উপহাস বনাম পরিহাস

এবি ছিদ্দিক

হাস’ শব্দটিকে প্রাতিপদিক ধরে তার শুরুতে ‘উপ’ আর ‘পরি’ উপসর্গ যুক্ত হয়ে যথাক্রমে ‘উপহাস’ আর ‘পরিহাস’ শব্দ দুটি গঠিত হয়। অভিধান অনুসারে ‘ঠাট্টা’, ‘বিদ্রুপ’, ‘অবজ্ঞা’, ‘তামাশা’ প্রভৃতি অর্থে আলোচ্য শব্দ দুটি সমার্থক। আভিধানিক অর্থে শব্দ দুটি যতই সমার্থক হোক না কেন, ব্যাবহারিক প্রয়োগ কিন্তু একেবারেই ভিন্ন। আর, আমার পরবর্তী আলোচনা এই প্রায়োগিক পার্থক্য তুলে ধরার লক্ষ্যে এগিয়ে নেওয়া হয়েছে।

শুরুতেই উল্লেখ করে দেওয়া উচিত— সংস্কৃত ‘হস্’ ধাতুর সঙ্গে ‘অ’ প্রত্যয় যুক্ত হয়ে ‘হাস’ শব্দের উৎপত্তি। ‘√হস্’ মানে ‘হাস্য করা’, ‘বিদ্রুপ করা’ প্রভৃতি। এই ‘হস্’ ধাতুর সঙ্গে ‘ভাবে’ অর্থে ‘অ’ প্রত্যয় যুক্ত হয়ে ‘হাস’ শব্দটি গঠন করে। অর্থাৎ, যা হাসতে ভাবায় কিংবা যা হাসির উদ্রেক সৃষ্টি করে; যেখানে বিদ্রুপের ভাব থাকে, তাই (তা-ই) হচ্ছে ‘হাস’। পরবর্তী ধাপে এই ‘হাস’ প্রাতিপদিকের সঙ্গে ‘সম্যক’ অর্থে ‘উপ’ আর ‘পরি’ উপসর্গ যুক্ত হয়ে যথাক্রমে ‘উপহাস’ আর ‘পরিহাস’ শব্দ দুটি গঠিত হয়। ‘সম্যক’ মানে ‘সমগ্রভাবে’। অর্থাৎ, যেখানে সমগ্রভাবে কিংবা সামগ্রিকভাবে হাস্য নিহিত থাকে, বিদ্রুপের ইঙ্গিত থাকে; সেখানে ‘উপহাস’ কিংবা ‘পরিহাস’ থাকে।

ব্যুৎপত্তিগত বিশ্লেষণের মাধ্যমে আলোচ্য শব্দ দুটির ব্যাবহারিক অর্থ স্পষ্ট হয় বটে, কিন্তু প্রায়োগিক পার্থক্য নিয়ে সেই আগের ধোঁয়াশা থেকেই যায়। তাই, এই ধোঁয়াশা থেকে পরিত্রাণের জন্যে আলোচ্য শব্দ দুটিতে ‘উপ’ আর ‘পরি’ উপসর্গদ্বয়ের অন্তর্নিহিত অর্থ নিরূপণের জন্যে আমি *‘উপসর্গযুক্ত শব্দের অর্থ নিরূপণের বর্ণক্রম পদ্ধতি’ নির্ণয় করেছি এবং সেটির সাহায্যে আলোচ্য শব্দ দুটির প্রায়োগিক পার্থক্য নিরূপণ করেছি।

বাংলা বর্ণমালায় আগে ‘দন্ত্য-স’ এবং পরে ‘হ’ আসে। এই ক্রমটির সাহায্য নিয়ে ‘উপ’ আর ‘পরি’ উপসর্গ দুটিকে ‘দন্ত্য-স’-যুক্ত যথাযথ ধাতু বা শব্দের সঙ্গে জুড়ে দিয়ে ‘উপহাস’ আর ‘পরিহাস’ শব্দদ্বয়ের অর্থ ও প্রয়োগক্ষেত্র অত্যন্ত শ্লক্ষ্ণভাবে (সূক্ষ্মভাবে) নির্ণয় করা যায়। এই পদ্ধতিতে উপহাস আর পরিহাসের ব্যাবহারিক পার্থক্য নিরূপণের জন্যে প্রাসঙ্গিক অর্থ বিবেচনা করে এবং নিয়মনীতি অনুসরণ করে আদিতে ‘দন্ত্য-স’-যুক্ত প্রাতিপদিকের সঙ্গে ‘উপ’ আর ‘পরি’ উপসর্গ জুড়ে দিয়ে যথাক্রমে ‘উপস্থিতি’ আর ‘পরিসমাপ্তি’ শব্দ দুটি নির্ণয় করা হয়েছে।

‘উপস্থিতি’-র সঙ্গে ‘উপহাস’-এর সুস্পষ্ট সম্পর্ক রয়েছে। উপহাস করবার জন্যে উপহাসকের (যে উপহাস করে) সক্রিয় উপস্থিতি আবশ্যক হয়ে দাঁড়ায়। বর্ণক্রম বিবেচনায় নিলে— প্রথমে উপহাসকের উপস্থিতি নিশ্চিত হয়, তারপর সম্পন্ন হয় উপহাস। অর্থাৎ, বিদ্রুপকারীর সক্রিয় উপস্থিতেই উপহাস সম্ভব। যেখানে বিদ্রুপকারীর সক্রিয় উপস্থিতি থাকে না, সেখানে উপহাস থাকতে পারে না।

আবার, পরিসমাপ্তির সঙ্গে পরিহাসের নিবিড় সম্পর্ক রয়েছে। বর্ণমালার ক্রমের মতোই পরিসমাপ্তির পর পরিহাস লক্ষিত হয়। সরলভাবে বললে— কোনোকিছুর পরিসমাপ্তিতে যে ‘হাস’ বা ‘বিদ্রুপ’-এর সৃষ্টি হয়; নিয়তির অনাকাঙ্ক্ষিত সমাপ্তি পাওয়া যায়, তাই (তা-ই) হচ্ছে ‘পরিহাস’। এই সংজ্ঞার্থ দুটি স্পষ্টতর করবার জন্যে কিছু প্রায়োগিক উদাহরণ উল্লেখ করা আবশ্যক এবং আমিও এই আবশ্যকতা উপলব্ধি করে নিম্নের উদাহরণ কটির মাধ্যমে স্পষ্টতর করবার চেষ্টা করেছি।

দিলফার /র/ উচ্চারণ করতে পারে না। সে /র/ ধ্বনির উচ্চারণও /ব/ করে। ‘বারো’, ‘আচার’ প্রভৃতি শব্দ তার মুখ দিয়ে /বাবো/, /আচাব্/ প্রভৃতি রূপে বের হয়। দিলফার ঠিকমতো /র/ বলতে না-পারায় তার বন্ধুমহল তার সামনে /অ্যাগাবো, বাবো, ত্যাবো/ বলে ব্যঙ্গ করে, তাকে নিয়ে হাসে, বিদ্রুপ করে। যেহেতু এখানে ঠাট্টা-বিদ্রুপের সময় বিদ্রুপকারীর সক্রিয় উপস্থিতিতে দিলফারকে বিদ্রুপ করার কাজটি সম্পন্ন হচ্ছে, সেহেতু দিলফারের বন্ধুদের এই ঠাট্টা-বিদ্রুপকে উপহাস বলতে হবে, পরিহাস নয়।
দিলফার বন্ধুদের এই ঠাট্টা-তামাশা থেকে রেহাই পেতে টানা চার বছর /র/ উচ্চারণ শেখার চেষ্টা করল। কিন্তু তার ভাগ্য সহায় হলো না। চার বছর সমাপ্তির পরও সেই আগেরটাই রয়ে গেলে, অপ্রসন্ন নিয়তি তাকে /ব/-তেই আটকে রাখল। এই যে চার বছরের প্রচেষ্টায়ও ভাগ্য তার সহায় হলো না, তাকে হাসির পাত্র বানিয়ে অবজ্ঞা ভরে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে চলে গেল, এটিই হচ্ছে দিলফারের প্রতি ভাগ্যের পরিহাস, উপহাস নয়। কারণ, এখানে প্রচেষ্টার পরিসমাপ্তিতে এসে দিলফার ভাগ্যের বিদ্রুপে শিকার হয়েছে এবং এতে বিদ্রুপকারী ভাগ্যের কোনো সক্রিয় উপস্থিতি নেই।

জিম আর ডেলা (The Gift of the Magi) একে-অপরকে উপহার দেওয়ার জন্যে নিজেদের সবচেয়ে প্রিয় ও গর্বের জিনিস বিসর্জন দিয়েছিল। কিন্তু সেসব বিসর্জনের পরিসমাপ্তি-পরিণতি ছিল খুবই করুণ, একেবারেই অর্থহীন। নিয়তি যেন বিদ্রুপ করেই জিম ও ডেলার বিসর্জনকে অর্থহীন-হাস্যকর বানিয়ে দিয়েছিল। যেহেতু সেখানে বিদ্রুপকারী নিয়তির সক্রিয় উপস্থিতি ছিল না, সেহেতু জিম ও ডেলার ওই নিদারুণ পরিসমাপ্তি ছিল নিয়তির নির্মম পরিহাস, ‘উপহাস’ নয়।
আরজু সারাক্ষণ কানের মধ্যে ইয়ারফোন লাগিয়ে গ্রামের রাস্তায় রাস্তায় ঘোরে। তাকে এরকম করতে দেখে গ্রামের একদল ছেলে খুবই হাসিঠাট্টা করে। মাঝেমধ্যে ডাক দিয়ে বলে, ‘কী হে আরজু! মানুষ হাত দিয়ে স্যালাইন দেয়, আর তুই কিনা কান দিয়ে দিস!’ এই যে কানে ইয়ারফোন লাগিয়ে ঘোরাফেরা করায় এলাকার ছেলেরা আরজুকে নিয়ে ঠাট্টা-বিদ্রুপ করে, এটিই হচ্ছে উপহাস। কারণ, এখানে উপহাসকদের সক্রিয় উপস্থিতি রয়েছে।

জীবনের প্রায় পুরোটা সময়ই দেশ ও দেশের মানুষের পক্ষে কথা বলা শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক যখন জীবনের গোধুলি বেলায় গিয়ে নিজের দু-একটি কথা শোনাবার শ্রোতা পান না, খোশগল্প করবার সঙ্গী পান না, তখন ভবেশ রায়ের মতো স্মৃতিচারকেরা বলেন, ‘গোটা বাংলার মানুষ যাঁর মুখ থেকে নিঃসৃত এক একটি শব্দ শ্রবণের জন্যে অধীর-উদ্‌গ্রীব হয়ে থাকত, অদৃষ্টের নির্মম পরিহাসে শেষ সময়ে দেশের খবর জিজ্ঞেসা করবার মতো মানুষও তিনি পাশে পাননি।’ অদৃষ্টের পরিহাসই বটে। কারণ, জীবনের পরিসমাপ্তিতে গিয়ে তাঁর অদৃষ্ট বিরূপ আচরণ করেছে এবং এই বিরূপ আচরণে পরিহাসক অদৃষ্টের কোনো সক্রিয় উপস্থিতি নেই।
ম্যাগনাম প্রতিষ্ঠানের ম্যানেজিং ডিরেক্টর, মি. ইশমাম সবসময় নতুন কিছু করবার কথা ভাবেন, নিত্যনতুন চিন্তাভাবনার কথা বোর্ড মিটিঙে উত্থাপন করেন। তাঁর চিন্তাভাবনা অন্যান্য সদস্যদের কাছে অত্যন্ত হেঁয়ালি মনে হয়। তাই, তারা আড়ালে ইশমামকে ‘আধ-পাগল’ বলে হাসিতামাশা করে। ইশমামকে নিয়ে কোম্পানির অন্যান্য সদস্যদের এই হাসিতামাশাই হচ্ছে উপহাস। কারণ, এখানে বিদ্রুপকারীদের সক্রিয় উপস্থিতি বর্তমান।

স্কুলের প্রতিটি পরীক্ষায় ইংরেজিতে ৯৫-এর ওপরে নম্বর পাওয়া মেধাবিনী ছাত্রী আফসানা যখন জেএসসি পরীক্ষায় কেবল ওই ইংরেজিতে আশির ওপরে নম্বর না-পাওয়ায় জিপিএ-৫ পাওয়া থেকে বঞ্চিত হয়, তখন নিয়তির পরিহাসে প্রসঙ্গ সামনে এসে দাঁড়ায়। কিন্তু সারাটি বছরে টানা এক ঘণ্টার জন্যেও বই না-খোলা ফয়সাল যখন সাত বিষয়ের মধ্যে আট ( ? ) বিষয়ে অকৃতকার্য হয়, তখন আর নিয়তির পরিহাসের কথা উচ্চারিত হয় না; বরং সকলে মিলে তার উপহাসে মত্ত হয়।

মানুষ নিয়তির নির্মম পরিহাস এড়াতে না-পারলেও ব্যক্তির উপহাস এড়াতে পারে। তবে উপহাস সেদিনই সম্পূর্ণরূপে এড়ানো সম্ভব হবে, যেদিন আশপাশের মানুষের ‘মান’ আর ‘হুঁশ’-এর কোনো কমতি থাকবে না। আর, তেমনটি সম্ভব হলে সেদিন থেকে ‘উপহাস’ আর ‘পরিহাস’ শব্দদ্বয়ের যথাযথ প্রয়োগ নিয়ে ভোগান্তিরও ইতি ঘটবে।

সূত্র:  উপহাস বনাম পরিহাস, এবি ছিদ্দিক, শুদ্ধ বানান চর্চা (শুবাচ)

* একই ধাতু বা প্রাতিপদিকের সঙ্গে একই অর্থে যুক্ত হওয়া ভিন্ন ভিন্ন উপসর্গযোগে গঠিত দুটি সমার্থক শব্দের ব্যাবহারিক পার্থক্য নিরূপণের এক বিশেষ পদ্ধতি।


All Link

বিসিএস প্রিলি থেকে ভাইভা কৃতকার্য কৌশল

ড. মোহাম্মদ আমীনের লেখা বইয়ের তালিকা

বাংলা সাহিত্যবিষয়ক লিংক

বাংলাদেশ ও বাংলাদেশবিষয়ক সকল গুরুত্বপূর্ণ সাধারণজ্ঞান লিংক

বাংলা বানান কোথায় কী লিখবেন এবং কেন লিখবেন/১

বাংলা বানান কোথায় কী লিখবেন এবং কেন লিখবেন/২

বাংলা বানান কোথায় কী লিখবেন এবং কেন লিখবেন /৩

কীভাবে হলো দেশের নাম

ইউরোপ মহাদেশ : ইতিহাস ও নামকরণ লিংক

শুদ্ধ বানান চর্চা লিংক/১

দৈনন্দিন বিজ্ঞান লিংক

শুদ্ধ বানান চর্চা লিংক/২

শুদ্ধ বানান চর্চা লিংক/৩

শুদ্ধ বানান চর্চা লিংক/৪

কীভাবে হলো দেশের নাম

সাধারণ জ্ঞান সমগ্র

সাধারণ জ্ঞান সমগ্র/১

সাধারণ জ্ঞান সমগ্র/২

বাংলাদেশের তারিখ

ব্যাবহারিক বাংলা বানান সমগ্র : পাঞ্জেরী পবিলেকশন্স লি.

শুদ্ধ বানান চর্চা প্রমিত বাংলা বানান বিধি : বানান শেখার বই

কি না  বনাম কিনা এবং না কি বনাম নাকি

মত বনাম মতো : কোথায় কোনটি এবং কেন লিখবেন

ভূ ভূমি ভূগোল ভূতল ভূলোক কিন্তু ত্রিভুবন : ত্রিভুবনের প্রিয় মোহাম্মদ

মত বনাম মতো : কোথায় কোনটি এবং কেন লিখবেন

প্রশাসনিক প্রাশাসনিক  ও সমসাময়িক ও সামসময়িক

বিবিধ এবং হযবরল : জ্ঞান কোষ

সেবা কিন্তু পরিষেবা কেন

ভাষা নদীর মতো নয় প্রকৃতির মতো

এককথায় প্রকাশ

শব্দের বানানে অভিধানের ভূমিকা

আফসোস নিয়ে আফসোস

লক্ষ বনাম লক্ষ্য : বাংলা বানান কোথায় কী লিখবেন

ব্যাঘ্র শব্দের অর্থ এবং পাণিনির মৃত্যু

যুক্তবর্ণ সরলীকরণ আন্দোলন : হাস্যকর অবতারণা

error: Content is protected !!