উজবেকিস্তান (Uzbekistan) : ইতিহাস ও নামকরণ

কীভাবে হলো দেশের নাম (এশিয়া)

ড. মোহাম্মদ আমীন

উজবেকিস্তান (Uzbekistan)

উজবেকিস্তান মধ্য এশিয়া অবস্থিত একটি প্রজাতন্ত্র। এর পশ্চিম ও উত্তরে কাজাকিস্তান, পূর্বে কিরগিজস্তান, দক্ষিণ-পূর্বে তাজিকিস্তান এবং দক্ষিণে আফগানিস্তান ও তুর্কমেনিস্তান অবস্থিত। উজবেকিস্তানের পশ্চিম অংশে দেশটির প্রায় ৩৭% এলাকা নিয়ে স্বায়ত্তশাসিত কোরাকালপোগ প্রজাতন্ত্র অবস্থিত। উজবেকিস্তানের উত্তর-পূর্ব প্রান্তে অবস্থিত তাশখন্দ দেশটির রাজধানী। এ দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণ উজবেক জাতিভুক্ত এবং তারা উজবেক ভাষায় কথা বলে। উজবেক দেশটির রাষ্ট্রভাষা। ১৯২৪ থেকে ১৯৯১ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত উজবেকিস্তান সোভিয়েত ইউনিয়নের অধীন উজবেক সোভিয়েত সমাজতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্র নামে পরিচিত ছিল। ১৯৯১ খ্রিষ্টাব্দের ২৫ ডিসেম্বর এটি স্বাধীনতা লাভ করে। ১৯৯২ খ্রিষ্টাব্দে সংবিধান সংশোধন করে ধর্মনিরপেক্ষ ও গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্র হিসাবে প্রতিষ্ঠা করা হয়।

উজবেকিস্তান শব্দের অর্থ মুক্ত দেশ বা Home of the Free। তার্কিস উজ (uz), সোগাডিয়ান বেক (bek) এবং পারসি স্তান (-stan) শব্দের সমন্বয়ে উজবেকিস্তান শব্দের উৎপত্তি। উল্লেখ্য ‘উজ’ শব্দের অর্থ সেলফ বা নিজ, ‘বেক’ শব্দের অর্থ মাস্টার বা প্রভু এবং ‘স্তান’ শব্দের অর্থ ভূমি। এ হিসাবে উজবেকিস্তান শব্দের অর্থ নিজ প্রভুর ভূমি। কিন্তু এখন উজবেকিস্তান বলতে উজবেকদের ভূমি বা মুক্তভূমি বলা হয়।

বিশ্ব ও মুসলমানের অহঙ্কার কয়েকজন বিশ্ববরেণ্য ব্যক্তির জন্মস্থান হিসাবে উজবেকিস্তান নিরূপম গর্বের অধিকারী। সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ চিকিৎসা বিজ্ঞানী ইবনে সিনার The Book of Healing The Canon of Medicineএখনও সারা বিশ্বে সম্মানের সঙ্গে বারিত। এ বিশ্ববরেণ্য বিজ্ঞানীর জন্মস্থান উজবেকিস্তান। খ্যাতিমান গণিতজ্ঞ, ভুগোলবিশারদ ও জ্যোতির্বিজ্ঞানী মোহাম্মদ ইবনে মুসা আল খোয়ারিজমির (Mohammed ibn-Musa al-Khwarizmi) জন্মস্থান হিসাবেও উজবেকিস্তান খ্যাত। গণিতে অসামান্য অবদানের জন্য Algorithm and Algebra তাঁর নামের সম্মানে রাখা হয়। ইতিহাসবেত্তা, ভাষাবিদ ও ক্রোনোলজিস্ট আল বেরুনি পৃথিবীর প্রথম নৃতত্ত্ববিদ এবং ভূগণিতের জনক হিসাবে পরিচিত। তার সম্মানে চন্দ্রের একটি আগ্নেয়গিরির নাম রাখা হয়েছে। এ বিশ্বখ্যাত ব্যক্তির জন্মস্থান হিসাবেও উজবেকিস্তান খ্যাত।

উজবেকিস্তানের মোট আয়তন ৪,৪৮,৯৭৮ বর্গকিলোমিটার বা ১,৭২,৭৪২ বর্গমাইল। আয়তনের দিক হতে এটি পৃথিবীর ৫৬-তম বৃহত্তম রাষ্ট্র। মোট ভূমির ৪.৯ % জলভাগ। ২০১৫ খ্রিষ্টাব্দের হিসাব অনুযায়ী উজবেকিস্তানের জনসংখ্যা ৩,১০,২৫,৫০০। প্রতি বর্গকিলোমিটারে জনসংখ্যা ৬১.৪ জন। জনসংখ্যার দিক হতে এটি পৃথিবীর ৪১-তম বৃহত্তম রাষ্ট্র কিন্তু জনসংখ্যার ঘনত্বের দিক দিয়ে ১৩৬-তম জনবহুল দেশ। উজবেকিস্তানের জনগণের মাথাপিছু আয় ৫,৬০৯ ইউএস ডলার। সরকারিভাবে উজবেকিস্তানের অধিবাসীদের উজবেক বলা হয়। ২০১৪ খ্রিষ্টাব্দের হিসাবমতে, উজবেকিস্তানের জিডিপি (পিপিপি) ১৭১.৬৬৯ বিলিয়ন ইউএস ডলার, সে হিসাবে মাথাপিছু আয় ৫,৬০৯ ইউএস ডলার। অন্যদিকে, জিডিপি (নমিনাল) ৬২.৬১৯ বিলিয়ন ইউএস ডলার, এবং মাথাপিছু আয় ২,০৪৬ ইউএস ডলার। মুদ্রার নাম উজবেকিস্তান সম। তাসখন্দ দেশটির রাজধানী ও বৃহত্তম শহর।

উজবেকিস্তানের ৮০% এলাকা সমতল মরুভূমি। দেশের পূর্বভাগে রয়েছে সুউচ্চ পর্বতমালা যেগুলি ৪,৫০০ মিটার উচ্চতা পর্যন্ত উঠে গেছে। দক্ষিণ-পূর্ব প্রান্ত তিয়ান শান পর্বতমালার পশ্চিম পাদদেশ নিয়ে গঠিত। উত্তরের নিম্নভূমি কিজিল কুম নামের এক বিশাল মরুভূমি, যা দক্ষিণ কাজাকিস্তানেও প্রসারিত হয়েছে। ফের্গানা উপত্যকা উজবেকিস্তানের সবচেয়ে উর্বর অঞ্চল। এটি কিজিল কুম মরুভূমির পূর্বে অবস্থিত এবং উত্তর, দক্ষিণ ও পশ্চিমে পর্বতমালা দ্বারা বেষ্টিত। সির দরিয়া নদী এই অঞ্চলটিকে কিজিল কুম মরুভূমি থেকে পৃথক করেছে। আমু দরিয়া এখানকার আর একটি গুরুত্বপূর্ণ নদী। উজবেকিস্তানে প্রায়শ ভূমিকম্প হয়। ১৯৬৬ খ্রিষ্টাব্দে এক ভূমিকম্পে রাজধানী তাশখন্দের বেশির ভাগ অংশ ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল।

উজবেকিস্তান প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের সভ্যতাকে সংযুক্তকারী বিখ্যাত রেশম পথের উপর অবস্থিত। এখানকার যাদুঘরসমূহে প্রায় ২০ লক্ষের মতো প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন য়েছে। যেগুলো মধ্য এশিয়ায় প্রায় ৭০০০ বছর ধরে বসবাসকারী বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর সংস্কৃতি ও ইতিহাসের সাক্ষ্য বহন করছে। উজবেকিস্তানের ২য় বৃহত্তম শহর সমরকন্দ রশম পথের মধ্যস্থলে অবস্থিত। এটি বিশ্বেও প্রাচীনতম শহরগুলির একটি। আনুমানিক খ্রিস্টপূর্ব ৭ম শতকে এটি প্রতিষ্ঠিত হয়। এখানকার অধিবাসীরা মূলত তাজিক। ৩২৯ খ্রিস্টপূর্বাব্দে আলেকজান্ডার এটি জয় করে নিয়েছিলেন। সমরকন্দের প্রধান আকর্ষণ রেগিস্তান নামের এলাকা, যার চারপাশ ঘিরে আছে অনেকগুলি প্রাচীন মাদ্রাসা। এছাড়াও এখানে অনেক বিখ্যাত মসজিদ ও স্মৃতিস্তম্ভ রয়েছে।

উজবেক ভাষা বিংশ শতকের শুরুতে আরবি লিপিতে লেখা হতো। সোভিয়েত ইউনিয়নের অংশ হবার পর লেনিনের নির্দেশে এটি ল্যাটিন লিপিতে লেখা শুরু হয়। কিন্তু স্ট্যালিন ক্ষমতা দখলের পর ১৯৪০-এর দশক থেকে এটি সিরিলীয় লিপিতে লেখা হতে থাকে। ১৯৯১ খ্রিষ্টাব্দে উজবেকিস্তান স্বাধীনতা লাভ করলে প্রাক্তন সোভিয়েত দেশগুলোর থেকে রাষ্ট্রীয় স্বাতন্ত্র্য প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে উজবেক সরকার ১৯৯৩ খ্রিষ্টাব্দে উজবেক ভাষা সরকারিভাবে আবার ল্যাটিন লিপিতে লেখার আদেশ জারি করে। ১৯৯২ খ্রিষ্টাব্দের ৪ জুন উজবেকিস্তানের বর্তমান পতাকাটি গৃহীত হয়।

পৃথিবীর দুটি দিত্ব স্থলবেষ্টিত দেশের মধ্যে উজবেকিস্তান একটি। অন্যটি হচ্ছে লিচটেনস্টাইন। দিত্ব স্থলবেষ্টিত দেশ হচ্ছে সে দেশ, যা অন্য একটি স্থলবেষ্টিত দেশ দ্বারা স্থলবেষ্টিত। উজবেকিস্তানের মুরুনটান (Muruntan) স্বর্ণখনি পৃথিীর বৃহত্তম উন্মুক্ত সোনার খনির অন্যতম। তাশখন্দ মেট্রো ঝাড়বাতি, মার্বেল স্তম্ভ ও সিলিং, গ্র্যানাইট এবং খোদাইকৃত মেটাল পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর। এখানে রয়েছে অপূর্ব সুন্দর রেল স্টেশন। প্রত্যেকটি স্টেশনের বৈশিষ্ট্য সম্পূর্ণরূপে আলাদা।

উজবেকিস্তানে হ্যান্ডস্যাক কেবল পুরুষের মধ্যে স্বীকৃত। উজবেক ঐতিহ্য অনুযায়ী সবচেয়ে সম্মানিত মেহমানকে ঘরের প্রবেশ পথ হতে সবচেয়ে দূরে বসানো হয়। প্রাচীন রীতি এ যে, পরিবারের কোনো ব্যক্তি ভ্রমণে গেলে তাকে একটি উজবেক রুটির ছোট এক কামড় খেতে হয়। রুটির বাকি অংশ পরিবারের ওই সদস্য ফিরে না আসা পর্যন্ত মাটির নিচে বা অন্য কোথাও লুকিয়ে রাখা হয়। উজবেকের মাস্টার শেফগণ এতই দক্ষ যে, তারা মাত্র একটা কড়াইয়ে একহাজার লোকের তৃপ্তি সহকারে খাওয়ার মতো খাদ্য প্রস্তুত করতে পারে।

উজবেকিস্তানে মুসলমানের সংখ্যা ৮৮% তবে মাত্র ৪% লোক কোনোভাবে ইসলামধর্ম পালন করে। পিতামাতা বৃদ্ধ হলে পরিবারের কনিষ্ঠতম সন্তানের সঙ্গে বসবাস করে। বাকি সন্তানেরা বিয়েশাদি করে পিতা-মাতার দেওয়া অন্য বাড়িতে বসবাসের জন্য চলে যায়। কোনো উজবেক বৃদ্ধ বা মুরুব্বিদের সঙ্গে অশোভন আচরণ করে না, বড় গলায় তাদের সঙ্গে কথাও বলে না। এরা খুব ভদ্র এবং অতিথিপরায়ণ। বাংলায় ব্যবহৃত উজবুক শব্দটি উজবেক সৈনিকদের থেকে উদ্ভুত।

তুরস্ক (Turkey) : ইতিহাস ও নামরণ

তুর্কমিনিস্তান (Turkmenistan) : ইতিহাস ও নামকরণ

ইউনাইটেড আরব আমিরাত (United Arab Emirates) : ইতিহাস ও নামকরণ

সূত্র:  কীভাবে হলো দেশের নাম, ড. মোহাম্মদ আমীন, পুথিনিলয়, বাংলাবাজার, ঢাকা।

error: Content is protected !!