উপকরণ বনাম উপাদান: অভিযোগ বনাম অনুযোগ

এবি ছিদ্দিক

উপকরণ বনাম উপাদান: অভিযোগ বনাম অনুযোগ

উপকরণ বনাম উপাদান

দুইটি শব্দ কাছাকাছি অর্থের হলে ওই শব্দ দুটির একটিকে অপরটির বিকল্প হিসেবে ব্যবহারের সুবিধা যেমন পাওয়া যায়, তেমনি সূক্ষ্ম পার্থক্য অনুধাবন করে ক্ষেত্রভেদে যথাযথ প্রয়োগের বিড়ম্বনাও পোহাতে হয়— বিশেষ করে যাঁরা নিজেদের লেখায় শব্দের যথাযথ প্রয়োগ নিশ্চিত করতে চান। ‘উপকরণ’ আর ‘উপাদান’ এরকম সূক্ষ্ম পার্থক্যের শব্দজোড়ের মধ্যে একেবারেই পরিচিত একটি জোড়। বাংলা একাডেমি আধুনিক বাংলা অভিধানে উল্লেখ-করা অর্থ অনুসারে এই শব্দ দুটি সমার্থক হলেও এদের ব্যাবহারিক প্রয়োগে যথেষ্ট ভিন্নতা রয়েছে। এই ভিন্নতা স্পষ্টভাবে উপলব্ধি করতে না-পারলে ভাষার মূল উপাদান ‘ধ্বনি’ এবং মূল উপকরণ ‘বাক্য’ হওয়ার মতো ব্যাপারগুলো নিয়ে সবসময় ধোঁয়াশার মধ্যে থাকতে হবে। তাই, এই বিভ্রান্তি থেকে মুক্তির জন্যে আলোচ্য শব্দদ্বয়ের ব্যাবহারিক পার্থক্য ঠিকভাবে অনুধাবন করা মোটেও এড়িয়ে যাওয়ার মতো নয়। এই প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করে শিরোনামের মূল শব্দদ্বয়ের প্রায়োগিক পার্থক্য স্পষ্ট করার লক্ষ্যে আমার এই আলোচনা সামনে এগিয়ে নেওয়া হয়েছে। আর আমার বিশ্বাস, এই আলোচনার পরবর্তী অংশ পাঠের পর আপনি উপকরণ আর উপাদানের ব্যাবহারিক পার্থক্য অনেকটা অনুধাবন করতে পারবেন এবং আগামী দিনে নিজের লেখায় অনেকটা নির্দ্বিধায় প্রয়োগ করতে পারবেন। 
 
উপকরণ আর উপাদানের প্রায়োগিক পার্থক্য শব্দ দুটির ব্যুৎপত্তিগত অর্থ নির্ণয়ের মাধ্যমে খুব সহজেই নিরূপণ করা যায়। প্রথমে ‘উপকরণ’ শব্দের ব্যুৎপত্তি দেখা যাক— ‘কৃ’ ধাতু থেকে ‘করণ’ শব্দের এবং এই ‘করণ’ শব্দের পূর্বে ‘উপ’ উপসর্গটি যুক্ত হয়ে ‘উপকরণ’ শব্দের সৃষ্টি। ৷ ‘√কৃ’ মানে ‘করা’ এবং ‘করণ’ হচ্ছে ‘করার সহায়ক বা যন্ত্র’। এই ‘করণ’-এর সঙ্গে ‘সাহায্য’ অর্থে ‘উপ’ উপসর্গটি যুক্ত হয়ে ‘উপকরণ’ শব্দটি গঠন করে বলে শব্দটির ব্যুৎপত্তিগত অর্থ দাঁড়ায়— যে যন্ত্র বা সহায়ক কোনো ক্রিয়া (কাজ) সম্পন্ন করতে সাহায্য করে। অর্থাৎ, উপকরণের মূল সম্পর্ক হচ্ছে ক্রিয়ার সঙ্গে। উপকরণ কেবল সেখানে পাওয়া যাবে, যেখানে ক্রিয়া বর্তমান থাকবে। তাই, কোনো কাজের উপকরণের নাম উল্লেখ করা যায়, কোনো জিনিসের নয়।
 
অপরদিকে, ‘আদান’ শব্দের পূর্বে ‘উপ’ উপসর্গটি যুক্ত হয়ে ‘উপাদান’ শব্দের সৃষ্টি। ‘আদান’ মানে ‘গ্রহণ’, ‘নেওয়া’ প্রভৃতি। এই ‘আদান’ শব্দটির সঙ্গে ‘সমীপে’ অর্থে ‘উপ’ উপসর্গটি যুক্ত হয়ে ‘উপাদান’ শব্দের উৎপত্তি। তাহলে উপাদান শব্দের ব্যুৎপত্তিগত অর্থ দাঁড়ায়— সমীপে গ্রহণ বা নিকটে নেওয়া। অর্থাৎ, যেসকল জিনিস একটিকে অন্যটির কাছে নিয়ে বা মিশ্রিত করে কোনোকিছু তৈরি করা হয়, সেগুলোই হচ্ছে ‘উপাদান’। উপাদানের মূল সম্পর্ক নতুন তৈরি জিনিসটির সঙ্গে, ক্রিয়ার সঙ্গে নয়। মূলত, উপকরণের সাহায্যে উপাদানসমূহকে সমীপে নিয়ে গিয়ে নতুন কিছু তৈরি করা হয়। মোদ্দা কথায় বললে— নতুন কোনোকিছু তৈরির সময় যেসকল জিনিসের সহায়তা নিয়ে তৈরির কাজটি করা হয়, সেগুলো উপকরণ; এবং তৈরিকৃত নতুন সৃষ্টিটির মধ্যে যে জিনিসগুলোর সমন্বয় থাকে, সেগুলো হচ্ছে উপাদান। কোনোকিছু তৈরির কাজ শেষ হয়ে গেলে ব্যবহৃত উপকরণের সঙ্গে নতুন সৃষ্টির কোনো সম্পর্ক থাকে না, উপকরণের প্রয়োজনীয়তা ফুরিয়ে যায়, কিন্তু উপাদান নতুন সৃষ্টির মধ্যে নবরূপে উপস্থিত থাকে। কয়েকটি প্রায়োগিক উদাহরণ দেখালে শব্দদ্বয়ের ব্যুৎপত্তিগত অর্থ আরও পরিষ্কার হয়ে যাবে:
 
তাসিয়া পুডিং তৈরি করবে। এখন, যদি কেউ পুডিং তৈরির উপকরণের নাম জানতে চায়, তাহলে কেবল ওই জিনিসগুলোর নাম বলতে হবে, যেগুলো পুডিং বানানোর কাজে সহায়ক বা যন্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা হয়। সাধারণত পাত্র, ডেকচি, ঢাকনা প্রভৃতি জিনিস (আসবাব) পুডিং তৈরির কাজে যন্ত্র বা সহায়ক হিসেবে সাহায্য করে বলে এগুলো হচ্ছে পুডিং তৈরির উপকরণ। তৈরি-করা পুডিঙের মধ্যে এসব জিনিসের কোনো উপস্থিতি নেই। অপরদিকে, শুরুতে উল্লেখ-করা করা উপকরণসমূহের সহায়তায় ডিম, দুধ, চিনি, লবণ প্রভৃতি জিনিস সমীপে এনে নতুন জিনিসটি (খাবারটি) তৈরি করা হয় বলে এসব হচ্ছে পুডিং তৈরির উপাদান। তৈরিকৃত পুডিঙের মধ্যে এসব জিনিসের উপস্থিতি ভিন্ন রূপে হলেও বর্তমান থাকে।
 
শহরের ব্যস্ত রাস্তাগুলোয় উড়ালসেতু নির্মাণের দরকার পড়ে। ওই উড়ালসেতু তৈরি করার সময় ক্রেন, শাবল, হাতুড়ি, করাত, কম্পাস, ফিতা প্রভৃতি যন্ত্র বা সহায়কের দরকার পড়ে, তাই এসব হচ্ছে উড়ালসেতু তৈরির উপকরণ। উড়ালসেতু তৈরির কাজ শেষ হয়ে গেলে এসবের উপস্থিতির প্রয়োজনও শেষ হয়ে যায়। আবার, ইট, পাথর, লোহা, সিমেন্ট, পানি প্রভৃতি জিনিসের সমন্বয়ে নতুন উড়ালসেতুটি তৈরি হয় বলে এসব জিনিস হচ্ছে উড়ালসেতু তৈরির উপাদান। তৈরিকৃত উড়ালসেতুর মধ্যে এই উপাদানগুলোর উপস্থিতি বর্তমান থাকে।
 
কতগুলো ধ্বনি বা আওয়াজ ভাষা হওয়ার জন্যে ওই ধ্বনি বা আওয়াজগুলো একত্র করে স্পষ্ট ভাব প্রকাশ করা আবশ্যক হয়ে পড়ে। একাধিক ধ্বনির একটিকে অপরটির সমীপে এনে স্পষ্টভাবে মনের ভাব প্রকাশ করতে শব্দ, পদবন্ধ, বাক্য প্রভৃতির সাহায্য নিতে হয়। এসবের মধ্যে বাক্যের সাহায্যে বক্তার মনের ভাব সবচেয়ে স্পষ্টভাবে ব্যক্ত করা যায় বলে ভাষা তৈরির মূল উপকরণ হচ্ছে ‘বাক্য’। আবার, অনেকগুলো ‘ধ্বনি’ শব্দ, পদবন্ধ, বাক্য প্রভৃতির সহায়তায় পরস্পরের সমীপে এসে একটি ভাষা সৃষ্টি করে বলে ভাষার মূল উপাদান হচ্ছে ‘ধ্বনি’। অনেকগুলো ধ্বনির সমন্বয় ঘটিয়ে কোনো বাক্যের সাহায্যে ব্যক্তির নির্দিষ্ট মনের ভাব প্রকাশ করা হয়ে গেলে ওই বাক্যের উপস্থিতির প্রয়োজনীয়তা ফুরিয়ে যায়। কিন্তু ওই বাক্যের সাহায্যে অনেকগুলো ধ্বনি মিলে যে ভাব প্রকাশ করে, তা ভাষায় সবসময় বর্তমান রয়ে যায়। যেমন: ছাফিয়া চাইলে ‘আমি ভালো আছি’ বাক্যটির সাহায্য নিয়ে আ, ম্, ই, ভ্, আ, ল্, ও, আ, ছ্, আর ই ধ্বনির সমন্বয় ঘটিয়ে নিজের হাল ব্যক্ত করতে পারে। ছাফিয়ার হাল ব্যক্ত করা হয়ে গেলে ওই বাক্যটি তার কাছে আর কোনো গুরুত্বের দাবি রাখে না। কিন্তু ওই ধ্বনিগুলো একত্র করে যে একটি ভাব তৈরি করে, তা সম্পূর্ণ ভাষার একটি ক্ষুদ্র অংশস্বরূপ। এভাবে বিভিন্ন ধ্বনি নানানভাবে সাজিয়ে (মিশ্রিত করে) ভাষা তৈরি হয় বলে ভাষায় ধ্বনি উপস্থিতি সবসময় বর্তমান এবং এই ধ্বনিই ভাষার মূল উপাদান।
 
 
 
অভিযোগ বনাম অনুযোগ
 
একজন বাঙালি আর যাইহোক, অভিযোগ কিংবা অনুযোগ করায় কখনো পিছিয়ে থাকেন না। কিন্তু মজার বিষয় হচ্ছে, অনেক বাংলাভাষী কখন অভিযোগ করছেন, আর কখনই-বা অনুযোগ করছেন, সে ব্যাপারে দ্বিধায় পড়ে যাওয়াতেও খুব একটা পিছিয়ে থাকেন না। দ্বিধায় পড়বেই না বা কেন, আভিধানিক অর্থে ‘নালিশ’, ‘দোষারোপ’ প্রভৃতি অর্থে ‘অভিযোগ’ আর ‘অনুযোগ’ শব্দ দুটি যে সমার্থক। অভিধানে উল্লেখ-করা এই অর্থ পড়েই নিজেদের লেখায় শব্দ দুটির যথাযথ প্রয়োগ নিয়ে তাঁরা প্রায়শ বিভ্রান্তিতে পড়ে যান। খুশির বিষয় হচ্ছে, প্রকৃষ্টরূপে চেষ্টার মাধ্যমে আলোচ্য শব্দ দুটির যথাযথ ব্যাবহারিক প্রয়োগ রপ্ত করা যায়। বিভ্রান্তি এড়িয়ে প্রাত্যহিক ব্যবহারের প্রয়োজনে এই শব্দ দুটি যথাযথ উপায়ে প্রয়োগ করতে চাইলে প্রথমেই শব্দদ্বয়ের মধ্যে বিদ্যমান সূক্ষ্ম পার্থক্য অনুধাবন করা উচিত। এই পার্থক্য অনুধাবনের জন্যে শব্দদ্বয়ের ব্যুৎপত্তিগত বিশ্লেষণের মাধ্যমে প্রায়োগিক অর্থ নিরূপণ করাই সবচেয়ে সহজ পন্থা। আর তাই, আমার লেখার পরবর্তী ধাপে উল্লেখ-করা শব্দ দুটির ব্যুৎপত্তিগত বিশ্লেষণের মাধ্যমে প্রায়োগিক পার্থক্য নিরূপণ করার চেষ্টা করা হয়েছে।
 
অভিযোগ আর অনুযোগ— উভয় শব্দের মূলে রয়েছে ‘যুজ্’ ধাতু। ‘√যুজ্’ অর্থ ‘যুক্ত করা’। এই ‘যুজ্’ ধাতুর আদিতে ‘বিরুদ্ধে’ অর্থে ‘অভি’ প্রত্যয় (উপসর্গ) এবং শেষে ‘অ’ প্রত্যয় যুক্ত হয়ে ‘অভিযোগ’ শব্দটি গঠিত হয়। অর্থাৎ, কারোর কাছে অন্যের বিরুদ্ধে কোনোকিছু যোগ করাই হচ্ছে অভিযোগ। সাধারণত কারোর খারাপ বা নেতিবাচক দিকগুলোই ওই ব্যক্তির বিরুদ্ধে যোগ করা যায়। তাহলে বলা যায়— নির্দিষ্ট কারোর খারাপ বা নেতিবাচক দিক বা দিকগুলো অন্যের কাছে যোগ করা কিংবা তুলে ধরাই হচ্ছে অভিযোগ। যে দোষ করে তার কাছে অভিযোগ নিয়ে যাওয়া হয় না, নিয়ে যাওয়া হয় অন্য আরেক পক্ষের কাছে। ‘অভিযোগ’ শব্দটির শেষে যুক্ত হওয়া ‘অ’ প্রত্যয় ‘ভাবে’ অর্থ ধারণ করায় অভিযোগের সংজ্ঞার্থ চাইলে এভাবেও উল্লেখ করা যায়— যা কারোর বিরুদ্ধে যোগ করা হলে নির্দিষ্ট কোনো ব্যক্তি বা মহল ওই ব্যক্তিকে দোষী ভাবে।
 
আবার, ‘যুজ্’ ধাতুর আদিতে ‘সমীপে’ অর্থে ‘অনু’ প্রত্যয় (উপসর্গ) এবং শেষে ‘ভাবে’ অর্থে ‘অ’ প্রত্যয় যুক্ত করে ‘অনুযোগ’ শব্দটি গঠন করা হয়। তাহলে অনুযোগ শব্দের ব্যুৎপত্তিগত অর্থ দাঁড়ায়— কোনো ব্যক্তির সমীপে ওই ব্যক্তি সম্পর্কে কোনোকিছু যোগ করা, যাতে ওই ব্যক্তি (দোষী) ভাবতে বাধ্য হয়। অর্থাৎ, কোনো ব্যক্তির সমীপে (কাছে) ওই ব্যক্তি সম্পর্কে যা যোগ করলে ওই ব্যক্তি নিজেকে দোষী ভাবতে বাধ্য হয়, তাই (তা-ই) হচ্ছে অনুযোগ। যে দোষ করে, তার কাছেই অনুযোগ করা হয়; অভিযোগের মতো তৃতীয় কোনো পক্ষের প্রয়োজন পড়ে না। মোদ্দা কথায়— সমাধানের আশায় দোষীর কাছে দোষ ব্যক্ত করা হচ্ছে অনুযোগ, এবং সমাধানের বাসনায় দোষীর দোষ অন্যের নিকট ব্যক্ত করা হচ্ছে অভিযোগ। অভিযোগ আর অনুযোগের এই ব্যুৎপত্তিগত অর্থের পার্থক্য স্পষ্টতর করবার জন্যে শব্দদ্বয়ের প্রয়োগোদাহরণ খুব করে দরকার বিধায় কিছু প্রায়োগিক উদাহরণ উল্লেখ করে, তবেই আমার লেখার ইতি টানছি:
 
সি. টি. পরীক্ষায় প্রথম হওয়ায় খোকন স্যারের কাছ থেকে পাওয়া গোলাপি রঙের প্লাস্টিকের স্কেলটি ছাফিয়ার খুবই প্রিয়। কিন্তু একটু আগে সুমাইয়া ইচ্ছে করেই সেটি ভেঙে ফেলেছে। নিজের চোখের সামনে প্রিয় স্কেলটি দু-টুকরো হয়ে যেতে দেখে ছাফিয়ার মনে রাগ আর ক্ষোভ— দুটোই জন্মাল। সে সোজা প্রধানশিক্ষকের কক্ষে গিয়ে সুমাইয়ার অপকর্মের কথা ব্যক্ত করে তাকে (সুমাইয়াকে) দোষী প্রমাণ করতে চাইল। সুমাইয়ার নেতিবাচক কাজের ব্যাপারে প্রধানশিক্ষকের সমীপে ছাফিয়ার এই যোগ বা নালিশই হচ্ছে অভিযোগ।
 
মুনতাহার কোনো এক আচরণে মনঃক্ষুণ্ন হওয়ায় তার আর টমের মধ্যে সপ্তাহ ধরে বার্তাবিনিময় হচ্ছে না। অবশেষে অষ্টম দিনে টম তাকে (মুনতাহাকে) বার্তা পাঠায় এবং তার (মুনতাহার) নামের সঙ্গে নির্দয়, কোনোকিছু বোঝে না, কেবল মুখের ভাষাটাই দেখে প্রভৃতি তকমা যুক্ত করে দেয়; যাতে মুনতাহা নিজেকে দোষী ভাবে। মুনতাহাকে দোষী ভাবাতে তারই সমীপে টমের এরূপ দোষ যোগ করাই হচ্ছে অনুযোগ।
বাবা যখন মেলা থেকে এসে বড়ো ছেলের হাতে টুকটুকে লাল জামাটি তুলে দিয়ে ছোটো ছেলের হাতে কেবল মিঠাইয়ের প্যাকেটটি ধরিয়ে দেয়, ছোটো ছেলে তৎক্ষণাৎ বলে ফেলে, “তুমি কেবল দাদাকে দেখতে পার, আমাকে মোটেও পার না।” খোদ পিতার সমীপে পিতাকে এরূপ দোষারোপই হচ্ছে পিতার প্রতি ছোটো ছেলের অনুযোগ।
 
নিজের ছেলে অন্য ছেলের কাছে মার খেলে মা সোজা ওই ছেলের মায়ের কাছে গিয়ে অভিযোগ করে, কিন্তু পরীক্ষার হলে না-দেখালে বন্ধুর কাছে বন্ধু অনুযোগ করে।
 
অনুযোগে অল্পতেই মিটমাটের ইঙ্গিত থাকে; অনেক সময় মিটমাট হয়ে যায়ও। কিন্তু অনুযোগের পর অনুযোগ চলতে থাকলে তা পরে অভিযোগে বদলে যায়। অভিযোগের মাত্রা অসহ্যের পর্যায়ে পৌঁছে গেলে অভিশাপ দেওয়ার পালা চলে আসে। এক্ষেত্রে স্বামী-স্ত্রীর মনোমালিন্যের প্রসঙ্গ টানা যেতে পারে। স্বামীর কোনো আচরণ যখন স্ত্রীর অপছন্দ হয়, তখন স্ত্রী, স্বামীর সমীপে তা ব্যক্ত করে ওই আচরণ শুধরে নেওয়ার জন্যে যা করে, তাই (তা-ই) হচ্ছে অনুযোগ। স্ত্রীর অনুযোগে অনেক স্বামী শুধরে গেলেও ঘাড় ট্যাড়ারা অতটা সহজে শোধরায় না। এমন ট্যাড়ারা আপন স্ত্রীর অনুযোগ তোয়াক্কা না-করে নিজেদের অপকর্ম জারি রাখে। তখন এদের অপকর্মে লাগাম পরাতে স্ত্রীকে পরিবার-পরিজন কিংবা আইনের সমীপে স্বামীর অপকর্ম যোগ করতে হয়। স্বামীকে দোষী ভাবাতে তৃতীয় পক্ষের সমীপে স্ত্রীর এই যোগ বা নালিশই হচ্ছে অভিযোগ। অভিযোগের যখন সমাধান আসে না, তখন স্ত্রী বলে, “স্রষ্টা যেন অচিরেই তোমাকে এই অপকর্মের শাস্তি দেন।”
বন্ধুতা কিংবা সৌহার্দ বজায় রাখতে অভিযোগ আর অনুযোগকে দূরে সরিয়ে রাখা খুব করে প্রয়োজন। অভিযোগ আর অনুযোগ করা থেকে বিরত থাকা সম্ভব হলে সৌহৃদ্য অটুট থাকার পাশাপাশি শব্দদ্বয়ের যথাযথ প্রয়োগসংক্রান্ত ঝামেলা থেকেও মুক্তি মিলবে।
 
 
লিংক:  https://draminbd.com/উপকরণ-বনাম-উপাদান/
error: Content is protected !!