ঈশ্বরের পরাজয়

ড. মোহাম্মদ আমীন

ঈশ্বরের পরাজয়

ড. মোহাম্মদ আমীন
একদিন ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর এবং ইংরেজ প্রফেসর কাম প্রশাসক মিস্টার লেথব্রিজ হুগলী নদীর তীরে হাওয়া খাচ্ছিলেন। লেথব্রিজ ভালো বাংলা জানেন গর্বে গর্বিত হয়ে বিদ্যাসাগরকে খোঁচা দিয়ে যাচ্ছিলেন। বিদ্যাসাগর তাঁকে উচিত শিক্ষা দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেন।
লেথব্রিজ গর্বের সঙ্গে বললেন, ‘জান ঈশ্বর, আমি ভালো বাংলা শিখিয়াছি। টোমাদের বাংলার লোকও আমার মটো বালো বাংলা বলটে পারে না। আমি ইচ্ছা করিলে টোমাকে বাংলা শিখাইতে পারিব।
কেমন ভালো বাংলা জান তুমি?
পরীক্ষা করিয়া দেখিতে পার।
ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর বললেন, (boat) অর্থ কী?
তরণি। এইটা কোনো প্রশ্ন হইলো।
যে তরণি চালায় তাহাকে কী বলে?
কর্ণধার। এইটা আরও সহজ প্রশ্ন করিলে টুমি।
রিভার অর্থ?
স্রোতস্বিনী। আমারে ঈশ্বর টুমি পাগল পাইয়াছ?
এই যে আমরা দাঁড়াইয়া আছি, ইহাকে কী বলে?
তট। ব্যংক অভ রিভার। হইয়াছে তো?
হইয়াছে।
ল্যাথব্রিজ বললেন, মডনমোহন টর্কালঙ্কার আমার বাংলা জ্ঞান দেখিয়া কী বলিয়াছিলেন জানো? বলিয়াছিলেন- বাংলাটাকেও টুমি ইংরাজি করিয়া দিয়াছ। তুমি তো আমাদের কালিদাস হইয়া যাইবে। কালিদাস কে জানো ঈশ্বর? বাংলার শেক্সপিয়ার। আমি বাংলার কালিদাস, তুমি ঈশ্বর হইলা ঘোড়ার ঘাস। কত নম্বর পাইলাম, ঈশ্বর?
একশতে নব্বই।
সংস্কৃত কলেজে পড়ার সময় বাংলায় তুমি কত নম্বর পাইয়াছিলে?
ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর বললেন, সত্তর।
আমি তোমার চেয়ে বিশ বেশি পাইলাম। বাঙালি হইলে একশ পাইতাম। তোমার চাইতে অনেক বেশি বাংলা জানি আমি। ঠিক বলিলাম তো?
ঈশ্বরচন্দ্র হেসে বললেন, দেখা যাক।
লেথব্রিজ: তোমার কি এখনও আমার কথা বিশ্বাস হইতেছে না? তোমার মতো বাঙালির বাংলাকে আমি এই হুগলী নদীতে থার্টিন টাইমস ডুবাইয়া দিতে পারি। তুমি যত বড়ো বিদ্যাসাগর হও আমার কাছে গোষ্পদ।
ঈশ্বরচন্দ্র বললেন, তাহা হইলে একটা ব্যাবহারিক পরীক্ষা হইয়া যাক?
লেথব্রিজ অবজ্ঞার স্বরে ঈশ্বরচন্দ্রকে বললেন, তথাস্তু।
ঈশ্বরচন্দ্র বললেন, ওই যে, নদীতে বোট দেখিতে পাইতেছ?
পাইতেছি।
সেই বোটটা তটে আনিতে পারিবে?
লেথব্রিজ বললেন, হাজার বার পারিব। ইহা আমার জন্য অত্যন্ত সহজ কাজ হইবে। তুমি পারিবে না।
ঈশ্বরচন্দ্র বললেন, সহজ হইলে করিয়া দেখাও।
লেথব্রিজ নৌকার মাঝিকে লক্ষ করে চিৎকার দিয়ে বললেন, ওহে কর্ণধার!
ত্বদীয় তরণি তটে সংলগ্ন করো ত্বরা।
মাঝি, ইংরেজ সাহেবের কথা কিছুই বুঝতে পারল না। তবু ইংরেজ সাহেবের আর্তচিৎকারে দয়ার্দ্র হয়ে নৌকাটি তীরে ভিড়িয়ে বলল, সাহেব, আপনি কী বলিছেন আমি একবর্ণও বুঝতে পারিনি।
ল্যাথব্রিজ মাঝির হাতে কিছু টাকা দিয়ে বললেন, তোমার অত বুঝিবার প্রয়োজন নাই। তোমাকে তটে আনিতে পারিয়াছি- ইহা আমার জন্য যথেষ্ট হইয়াছে। এইবার থেকে সাহেব দেখিবামাত্র তরণি তটে নিয়া আসিবে।
মাঝি বলল, অমন টাকা দিলে তরণি কাঁধে করিয়া তোমার বাড়ি চলিয়া যাইব সাহেব।
লেথব্রিজ মাঝির কানে কানে বললেন, আমার বাড়ি যাইতে হইবে না। অন্য কর্ণধারদের বলিবে, “সাহেব ছাড়া আর কেউ ডাকিলে যে না আসে। এই নাও তাদের জন্য টাকা।
ঈশ্বরচন্দ্র হতাশ হয়ে বললেন, মাঝি না বুঝিয়া চলিয়া আসিয়াছে।
লেথব্রিজ বললেন, এমন না হইলে কী ব্যবসায় করিতে আসিয়া লর্ড ক্লাইভ তোমাদের সম্পূর্ণ দেশ দখল করিয়া নিতে পারিত? মাঝি আমার কথা বুঝিতে পারিলে তটে তরণি আনিত না। তোমরা আমাদের কথা বুঝিতে পারিলে হাজার হাজার মাইল দূর হইতে আসিয়া আমরা কি তোমাদের দেশ দখল করিতে পারিতাম? আচ্ছা, ঈশ্বর এবার আমি তোমার বাংলা পরীক্ষা নিব। দেখি পাস করিতে পার কি না।
এসময় আগের মাঝি যেদিকে গিয়েছে সেদিক থেকে একটা নৌকা আসছিল।
লেথব্রিজ বলল, দেখি ঈশ্বর তুমি এই মাঝিটাকে তটে আনিতে পার কি না।
ঈশ্বরচন্দ্র ডাক দিলেন, মাঝি ভাই, একটু কূলে আসো।
মাঝি এল না।
লেথব্রিজ বলল, আমি আনিব?
আনো।
All’s well that ends well. লেথব্রিজ বলল।
মাঝি চলে এল লেথব্রিজের কথা শুনে।
ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর অপমানিত কষ্টে আর্দ্র হয়ে বললেন, মাঝি কেন এলে?
বাবু, আমার ওস্তাদ সালাম মাঝি বলেছেন, কোনো ইংরজ ডাকামাত্র যেন ছুটে যাই। (সংক্ষেপিত)।
>> ড. মোহাম্মদ আমীন
—————————————————————-
সূত্র: হাস্যরসে বাংলা বানান: অর্থ অনর্থ এবং বাগর্থ, ড. মোহাম্মদ আমীন।
——————————————————————————
error: Content is protected !!