উদোর পিণ্ডি বুধোর ঘাড়ে, অকালবোধন

ড. মোহাম্মদ আমীন

উদোর পিণ্ডি বুধোর ঘাড়ে, অকালবোধন

উদোর পিণ্ডি বুধোর ঘাড়ে

এটি বাংলার একটি প্রাচীন প্রবাদ/ বাগ্‌ধারা। উদো, পিণ্ডি ও বুধো এই তিনিটি শব্দ নিয়ে বাগ্‌ধারাটি নির্মিত।বাংলা একাডেমি আধুনিক বাংলা অভিধানমতে, বাংলা উদো শব্দের অর্থ: (বিশেষণে) নির্বোধ, হাবাগোবা, বোকা, কাণ্ডজ্ঞানহীন, অলস, অকর্মা। হিন্দি বুদ্ধু অর্থ: (বিশেষণে) বোকা, মূর্খ। বুধো, বুদ্ধু শব্দের আঞ্চলিক রূপ। যার অর্থ: বোকা, মূর্খ প্রভৃতি। পিণ্ডি শব্দের অনেকগুলো অর্থ আছে। এখানে প্রাসঙ্গিক আলংকারিক অর্থ: দোষ, কাজ, দেহ। উদোর পিণ্ডি বুধোর ঘাড়ে কথার শাব্দিক অর্থ: এক বোকার দোষ অন্য বোকার ঘাড়ে চাপানো। আলংকারিক অর্থ: একজনের দোষ অন্য জনের ওপর আরোপ করা।
 
সুকুমার রায়ের লেখা হযবরল গল্পের দুটি চরিত্রের নাম উদো ও বুধো।প্রধান চরিত্রের নাম কাকেশ্বর কুচকুচে। গল্পে একটি হিসেবে নিয়ে দুই চরিত্রের মধ্যে শুরু হয় ঝগড়া। একে অন্যের ঘাড়ে দোষ চাপাতে থাকে। তখনই প্রসঙ্গক্রমে উচ্চকিত হয়, উদোর পিণ্ডি বুধোর ঘাড়ে
 
জ্ঞানেন্দ্রমোহন দাসের ‘বাঙ্গালা ভাষার অভিধান’, প্রথম ভাগ, দ্বিতীয় সংস্করণের দশম মুদ্রণ (জানুয়ারি ২০১১ খ্রিষ্টাব্দ) থেকে পাওয়া যায় : “সম্বন্ধ-নির্ণয় নামক কুলগ্রন্থ মতে উৎসাহ মুখোপাধ্যায়ের সংক্ষিপ্ত নাম ‘উধো’। …উৎসাহ মুখোপাধ্যায়ের (উধোর) পত্নীর সহিত যোগেশ পণ্ডিতের (বুধোর) অবৈধ প্রণয় জন্মে, দৈবকীনন্দন তাদের এ অবৈধ প্রণয়জাত সন্তান।” উধোর মৃত্যুতে দৈবকীনন্দন উধোর নামে পিণ্ডদান করিলে বুধ যোগেশ বীজী অধিকারে তাহা পেয়েছিলেন। যথা : “যোগেশের উপজায়া প্রসবিল যোগ ছায়া দৈবকীনন্দন উধোর পত্নী।” “পঞ্চানন নুলো কয় দৈবদত্ত পিণ্ডচয়, ক্ষেত্রী বীজী কেহ নাহি ছাড়ে। পণ্ডিতের বুধ খ্যাতি নহ্যমুলা জনশ্রুতি তি, উদোর পিণ্ডি পড়ে বুধোর ঘাড়ে।” সম্বন্ধ-নির্ণয়। যোগেশ বুধ বা পণ্ডিতের নামের অনুপ্রাস ঘটাবার জন্য বুধ শব্দটি থেকে এসেছে বুধো বা বুদো। ‘বুধ’ শব্দটির অন্যতম অর্থ: পণ্ডিত, বিদ্বান, জ্ঞানী, প্রতিভাধর ব্যক্তি।
 
অকালবোধন
 
‘অকালবোধন’ শব্দের আভিধানিক অর্থ– অসময়ে কাজ আরম্ভ করা।‌ সংস্কৃত ‘অকাল’ ও সংস্কৃত ‘বোধন’ শব্দের মিলনে অকালবোধন শব্দের উৎপত্তি। অকাল শব্দের অর্থ অসময়ে, নির্ধারিত সময়ের বাইরে এবং বোধন শব্দের অর্থ জাগানো। শব্দটির রূপতাত্ত্বিক বিশ্লেষণ: অ-কাল {√কল্ (গণনা করা) + অ (ঘঞ্), করণবাচ্য} + বোধন {√বুধ্ (জানা) + অন, ভাববাচ্য}।
 
অকালে বোধন = অকালবোধন। এটি সপ্তমী তৎপুরুষ সমাস। এর ব্যুৎপত্তিগত অর্থ হচ্ছে অসময়ে আরাধ্য দেবতার নিদ্রাভঙ্গ বা আহ্বান করা বা অসময়ে জাগরণ। হিন্দু পৌরাণিক কাহিনিমতে– রাবণকে বধ করার উপযুক্ত শক্তি লাভের জন্য রামচন্দ্র অকালে তথা শরৎকালের আশ্বিন মাসে দেবী দুর্গার বোধন বা নিদ্রাভঙ্গ করেছিলেন। এই নিদ্রাভঙ্গ থেকে ‘অকালবোধন’ বাগ্‌ধারাটির উৎপত্তি। এ নিদ্রাভঙ্গের কারণে বাংলাদেশে শারদীয় দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হয়। উল্লেখ্য, দুর্গাপূজার আদি সময় হিসাবে বসন্তকাল নির্ধারিত রয়েছে। কিন্তু অকালবোধনের কারণে বাংলাদেশ-সহ অনেক স্থানে এটি শরৎকালে অনুষ্ঠিত হয়।
error: Content is protected !!