসাগর রাঢ় থেকে আসা মাস্টারমশাই, আচার্য। বন্দ্যোপাধ্যায় সেই পরিচয়।
পদবী জুড়ে নাম লেখা চালু হবার আগে, ব্রাহ্মণ বোঝানোর জন্য লোকে লিখতো শর্মা-শর্ম্মণঃ-দেবশর্মণঃ। ব্রাহ্মণ মহিলারা লিখতো দেবী। অব্রাহ্মণ হলে দাসী।
ঈশ্বরচন্দ্রের উপাধি বিদ্যাসাগর, গাঞী পরিচয় বন্দ্যোপাধ্যায়, লিখতেন ঈশ্বরচন্দ্র শর্ম্মা। সেসময় সব ব্রাহ্মণই এভাবেই লিখতেন। আমরা লিখি ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর।

ইউসুফ খান, কলকাতা, ২০২০ জুন ০৬

সূত্র: ঈশ্বরচন্দ্র কেন শর্ম্মা, ইউসুফ খান, শুদ্ধ বানান চর্চা (শুবাচ)

বাঁকুড়া থেকে বগুড়া, ইউসুফ খান, শুদ্ধ বানান চর্চা (শুবাচ)

বেশ্যারা প্রস্টিটিউট নয়, ইউসুফ খান, শুদ্ধ বানান চর্চা (শুবাচ)

ইত্যাদি প্রভৃতি প্রমুখ. ইউসুফ খান, শুদ্ধ বানান চর্চা (শুবাচ)

শুবাচ গ্রুপ এর লিংক: www.draminbd.com

All Link

All Links/1

All Links/2 শুবাচির পশ্ন থেকে উত্তর

উৎস: ব্যাবহারিক প্রমিত বাংলা বানান সমগ্র, ড. মোহাম্মদ আমীন, পাঞ্জেরী পবিলেকশন্স লি.

বাক্য: গঠন-অগঠন/১

বাংলা শব্দের পৌরাণিক উৎস, ড. মোহাম্মদ আমীন

মৌলবাদ ও মৌলবাদী শব্দের অর্থ কী জানতে চাই

বাংলা ভাষার মজা, ড. মোহাম্মদ আমীন, পাঞ্জেরী পবিলেকশন্স লি.

আল্লাহ শব্দের বাংলা

শুবাচ বিসিএস বাংলা/১

শুবাচির প্রশ্ন থেকে উত্তর/৩২

শুবাচির প্রশ্ন থেকে উত্তর/ ৩৩

বহুল ব্যবহৃত কিছু শব্দের শুদ্ধ বানান/১২ ড. মোহাম্মদ আমীন

ইত্যাদি প্রভৃতি প্রমুখ

বেশ্যারা প্রস্টিটিউট নয়

বাঁকুড়া থেকে বগুড়া

ঈশ্বরচন্দ্র কেন শর্ম্মা

 

error: Content is protected !!